নারায়ণগঞ্জ জাতিকে ‘গ্রিনসিগন্যাল’ দিয়েছে

অতিসম্প্রতি (২২/১২/২০১৬ তারিখ) নারায়ণগঞ্জ-সিটি-কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচন নিয়ে সারাদেশে জল্পনাকল্পনার শেষ ছিল না। একদিকে সংবাদপত্র-নামধারী সর্বস্তরের প্রিন্টমিডিয়া অন্যদিকে প্রাইভেট-টিভিচ্যানেল-নামধারী ইলেকট্রিক-মিডিয়াগুলো ছিল সমান সরব। আর এই নির্বাচন নিয়ে বিএনপি-শিবির যেমন ছিল বিশালবিরাট আশাবাদী তেমনি হিমালয়ের সমান আশাবাদী হয়ে উঠেছিলো বিএনপি’র চিরকালীন-মিত্র একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীগোষ্ঠী। তাদের চোখে-মুখে সে-কী স্বপ্ন! তারা ভাবছিলো: এইবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার শেষ! তারা যেন বিজয়ের আগেই আনন্দের আয়োজনে ব্যস্ত। আর রাজাকারদের মুখপত্র: দৈনিক শয়তানের ইনকিলাব, দৈনিক শয়তানের ‘আমার দেশ’ পাকিস্তান, দৈনিক শয়তানের তালের কণ্ঠ, দৈনিক শয়তানের অনলাইন ভার্সন নয়াদিগন্ত ইত্যাদি দেশের ভিতরে যে-সব নিউজপ্রকাশ করছিলো—তাতে মনে হচ্ছিলো: নির্বাচনের আগেই বিএনপিপ্রার্থী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন জয়ী হয়ে গেছে! আর সরকার যেন জোরপূর্বক তাদের ফলাফল এখনই কেড়ে নিচ্ছে! আর দুই-একদিনের মধ্যেই নারায়ণগঞ্জের এই সিটি-কর্পোরেশন-নির্বাচনের পরপরই দেশের সরকারের পতন ঘটবে! এমনই একটা রমরমা অবস্থা!

সাম্প্রতিককালের অন্যান্য জাতীয় ও অন্যান্য সাধারণ নির্বাচনের মতো এটিও দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর এখানে, লড়াই হয়েছে ‘নৌকা’ ও ‘ধানের শীষের’ মধ্যে। জমজমাট লড়াই। নির্বাচনের আগে সাখাওয়াতের সরে যাওয়ার কথা থাকলেও শেষপর্যন্ত তিনি সরে যাননি। তিনি মাঠে থেকে বাঙালি-জাতিকে একটি চমৎকার ও অভূতপূর্ব নির্বাচনদৃশ্য দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমরা দেখেছি, ইতঃপূর্বে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণের মেয়র-নির্বাচনের সময় পরাজয় আঁচ করতে পেরে তড়িঘড়ি করে দুপুরের পরপরই বিএনপিপ্রার্থীরা দলের হাইকমান্ডের নির্দেশে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়। আর তারা নিজেদের ব্যর্থতার ও পরাজয়ের গ্লানি মুছে ফেলতে বর্তমান-সরকারের বিরুদ্ধে ভোট-কারচুপির অভিযোগ করে। এবার তাদের সাহসীসিদ্ধান্তের কারণে জাতিকে আরেকটি নাটক দেখতে হয়নি। এবার বাংলাদেশের মানুষ একটি অবাধ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জমজমাট নির্বাচন দেখেছে। আর এতে পরাজিত হয়েছে বিএনপিপ্রার্থী।

এই নির্বাচন নিয়ে সম্প্রতি প্রায় সকলেই ভূয়সীপ্রশংসা করেছেন। শুধু হাতেগোনা ও আমাদের মুখচেনা দুই-চারজন মাতাল (নিয়মিত রাজাকারদের মূত্রসেবী-টকশো-স্পেশালিস্ট) ছাড়া আর সবাই প্রশংসা করতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি। এতে বোঝাই যাচ্ছে, এই নির্বাচন সার্থক ও সুন্দর হয়েছে।

২২-এ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জাতি কোনো রাজাকার-দলীয়-প্রার্থীকে বিজয়ী করেনি। বাঙালি-জাতির বিজয়ের মাসে এই নির্বাচনে জাতি আরেকবার দেখিয়ে দিলো যে, এই দেশে আর-কোনো রাজাকারের ঠাঁই হবে না। আর কোনো রাজাকার এদেশে ভোটে জিততে পারবে না। ওদের একমাত্র মূলধন হলো: ভোটচুরি আর ভোটডাকাতি। ঐতিহাসিক এই নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জবাসী সমগ্র জাতিকে সাহসের সঙ্গে একটি ‘গ্রিনসিগন্যাল’ দিয়েছে। আর তা হলো: কোনো রাজাকার-দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করা যাবে না। আর ঐক্যবদ্ধ হয়ে সবসময় এভাবে রাজাকার-দলীয় প্রার্থীদের পরাজিত করতে হবে।

বিজয়ীদলের প্রার্থী হিসাবে এই নির্বাচনে ‘নৌকা’প্রতীক নিয়ে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী পেয়েছেন:
১, ৭৪, ৬০২ ভোট। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীপ্রার্থী হিসাবে ‘ধানের শীষ’প্রতীক নিয়ে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন পেয়েছেন: ৯৬, ৭০০ ভোট। তিনি ৭৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন।

এই নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিজয়ের কারণগুলো হলো:
১. বাঙালি-জাতি এই দেশে আর জঙ্গিবাদ চায় না। যারা জঙ্গিবাদীশাসনে বিশ্বাসী তাদের প্রতি জাতি ঘৃণাপ্রকাশ করেছে।
২. জাতির ইতিহাসকে—বিশেষ করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পবিত্র ইতিহাসকে যারা বিশ্বাস করে না তাদের এদেশে ভোট পাওয়ার কোনো অধিকার নাই।
৩. আগুনসন্ত্রাসে যারা পারদর্শী—জাতি তাদের আর বিজয়ী দেখতে চায় না।
৪.যারা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী আর যারা এদের দোসর তাদের বিরুদ্ধে জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকতে চায়।

মূলত নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতাবাদ, রাজাকারতন্ত্রবাদ, আগুনসন্ত্রাসবাদ, পেট্রোলবোমাবাদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে বিজয়। আর এই বিজয় বাঙালি-জাতির। এই জাতি আর-কখনও একসেকেন্ডের জন্য হলেও আর-কোনো রাজাকারিশাসন চায় না। এবারের নারায়ণগঞ্জের সিটিকর্পোরেশন-নির্বাচনে স্থানীয়-জনগণ জাতিকে সে-ই ‘গ্রিনসিগন্যাল’ই দিয়েছে।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
২৪/১২/২০১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 1