বান্দরবান থেকে আদি নাম হারিয়ে যাবার গল্প ।

আমি আগেই বলেছি,বাড়ি থেকে খুব বেশী দুরে নয়,আমাদের এলাকায ছোট একটি ঝর্ণা আছে । ছোটকাল থেকে জেনে এসেছি ঝর্ণাটির নাম জুজ্জুরী ঝর্ণা । এলাকার সবাই এ নামেই চেনে । ক’দিন আগে জানলাম জুজ্জুরী ঝর্ণাটি রূপসী ঝর্ণা নামে পরিবর্তিত হয়েছে ।

বান্দরবান থেকে ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যেতে বসা ইতিহাস এবং ঐতিহ্য নির্ভর,অর্থবহুল কিছু আদি নামের গল্প হবে আজ । লাসভেগাসীয় পর্যটনের মানসিক দাপটে যেসব নাম আজ প্রায় বিলীন ।

বান্দরবান জেলা পরিষদকে কায়িংওয়াই ম্রো হেডম্যান এর দেয়া ২০ একর পাহাড় এখন চন্দ্রপাহাড় নামে সবাই চিনে । বাহ!!! কি দারুণ নাম । মাল্টি রিজোর্ট হবে,হোটেল হবে । চন্দ্রপাহাড় চূড়ায় বসে চন্দ্রকে ছুঁয়া হবে,কি ভেগাসীয় স্বর্গীয় অনুভূতি । আহ নাই টং!!!!!! তুমি বড্ড অপাংতেয়,অচ্ছুৎ । বুঝাই যায় দেবতার কোন মূল্য নেই,গ্রাহ্য নেই । নাইটং হচ্ছে চন্দ্র পাহাড়ের আগের নাম,যার অর্থ দেবতা পাহাড় ।

ডিম পাহাড়,সেনাবাহিনীর দেয়া এডভেঞ্চার প্রেমীদের অন্যতম আকষর্ণের একটা নাম । যে পাহাড়ের বুক চিড়েই মেঘের সাথে মিশবে বলে হারিয়ে গেছে দেশের সর্বোচ্চ গাড়ি পথ । যে পথ উঠতে উঠতে,নামতে নামতে,বাঁক নিতে নিতে মেঘে মেঘে প্রকৃতির সাথে একাত্বতা হয়ে দুটো উপজেলাকে ভালবাসার বন্ধনে বেঁধেছে আলীকদম আর থাইন চৈ অর্থাৎ থানছিকে । মারমারা এটিকে “ক্রা উ ডং” বলে যার অর্থ ডিম পাহাড়। এই নামের পেছনে মারমাদের কাছে দুই ধরণের কাহিনীর চালু আছে। এক) পাহাড়টা দেখতে অনেকটা ডিমের মত। দুই) কেউ একজন ওখানে জুম করার সময় ডিম সিদ্ধ করতে গিয়ে দেখেন ডিম সিদ্ধ হচ্ছে না। বারবার সিদ্ধ করার পরও ডিম আধা সিদ্ধ থাকে। তাই পাহাড়টার নাম “ক্রা উ ডং”। ম্রো সম্প্রদায় পাহাড়টাকে বলে “তেংতার চুট”। যদিও “ক্রাউ ডং” ই বেশি প্রচলিত। ব্রিটিশ আমলে পাহাড়ে পাহাড়ে অনেক সীমানা পিলার পুটেছিল ব্রিটিশরা,ঠিক তেমনি এপাহাড়ের চূড়ায় নাকি সীমানা পিলার পুটা হয়েছিল । তাই ম্রো ভাষায় এর নাম “তেংতার চুট” । যা ঠিক পিলার পুটা এমন একটি অর্থ বহন করে । ডিম পাহাড়ের কাছে হারিয়ে গেছে ক্রাউ ডং আর তেংতার চুট ।

চিম্বুক পাহাড়,যখন বান্দরবানে নীলগিরী,নীলাচল গড়ে উঠেনি তখন পর্যটকরা বান্দরবান বললেই মেঘলা,শৈলপ্রপাত আর চিম্বুক চিনত । আমি ছোটকালে শুনেছিলাম,চিম্বুক পাহাড়ে প্রতিদিন যেকোন সময়ে একবার বৃষ্টি হতই । সেই চিম্বুককে ম্রো’রা “ইয়াংবং হুং” নামে জানে,চিনে এখনো । ম্রো সহ এলাকায় সবাই জানে হেডম্যান চ্যংবত ম্রোর নামে পাহাড়টার প্রথম নামকরণ “চ্যংবত পাহাড়” করা হয়েছিল। সেই চ্যংবত পাহাড় এখন পরিবর্তিত হয়ে চিম্বুক পাহাড় হয়েছে । কি খ্যাত শব্দ ইয়াংবং হুং,চ্যংবত তাইনা??!!!!!! কিন্তু এমন ঐতিহ্য আদি নাম,আদিবাসী ভাষার শব্দ,নামের ক্ষেত্রে কি অন্যরকম মাত্রা দিত না??!!!

টেবিল পাহাড়,ভ্রমণপ্রেমীদের অনেকের সাথে চেনা,পরিচয় এই পাহাড়টির সাথে । রুমা থেকে তিনাপ সাইতারএ গেলে কিংবা মুননুয়াম,বাসত্লাং,আরথা,রোনিন,দেবাছড়া পাড়া গেলে পথে পড়ে টেবিলের মত পাহাড়টির । বম সম্প্রদায় যে পাহাড়কে “লুংমাইচাম” বলে জানে । যা বাংলায় দারুণ স্বর্গীয় একটা অর্থ বহন করে ”পাথুরে মন্দির” ।

পিক ৬৯,নীলগিরী কিংবা থানছি গেলে পথে পড়ে মেঘের সাথে মিশে যাওয়া চূড়াটি । তার আগের নাম ছিল “সীতা পাহাড়” ।

শৈলপ্রপাত, সমতলের ভ্রমণপিপাসুরা ঝর্ণা দেখতে চাইলে প্রথমেই যেখানে যান সেটি হচ্ছে শৈল প্রপাত । ছোট্ট একটি ঝর্ণা,পার্বত্য এলাকায় এমন ঝর্ণা হাজার হাজার রয়েছে । গরমকালে প্রায় শুকিয়েই যায় ঝর্ণাটি । তারপরেও ভ্রমণ পিপাসুদের এই ঝর্ণা দেখার ভীর কমেনা । শৈলপ্রপাত নাম ধারণ হওয়ার আগে এই ঝর্ণা’র কি নাম ছিল হালের অনেকেই হয়তো জানে না । শৈলপ্রপাত কে মার্মারা বলতো “চাইখ্যং”,আর বমরা বলতো “চাইখ্যংভা”,অবশ্য তারা এখনো এ নামে ডাকে । মূলত মার্মা নামের সাথে “ভা” লাগিয়ে তারা “চাইখ্যংভা” বলে । “ভা” অর্থ ঝিড়ি,ঝর্ণা । আর “চাই” হচ্ছে যুদ্ধ বা কোন একসময় এখানে যুদ্ধ হয়েছিল তার অর্থ বহন করে । “খ্যং” মানে ঝিড়ি,ঝর্ণা ।

মেঘলা,একটা সময় বান্দরবান বললেই প্রথমে যে নাম আসে তা হচ্ছে মেঘলা । পর্যটন লালসা জড়ানো কি কাব্যিক নাম । মেঘলার আসেপাশে তঞ্চঙ্গ্যা এবং মার্মা জাতিসত্বার বসবাস । অথচ মেঘলা নামকরন হওয়ার আগে সবাই “ডুলুঝিড়ি মাথা” নামে চিনত । মেঘলা পর্যটন স্পট এর যে কৃত্রিম হ্রদটি আছে সেটি ডুলুঝিড়ি ঝর্ণাকে বাঁধ দিয়ে করা হয়েছে । ঝিড়িটার জন্ম এপাহাড়ে বিধায় সবাই বলতো ডুলুঝিড়ি মাথা ।

নীলাচল, ভ্রমণ পিপাসুদের অন্যতম আকর্ষণের নাম হচ্ছে নীলাচল । বান্দরবান ভ্রমণ মানে অবশ্যই নীলাচল ভ্রমণ । মায়ামায়া মেঘ জড়ানো,একপাশ দিয়ে বান্দরবান শহর আরেকপাশ দিয়ে চিম্বুক নয়নাভিরাম পাহাড় দেখা যায় । আমার শৈশবের একটা অংশ এ এলাকা ঘিরে ছিল । নীলাচলের পাশে টাইগার পাড়া নামে যে আদিবাসী গ্রামটি আছে সেখানে ছিল আমার দাদুদের ঘর । আমার অনেক আত্বীয় এখনো রয়েছে এপাড়ায় । যাদের নিয়ে প্রবল দুঃশ্চিন্তায় থাকি । নব্য পর্যটনের জোয়াড়ে তারা টিকতে পারবেতো । যৌথ খামার থেকে নীলাচল পর্যন্ত ছোট বড় অনেক রিসোর্ট গড়ে উঠেছে,উঠছে এসবে তারা তাদের স্বকীয়তা বজায় রেখে জীবনধারণ করতে পারবেতো!!!!! নীলাচলের চুড়া বা পাহাড়ের কোন নাম না থাকলেও পাহাড়ের দু-পাশে যে পাথুরে দেয়াল বা খাদ রয়েছে তার দূর্দান্ত দুটো নাম রয়েছে । স্থানীয়রা একটাকে বলতো “হাতিভাঙ্গা তাং”,যে পাশ দিয়ে বান্দরবান শহর দেখা যায় । আর তার ঠিক একটু দক্ষিণ পাশেরটিকে বলা হতো “এম্মেন তাং” । হেডম্যানকে তঞ্চঙ্গ্যারা এম্মেন বলে আর পাথুরে দেয়াল বা খাদকে বলে তাং । হাতিভাঙ্গা তাং কেন বলে আমি সঠিক জানিনা তবে এম্মেন তাং এর নামকরণের পিছনে ছোট্ট একটি প্রচলিত কাহিনী আছে । জনশ্রুতি আছে,এ তাং এ একটা ভুত ছিল এবং প্রায় সময় এলাকার মানুষদের দেখা দিত । ভুতটি ছিল হেডম্যান । মূলত,তা থেকেই এম্মেন তাং নামের জন্ম । ২০০১সালে এপাহাড়ের চূড়াকে টাইগার পাড়ার নামানুসারে টাইগার হিল রাখা হয়েছিল । এর পরপরই টাইগার হিল হয়ে যায় নীলাচল ।

নাম পরিবর্তনের পিছনে যেমন প্রশাসনের চাপিয়ে দেয়া’র সাথে পর্যটন ব্যবসার লোভনীয় উত্তেজিত দৃষ্টি রয়েছে তেমনি রয়েছে স্থানীয়দের উদাসীনতার সাথে অসচেতনতা । এলাকার আদিবাসী শিক্ষিত সমাজেরও এ দায় কম নয় অন্তঃত আমার মতে । পার্বত্য এলাকায় তিন সার্কেলের একটি সার্কেল বান্দরবান । বান্দরবানে বোমাং রাজাদের রয়েছে শত বছরের ঐতিহ্য,ইতিহাস । সে ইতিহাসের অন্যতম স্বাক্ষী বাজালিয়া বোমাংহাট ক-জনই বা চেনেন । কিংবা এই এক বোমাংহাট বাদে বোমাং রাজাদের নামে স্থাপনা,পূরাকীর্তি,পথ ঘাট,কিইবা আছে যা তাদের অমর ইতিহাস,ঐতিহ্য বয়ে বেড়াচ্ছে??!!! ষোলশ শতক থেকে এখন অবধি ১৭জন রাজা রাজত্ব করে গিয়েছেন, বান্দরবান কিংবা রাজাদের সার্বভৌমত্বের অভ্যন্তরে কি স্থাপনা রয়েছে,কি এমন ইতিহাস নির্ভর স্থাপনা দেখলে মনে হবে যে বোমাং রাজারা চারশ বছর অধিক এ এলাকা চরম গৌরবে রাজত্ব করছেন??!!

বান্দরবানে অনেকে আছেন যারা অস্তিত্ব সচেতন,যারা অধিকার সচেতন । অনেকেই ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলেন,ঐতিহ্য রক্ষা’র কথা বলেন,ইতিহাস কিংবা উৎসব নিয়ে কথা বলেন । ইতিহাস নির্ভর নাম মুছে যাওয়া,ঐতিহাসিক আদি নাম ক্রমান্বয়ে কালের অতলে হারিয়ে যাওয়া এসব কি ঐতিহ্য হরণ নয়??!! এসব আদিবাসীদের অস্তিত্বের হুমকির অংশে পড়েনা??!!

হয়তো এভাবে জোড়ে কিংবা ধীরে পর্যটনের ঠেলায়,প্রশাসন অথবা সেনাবাহিনীর চাপে,চাপিয়ে,পাহাড় থেকে আদি নাম হারিয়ে যাবে । হালের পত্রিকার খবরে জানা গেছে বান্দরবান থেকে খুব দ্রুতহারে মার্মা এবং ম্রো কমে যাচ্ছে । আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি শুধু ম্রো বা মার্মা নয়,আরেকটু গভীরভাবে জড়িপ,পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, লুসাই,পাংখুয়া,বম, জাতিসত্বার মানুষও অনেক কমে গেছে । নিশ্চই তারা দেশান্তরি হয়েছেন । এভাবে যদি আদিবাসীরা দেশান্তরি হয়,এভাবে যদি এলাকার আদি নাম মুছে নব্য পর্যটনের জৌলুশ ভেগাসীয় নাম বসানো হয় তাহলে সম্প্রীতির আবৃতে থাকা বান্দরবান আদিবাসীদের অস্তিত্ব বাঁচানোর সংঙ্গা ‍কি হবে হয়তো অনুধাবন করতে পারছেন ।

(যারা আমাকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন আপনাদের সবার কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা,সবাইকে ধন্যবাদ । কারো কাছে সঠিক তথ্য কিংবা অর্থ জানা থাকলে আমাকে জানাবেন আমি যথাযথ সম্মান,কৃতজ্ঞতার সাথে তথ্যসব শুদ্ধ করে নিব ।)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “বান্দরবান থেকে আদি নাম হারিয়ে যাবার গল্প ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + = 7