শত ফুল ফুটতে দিন

১.আমাদের দেশের বামপন্থী দলগুলোর সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে ছাত্র সংগঠনগুলোর গুরুত্ব অন্যান্য যেকোন সহযোগী সংগঠন থেকে বেশি।ছাত্র সংগঠন থেকেই ভবিষ্যৎ সক্রিয় এবং সার্বক্ষণিক নেতৃত্ব উঠে আসে।প্রত্যেকটা বাম ছাত্র সংগঠন দলীয় আদর্শের ভাবধারানুযায়ী তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।তবে ঐতিহ্যময় ছাত্র ইউনিয়ন তাদের স্বাধীন গণসংগঠন বলে পরিচিত করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।একারনে অনেক উদারপন্থী ছাত্র এই সংগঠনে যুক্ত হতে পারে।ছাত্র ইউনিয়নের রিক্রুটমেন্ট অন্যান্য সংগঠনের থেকে অনেক বেশি।তবে কর্মীর মানের ক্ষেত্রে ছাত্র ইউনিয়ন অতটা কড়াকড়ি নয় যতটা অন্যান্য দলীয় বাম ছাত্র সংগঠনগুলো বজায় রেখে সদস্যপদ দেয়।বামছাত্র সংগঠনগুলো সাধারণত দুটো বৃহৎ জোট, প্রগতিশীল ছাত্রজোট এবং সম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্য জোটে একত্রিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আন্দোলন করে থাকে।বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির যা কিছু ভালো অর্জন তার সবকিছুর সাথে বাম ছাত্র সংগঠন বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়ন জড়িত।প্রতিটি প্রগতিশীল, সংস্কৃতিবান এবং সমাজ ও রাজনীতি সচেতন ছেলে বা মেয়ের স্বপ্ন থাকে বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে একটি বাম ছাত্রসংগঠনে যুক্ত হওয়ার।

২.বাম ছাত্র সংগঠনের কর্মী সংগ্রহের প্রসেস টা কিরকম? -ছাত্র ইউনিয়ন এর অধিকাংশ সদস্য আসে খেলাঘর থেকে এবং সিপিবি পরিবারের সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ভর্তি হয়।ছাত্র ফ্রন্টের শিশু কিশোরদের সংগঠন শিশুকিশোর মেলা থেকে এবং বাসদ ওরিয়েন্টেড পরিবারের সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজে ভর্তি হয়।এছাড়াও যেসব ছেলে মেয়ে পাঠ্যবিষয়ের বাহিরে বিভিন্ন বই পড়ে থাকে,চিন্তাভাবনার একটা মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড ধারণ করে এরা কোন না কোনভাবে জড়িয়ে যায় বাম রাজনীতির সাথে।কারণ এইসব অগ্রসর চিন্তাভাবনা লালনকারী ছেলেমেয়েদের প্রথাগত ডানপন্থী বা মধ্যপন্থি ছাত্রসংগঠন গুলো ধারণ করতে পারেনা। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর সাথে জড়িত ছাত্ররা সাধারণত নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। যাদের অধিকাংশই পার্টি লিংকে টিউশনি কিংবা কোন ডোনারের ফিন্যান্সিয়াল সাপোর্ট নিয়ে লেখাপড়া করে।রিক্রুটমেন্ট করা হয় প্রাথমিক সদস্য হিসেবে।এরপর চলে কমিউনিস্ট আদর্শে গড়ে তোলার নিবিড় পরিচর্যা।

৩. বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজের রঙিন জীবনে পা দিয়ে বাম ছাত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত হয় কোন সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণ, মিছিলে স্লোগান ধরে দুনিয়ার মজদুর এক হও লড়াই কর কিংবা শিক্ষা কোন সুযোগ নয় শিক্ষা আমার অধিকার, অথবা যুগের শ্রেষ্ঠ মতাবাদ মার্ক্সবাদ লেলিনবাদ। এভাবে এগিয়ে চলে লাল পতাকার বিশ্বজয়ের মিছিল,সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন।সংগঠনের শীর্ষ ব্যক্তির প্রতি মুগ্ধতা আর কমরেডদের সাথে নিজের স্বপ্ন একাকার করে নতুন পরিবার হয়ে ওঠে সংগঠন।নিজেদের মধ্যে এতটাই গড়ে ওঠে যে চায়ের কাপ থেকে শুরু করে হলের কিংবা মেসের ডাইনিং সব যৌথ হয়ে যায়।শুরু হয় এই বাংলা ওই বাংলার সমাজতন্ত্রের অ আ ক খ পুস্তক নীহার কুমার সরকারের ছোটদের রাজনীতি অর্থনীতি। এছাড়া চলে গঠনতন্ত্র আয়ত্ব করা।পার্টি অফিসে নিয়মিত যাতায়াত। পার্টির সিনিয়র নেতাদের সাথে আড্ডা এবং রাজনীতির পাঠ।পার্টি অফিসে দাস ক্যাপিটাল কিংবা মাওয়ের রেডবুক হাতিয়ে দেখা।পার্টির ছোটখাটো প্রকাশনা কেনা ও বিক্রির দায়িত্ব নেয়া।সিনিয়র ছাত্রনেতার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের লিংকড শিক্ষকদের চেম্বারে যাতায়াত, দলীয় মুখপত্র বিক্রি। বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য প্রসাশনের মাথাওয়ালদের সাথে মিটিং সবমিলিয়ে কর্মব্যস্ত সময় শেষে দলীয় টেন্টে বসে চা বিড়ি ফুকানো যেন একটু প্রশান্তি। আর নারী কমরেডসদের জন্য বাড়তি উদ্দীপনা সংগঠনে কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়।কমরেড অনিমেষ সবার মধ্যেই ভর করে।পোশাক আশাক সেরকম খেয়ালের বাইরে চলে যায়,সময় কই এসব ভাবার।আর নিজেকে ডিক্লাসড করতে হবেনা।নিজের শ্রেণী চরিত্র যদি সর্বহারা শ্রেণীর কাতারে নিয়ে আসা না যায় তাহলে বিপ্লবী হওয়া যাবেনা।যখন দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের উপর পাঠচক্র শুরু হয়,তখন শুরু হয় পেইন।নেতাবলেন সবকিছু বিচার করতে হবে ডায়ালেক্টিস দিয়ে।মার্ক্সবাদ হল সর্বশ্রেষ্ঠ মতবাদ। এর উপরে আর কিছু নাই।শুধু শুনতাম সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণী একনায়ক তন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শাসক শ্রেণীকে স্বশস্ত্র বিল্পবের মাধ্যমে উৎখাত করতে হবে। আমি বলতাম নেতাকে বলতাম ভাই আমাদেরও কি অস্ত্র হাতে নিতে হবে, মামানে যুদ্ধ করতে হবে? তিনি বলেন বিপ্লবের জন্য দুয়েকটা বুর্জোয়া মারতে তো হবেই! আমি প্রশ্ন তুললাম, তাহলে বুর্জোয়ারাও কি শ্রমিকশ্রেণীতে নেমে আসবে।নেতা বলতেন শ্রেণী বিলুপ্ত হয়ে যাবে।আমি আমতাআমতা করে বলেছিলাম তাহলে শ্রমিক শ্রেণীও কি বিলুপ্তি ঘটবে।??

৪. এভাবে বিপ্লবী জীবন চলার পর প্রথম বর্ষে রেজাল্ট খারাপ করে অনেকেই বিপ্লবের পাঠ চুকিয়ে একাডেমীশিয়ান হয়ে যায়।আবার যুক্ত হয়,আর কিছু টিকে যায়।প্রত্যেক দলের নিজস্ব পাঠক্রম থাকে।সে অনুযায়ী বই পড়তে হয়।পাঠক্রমে কেন্দ্রীয় নেতারা যেসব বই তালিকায় দেন সেগুলো একই চিন্তার।চিন্তার বৈপরীত্য কিছু পাওয়া যাবেনা।প্রত্যেক দলের ছাত্র সংগঠনকে শেখানো হয় তাদের বিপ্লবী পন্থা সঠিক এবং তাদের রণকৌশল ও রণনীতি সহীহ।পার্টির নেতাই হল দেশের সৎ নেতা।পার্টি অফিসে ঝুলানো মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, মাও সে তুং এরা সবাই কমিউনিস্ট দেবতা।এদের প্রতিটি বাক্যই অপ্ত বাক্যের মত বিপ্লবীদের মেনে চলতে হবে।এভাবে চিন্তাভাবনার জগৎ সংকুচিত হতে থাকে ক্রমশ।রুশ প্রগতি প্রকাশনীর বই পড়তে বেশি উৎসাহিত করা হয়।যেসব লেখক কিংবা দার্শনিক কম্যুনিস্ট মতাদর্শ ধারণ করেনা এরা সবাই বুর্জোয়া শ্রেণীর প্রতিনিধি। এদের নাটক, সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র সব সম্রাজ্যবাদের প্রোপাগান্ডা। খুবই সুকৌশলে কম্যুনিস্ট ধারার বাইরের জগৎ থেকে বিছিন্ন করে রাখা হয়।বুঝে হোক আর না বুঝে হোক গিলতে হবে বস্তুবাদ। মার্কিন সম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সদা সজাগ থাকতে পরামর্শ দেয়া হত।বার্লিনের দেয়াল পতন,সোভিয়েত পতন থেকে ইরাক, আফগান, ফিলিস্তিন সবকিছু মার্কিন সম্রাজ্যবাদের চক্রান্ত এই বলে একচ্ছত্র মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সকাল সন্ধ্যা গুষ্ঠি উদ্ধারের প্রতিযোগিতা চলতো। দু তিন বছর সিনিয়র হলেই পার্টির অলিখিত মেম্বার হিসেবে ধরে নেয়া হত ছাত্রকে।চাঁদা সংগ্রহের যাবতীয় কৌশল পুস্তিকারেই প্রকাশিত হত কোন কোন দলের।তত্ত্ব ও প্রয়োগ এই চলতে চলতে ফাইনাল ইয়ার শেষে আট দশটা ক্রাশ নিয়ে কিছুকাল ক্যাম্পাসে থাকা।সিরিয়াস সংগঠন করা অধিকাংশ ছাত্রনেতা ভালো ফলাফল নিতে পারেনা।গড়পড়তা রেজাল্টও জোটেনা।যদি পার্টির কোন নারী কমরেড এর সাথে সম্পর্ক হলে ভালো, না হলে চিরকুমার থাকা অবধারিত।

৫. এসব জুয়েল ছেলেমেয়েরা যারা পার্টি প্র‍্যাক্টিসে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এরা একসময় চিন্তার বৈকল্যে ভোগে।কারণ তাদের নেতাদের ত্যাগী জীবন দেখে একধনের ডিভোশন তৈরি হয় যা তাদের মধ্যে মানসিক আপোষ করতে বাধ্য করে।এরা জানেনা স্ট্যালিনের হত্যাযজ্ঞ,মাও সে তুং ‘য়ের হত্যাযজ্ঞ,পলপটের কম্বোডিয়ার গণহত্যা। প্রতিটি সমাজতান্ত্রিক রেজিমে রয়েছে হত্যা আর নির্যাতনের কালো অধ্যায়।ইয়াং কমরেডস রা খুব উদ্যোগী না হলে এগুলো বিষয়ে জানা খুব দুরহ।ইন্টারনেট এর যুগে এই তথ্য ও লেখাগুলো উন্মুক্ত।তাই কম্যুনিজমের মোহমুক্তি ঘটা অস্বাভাবিক নয়।এক একেকটা খুনিকে যখন নায়ক হিসেবে উপস্থাপন করা হয় তা অপরাধ। বুঝে না বুঝে কম্যুনিস্ট নেতাগণ এটি করে থাকেন।

৬. আমি আমার জীবনের অনেকটা সময় কম্যুনিস্ট আদর্শের পিছনে ছুটেছি। থেমে গেছি একসময়, যখন পড়ে জেনেছি বিভিন্ন দেশে এই মতবাদের প্রয়োগ অত্যন্ত বাজেভাবে ঘটেছে।আমাদের পাশের দেশের নকশালবাড়ী কি কম অতংকের,কিংবা পূর্ব বাংলা কম্যুনিস্ট পার্টির নির্মমতার ইতিহাস আমাদের কমবেশি জানা।জেনেশুনে একটা খুনে হিংসাত্নক মতবাদ লালন করতে পারিনা।একজন দার্শনিক হিসেবে মার্ক্স সমাজ বিশ্লেষনের অন্যতম যোগসুত্র কিন্তু স্ট্যালিন এর মত খুনি ঘৃণিত। আমার ব্যক্তিগত অবজারভেশন হল, কম্যুনিস্ট নেতাকর্মীরা অত্যন্ত সৎ এবং ভালো মানুষ। প্রত্যেকে শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য।ত্যাগ না থাকলে একটা আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে জীবন পার করা যায়না।যেসব তরুণরা বাম ছাত্রসংগঠনের সাথে জড়িত তারাও সৎ এবং অগ্রসর চিন্তার প্রগতিশীল মানুষ।আপনাদের প্রতি আহবান সকল মতের সাথে পরিচিত হন,একরৈখিক চিন্তার বিকলাঙ্গতা দুর করে উদার মুক্তচিন্তা ধারণ করুন।একনায়ক মাও একটা ভালো কথা বলে গেছেন,
“শত ফুল ফুটতে দিন
‌ শত মত প্রকাশ করতে দিন।”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

92 − = 90