ঈশ্বরঃ আস্তিকতা,নাস্তিকতা,অজ্ঞেয়বাদীতা এবং ঈশ্বরের দার্শনিক ব্যাখ্যা

গভীর ভাবনায় আস্তিকতা ও নাস্তিকতাঃ

১.১ কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে আপনি কি আস্তিক? আমি নিরব থাকি। আবার কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে আপনি কি নাস্তিক? তখনও আমি নিরব থাকি। কারন তখন আমার মনে প্রশ্ন জাগে প্রশ্নকারী আস্তিক, নাস্তিক বলতে কি বুঝেন তা আগে আমার জানা দরকার। অধিকন্তু “অজ্ঞেয়বাদী” শব্দটিতেও একেকজন একেক অর্থ বহন করে। অতএব, আস্তিক, নাস্তিক কিংবা অজ্ঞেয়বাদী প্রশ্নে আমার নিকট এক কথায় হ্যাঁ, না কোন জবাব নেই।

১.২ ধর্মে ধর্মেতো পার্থক্য আছেই,ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে ঈশ্বর ভাবনা কিংবা চিন্তায় পার্থক্য রয়েছে।প্রতিটি মানুষেরই ঈশ্বর চিন্তা পৃথক। পৃথিবীর ৮০০কোটি মানুষের ঈশ্বর ভাবনা ৮০০কোটি রকম। পৃথিবীর যেকোন দুইটি ব্যক্তি যদি ঈশ্বর ভাবনায় তর্ক-বিতর্ক কিংবা মত বিনিময় করে তবে তাদের ঈশ্বর ভাবনার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যাবে। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে যেকোন দুইজন চিন্তাশীল ব্যক্তি ঈশ্বর ভাবনায় শতভাগ একমত পোষণ করতে পারবেনা!

১.৩ একজন স্পিরিচুয়ালিস্ট কিংবা একজন সর্বেশ্বরবাদী যিনি মনে করেন তিনি God বা ঈশ্বরের অংশ তাঁর নিকট ” আপনি কি আস্তিক কিংবা নাস্তিক?” প্রশ্নটি অর্থহীন। কারন তিনি মনে করেন জগতই ঈশ্বর, ঈশ্বরই জগত! তারমতে নিজেকে বিশ্বাস করলেই ঈশ্বরে বিশ্বাস হয়ে যায়। পৃথক ভাবে ঈশ্বরকে বিশ্বাস করা মানে নিজেকে ঈশ্বর থেকে পৃথক ভাবা। তাঁর মতে জড়ীয়-অজড়ীয় কিংবা জৈব-অজৈব কিংবা বাস্তব-অবাস্তব প্রতিটি দৃশ্যমান/অদৃশ্যমান, মূর্ত-বিমূর্ত প্রতিটিই সত্তাই ঈশ্বরের অংশ। আস্তিক, নাস্তিক,অজ্ঞেয়বাদী, সংশয়বাদী ইত্যাদি বিষয়ক প্রশ্ন অর্থহীন!

১.৪ কোন কিছুর অস্তিত্বের বিষয়ে পাঁচটির যেকোন উত্তর হতে পারেঃ ১) আছে ২) নেই ৩) আছে এবং নেই(শর্তযুক্ত/আপেক্ষিক ৪) জানিনা ৫) আলোচনাই অর্থহীন। ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রশ্নে, ১=আস্তিক, ২=নাস্তিক এবং ৩,৪,৫=অজ্ঞেয়বাদীতা/সংশয়বাদীতা।

১.৫ একজন বিজ্ঞান মনষ্ক ব্যক্তিরও ঈশ্বর বিষয়ক প্রশ্নের কোন সাইন্টিফিক উত্তর নেই। তিনি অবশ্যই ঈশ্বর সম্পর্কে দার্শনিক অভিমত ব্যক্ত করতে পারেন কিন্তু তা কখনও বৈজ্ঞানিক নয়!

১.৬ ঈশ্বর বিষয়ক প্রশ্ন করা যতটা সহজ ঠিক ততটাই কঠিন এর উত্তর দেওয়া। ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমান করা যতটা কঠিন ঠিক ততটাই কঠিন তার অনস্তিত্ব প্রমান করা!

১.৭ অতএব, ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও অনস্তিত্ব থাকার সম্ভবনা ফিফটি-ফিফটি! সম্ভবত এই সম্ভবনা থাকবে অনন্তকাল কিংবা দেশ-কালহীনতায়!

১.৮ এই জন্যই আমি ঈশ্বর প্রশ্নে অজ্ঞেয়বাদী এবং আমি মনেকরি বিজ্ঞানের অবস্থানও তাই হওয়া উচিত!

ঈশ্বরের দার্শনিক ব্যাখ্যাঃ

ধরাযাক, আপনি একটি ঘরে কিংবা একটি বৃহদাকার বাক্সের ভেতরে অবস্থান করছেন। ঘরটিতে আপনি ছাড়া অন্য কোন বস্তুগত কিছুনেই। আপনার শরীরে একটা সূতাও নেই অর্থাৎ আপনি উলঙ্গ। এ অবস্থায় আপনার কোন একটি কিছু তৈরি করতে ইচ্ছে করল। কিন্তু কোন কিছু তৈরি করতে হলে কিছু একটা প্রয়োজন। কিন্তু যৌক্তিক ভাবেই “কিছুনা”থেকে “কিছুনা” বানানো আপনার পক্ষে সম্ভব! ইচ্ছে করলে আপনি আপনার চুল গুলো ছিড়ে একটা কিছু বানানোর চেষ্টা করতে পারেন! অর্থাৎ আপনি যা বানাতে চান তা আপনার শরীরের অংশ ব্যবহার করেই বানাতে হবে!

ধরাযাক, জগত যখন ছিলনা তখন শুধু ঈশ্বরই ছিলেন। ঈশ্বরের ইচ্ছে হলো কোন কিছু সৃষ্টি করার। ইহা দুই ভাবে সম্ভব ছিলঃ

১) ঈশ্বর নিজেই জগতরূপে প্রকাশিত হলেন।

২) ঈশ্বরের ইচ্ছায় কিছুইনা( শূন্য) জগত হিসেবে আবির্ভূত হলো যাতে ঈশ্বর স্বয়ং নিয়ম ও নীতি হিসেবে জগতে ক্রিয়াশীল রইলেন।

ইহা থেকে আমরা নিম্নোক্ত সমীকরন দুইটি পেতে পারিঃ

যখন জগত অসীম, ঈশ্বর = জগত (সর্বেশ্বরবাদ)…….(I)

যখন জগত সসীম, জগত= 0+ নিয়ম ও নীতি…….(ii)
যেখানে স্বয়ং ঈশ্বর নীয়ম ও নীতি হিসেবে ক্রিয়াশীল।

১নং সমীকরন অনুসারে, জগতই ঈশ্বর, ঈশ্বরই জগত,ঈশ্বরই জগতরূপে প্রকাশিত[ বেদান্ত, সুফিবাদ এবং দার্শনিক স্পিনোজার গড], এখানে ঈশ্বর নিজেই জগত এবং জগতের নিয়ম ও নীতি।

২নং সমীকরন অনুসারে, জগত হলো ঈশ্বরের মায়ার ঝাল যার যার মোট শক্তি, মোট চার্জ, মোট স্পিন সবই শূন্য(০) এবং ঈশ্বরের ইচ্ছা ক্রিয়াই জগতের নিয়ম ও নীতি হিসেবে ক্রিয়াশীল( শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ)।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 53 = 56