নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন, বিএনপির অবিশ্বাস এবং বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যত

যেই দেশের অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত, সমাজতন্ত্রের আগামাথা কিছু বুঝে না, তাদের বামপন্থা গেলানো এত সহজ না। আর বিশ্বব্যাপীই এই মতবাদ মুখ থুবড়ে পরেছে। সেই হিসেবে আমাদের বেছে নিতে হয় প্রধান দুই ধারা থেকেই। যারা আবার গণতন্ত্রের কথা বলে। অবশ্য অশিক্ষিত জনগণের জন্য গণতন্ত্রও উপযুক্ত নয়। গণতন্ত্রে যদি এমন নিয়ম থাকতো যে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য জনগণকে নুন্যতম এসএসসি পাস করতে হবে, সেটা হয়তো ভালো হতো। আমি সরকার চালাবার জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করবার ক্ষেত্রে মুর্খদের মতামতকে গার্বেজ বলেই মনে করি। আর এই গার্বেজ এবং স্রোতে গা ভাসানো, মার্কা দেখা আবেগী গার্বেজ মতামতের উপরই এইদেশের জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হন।

সরকার চালাবার কথা সবচেয়ে শিক্ষিত এবং সচেতন অংশের, দেশের জন্য যারা বুক ভর্তি মায়া ধারণ করেন। কিন্তু আমাদের সংসদে তেমন মানুষেরা কই?

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সেলিনা হায়াত আইভীর বিজয় ছিল সুনিশ্চিত, যারা সামান্য খোঁজ খবর রাখতেন তাদেরও সন্দেহ থাকবার কথা নয় নারায়ণগঞ্জবাসীরা কাকে বেছে নেবে। এমনকি নারায়ণী মাস্তান শামীম ওসমান যদি ঘাড়তেড়ামী করে অন্য প্রার্থীও দাঁড় করিয়ে দিত, তাও। একটা কথা এই ব্যাপারে বিবেচ্য, গত নির্বাচনে শামীমকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েই কিন্তু প্রায় দ্বিগুন ভোট পেয়ে উনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই ভোটের পরিমাণ একই আছে। বিএনপির ভোটারেরাও সেলিনাকেই ভোট দিয়েছেন, কারণ সেখানে দলের চেয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রভাব বেশি।

বিএনপি প্রকাশ্য প্রমাণ না পেয়ে গোপন ইঞ্জিনিয়ারিং এর কথা বললো, বললো যে এই ফল অবিশ্বাস্য। আমার ধারণা হাসিনা বিরোধী দলে থাকলে উনিও বলতেন। আমাদের দেশে এটাই রাজনৈতিক কালচার। ২০০১ এর নির্বাচনের পর একটা শব্দযুগল খুব প্রচার পায়, “সুক্ষ কারচুপি”। উনি হয়তো আবারও বলতেন, সুক্ষ কারচুপি হয়েছে। এই সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে। যে নির্বাচন অবাধ নিরপেক্ষ হয়েছে, তাকে স্বীকার করে নিতে হবে। পালাবদলের জন্য জনগণের মুখের দিকে না তাকিয়ে নিজেদের কাজের দিকে মনোযোগ দিলে এইসব আজগুবি কথা বলা লাগতো না কারো। এইদেশের মানুষ খুব অল্পতেই খুশীতে বাকবাকুম হয়। চাওয়া পাওয়ার হিসাব আকাশচুম্বী নয় এখনো। কিন্তু জানিনা কেন যেন আমাদের দেশের সকল এমপি কিংবা পাতি নেতাদের সম্পদের পরিমাণও দল ক্ষমতায় আসলে পাঁচ বছরের চক্রে বহুগুণ বেড়ে যায়, কিন্তু জনতার তো বাড়ে না। জনতার বাড়ে না কেন এই প্রশ্নের জবাব কে দিবে? নেতাদের সাথে জনতার অর্থনৈতিক অবস্থাবান্ধব পরিবেশের অসঙ্গতিটা কই?

এই নির্বাচন প্রতিটা দলের জন্যই শিক্ষণীয়। ব্যক্তির মাস্তানীর বিরুদ্ধে গিয়ে জনগণ যে গত নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর তোয়াক্কা না করেই সেলিনাকে বিজয়ী করেছিল, তা থেকে আওয়ামী লীগ শিখেছে কিছু। গত কয় বছরে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন বলতে চোখে পড়ছে অপেক্ষাকৃত ক্লিন ইমেজের নেতাদের সামনে নিয়ে আসা এবং নির্বাচনে প্রার্থী করা। আপাত একদলীয় শাসনের সময়ে এই গুণগত পরিবর্তনও তেমন খারাপ কিছু না।

আমি কোনোদিন ভোট দেইনি, চোরচামারকে ভোট দিয়ে ভোটের অপমান করতে চাইনি বলেই হয়তো। তুলনামুলক কম খারাপ প্রার্থীকে ভোট দিতে আমি রাজী না। যাইহোক, এই দেশেই যখন আমার বাস, এই দেশের নানাকিছুই আমি দেখি। আমি নিজে বিশ্বাস করি আমি দলনিরপেক্ষ। আর যথাসম্ভব নিরপেক্ষ থেকে আমি যেখান থেকে দেশকে দেখি, সেখান থেকে দেখলে মনে হয় আওয়ামী লীগ ছাড়া তেমন বিকল্প এই মুহূর্তে আর নেই। বিএনপি তো জামাতের সঙ্গ ত্যাগ করতে পারলো না এখনো।। ২০০৭ এর নির্বাচনে মাত্র গোটা তিরিশেক আসন লাভ জনগণ তাদের থেকে কতটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো তার অকাট্য প্রমাণ।

জাপার কথা বলবো না, বলতে চাইও না। সব মানুষই জানে এরশাদ কী ছিল আর কেমন আছে এখনো। এইদেশের রাজনীতিতে তার স্থান থাকবার কথা নয়। বাকী থাকে কিছু গুড়া গুড়া দল, যারা এককভাবে নির্বাচনে প্রার্থী দিলে প্রায় সবারই নির্বাচনে জামানত বাজেয়াপ্ত হবার কথা।

তাহলে এখন যারা ক্ষমতায়, তাদের থেকে ভালো আর কাকে তুলে আনা যাবে? কাকে বেছে নেয়া যাবে? সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে এমন কাউকে তো চোখে দেখি না। কিছু বামপন্থীও আছেন দেশে, কিন্তু যেই দেশের অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত, সমাজতন্ত্রের আগামাথা কিছু বুঝে না, তাদের বামপন্থা গেলানো এত সহজ না। আর বিশ্বব্যাপীই এই মতবাদ মুখ থুবড়ে পরেছে। সেই হিসেবে আমাদের বেছে নিতে হয় প্রধান দুই ধারা থেকেই। যারা আবার গণতন্ত্রের কথা বলে। অবশ্য অশিক্ষিত জনগণের জন্য গণতন্ত্রও উপযুক্ত নয়। গণতন্ত্রে যদি এমন নিয়ম থাকতো যে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য জনগণকে নুন্যতম এসএসসি পাস করতে হবে, সেটা হয়তো ভালো হতো। আমি সরকার চালাবার জন্য প্রতিনিধি নির্বাচন করবার ক্ষেত্রে মুর্খদের মতামতকে গার্বেজ বলেই মনে করি। আর এই গার্বেজ এবং স্রোতে গা ভাসানো, মার্কা দেখা আবেগী গার্বেজ মতামতের উপরই এইদেশের জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হন।

সরকার চালাবার কথা সবচেয়ে শিক্ষিত এবং সচেতন অংশের, দেশের জন্য যারা বুক ভর্তি মায়া ধারণ করেন। কিন্তু আমাদের সংসদে তেমন মানুষেরা কই?

আমি ব্যক্তিগতভাবে ওবায়দুল কাদের কিংবা শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ সাহেবকে পছন্দ করি। পছন্দ করি কারণ উনারা সৎ। যদিও তাদের ব্যর্থতা অনেক, তবে উনারা সেটা স্বীকার করেন; কালো বিলাই, মালাঙ্কেল কিংবা এমন অনেকের মত বড় বড় কথা বলেন না। দূর্নীতির অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে অন্তত নেই।

বিএনপিতে এখন যারা আছেন, তাদের মধ্যে আমিতো কাউকে দেখি না যাকে বলতে পারি উনি খুব ভালো মানুষ, ভরসা করা যায়। যেই রিজভী সাহেবকে শিবিরের পোলাপান মাইরা তক্তা বানাইয়া ফেলছিলো, উনি কি কখনো ম্যাডাম খালেদাকে বলছেন আমি জামাত শিবিরকে সাথে নিয়ে রাজনীতি চাই না? সম্ভবত বলেন নাই…

কার কথা বলি? কোনো মুখ তো চোখের সামনে ভাসে না। এর মাঝে আওয়ামী লীগ আবার জয় সাহেবকে সামনে আনবার চেষ্টা করছে। মানে হচ্ছে যে, এটা তারই আভাস আওয়ামী লীগে পরিবারতন্ত্র বহাল থাকবে। নাহ, একটা আদর্শ গণতন্ত্রে পরিবারতন্ত্র থাকবার কথা না। দেশে এত কোটি মানুষ, কিন্তু প্রধান দল দুইটা যে কেন দুই পরিবারের মধ্যে থেকেই ভবিষ্যত নেতা পয়দা করে তা আমি বুঝি না। এইসব হচ্ছে তেল। আশেপাশে যারা থাকে, তারাই বুঝায় আপনারা ছাড়া দেশের আর কোনো গতি নাই।

দেশের রাজনীতির যে লক্ষণ দেখি, তাতে ২০১৯ এ স্বাভাবিক নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা। সেটা দেশের জন্য ভালো হবে না। আবার আওয়ামী লীগ আসলে সেটা তাদের প্রায় বাকশালের মত এক নেত্রী আর একদলীয় শাসনকে শক্ত করবে, দেশের জন্য ক্ষতিকরই হবে। আর কেউ যদি আসতে পারে বড় কোনো গন্ডগোলের কারণে সেটা হচ্ছে সামরিক বাহিনী। সামরিক সরকার সাধারণত দেশের জন্য উন্নতির ব্যবস্থা করে যায় না।

তাহলে ভবিষ্যত কি এই দেশের? আমার চোখে আপাত ছানি, আমি চোখে স্পষ্ট কিছু দেখছি না…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

51 + = 61