ব্যক্তির অভিব্যক্তি ও রাজনৈতিক

রাজনীতি সংকীর্ন অর্থে, মতাদর্শ, সরকার, দল, ভোট – ইত্যাদি। রাজনীতি মর্মার্থে ক্ষমতা। সিদ্ধান্ত গ্রহণ (নীতি, পলিসি) ও বাস্তবায়ন ক্ষমতা। যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সকল নাগরিকের কম বেশি ভূমিকা থাকে। কোন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমাদের অভিব্যাক্তি, সন্মতি দিয়ে, মৌন সন্মতি দিয়ে কিংবা বিরোধিতা করে হয়ে থাকে। আমাদের ব্যক্তিগত অভিব্যক্তিও রাজনৈতিক।

এই সিদ্ধান্তক্ষমতার প্রভাব পরে সকল মানুষের জীবনে। নির্ধারন করে দেয় ব্যক্তি নারী বা পুরুষ হিসেবে, একজন পেশাদার হিসেবে, একজন শ্রেণীবর্গের সদস্য হিসেবে আপনি কি সুবিধা বা অসুবিধার মধ্যে থাকবেন।
আমরা কেউই সেকারণে রাজনীতির বাইরের মানুষ নই। আমরা রাজনীতি নিরপেক্ষ নই। ব্যক্তিগত যা সবই আসলে রাজনৈতিক।

সরকার রাজনীতি করছে, রাজনৈতিক দল রাজনীতি করছে, মিডিয়া রাজনীতি করছে, ব্যাবসায়িরাও রাজনীতি করছে রাষ্ট্রীয় নীতিকে প্রভাবিত করে। ফেবুতেও আমরা রাজনীতি করছি, লাইক দেয়া বা না দেয়া একধরনের ভোট, কোন না কোন বার্তা ও মতাদর্শকে সমর্থন, মৌন সমর্থন কিংবা বিরোধিতা করে।

ব্যক্তি হিসেবে আমি কি কি ধরনের রাজনীতি করতে পারি?
আমি তিন ধরনের রাজনীতি করতে পারি। (১) প্রচলিত নীতি সমালোচনার, (২) প্রচলিত নীতি সমর্থনের, এবং (৩) প্রচলিত নীতি রূপান্তরের।
(১) সমালোচনার রাজনীতিঃ এটা নানা ধরনের আছে। ক্ষমতায় যারা আছে তাদের “ভুল” ধরিয়ে দেয়ার জন্য (সিপিবির অনেক কর্মীর মনোভাব দেখেছি যারা মনে করে আওয়ামীলীগকে সমালোচনা করলে তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিছু করবে)। ক্ষমতায় যারা আছে তাদের চাপ দিয়ে পলিসি সংস্কারের জন্য সমালোচনা (যেমন, সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন পরিবেশ বান্ধব নীতির জন্য)। ব্যার্থতার সমালোচনা যাতে প্রচলিত ক্ষমতার বৈধতা কমে যায় ও বিরোধী দলের ক্ষমতায় আসার সুযোগ তৈরি হয় (বিএনপি জামাত জোটের সমালোচনা)।

সমালোচনার রাজনীতির কি ধরণের প্রভাব থাকে?
প্রথমতঃ আত্মতৃপ্তি। আমার কিছু অপছন্দের ব্যাপার আমি বললাম। এটা প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে আমার কিছু ক্রোধ বা হতাশা প্রশমিত হল। আড্ডায় অপছন্দের লোকদের “ধুয়ে দেয়ার” আনন্দ মানসিক স্থিরতার জন্য খারাপ না।

দ্বিতীয়তঃ আমি এটাকে বলি “প্রেশার কুকার” এফেক্ট। সমালোচনা করার মধ্য দিয়ে অনেক “সংস্কার” হয়। “সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন” দাবীর আন্দোলনের “বিজয়” আমরা নারায়ণগঞ্জে দেখলাম। এটি প্রচলিত নির্বাচন ব্যাবস্থায় পরিবর্তন আনে ততটুকুই, যা শাসকশ্রেণীর শান্তিপুর্ন ক্ষমতা হস্তান্তর করতে সহায়ক। একই সাথে এই ধরনের আন্দোলন সমাজের প্রচলিত শোষণ বঞ্চনা থেকে যে টেনশন তৈরি হয় সেই ক্ষোভ প্রেশার কুকার পদ্ধতিতে বের হয়ে যায়।

তৃতীয়তঃ বৈধতা বাড়ানো বা কমানো। লেজিটিমেসি ডেফিসিট বা বৈধতা কমানোর জন্য সমালোচনা খুব কাজ দেয়। অপেক্ষাকৃত অপছন্দের লোকও লাভবান হয় এই ধরনের সমালোচনায়। এই ধরনের সমালোচনা সাধারণত শাসকশ্রেণীর ক্ষমতার বাইরের অংশকে ক্ষমতায় বসাতে সহায়তা করে। বাংলাদেশে এই সমালোচনার একটি উদহারন “সমদূরত্বের” রাজনীতি যা বাংলাদেশে বিবদমান দুই জোটকে সমান্তরালে এনে এদের পার্থক্য আড়াল করা হয়, প্রগতিশীল অংশটির বৈধতা কমানো হয়, অপেক্ষাকৃত খারাপটি লাভবান হয়।

আমি কেন কাকে কি উদ্দেশ্যে সমালোচনা করছি? আমি কি উপসর্গকে সমালোচনা করে প্রচলিত ব্যাবস্থা সংস্কারের কাজ করছি? আমি কি নীতিকে সমালোচনা করছি, ব্যাবস্থাকে সমালোচনা করছি, নাকি ব্যাক্তিকে সমালোচনা করছি? আমি কি প্যাথলজিক্যাল সমালোচক? – এই প্রশ্নগুলো জরুরি।

(২) সমর্থনের রাজনীতিঃ প্রধানত দুই ধরনের। এক ধরনের হচ্ছে, আমার রাজনৈতিক বিশ্বাসের সাথে মিলে যায় ফলে আমি সমর্থন করছি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বলে আওয়ামীলীগ সরকারকে সমর্থন, অথবা ভারতকে পছন্দ করিনা বলে বিএনপি সরকারকে সমর্থন। হতে পারে দুই দলের কাউকেই নয়, কিন্তু কিছু নীতি সমর্থন করছি। আওয়ামীলীগের যুদ্ধাপরাধীবিচার নীতির সমর্থন করছি, আওয়ামীলীগকে নয়।

দ্বিতীয় ধরন হচ্ছে, কর্মসুচি ভিত্তিক সমর্থন। জাপানের বিরুদ্ধে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি চীনের রক্ষণশীল পার্টির সাথে জোট করেছিল। কৌশলগত সমর্থন। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি সফল হয়েছে। ৩৩% ভোট পেয়ে জার্মানিতে ফ্যাসিবাদ ক্ষমতায় এসেছে, তারপর যুদ্ধ ও হত্যার পৈশাচিকতা ও মানবতার ধংসযজ্ঞ আমরা দেখেছি। জার্মান কমিউনিস্ট ও লিবারেলরা জোটবদ্ধ হলে ইতিহাস ভিন্ন রকম হতে পারত। জামাত, নেটেনিয়াহু বা ট্র্যাম্প কোন কাল্পনিক জুজু নয়, এরা বাস্তব। ( বাংলাদেশে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ঐক্যজোট বাতিল করে, কারণ তারা মনে করে এই দেশে বাস্তবে সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ বলে কিছু নেই, সব কাল্পনিক জুজু)।

জোট হিসেবে পারস্পরিক সমর্থন রণকৌশলগত। প্রধান শত্রুর বিরুদ্ধে জোটের উপকারিতা আছে। কিন্তু জোটের রাজনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে ভুল কৌশল অনুসরণ আত্মবিলোপ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। বাকশালগঠন সম্ভবত একটি কৌশলগত ভুল যা জোটের বদলে সিপিবিকে আত্মবিলোপের ঝুঁকির দিকে নিয়ে যায়। বিপরীতে যা হতে পারত, তা হল, বাকশালের বদলে সদ্যস্বাধীন দেশে মুক্তিযুদ্ধের অংশীদার সকল দলের জাতীয় জোট। সেটা হলে বাংলাদেশের অবস্থা অন্যরকম হতে পারত।

সরকারে অবস্থান নেয়া না নেয়ার প্রশ্নে জাসদ ইতোমধ্যেই বিভক্ত। তারমানে এই না যে এটা জাসদের ১৪ দলের জোটে থাকার ফল। জোটে ছিলোনা, জোট থেকে “সমদূরত্বে” থাকা বাসদও বিভক্ত হয়েছে। এই বিভক্তির কারণ আভ্যন্তরীণ, জোটে থাকা না থাকার সাথে এর সম্পর্ক মৌলিক নয়।

(৩) রূপান্তরের রাজনীতিঃ রূপান্তরের রাজনীতি মানে সমাজতন্ত্রের রাজনীতি। এটাও নানা পথে হতে পারে। সহিংস কিংবা অহিংস পথে। উদহারন, রাশিয়া, চীন, কিউবা, নিকারাগুয়া কিংবা ভেনেজুয়েলা। সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের দলের ক্ষমতা দখল সম্ভব। শ্রেণীশোষণ ও পিতৃতান্ত্রিক শোষণ বঞ্চনা বিলোপ ও সমতাভিত্তিক সমাজের নীতি গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন সম্ভব। এই ক্ষমতা দখল নির্বাচনের মাধ্যমেও হয়েছে। (পুঁজিবাদের কালপর্বের যুগে রাষ্ট্রীয় সমাজতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় অনেক দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতা আছে। ক্ষমতাশ্রেণী হিসেবে রাষ্ট্রের বা আমলাতন্ত্রের আবির্ভাবের সমস্যা আছে, কিন্তু এইসব রোগ সম্ভবত সমাজ বিবর্তনের অনুষঙ্গ। সেটা অন্য আলোচনা।)

রূপান্তরের রাজনীতি মানে শ্রেণীসংগ্রাম, এবং শ্রেণী সংগ্রাম মানে সশস্ত্র সংগ্রাম, দুনিয়ার নানা দেশের সাম্যবাদীদের কাছে এই ধারনাটি এখন বাতিল। অন্যকথায়, ধংস করে গড়তে হবে, রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙ্গে নূতন সর্বহারার একনায়কতন্ত্র কায়েম করতে হবে, এই সব ধারনা বাতিল হয়ে গেছে (মার্ক্সবাদের চটি পাঠকদের মধ্যে হয়ত এইধরনের ধারনার অবশেষ এখনো আছে)। সর্বহারার একনায়কতন্ত্রের বদলে “এক্সপানশন অফ ডেমোক্রেটিক কন্ট্রোল” ধারনা বিকশিত হচ্ছে। ফলে, জনগণের সমাজতন্ত্র, নীচ থেকে গড়ে তোলা সমাজতন্ত্র, সৃজনশীল ধ্বংস এবং সৃজনশীল রূপান্তর কৌশল – ইত্যাদি নানা নামে অহিংস শ্রেণীসংগ্রামের ধারনা বিকশিত হয়েছে।

রূপান্তরের রাজনীতির জন্য সামাজিক আন্দোলন দরকার, সাংস্কৃতিক নির্মান দরকার, ভবিষ্যৎমুখী রাজনৈতিক কর্মসুচি দরকার। আমেরিকায় “অকুপাই ওয়ালস্ট্রীট” এমন একটি সামাজিক আন্দোলন যা প্রচলিত শ্রেণী বাস্তবতা উন্মোচন করছে।
বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জন্য এক অসাধারণ সাংস্কৃতিক সম্পদ, যা বাংলাদেশের রূপান্তরের রাজনীতির ভিত্তি প্রস্তত করে দিয়েছে। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ (জাতীয়তাবাদের গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী ব্যাখ্যার প্রয়োজন সহ) বাস্তবায়ন প্রশ্নে সুনির্দিস্ট নীতি ও কর্মসুচি উপস্থাপন করা অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য অপরিহার্য্য। এবং অর্থনৈতিক মুক্তির কাজটি কেবল সমাজতন্ত্রীরাই পারে, আওয়ামীলীগ নয়। আওয়ামীলীগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সমাজশক্তির সমর্থন পাচ্ছে, কারণ আর কোন শক্তি সামনে নেই।

সুনির্দিষ্ট নীতি ও কর্মসুচি উপস্থাপন করতে হলে, সমাজতন্ত্রীদের হোমওয়ার্ক দরকার। আপনি যখন অন্যদের কেবল সমালোচনা করেন, তার ইমপ্লিসিট বা অন্তর্নিহিত বার্তা হচ্ছে, আপনি নেতৃত্ব দিতে অনিচ্ছুক এবং আপনি একজন অযোগ্য লোক, কেবল অন্যদের নিন্দা করেন। জনগণ নিন্দা শুনতে চায়না, সমস্যার সমাধান চায়। সমাধান প্রস্তাব উপস্থাপন না করে বাকবাকুম করলে আপনার প্রতি জনগণের আস্থা কিভাবে তৈরি হবে?

রূপান্তরের রাজনীতি বিকশিত না করে, আপনি জোটেই থাকুন বা “সমদূরত্বে” থাকুন, আপনি অযোগ্য লোক। এবং আপনি সরকারের সমালোচনা বা সমর্থন যা ই করেন না কেন, আপনি এই বৈষম্যমূলক ব্যাবস্থার পক্ষের লোক।
শোষণ, বঞ্চনা, বৈষম্য ও সহিংসতার সমালোচনা ও নীতিকথা আওড়ানো শেষ কথা নয়। সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মত প্রকাশও শেষ কথা নয়। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের নীতি ও কর্মসুচি নিয়ে আলোচনা এই সময়ের একটি অন্যতম প্রধান কাজ হতে পারে, রূপান্তরের রাজনীতির।

যারা কোন দলে নেই, সক্রিয় ভাবে, ব্যক্তি হিসেবে আমরা কি পারি? আমরা প্রশ্ন করতে পারি, বিশ্লেষণ করতে পারি, রূপান্তরের রাজনীতিটাকে সবার চোখের সামনে আনতে পারি। মতামত গঠনে সক্রিয় থাকতে পারি। রূপান্তরের রাজনীতির জন্য বুদ্ধির মুক্তি দরকার (দলীয় পীরদের বাতিল করে), সৃজনশীল কর্মযজ্ঞ দরকার, সাধ্যমত সেটুকুই চেষ্টা করি না কেন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “ব্যক্তির অভিব্যক্তি ও রাজনৈতিক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

73 + = 75