“এক নাস্তিকের জবানবন্দী” ২য় পর্ব

আমি আর কিছু না ভেবে ছোট ভাইয়ের সাথে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলাম। যাওয়ার সময় রাস্তায় জাশেদের বাবা, মন্নান আর আবুলকে দেখলাম। কেউ কিছু বলেনি। শুধু আমার দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে থাকিয়েছিল। স্কুলের সামনে থেকে রিকশা নিলাম। বললাম, তাড়াতাড়ি চালা! বুকের ভয়টা দারুনভাবে অনুভব হচ্ছে। রিকশা চালক মেইন রোডে এসে বলল, -কোথায় যাবেন?
আমি বললাম, -চালা চালা তাড়াতাড়ি চালা! আগ্রাবাদের দিকে চালা……

১ম পর্বের জন্য এখানে ক্লিক করুন।

দোকানের বাইরে অনেক মানুষ উৎসুক হয়ে আমাকে দেখছে। কেউ কেউ কল্লা কাটার জন্য রেডি হয়ে আছে। কেউ অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করছে।

জোদ্দিন বলল, -অপ্রিয় আজ তোমাকে প্রমান করে দিতে হবে আমাদের নবী (সাঃ) কিভাবে লুইচ্চ্যা ছিলেন।
আমি বললাম, -এই ধর্মকারী কমিক ২তে ক্লিক কর। ওখানে আয়াত শুদ্ধ লেখা আছে।
জোদ্দিন রাইসারকে ফোন করে বলল, -রাইসার তোর ল্যাপটপটা অপ্রিয়ের দোকানে নিয়ে আয়। একটু তাড়াতাড়ি নিয়ে আয় বলে ফোন রেখে দেয়।

রাইসার পাঁচ মিনিটের মধ্যে এসে তার ল্যাপটপ ওপেন করে নেট চালু করে। ক্লিক করে ধর্মকারী লিংকে। প্রথমে দেখে রাইসার, আবুল, জাশেদ, রাপ্পি, রাজু সমস্বরে বলে উঠে, -আল্লা আল্লা এগুলো কি!
জাশেদ রেগে বলল, এই ল্যাপটপ বন্ধ কর! এগুলো আমি দেখতে পারছিনা!
জোদ্দিন বলল, এটা ইহুদি নাসারাদের ষড়যন্ত্র হবে। আমাদের ইসলামকে ধ্বংস করার জন্য তারা এই ধর্মকারী ওয়েব সাইটটি খুলেছে।
আমি বললাম, -জোদ্দিন ভাই একই বক্তব্য “তসলিমা নাসরিনের” দ্বিখণ্ডিত বইয়ের পাওয়া যায় বলে আমি তসলিমার দ্বিখন্ডিত বইটা খুলে দেখাই। তারা দ্বিখন্ডিত বইয়ের “পরোলৌকিক মুলো”র প্রায় শেষাংশে চোখ বুলায়।

রাপ্পি খুব তাচ্ছিল্যের সাথে বলল, -তসলিমা একটা মাগি! সেই বলেছে নারীদের পুরুষের মতো দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করতে, তিন চারটা বিয়ে করতে।
আমি সাথে সাথে রাপ্পিকে বললাম, -তসলিমা তাঁর কোন বইয়ে বলেছে যে নারীদের দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করতে? কোন বইয়ে বলেছে নারীদের তিন-চারটা বিয়ে করতে?
রাইসার বলল, -ওসব বাদ দে! এই অপ্রিয় ফেইসবুকে কি লিখেছে বল!
জোদ্দিন বলল, -এই দেখ হিজাব পড়া তিনটি মেয়ের ছবির সাথে ওর পোষ্ট–

রাইসার একটানে পড়তে থাকে– “হিজাব পড়া মেয়েদের বলছি, পড়ালেখা শিক্ষা দিক্ষা তোমাদের জন্য আসেনি। স্কুলে এসে নামাজ পড়ার নামে ক্লাস ফাঁকি দেয়ার দরকার কি? তারচেয়ে বরং ঘরে বসে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ো, কোরাণ তেলেওয়াত পড়ো, আর নবীর মতো যাতে….একটা স্বামী পাও ভক্তি করে মহান আল্লাহকে ডাকো। তিনি তোমাদের মনোবাসনা পুর্ন করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ অনেক মহান!”
রাইসার হেসে বলল, – অপ্রিয় খুব সুন্দরই তো লিখেছে। তোরা চার্স করছিস কেন ওকে?
জোদ্দিন ল্যাপটপের স্কিনে আঙ্গুল রেখে বলল, -এই লাইনটা ভালো করে পড়।
রাইসার লাইনটি পড়তে থাকে–
আর নবীর মতো যাতে “লুইচ্চ্যা” একটা স্বামী পাও ভক্তি করে মহান আল্লাহকে ডাকো…
পড়া শেষ না করেই রাইসার আমার শার্টের কলার চেপে ধরে বলল, -মাদারচোদ আমার নবীকে কি বললি বলে আমাকে ঝাঁকাতে থাকে।
জোদ্দিন, রাপ্পি, আবুল বলল, -রাইসার ভাই তাকে ছেড়ে দাও।
ওরা রাইসারকে ছাড়িয়ে নেয়। আমি চুপ।
রাপ্পি বলল, -অপ্রিয় আমি তোমার সাহস দেখে অবাক হচ্ছি! যারা তোমার উপর ক্ষেপেছে তাদের আমরা বুঝাবো। এখনো সময় আছে তুমি ভুল স্বীকার করে সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও।
-আমি চুপ।

বাইরে চিৎকার চেঁচামেচি। মানুষের জটলা। কিছুক্ষন পর আমার দোকানের জমিদার হারুনুর রশিদ আসলেন। তিনি ৩ বছর আগে সৌদি আরবে গিয়ে হ্বজ করে আসেন। তাই তাকে এলাকার মানুষজন হ্বাজী সাব বলে ডাকে। তিনি আসার পর রাপ্পি, আবুল, জোদ্দিন, জাশেদ, রাইসার, রাজু, দোকান থেকে বেড়িয়ে যায়। তিনি এসে দোকানের সামনের সবাইকে বলেছেন, -আমি তোমাদের কোনো কথা শুনবো না, আমি আগে শিউর হবো অপ্রিয় কি বলেছে না বলেছে। কারন আমি যতটুক জানি ও মিথ্যা বলেনা।

হ্বাজী হারুন দোকানের ভিতরে এসে আমাকে বলল, -আচ্ছা অপ্রিয় ওরা যা বলছে তা ঠিক?
আমি বললাম,- কি?
হারুন বলল, -তুমি নাকি আমাদের নবীকে লুইচ্চ্যা বলে ইন্টারনেটে ছেড়েছো?
আমি বললাম, -ইন্টারনেটে ছাড়িনি, আমার ফেইসবুকের ওয়ালে লিখেছি।

তিনি এসে আমার মাথায় জোরে একটা ঘুষি মারলেন। প্রচন্ড ব্যাথায় মাথা জিম জিম করছে। তখন রাগে খুব ইচ্ছে করছিল একটা রামদা নিয়ে সবাইকে কোপাতে থাকি! মনে মনে বললাম, অপ্রিয় কন্ট্রোল কন্ট্রোল কর নিজেকে। মাথা গরম করিস না, এটা নাস্তিকতার আদর্শ না!

হারুনুর রশিদ গর্জে গর্জে বলতে লাগলেন, -আমাদের নবী বিশ্বনবী। আমাদের নবীর মতো দয়ালু পৃথিবীতে আর কোথায় ছিলনা। আল্লাই বিশ্বাস করে একমাত্র নবীর কাছে কোরান নাজিল করেছিলেন। তুই কোন সাহসে নবীকে চরিত্রহীন বলিস? আমেরিকা রাশিয়া চীন ইন্ডিয়া ফ্রান্স জার্মান অস্ট্রেলিয়া, এরা পর্যন্ত আমাদের নবী সাল্লাল্লাহুকে অবমাননা করার সাহস পায়না। এরা পর্যন্ত আমাদের নবীকে মানে। তুই কোন সাহসে কার বলে একথা বলিস?

তার গর্জনে আমার শরীর কাঁপছে। আমি চুপ।

তিনি আরো বলছেন, -অপ্রিয় তুমি একটা স্পর্ষ কাতর জায়গায় হাত দিয়ে ফেলেছো।
কিছুক্ষন পর আমার পাশের টেইলারিং দোকানের আংকেল এসে হারুন সাহেবকে বলছেন, -ওকে এগুলো বলে লাভ নেই। ওর সাথে এই নিয়ে আমার দীর্ঘদিন ধরে তর্ক চলছে। এই পোলাডা একটা নাস্তিক। কোনো আল্লা ঈশ্বর বিশ্বাস করেনা। কোনোদিন দোকানে সন্ধ্যায় আগর বাতি জ্বালাতে দেখিনি। ঠাকুর দেবতার কোনো ছবি রাখেনি। এমনকি দোকান খুলে কখনো ক্যাশে প্রনাম করতে দেখিনি। বড় গোঁয়ার এই ছেলে। ওকে বোঝানো মানে বৃথা।

এসময় জোদ্দিন, রাইসার, এসে জমিদার হারুনকে বলল, -চাচা ও আমাদের অনেকবার বলেছে কোরান নাকি নবীজীর মনগড়া সৃষ্টি। আল্লাহকেও নাকি নবী বানিয়েছে।
হারুন সাহেব বলল, কি?
জাশেদ বলল, -ও তো আমাদের একথা প্রায়ই বলে।
হারুন সাহেব মাথা নেড়ে নেড়ে বলতে লাগলেন, -না না এই ছেলেকে এলাকায় আর রাখা যাবেনা।

ইজিলোডের দোকানের আরিফ, যে আমার বন্ধুর মতো। যেখানে দেখত, আমার সাথে আগ বাড়িয়ে কথা বলতো। সেই এসে বলল, -এতো কথা কিসের? এই ডান্ডির বাচ্চাকে কুত্তার মতো রাস্তায় কেটে ফেলে রাখলে কে কি বলবে যে?

মন্নান, যদিও তিনি আমার থেকে বয়সে বছর দশেকের বড়। তার বউয়ের সাথে কি হয়েছে, তার বউ কি অভিমান করেছে। এসে আমাকে সব শেয়ার করতো। সেই আমার কাছে বকেয়া জিনিস বানাতো। তার বউ খাসির বিরিয়ানি রান্না করলে আমার জন্য পাঠিয়ে দিত। মন্নান থেকে তখনো আমি পনেরো হাজার টাকা বকেয়া পাই। সেই এসে হারুন সাহেবকে বলল, -এখন যদি অপ্রিয়কে কেউ কেটেও ফেলে আমরা তাদের বাধা দিতে পারবো না। কারণ বাধা না দেয়াটা আমাদের ইসলামের ঈমানী দায়িত্ব।

কিছুক্ষন পর আরেক পাড়ার মসজিদের ঈমাম সাহেব আর কমিশনার আসলেন। তারা দোকানে ঢুকে বললেন, – অপ্রিয় তুই ক্ষমা চেয়ে ফেল।
আমি চুপ। মনে মনে বলছি, ক্ষমা আমি চাইবো না। মরতে হয় এখানে মরবো।
ঈমাম সাহেব খানকির পোলা কথা কসনা কেন বলে আমাকে থাপ্পড় লাগিয়ে দিলেন।

টেইলারিং দোকানের আংকেল বলল, -ও মরে যাবে, তবুও ক্ষমা চাইবেনা। ওকে আমি চিনি। ওর রগ কতো টেরা আমি জানি। ওর মাথা অনেক উঁচু! সহজে মাথা নোয়ায় না ও! আপনারা মেরে ফেললেও ও ক্ষমা চাইবেনা। নাস্তিকরা এরকমই হয়।

সেই সময় হারুন তার পরিচিত এক ভদ্রলোক দাঁড়িওলাকে ডাকলেন। তাকে আমার সবকিছু খুলে বললেন। এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এখন এই অপ্রিয়কে কি শাস্তি দেয়া উচিত বলেন?
ভদ্রলোক বললেন, -দেখুন হারুন সাহেব, ও যখন নবীকে ইয়ে… বলেই ফেলেছে। তার বিচার আল্লাহ করুক। আল্লাই তাকে নাশ করবে। আপনারা কেন তার বিচার করে পাপের ভাগীদার হচ্ছেন। আল্লাহ এই কাফেরের স্থান দোযকে রেখেছেন। ওকে ছেড়েদেন, ওর বিচার আল্লাহ করবে।

তখন হারুন সাহেব আমার বাবাকে ফোন দিয়ে বললেন, – দাদা আপনি একটু তাড়াতাড়ি দোকানে আসেন। আপনার ছেলের সমস্যা হয়েছে।

বাবা আসলেন। দোকানের সামনে মানুষের ভীড়। ভীড় ঠেলে এসে বাবা আমাকে বললেন, -কি হয়েছে?
আমি চুপ।
হারূন সাহেব সবকিছু খুলে বলেন। তিনি বাবাকে বললেন, -এই মানুষগুলো তোমার ছেলেকে মারতে এসেছে। এখন কি করবে?

বাবা অনুনয় বিনয় করে একে একে হাত জোর করে সবার কাছে ক্ষমা চাচ্ছেন, -আমি আমার ছেলের হয়ে আপনাদের সবার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আপনারা দয়া করে আমার ছেলেকে ক্ষমা করে দিন।
হারুন সাহেব বলল, -এই হল আপনার কুলাঙ্গার ছেলে। যার জন্য আপনাকে ক্ষমা চাইতে হচ্ছে। তারপর হারুন সাহেব বলল, এই তোমরা সবাই যাও, নামাজের সময় হয়ে গেছে। মসজিদে যাও।

একে একে মানুষ কমতে থাকে। হারুন সাহেব বাবাকে বলল, -এই ফাঁকে আপনার ছেলেকে নিয়ে যান।
ছোটভাই আমাকে বলল, তুই তাড়াতাড়ি বাসায় যা। আমি দোকান বন্ধ করে আসছি।

আমি বাবার সাথে বাসায় চলে আসি। বাসা আর আমার দোকান খুব কাছাকাছি। এক মিনিটের পথ!
বাবা এসে মাকে বলল, তোমার ছেলেকে ওরা জবাই করতে আসবে। ওরা এখন নামাজ পড়তে গেছে।
মা অবাক বাবাকে হয়ে বলল, -কেন, কি হয়েছে?
-তোমার ছেলে মুসলমানের নবীকে লুইচ্চ্যা বলেছে। ওরা তো আজ মেরেই ফেলতো। জমিদার ছিল বলে মারতে পারেনি।
মা ও ভগবান বলে মাথায় হাত দিয়ে দপ করে মেজেতে বসে পড়েন।

ছোটভাই বাসায় এসে বলল, -চল চল তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে যা। ওরা নামাজ পড়ে বাসায় আসবে। এই নিয়ে মসজিদে আলোচনা হচ্ছে।
আমি বললাম, -আমি যাবো না!

বাবা আমাকে বলল, -ও বাপ! এটা গোঁয়ারতমি করার সময় না। তুই কখনো সকালে স্নান করে আসনে প্রনাম করিস না, তা নিয়ে আমরা কখনো বলেছি? তুই পুজায় অঞ্জলি নিস না, কখনো জোর করেছি? তুই মাটির মুর্তিকে প্রনাম করিস না, কখনো জোর করেছি প্রনাম করতে? আজ তোকে জোর করে বলছি, তুই পালিয়ে যা! ওরা মুসলিম। ওরা তোকে মেরে ফেলবে! বাবা অনেকটা কেঁদে ফেলেন।

আমি আর কিছু না ভেবে ছোট ভাইয়ের সাথে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলাম। যাওয়ার সময় রাস্তায় জাশেদের বাবা, মন্নান আর আবুলকে দেখলাম। কেউ কিছু বলেনি। শুধু আমার দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে থাকিয়েছিল। স্কুলের সামনে থেকে রিকশা নিলাম। বললাম, তাড়াতাড়ি চালা! বুকের ভয়টা দারুনভাবে অনুভব হচ্ছে। রিকশা চালক মেইন রোডে এসে বলল, -কোথায় যাবেন?
আমি বললাম, -চালা চালা তাড়াতাড়ি চালা! আগ্রাবাদের দিকে চালা……

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on ““এক নাস্তিকের জবানবন্দী” ২য় পর্ব

  1. প্রথম পর্ব পড়ার পর আগ্রহ
    প্রথম পর্ব পড়ার পর আগ্রহ বেড়েছিলো, এখন দ্বিতীয় পর্বটাও তার চাইতেও বেশি আগ্রহ বাড়ছে পড়ার। আতংকের এই গল্পে বাস্তবতার উপস্থিতি…. চলবে

    1. আমার জীবন ও পরিবারের মধ্যে কি
      আমার জীবন ও পরিবারের মধ্যে কি বর্বরতার অন্ধকার নেমে এসেছিল তা আমি পর্বে পর্বে বলব কথা দিলাম।

  2. এটা আপনার জীবনের সত্যি কাহিনী
    এটা আপনার জীবনের সত্যি কাহিনী হলে শুধু এটুকুই বলবো যে আপনি সত্যিই ভাগ্যবান যে বেঁচে আছেন এখনো আমাদেরকে শোনানোর জন্য।

    1. এটা বলার আমি তাগিদ অনুভব করছি
      এটা বলার আমি তাগিদ অনুভব করছি। এটা নিয়ে মামলা হয়েছিল। আসিফ মহিউদ্দিন মামলা বিষয়ে যথাযথ হেল্প করেছিলেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

63 − = 58