পাগলী

এই শহরের ভদ্রলোকদের অধিকাংশই নয়টা পাঁচটার চাকরি করে। কিন্তু ইসমাইল সাহেবের কাজ শুরু হয় ভোরে সূর্য উঠার আগ থেকেই, আর শেষ হয় শহরে মধ্যবয়স্কপুরুষরা যখন সুখনিদ্রায় যাওয়ার সমস্ত প্রস্তুতি শেষ করে তখন। তখনো তিনি বাসন কোসন মাজেন। পাঁচটা বাজার সাথে সাথে অফিস থেকে বের হয়ে পড়েন। ঢাকা শহরের যানজট ছাড়া আর কেউ তার যাত্রাপথে বাগড়া দিতে পারে না। তিনি শান্তশিষ্ঠ- নিরীহ-পত্নীনিষ্ঠ স্বামী। তাই বাসায় এসেই রান্নাবান্না শুরু করেন। ঘর গোছানো, সোফার কুশনটা ঠিক রাখা, বেডশিটটা গুজে দেওয়াও তার কাজ। সপ্তাহান্তে ঘরের ঝুলও পরিষ্কার করে নেয়া। মানে এটা নয় যে, পরিবারের কাজে সাহায্য করা খারাপ কাজ। খারাপ হবেই বা কেন? সব কাজ কি বৌয়েরা করবে নাকি! তবে ইসমাইল সাহেবের ক্ষেত্রে বলতে হয়, কোন কাজটাই বা তাঁর বৌ করবে।

সে যাই হোক, তাদের দাম্পত্য জীবন তাদের মতোই কাটাক না, পাড়াপড়শির কিন্তু ঘুম হারাম। সামনে পেছনে শ্রাব্য-অশ্রাব্য কত কথা বলাবলি করে! এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে এসব নিয়ে মাথা ঘামালে চলে? ইসমাইল সাহেবের স্ত্রী, আয়েশা আকন্দ, মাল্টি ন্যাশনালে জব করেন। উঁচু বেতনের চাকরি। ইসমাইল সাহেবের চেয়েও বেশি ইনকাম করেন। টাকা পয়সার সাথে কর্তৃত্বও নির্ভর করে। তবে কি সেই ধ্রুব সত্য দুজন পাশাপাশি থাকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সমাজস্বীকৃত দুজন নরনারীর জন্যেও সত্য হয়ে থাকবে?

আজকে পাঁচটায় অফিস শেষ হলো। কাওরানবাজার থেকে ফার্মগেইট আসতে এক ঘণ্টা দেরী হলো ইসমাইল সাহেবের। বাসায় পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় আটটা বেজে গেছে। তাকে ঘরে ঢুকতে দেখেই তাঁর স্ত্রী আয়েশা চিৎকার করে উঠলো,
“কি করো সারাদিন? সারাদিন রাস্তায় কাটিয়ে দাও আমি বের হবো কবে? তুমি তো ভুলেই যাবে! বলছিলাম না আজকে রাতে অফিসে আমাদের পার্টি আছে। কাপড়টা লন্ড্রী থেকে আনতে ভুলে গেলে বুঝি?”

ইসমাইল সাহেব সত্যিই ভুলে গিয়েছিলো। এখন কি হবে বাসায় তো লঙ্কাকাণ্ড বাজিয়ে বসবে। আয়েশা আরো জোরে চেঁচামেচি শুরু করল
“কি মনে করো তুমি? তোমার মতো টিপিক্যাল বাঙালি পুরুষরা এভাবে আমাদেরকে দমিয়ে রাখবে? কখনোই সেটা হতে দেব না!”

ইসমাইল সাহেব সচরাচর এই স্ত্রীর গর্জনের সময় নিশ্চুপ থাকেন। সেটা হতে পারে ভদ্র পুরুষ বলে নয়তো ক্ষমতা নেই বলে। আয়েশার মুখ থামার জো নেই। তিনি বেরিয়ে পড়লেন কাপড়টা নিয়ে আসতে। নাহলে রক্ষা নেই। গলির মুখ পেরিয়ে রিকশা নিলো। দোকানটা একটু দূরে। পৌঁছতে পৌঁছতে দশটা বেজে গেলো। বিপদ যেদিন আসে সব দিক থেকেই আসে। দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। ইসমাইল সাহেবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো কিনা জানি না, সম্ভাব্য সব বিপদের কথা চিন্তা করে তার সারা শরীর ঘেমে এককার। পাশে এক মামা চা বিক্রি করছে। ইসমাইল সাহেব বিপদ মোকাবিলার প্রস্তুতি পর্বের প্রথম ধাপে, প্রথমে চা নিলেন এক কাপ। এরপর একটা সিগারেট ধরালেন। কোথাও যেনো শান্তি নেই! দশটাকার সিগারেট পনেরো টাকায় কিনলেন! তাও ভালো, কিছু জ্বলে পুড়ে যেতে দেখলে শান্তি লাগে ইসমাইল সাহেবের!

রাত এগারোটা। বাসায় ফিরতে হবে। রিকশা পাওয়া গেলো। প্রায় রাস্তা খালি। তিনি বাসায় এসে দরজায় কড়া নাড়লেন। ভেতর থেকে রুদ্রমূর্তি নিয়ে আয়েশা বের হলেন এবং বললেন, “আসলে? তাও খালি হাতে? সিরিয়াসলি তুমি ক্যামনে পারো এমন করতে? তোমার সাথে আমার পোষাবে না!”

ইসমাইল সাহেব বললেন, “যেতে যেতে যদি দোকান বন্ধ হয়ে যায় তবে আমি কি করব বল? ”
“কিছু করতে হবে না! হয় তুমি এ ঘরে থাকবে নয়তো আমি এই ঘরে থাকব। তুমি ডিশিসান নাও”
এটা বলেই দরজা বন্ধ করে দিলো। ইসমাইল সাহেব এর কাছে দুইটা পথ খোলা, হয় দুয়ারে দাঁড়িয়ে ঝগড়া করে লোক জড়ো করা নাহয় সোজা রাস্তায় চলে গিয়ে কোথাও আশ্রয় নেওয়া! ”

তিনি শেষ রাস্তাই বেছে নিলেন। এত রাতে কোনো বন্ধুর বাসায় যাওয়া এই বয়সে সুন্দর দেখাবে না। তিনি রাস্তায় বের হয়ে গেলেন। একটা সিগারেট এর অভাব অনুভব করছেন প্রচণ্ডভাবে। তাও খুঁজে পেলো না। তিনি একা ফুটপাত ধরে হাঁটছেন। রাস্তা প্রাই খালি। ল্যাম্প পোস্টের আলোয় আবছাআবছা রাতের ঢাকা বড়ই মনোরম! রাস্তা নিষ্প্রাণ তেমনটা নয়। কিছু কিছু রাতের গাড়ি নিরুদ্দেশে চলে যাচ্ছে। ইসমাইল সাহেব ভাবলেন, কেমন হতো যদি কোথাও হারিয়ে যাওয়া যেতো! সবার থেকে! যেখানে কোনো আয়েশা আকন্দ নেই। বাঁধন নেই। মায়া নেই।

পৃথিবী হয়তো অতো সরল নয়। তাই সরলভাবে বাঁচাও কঠিন কাজ।
ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে কোথায় যাচ্ছেন তার হিসেব রাখার প্রয়োজন ইসমাইল সাহেবের নেই। ফুটপাতগুলোও উদ্বাস্তু মানুষের দখলে। ওখানে কি নিশ্চিত একটা চটের বস্তা মুড়িয়ে ওরা শুয়ে আছে! শান্তির ঘুম! এই লোকগুলোকে দেখে ইসমাইল সাহেবের প্রশ্ন জাগে, আসলে কে বেশি সুখী? ওরা না ইসমাইল সাহেবেরা?

তাঁর চোখ চলে গেলো হঠাৎ একজনের দিকে। ফুটপাতের এই দিকটাই একা একা বসে সিগারেট ফুঁকছে। মূলত সিগারেট দেখেই তার দিকে পা বাড়ালো ইসমাইল সাহেব। গিয়ে যা দেখলেন তার জন্যে তিনি প্রস্তুত ছিলেন না! একটি মেয়ে। উশখোখুশকো চুল। পাগলী হবে হয়তো। পেট ফোলা। দেখে মনে হচ্ছে পাঁচ ছয়মাসের বাচ্চা পেটে। ইসমাইল সাহেব কাছে আসতে পাগলী বলে উঠলো,
“কিরে কি চাস? খেলবি? দেখ দেখ!” এই বলে পাগলী তার বুকের কাপড় সরিয়ে দিলো!
ইসমাইল সাহেব কিছুক্ষণের জন্যে স্তব্ধ হয়ে গেলেন এবং সামলে নিয়ে বললেন,” এই বুকের কাপড় সরাবি না।”
“হা..হা..তুই কোন পুরুষ রে! বড়ই আজিব চিজ তো!”, পাগলী হা হা করে হেসে উঠলো। এরপর আবার কান্না করে উঠলো, “এই দেখ্! দেখ্! আমার পেট ফুলে গেছে কেমন? আমার কি অসুখ হলো দেখ তো! যতক্ষণ চাইবি, যা করতে বলবি করে দেব! দেখ্ দেখ্ …”

ইসমাইল সাহেব বুঝতে পেরেছে, পাগলী জানেই না পাগলীর পেটে বাচ্চা হয়েছে! ইসমাইল সাহেব আকাশের দিকে তাকালো, আকাশটা কেমন স্বার্থপর দেখ! কারোও দিকে ভ্রুকূটি নেই। সোজা মাথার উপর দিয়ে চলে গিয়েছে! ইসমাইল সাহেব আকাশের মতো স্বার্থপর হতে পারে না। কিন্তু পাগলীর দিকে তাকাতেই তার সেই নরপশুদের প্রতি তীব্র ঘৃণায় চোখ লাল হয়ে উঠলো! তার রক্ত টগবগ করে উঠলো!

ইসমাইল সাহেব পাগলীটাকে এই অবস্থায় রাস্তায় ফেলে যেতে পারেন না। তিনি পাগলীটাকে নিয়ে কোথায় যাবেন? ঘরে? যার নিজেরই ঘর নেই, তিনি কি করে ঘরে পৌঁছাবেন? কিংবা কেমন হতো যদি নতুন করে সব শুরু করা যেত! নতুন করে ঘর বাঁধলে কেমন হবে? সত্যিই সন্ন্যাসি হওয়া সহজ নয়, পথে বেরুলেই কি পথিক হওয়া যায়! মন যে বড় বিচিত্র!!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

12 − 8 =