মুভি রিভিউঃ Dangal (দঙ্গল)

স্টোরি টেলিং স্টাইলটা ছিল অসাধারণ। এমনকি গানগুলোও প্রাসঙ্গিক। যখন কাহিনী আগাচ্ছিলো, কিংবা দর্শক যখন দেখছিলো মুভিটা, তখন কিন্তু আশেপাশে ঘটে চলা স্বাভাবিক ব্যাপারই দেখেছে দঙ্গলে। সমাজের বসবাসকালীন স্বাভাবিক সময়ে এইসব অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হয়না। কিন্তু দঙ্গল দেখবার সময় মনে হচ্ছিলো মানুষগুলা এমন করছে কেন? কিংবা অল্প আফসোস কাজ করছিল, মনে হচ্ছিলো, আহারে, মেয়েগুলা কি লজ্জাই না পাচ্ছে। অথবা গীতা কিংবা ববিতার স্কুলের সহপাঠীরা এমন করছে কেন? আসলে এমনই তো করে, এমনই করতো মানুষেরা। আমরাই সেই মানুষের দলভুক্ত। দঙ্গলের আলাদা ব্যাপারটাই এখানে যে দর্শক হিসেবে নিজেই মনে করছিলাম মানুষের এমন আচরণ ঠিক নয় যা স্বাভাবিক জীবনে মনে হয়না। এর কারণ হিসেবে আমি বলব শুরুতেই দর্শক আমীর খান কিবা মহাবীর সিং ফোগাতের স্বপ্নকে নিজের মনে করা শুরু করেছিল, পিচ্চি কিংবা বড় গীতা ববিতার সামান্য দুঃখ কষ্ট হাসিগুলোকে নিজের অনুভূতির সাথে মেলাতে পারছিলো।


দঙ্গল দেখলাম, ইহা একটি সাইলেন্ট মাস্টারপিস।

যদিও এই ধরনের বায়োগ্রাফিকাল স্পোর্টস ড্রামা মুভিগুলোর কাহিনীর শেষটা সবার জানাই থাকে। তবে একটা সাধারণ কাহিনী, সাধারন দৃশ্যায়ন এবং সরল বর্ণনার চলচ্চিত্রও যে এমন হৃদয়ছোঁয়া হতে পারে তা দঙ্গল প্রমাণ করে দিল।

বাস্তব থেকে নেয়া কাহিনী তো, তাই ভারতীয় গ্রাম্য সমাজের নানা বাস্তবতা উঠে এসেছে। সামান্য ব্যাপার স্যাপার, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। পুত্র কামনা, নারী শিশুর প্রতি পিতামাতার প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা সমাজের নানা মানুষের মেয়েদের প্রতি আচরণ একদম সাদামাটাভাব উঠে এসেছে। এতটাই সাদামাটা যে মনে হয়নি মুভি দেখছি।

আর দঙ্গল আলাদা করে ভালোলাগবার জায়গাটাও এটা। স্টোরি টেলিং স্টাইলটা ছিল অসাধারণ। এমনকি গানগুলোও প্রাসঙ্গিক। যখন কাহিনী আগাচ্ছিলো, কিংবা দর্শক যখন দেখছিলো মুভিটা, তখন কিন্তু আশেপাশে ঘটে চলা স্বাভাবিক ব্যাপারই দেখেছে দঙ্গলে। সমাজের বসবাসকালীন স্বাভাবিক সময়ে এইসব অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হয়না। কিন্তু দঙ্গল দেখবার সময় মনে হচ্ছিলো মানুষগুলা এমন করছে কেন? কিংবা অল্প আফসোস কাজ করছিল, মনে হচ্ছিলো, আহারে, মেয়েগুলা কি লজ্জাই না পাচ্ছে। অথবা গীতা কিংবা ববিতার স্কুলের সহপাঠীরা এমন করছে কেন? আসলে এমনই তো করে, এমনই করতো মানুষেরা। আমরাই সেই মানুষের দলভুক্ত। দঙ্গলের আলাদা ব্যাপারটাই এখানে যে দর্শক হিসেবে নিজেই মনে করছিলাম মানুষের এমন আচরণ ঠিক নয় যা স্বাভাবিক জীবনে মনে হয়না। এর কারণ হিসেবে আমি বলব শুরুতেই দর্শক আমীর খান কিবা মহাবীর সিং ফোগাতের স্বপ্নকে নিজের মনে করা শুরু করেছিল, পিচ্চি কিংবা বড় গীতা ববিতার সামান্য দুঃখ কষ্ট হাসিগুলোকে নিজের অনুভূতির সাথে মেলাতে পারছিলো।

এই মুভিতে আমীর খান ছাড়া তেমন বড় তারকা ছিল না। নিজের মনে হয়েছে সবগুলো চরিত্র পারফেক্টলী কাস্ট করা। পিচ্চি গীতা চরিত্রে কাশ্মীরের মায়া মায়া চেহারার জায়রা ওয়াসিম কিংবা বড় গীতা হিসেবে ফাতিমা সানা শেখের অভিনয় ছিল অসাধারণ। আমি মুগ্ধ হয়ে জায়রা ওয়াসিমের অভিনয় দেখছিলাম। অতিরিক্ত কিছু নেই, একটা সাধারণ শিশুকে আমরা যেভাবে দেখি, সে তাই করছিল। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে এরা কুস্তি শিখে নিয়েছিল পুরোপুরি। শুধু অভিনয়ের জন্য ধারণা লাভের জন্য নয়, একদম প্রথাগত কুস্তি শেখা যাকে বলে। এ জন্যই পিচ্চি গীতা কিংবা বড় গীতা, দুজনেই যখন কুস্তি লড়েছে মনে হয়েছে তা অভিনয় নয়, বাস্তবের লড়াই দেখছি।

পরিচালনাঃ নিতেশ তিওয়ারী। গল্পের প্রাথমিক স্ক্রিপ্টও উনার করা। যেহেতু মুভিটায় মজে গিয়েছিলাম, ডিরেকশন সম্পর্কে আলাদা কিছু বলবার নেই। সবকিছু ফ্যান্টাসটিকলী সিম্পল ছিল।

সিনেমাটোগ্রাফীঃ এই মুভিটা এমন মুভি নয় যেখানে হাইফাই ভিজ্যুয়াল এফেক্ট কিংবা ক্যামেরা ও গ্রাফিক্সের জমকালো কাজের দরকার ছিল। সবকিছুই ছিল অসাধারণভাবে সাধারণ। এমনকিছু খুঁজে পাইনি যা কেবল সিনেমার জন্যই জুড়ে দেয়া। দৃশ্যায়ন প্রকৃতপক্ষেই ছিল বাস্তবের গ্রামীণ জীবনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিংবা কুস্তির ইভেন্টগুলোতে একদম অকৃত্তিম আবহের।


বাস্তবের মহাবীর সিং, গীতা এবং ববিতার সাথে আমীর খান

অভিনয়েঃ আমীর খান (মহাবীর সিং ফোগাত), জায়রা ওয়াসিম (পিচ্চি গীতা), ফাতিমা সানা শেখ (গীতা কুমারী) , সাক্ষী তানওয়ার (মহাবীর সিং এর স্ত্রী), সানিয়া মালহোত্রা (ববিতা কুমারী) , সুহান ভাটোনাগার (পিচ্চি ববিতা)

অভিনয়ে আমি পিচ্চি গীতা আর ববিতার চরিত্রগুলো দেখে অবাক হয়েছি। এত সাবলীল আর মায়াময় ছিল তাদের অভিনয়। মুভিটার মজা পাওয়া শুরু হয় তাদের কার্যকলাপ দেখতে দেখতেই। পৃথিবীর সব শিশুদের মানসিকতা একই রকম।

মাঝে মাঝেই খুব সাধারণ হিউমার ছিল, মেদবিহীন। ড্রামাটিক কিছু নয়, কাতুকুতু দিয়ে হাসাবার চেষ্টা নয়, স্বাভাবিক হিউমার, সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবন দর্শন থেকে উঠে আসা।

বড় গীতার চরিত্রে ফাতিমা সানার অভিনয় ছিল চ্যালেঞ্জিং, কারণ এজন্য তাকে কুস্তিও শিখতে হয়েছে। অবাক করা ব্যাপার হলো সে এই কাজটা এমনভাবে রপ্ত করেছে একটা দৃশ্যেও মনে হয়নি অভিনয় দেখছি। শেষের দিকে গোল্ড মেডেল জেতার জন্য পাঁচ পয়েন্টের মুভ ছিল অনন্য। আমি নিজেই বিশ্বাস করছিলাম লাইভ দেখছি আর সকল সরিত্র বাস্তব।

সালমান খানের সুলতানের সাথে এর পার্থক্য হচ্ছে সেটা প্রপার ফিকশন ছিল। আর দঙ্গল বাস্তবের মহাবীর, গীতা, ববিতার কাহিনী। আমি জানিনা গীতার কোচ কতটা ভিলেন ছিলেন বাস্তবে, তবে এখানে হালকা ভিলেনের মত করে উপস্থাপন মুভিটাকে উপভোগ্য করেছে অনেক, টেনশন নিয়ে এসেছে আরও কিছু। অনুভূতির উত্থানপতন উপভোগ করবার জন্য, আবেগে ডুবে যাবার জন্যই তো মানুষ মুভি দেখে, মুভি দেখে নতুন উপলব্ধির জন্য। সফলতা নিয়ে আসতে পারে এমন এলিমেন্টগুলো যা সমাজ পরিবর্তনে সামান্য হলেও প্রভাব রাখতে সক্ষম। দঙ্গলে এর সবই আছে। পারফেক্টলি পারফেক্ট প্যাকেজ…

গল্পঃ গল্পটা বাস্তব থেকে নেয়া। গল্পটা কঠোর সংকল্পের, স্বপ্নের। কোনো আহামরি কিছু নেই। সুপারম্যান নেই কোনো এই গল্পে। আর এখানেই গল্প কিংবা চিত্রনাট্যটা অন্য মুভিগুলোর থেকে আলাদা। আমার কাছে গল্পের চেয়ে মানুষের জীবনের কিছু পর্যায়ের উপাখ্যান বলে মনে হয়েছে যার বেশ কিছু অংশ ইন্টারেস্টিং। হয়তো চিত্রনাট্যে প্রকৃত গল্পের কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে, তবে তা মুভিটাকে মেকীভাব দেয়নি।

বাজেটঃ ৭০ কোটি রুপী
আইএমডিবি রেটিংঃ ৯.২/১০
আমার রেটিংঃ ৯/১০

এনজয় দঙ্গল। সকল মানবসত্ত্বার মঙ্গল হোক, মঙ্গল নেমে আসুক সকল মানব মানবীর জীবনে…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “মুভি রিভিউঃ Dangal (দঙ্গল)

  1. অপ্রত্যাশিতভাবেই মুভিটা
    অপ্রত্যাশিতভাবেই মুভিটা সিনেমা হলে দেখার সৌভাগ্য হয়ে গেল। আমির খান এর আরো একটি মাস্টারপিস মুভি এটি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1