বাংলা সিনেমা: আজকের পরিস্থিতি

বাংলা সিনেমার সমীকরণ ও একটি শাকিব খান:
(সৈয়দ নাজমুস সাকিব ও বিডি টুয়েন্টি ফোর লাইভ এর সৌজন্যে)।
সিনেমা মানুষকে ভালো অনুপ্রেরণা মূলক কিছু শিখতে সাহায্য করে। একটা সময় বিশ্বব্যাপী চলচ্চিত্র ছিল সামাজিক অসংগতিগুলো তুলে ধরে দুংখ সুখ রোমাঞ্চ আবেগ আবেদন ও হাস্যরসের মাধ্যমে জনসচেতনতার সৃষ্টি করতো।
সেক্ষেত্রে বাংলা চলচ্চিত্র জগতও কোন অংশে কম ছিলো না,
সাদা কালো সেলুলয়েডের আলোর ঝলকানিতে ফুটে উঠতো পারিবারিক, সামাজিক,বৈশ্বিক বাস্তবতার সাথে মিলে যাওয়া বিভিন্ন কাহিনী।
বাংলা সিনেমা শুধু আমাদের ঐতিহ্যকেই ধারণ ও লালন করেনি, আমাদের স্বাধিকার ও মানবাধিকার আন্দোলনে জুগিয়েছে অনুপ্রেরণা।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম শিখিয়েছে ইতিহাস ও বাস্তবিক উপলব্ধি।
‘ওরা এগারোজন ‘, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড ‘ থেকে শুরু করে অস্কারজয়ী ‘পথের পাচালী’, সহ ‘ভাত দে’ ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ সহ অসংখ্য কালজয়ী ছবি নির্মিত হয়েছে বাঙালী নির্মাতা, অভিনেতা,কলাকুশলীদের হাত ধরে।
আজো মানুষ সিরিয়াল ফিরিয়ালের যুগে,রঙিন সেলুলয়েডের যুগে অবসরে দেখে সাদা কালো যুগের কালজয়ী চলচ্চিত্রগুলো।

একটা সময় বলিউড আর টালিউডের সাথে পাল্লা দিয়ে অহেতুক গাল গল্প আর অশ্লীলতার রামরাজত্ব নিয়ে বাণিজ্যিক সিনেমার আড়ালে অখাদ্য কুখাদ্য সিনেমা তৈরি হতে শুরু হলো।
পোস্টারের দিকে ভদ্র লোকেরা তাকাতেও পারতো না।
সেন্সর বোর্ডে ঘুষ দিয়ে ঘন ঘন মুক্তি পেতে শুরু করলো এসব ছবি।
পাইরেসি হওয়া সিডিগুলোও বিক্রি হত অনেক দামে।
ভাতে মরতে লাগলো অসংখ্য নির্মাতা, কলাকুশলী ও অভিনয় জগতের তারকরা।
এমন পরিস্থিতি হয়েছিলো যে, অভিনেতারা কোনররকম চাকুরী আর অভিনেত্রীরা দেহ ব্যবসা পর্যন্ত জড়িত হয়েছে।
সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে হাট বাজার দোকানে পরিণিত হয়েছিলো।
যদি কেউ কলকাতার ‘সিনেমাওয়ালা ‘ ছবিটি দেখে থাকেন তবে এসব বিষয়গুলো উপলব্ধি করতে পারবেন।
তখনও কিছু ভালো ছবি নির্মাণ হতো হুমায়ুন আহমেদ, চাষী নজরুল ইসলামসহ গুটিকয়েক নির্মাতার হাত ধরে।
মান্নার মত অভিনেতা ‘ফায়ার’, ‘বিদ্রোহী সালাউদ্দিন’ এসব ছবিতে অশ্লীলতার যোগান দিয়েছিলো।
রাজ্জাক,আলমগির, সোহেল খান, ইলিয়াস কাঞ্চন,ভবিতা,শাবানা, কবরী, চম্পা, প্রবীর মিত্র, অমল বোস, এটিএম শামসুজ্জামান, হুমায়ুন ফরিদী, কিংবা সালমান শাহ, শাবনূর,রিয়াজ, পূর্ণিমাসহ অনেকেরেই চলচ্চিত্রের যে সুবর্ণ যুগ ছিলো তা বন্ধ হয়ে গেলো।
কেয়ারটেকার সরকার অশ্লীলতা বন্ধ করতে পারলেও, চলচ্চিত্রের সুদিন আর ফিরিয়ে দিতে পারেননি।
আস্তে আস্তে শুরু হলো শাকিব খান যুগের,
একজনমাত্রই বিএফডিসির যেন মূল গোড়াপত্তনকারী।
তার ইতিহাস পাবেন সৈয়দ সাকিবের নিচের লেখায়।

“আমাদের একটা কমন সমস্যা হচ্ছে নিজেদের অতীত ভুলে যাওয়া, একটু বিখ্যাত হলেই নিজের মাঝে একটা ‘মুই কি হনু রে’ ভাব নিয়া আসা!

জেমস ক্যামেরুন এর স্বীকার করতে কোন সমস্যা হয়নি যে তিনি এক সময় ট্রাক ড্রাইভার ছিলেন, আরিফিন শুভর বলতে অসুবিধা হয়না তিনি তার গ্রামের বন্ধুর কাছ থেকে ১৫৬ টাকা ধার নিয়ে মডেলিং করতে এই ঢাকাতে আসেন এবং বন্ধুর মেসে থাকতেন।

শাহরুখ খানের এটা বলতে কোন সমস্যা নেই যে তিনি মুম্বাইতে এসে পার্কের বেঞ্চে ঘুমাতেন আর বন্ধুর কাছ থেকে ২০ টাকা ধার করে ফিল্ম সিটিতে শুটিং দেখতে যেতেন। রজনীকান্তের এটা বলতে সমস্যা হয় না যে তিনি একজন বাসের হেলপার ছিলেন। ঢাকায় কনসার্ট এ এসে সাড়ে ২৬ হাজার লোকের সামনে লাইভ অনুষ্ঠানে অক্ষয় কুমারের স্বীকার করতে কোন দুঃখ হয়না যে তিনি এই বাংলাদেশের পুরবানি হোটেলের শেফ ছিলেন।

যত সমস্যা আমাদের শাকিব খানের। তিনি বলেন যে, একবার এফডিসিতে শুটিং দেখতে গেলে এক সাংবাদিক তাকে ‘আরে তুমি তো অনেক সুন্দর’ বলে ছবি তুলতে শুরু করেন। এরপর এই ছবি এক পরিচালকের হাতে যায় আর তিনি ছবিতে চান্স পেয়ে যান! এত সোজা হলেতো যাদের চেহারা একটু ভালো সেই নায়ক হয়ে যেতো!

আসল কাহিনী হল নৃত্য পরিচালক আজিজ রেজা শাকিবকে এই মিডিয়ার দুনিয়ায় নিয়ে আসেন। শাকিবের জন্য এমন কিছু নেই যা তিনি করেননি। আগে শাকিবের স্বাস্থ্য খারাপ ছিল। সে যাতে একটু স্বাস্থ্যবান হয়ে দেখতে সুন্দর হয় এজন্য আজিজ এক

রেস্টুরেন্ট ভাড়া করেন। যেখানে বলা ছিল- শাকিব যখন ইচ্ছা এসে যা ইচ্ছা খাবে, বিল সব আমি দিব।

অথচ এই শাকিব এখন আজিজ রেজাকে চেনেন না। এমনকি আজিজের বাবা মারা যাওয়ার দিন আজিজের বাসা থেকে মাত্র দশ মিনিটের দূরত্বে শাকিব শুটিং করছিলেন। অথচ খবর পাওয়ার পরেও তিনি আজিজের বাবার জানাজায় আসেননি।

বাকি সবার সাথে শাকিবের পার্থক্য এখানেই। তিনি সম্ভবত একমাত্র নায়ক, যিনি নিজেকে এক নাম্বার বলে নিজের নামে ছবি বানান ‘নাম্বার ওয়ান শাকিব খান’। কিন্তু অন্যদের এটা করতে হয় না, কারণ তারা তাদের অতীত, তাদের সংগ্রামের কথা ভোলেন না। এজন্য রজনীকান্ত ইজ রজনীকান্ত। আর গুগলে নাম্বার ওয়ান পপুলার স্টার অন দা আর্থ লিখলে শাহরুখ এর নাম আসে।

আমি শাকিবকে কোন দোষ দেইনা, কিন্তু যেই মানুষ তার অতীত ভুলে যায় তার ফল কিন্তু ভাল হয়না।”
তারপর শাকিবকে টপকে এলো বাপ্পী, আরেফিন শুভ,মাহিয়া মাহি, সাহারাসহ অনেকে।
নাট্যাভিনেতা ও নাট্যকাররাও ঝুঁকলেন সিনেমার দিকে।
শাকিবের যুগেও তৈরি হয়েছে, ‘টেলিভিশন’,’পিপড়াবিদ্যা’, ‘গেরিলা’, ‘আমার বন্ধু রাশেদ’সহ অসংখ্য দর্শকজনপ্রিয় সিনেমা, যেগুলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
যেখানে যুবসমাজে হলিউড, বলিউড,দক্ষিণ ভারতীয় ও কলকাতার কিছু ছবি পরিপূর্ণভাবে সমাদৃত, যেখানে বিকিনি পড়া অভিনেত্রী আর ইন্টারনেটে অবাধ সিনেমা প্রদর্শনেরর প্রতিযোগিতা সেখানেও বিএফডিসি বাঙালি দর্শকদের ভালো কিছু ছবি উপহার দিতে পেরেছে।
স্বল্প বাজেট আর খারাপ সিচুয়েশনে বাংলা সিনেমা যখন একটু আশার আলো দেখতে শুরু করেছে,
সেখানে বাজারে ভাটা পড়া টালিউড পাড়া এসে আমাদের দুর্বলতার পূর্ণ সুযোগে মওকা মিলাতে লাগলো।
যৌথ প্রযোজনার নামে প্রোফিট ভাগাভাগি আর চলচ্চিত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকের পেটে লাথি মারতে শুরু করলো।
জাজ মাল্টিমিডিয়া আর এসকে মুভিজ রক্তাক্ত করতে শুরু করলো আমাদের গৌরবময় শিল্পকে।
বিএফডিসিতে একটা অর্থহীন কমিটি আর ঘুষখোর বিএফডিসি হর্তা কর্তাদের কারণে অনেক অভিনেতা,নির্মাতা পথে বসতে শুরু করেছে।
পুরনো কাহিনী আর দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রেরর কপি পেস্ট করে একেবারে সব ধ্বংস করা শুরু করে দিলো।
আর তখনই ঘটলো আরেক ঘটনা।
ব্যবসায়ী সিনেমাওয়ালারা মোটামুটি কলকাতার প্রসাদ পেয়ে পুরো বাংলার ঐতিহ্যের ধারক সিনেমাকে কবর চাপা দিতে লাগলো।
শাকিপ খানের নিচের নিউজটি পড়ে দেখুন না,

শাকিবকে আর কোন ছবিতে না নেওয়ার ঘোষণা:
জনপ্রিয় চলচিত্র পরিচালক বদিউল আলম খোকন ঢালিউড ‘কিং খান’ শাকিব খানকে নিয়ে আর কোনো ছবি নির্মাণ করবে না বলে ঘোষনা দিয়েছেন। ইতো মধ্যে তার নতুন ছবি ‘রংবাজ ২’ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এই সুপারস্টারকে।

ছবিটিতে অভিনয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন শাকিব। তাকে বাদ দিয়ে আরিফিন শুভকে নতুন করে চুক্তিবদ্ধ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে খোকন বললেন, ‘অভিনয়ের জন্য শাকিব খানকে সাইনিং মানি দিয়েছিলাম। কিন্তু আমি এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছি যে শাকিব খানকে নিয়ে আর কোনো ছবি নির্মাণ করব না। সে কারণে এই ছবিতে আরিফিন শুভকে নেয়া হয়েছে।’

প্রিয়া আমার প্রিয়া’ ছবির এই নির্মাতা আরো জানান, ‘পরিচালক হিসেবে শিল্পীর কাছে আমরা সম্মান আশা করি। কিন্তু শাকিব ইদানীং আমাদের অসম্মান করছেন। বিভিন্ন জায়গাতে তিনি বলে বেড়াচ্ছেন, বাংলাদেশে কোনো ভালো টেকনিশিয়ান নেই, পরিচালক নেই। এখানে লোকজন নাকি কাজ বুঝেন না। তিনি আমাদের পুরো ইন্ডাস্ট্রিকে অপমান করেছেন। তাই তাকে নিয়ে আমি কাজ করবো না। এটা আমার একটি প্রতিবাদ।’

ছবিটিতে নায়িকা মাহিয়া মাহির অভিনয়ের কথা শোনা যাচ্ছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে থেকে ছবির শুটিং শুরু হবে জানালেন পরিচালক।”
এভাবে আর কত ধ্বংসের সম্মুখীন হবে গৌরবময়, ঐতিহ্যবাহী বাংলা চলচ্চিত্রের দেহ?
শিক্ষণীয় আর অশ্লীলতা মুক্ত, ধর্মীয় অবমাননাকর কাহিনীমুক্ত সিনেমা নির্মাণ আজ কোটি ভক্তের দাবি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 79 = 84