“এক নাস্তিকের জবানবন্দী” ৩ পর্ব

আগের পর্বগুলোর জন্য ক্লিকানঃ ১ম পর্ব, ২য় পর্ব

ওখান থেকে কোনো রকম পালিয়ে এলেও আতংকের ঘোরটা কাটেনি। ছোট ভাইটা কলেজে যায়। ছোট বোন স্কুলে যায়। মা ভ্যাং গাড়ি থেকে বাজার করার জন্য রাস্তায় বের হয়। বাবা দোকানে যায়। না জানি তাদের কখন হামলা করে বসে! রিকশায় করে আসার সময় খানিক পর পর একেক জনের ফোন আসতে থাকে। নাম্বারগুলো একটাও চিনিনা।

কেউ বলল, -অপ্রিয় তুই কই? শালা চাড়ালের বাচ্ছা পালিয়ে গেছিস কেন? সাহস থাকলে দোকানে আয়। আমরা তোর দোকানের সামনে আছি।
কেউ বলল, -মাগীর বাচ্চা ডান্ডি, তুই কোন সাহসে নবীর চরিত্র নিয়া প্রশ্ন তুলিস? তোদের দয়া করে এদেশে থাকতে দিছি এটাই তো অনেক বেশি।
কেউ বলল, -আমাদের গরু কোরবানির ছুড়িটা এখন ধার (শান) দিচ্ছি, তুই আসলে তোকে কোপাবো!

আরো কতো ফোন কতো হুমকি আসতে থাকে। আমি চুপই ছিলাম। রিকশা করে আসার সময় আস্তিক বনাম নাস্তিক গ্রুপে একটা লেখা পোষ্ট করি। পোষ্টটা এরকম, -“নবীর সমালোচনা করায় আমার জীবনে এমন অন্ধকার নেমে এটা কখনো ভাবিনি। ওরা আজ মেরেই ফেলত আমাকে, কোনো রকম বেঁচে আসলাম।” পোষ্ট দেয়ার পর ফোন আসতে থাকে আস্তিক বনাম নাস্তিক গ্রুপের বন্ধুদের।
কেউ বলল, -কেন ভাই লিখতে গেলেন নবীর বিরূদ্ধে? এবার বুঝেন ঠেলা!
আর কেউ বলল, -তওবা করে মাপ চেয়ে নিন। দরকার পড়লে নাকে খত দিন। ব্যাপারটা সমাধান করে ফেলুন।
আরেকজন বলল, -আপনি দুঃসাহস করে লিখতে গেলেন কেন? আমি গতকাল আপনার পোষ্টটি পড়ে মনে মনে যাই ভেবে ছিলাম তাই হয়েছে। এবার বুঝেন!
আরেকজন বলল, ভাই ঢাকায় চলে আসেন, আমার বাড়িতে থাকতে পারবেন। কোনো সমস্যা হবেনা। খালি আপনি নাস্তিক এটা কাউকে বলবেন না।

ফোন আসতে থাকে বিভিন্ন জনের। কিন্তু কেউ নাম বলেনা। ওখানে থেকে পালিয়ে আসার পর প্রথমে পিসিতো ভাই অচলের দোকানে আসি। অচলকে সব খুলে বললাম। সেই শুনে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।
সেই বলল, ভাই এটা কি করলি তুই?
-আমি চুপ।
-তুই জানস না এটা মুসলিমের দেশ? হুমায়ন আজাদকে মেরেছে, তসলিমাকে তাড়িয়েছে কি করল এদেশ?
-আমি চুপ।
কিছুক্ষন পর বাবা অচলকে ফোন করে আমি তার কাছে কিনা জানতে চাই।
অচল বলল, -হ্যাঁ অপ্রিয় আমার কাছে আছে বলে ফোন রেখে দেয়।

এরমধ্যে আমার মোবাইলে ফোন আসে জিমরানের। জিমরানকে চিনি দীর্ঘদিন থেকে। তার মা-চাচীর সাথে আমার ব্যবসায়ীক সম্পর্ক অনেক দিনের। তারা আমার কাছে বেশ কিছু অলংকার বানিয়েছিল। সেক্ষেত্রে জিমরানের সাথে আমার পরিচয়। জিমরান মাস তিনেক আগে আমার কাছ থেকে কিছু অলংকার (বন্ধক) রেখে লাখের কাছাকাছি টাকা নিয়েছিল। অন্য দোকানে যে অলংকার দিয়ে সেই ৫০ হাজার টাকা পাবেনা, আমি তাকে ৯০ হাজার দিয়েছিলাম। মনে মনে ভাবলাম, জিমরান বোধহয় বন্ধকটি ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য ফোন করেছে। তার ফোন রিসিভ করলাম-
-হ্যালো জিমরান?
-অপ্রিয় তুই কই?
জিমরানের কাছে আমাকে ‘তুই’ শব্দটা শুনতে হবে এটা আমার কল্পনায় ও ছিলনা। যে ছেলেটি আমাকে অপ্রিয় দা ডাকত, আজ সেই হুমকির সুরে তুই বলছে। আমি তার ‘তুই’ সম্বোধন হজম করে খুব শান্তভাবে বললাম,
-জিমরান তুমি আমার সাথে এভাবে ব্যবহার করছো কেন?
-ব্যবহারের মাইরে চুদ! তুই কই আগে সেটা বল? আমি তোর ভাইকে আটকে রাখছি। তুই এখন দোকানে আয়, তুই না আসলে তোর ভাইকে এখানে জবাই করবো!
ছোট ভাইকে আটকে রেখেছে শুনে চোখে অন্ধকার দেখছি। ভয়ে শিউরে উঠলাম! কান্না আসছিল। নিজেকে কোনো রকম সংবরণ করে বললাম,
-প্লীজ জিমরান তুমি সজীব কে ছেড়ে দাও। আমি আসছি।
আচ্ছা আয় বলে সেই ফোন রেখে দেয়।

আমার মামা দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে ঐ এলাকায় বসবাস করেন। মামা ব্যবসা করেন। ব্যবসার সুবাদে মামার ঐ এলাকার স্থানীয় কিছু আতিপাতি নেতার সাথে তাঁর পরিচয় আছে। ঐ এলাকার বাজারের বিচার টিচার হলে মামাকে ডাকে। মামার কথা গুরুত্ব দেয়। আমি ফোন করলাম মামাকে।

মামা বলল, এটা তুই কি কাজ করলি? কি করেছিলি ওখানে? কি লিখেছিলি ফেসবুকে?
আমি বললাম, -আচ্ছা এটা পরে শোনা যাবে। তুমি একটা কাজ কর।
-কি?
-ওরা সজীবকে আটকে রেখেছে। তুমি আমাদের বাসার ওখানে যাও। ওরা বলেছে আমি যদি ওখানে না যায়, সজীবকে মেরে ফেলবে!
-কি! আচ্ছা রাখ আমি যাচ্ছি।
-আর হ্যাঁ শুনো…
-কি বল?
-আমার ছোট ভাই সজীবের যদি কিছু হয় আমি পাগলা কুত্তা হয়ে যাবো মামা! ওর যদি এক বিন্দু ক্ষতি হয়, আমি পুরো এলাকা জ্বালাবো! প্রয়োজনে টেররিষ্ট হবো! সন্ত্রাস হবো! আমি আর আমার জীবনের কথা ভাববো না! বোমা মেরে ঐ এলাকা উড়িয়ে দেবো! কথাটা তোমাকে জানিয়ে রাখলাম। তুমি তাড়াতাড়ি যাও। ওর যাতে কিছু না হয়।
মামা আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বলল, -আচ্ছা আমি দেখছি কি করা যায়, তুই রাখ।

এখন ফোন আসলেই গা শিউরে উঠে! এর কিছুক্ষন পর ফোন আসে একজন মুক্তমনা ব্লগারের।
-হ্যালো কে বলছেন?
-আমি অমিত (ছদ্দনাম) বলছি, আপনার কি সমস্যা হয়েছে আমাকে খুলে বলুন।
-আপনি কোত্থেকে জানলেন?
-আস্তিক-বনাম নাস্তিক গ্রুপে আপনার স্ট্যাটাস দেখে জানালাম।
-আমার নাম্বার কোত্থেকে পেলেন?
-আপনার এব্যাউড থেকে নিলাম। আপনি কোথায় আছেন এখন?
-চট্টগ্রাম।

প্রায় ১৫ মিনিট কথা বলে তাকে সবকিছু খুলে বললাম। তিনি আমাকে একটা উকিলের নাম্বার দিলেন। বললেন, -উনি একজন লয়ার প্লাস এথিস্ট। আপনি উনার সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার সমস্যা খুলে বলুন, কোনো সমস্যা নেই, উনিও একজন নাস্তিক। আমাদের মতাদর্শের মানুষ। আর কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবেন।
-আচ্ছা ঠিক আছে বলে ফোন রেখে দিই।

চা-সিগারেট পান করতে করতে অস্থির সময় কাটতে থাকে। খানিক পর পর সিগারেট চা। সিগারেটের ধোয়ায় বাষ্প হয়ে গেছে অচলের দোকান। কখন দুপুর গড়িয়ে বেলা হয়ে গেল টের পায়নি। মধ্যন্ন ভোজ আর হয়নি। অবশ্য অচল অনেকবার দুপুরের খাবারটা খেতে বলেছিল, আমি খাইনি। বেলা তখন চারটে। হঠাৎ সজীব ফোন করে।
আমি বললাম, -ভাই তুই কই? তুই ঠিক আছিস তো?
-হ্যাঁ।
-মামা গিয়েছিল?
-হ্যাঁ মামা কয়েকজন মানুষ নিয়ে যাবার পর ওরা আমাকে ছেড়ে দেয়। তুই একটু সাবধানে থাকিস আর যোগাযোগ রাখিস বলে সজীব ফোন রেখে দেয়।

ছোট ভাইয়ের সাথে কথা বলে অনেকটা স্বস্তি পেলাম। জীবনে এতোবড় ঝড় কখনো মাথার উপর দিয়ে যায়নি। সন্ধ্যায় অচল বলল, -চল সঞ্জয় দার বাসায় যায়।
আমি বললাম, জেঠুর বাসায়? না, সঞ্জয় দা বকবে।
অচল বলল, চল চল ওখানে গিয়ে সঞ্জয় দার সাথে কথা বলব।

সঞ্জয় দা আমার জেঠাতো ভাই। আমার চেয়ে বছর চারেকের বড়। ছোটকাল থেকে তাকে খুব শ্রদ্ধা করি। দাদা ডাকি। তিনি ঈশ্বর ভগবান বিশ্বাস করেন, আমি করিনা। এই নিয়ে সঞ্জয় দার সাথে আমার দু-একবার দীর্ঘক্ষন তর্কালোচনা হয়েছিল। আমি যে নাস্তিক তিনি তা খুব ভালো করে জানেন। কিন্তু তর্কের সময় তিনি কখনো আমার সাথে রাগান্বিত হননি। সঞ্জয় দা এই চট্টগাম সিটির একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (নাম বলছি না) লেকাচারার (প্রভাষক) হিসেবে আছেন।

ওদের বাসায় যাবার পর রাতের খাবার খেয়ে নিয়ে সঞ্জয় দার সাথে এই নাস্তিক্যবাদ নিয়ে অনেক আলোচনা হলো।
তিনি বলল, -এদেশে নাস্তিক্যবাদ নিয়ে যেই লেখবে, তাকে হত্যা করবে মুসলমানরা। কারন মুসলমানরা তাদের ধর্মের সমালোচনা সহ্য করার মতো এতোটা উদার এখনো হয়নি। তুই হুমায়ুন আজাদকে দেখ। “পাক সার জমিন সাদ বাদ” লেখার পর জামাতিরা তাকে কুপিয়েছে। এখনো তাঁর বিচারও হয়নি।

আমি বললাম, -আচ্ছা ভারতে তো প্রবীর ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রা হিন্দু ধর্মের অনেক সমালোচনা করে লিখেন, কই তাদের তো হিন্দুরা কোপাতে আসেনি। বা কুপিয়ে রাস্তায় ফেলে দিয়ে যায়নি? তাঁদেরকে তো তসলিমা নাসরিন কিংবা দাউদ হায়দারের মতো দেশ ছাড়তে হয়নি? আর এখানে মুসলমানরা বছরে বছরে হিন্দুদের কতো মন্দিরই তো ভাঙচুর করে, কই কোনো হিন্দু তো ধর্মানুভুতিতে আঘাত লেগেছে বলে মুসলিমকে মারার জন্য বুনো ষাঁঢ়ের মতো তেড়ে যায়নি? আমি তো শুধু মোহাম্মদকে লুইচ্চ্যাই বল্লাম, তাই বলে ওরা আমার উপর এতোটা হিংস্র হবে?
আমার জেঠাতো বোন কলি বলল, -চুপ চুপ! আস্তে কথা বল। পাশে মুসলিমের বাসা আছে। শুনলে এখানেও বিপদ হতে পারে।

আলোচনা আর এগোয়নি। রাত এগারটার দিকে ছোট ভাই সজীব ফোন করে।
-হ্যালো?
-তুই কই?
-সঞ্জয় দার বাসায়। খাওয়া দাওয়া করেছিস?
-হ্যাঁ, তুই করেছিস?
-হ্যাঁ।
সজীব বলল,- আজ সন্ধ্যায় বাসার জমিদার এসে বলে গেছে বাসা ছেড়ে দেয়ার জন্য।
-কেন?
-এলাকার ত্রিশ-চল্লিশ জন মানুষ গিয়ে জমিদারকে চাপ দিয়েছে। তারা জমিদারের কাছে গিয়ে বলেছে আমাদের যেন বাসা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়।
-তো তুই কি বললি?
-অনেক অনুরোধ করে এক মাসের সময় নিলাম। ভাই তুই আমাদের অনেক বিপদে ফেলে দিয়েছিস।
-আমি চুপ। একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
সজীব আবার বলল, -কেন এগুলো লেখার কি দরকার ছিল? আজ আমরা পুরো হুমকির মধ্যে পড়ে গেলাম। অনেক পিছিয়ে গেলাম। নিজের খেয়ে এগুলো লেখার কোনো প্রয়োজন আছে কি? আজ সন্ধ্যায় জিমরান সাত-আটজন নিয়ে বাসায় এসেছিল তোকে খুঁজতে। আমি তাদের দুজনকে বাসায় ঢুকে দেখতে বললাম। তারা না পেয়ে চলে গেল।
-আমি চুপ।
সজীব আবার বলল, -আর হ্যাঁ তুই কাল এই চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে কিছুদিনের জন্য দুরে কোথায় চলে যা। ফোনে যোগাযোগ রাখবি। দেখি এদিকটা কিভাবে সামাল দিতে পারি। আচ্ছা ঠিক আছে এখন গিয়ে ঘুমা।
-ঠিক আছে সাবধানে থাকিস।
-ও হ্যাঁ, আজ বাসায় দোকানের জমিদার এসেছিল।
-কি বলল?
-তিনি ১৫ দিনের মধ্যে দোকান ছেড়ে দিতে বলেন।
-তুই কি বললি?
সজীব বলল, -আচ্ছা পরে বলবো বলে, এখন ঘুমা বলে সেই ফোন রেখে দেয়।

পরদিন সকালে অচলকে নিয়ে বেড়িয়ে গেলাম। অচল টিকিট কেটে আমাকে গাড়িতে তুলে দেয়। আমি যাচ্ছি চট্টগ্রামের বাইরের জেলা, (নাম বলছিনা) দিদির শশুর বাড়িতে। শুধু নিজের জীবনটা বাঁচানোর জন্য পালিয়ে যাচ্ছি। জানিনা সামনের দিনগুলোয় আমার জন্য কি দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে।

দিদির বাড়িতে থাকাকালীন তিনদিন পর সকালে দিদির কাছে আমার ছোট বোন জুলি কেঁদে কেঁদে ফোন করে বলে, – পুলিশ এসে মা বাবা আর ছোটদাকে ধরে থানায় নিয়ে গেছে।
দিদি আমার সামনে এসে কান্নাকাটি করছেন, আর বলতে লাগলেন, -তোর জন্য আমাদের সবকিছু শেষ! এটাই কেন করতে গেলি? কি লাভ ধর্মের বিরূদ্ধে লিখে? তুই ধর্ম বিশ্বাস করিস না ঠিক আছে, কিন্তু এগুলো ফেসবুকে কেন লিখবি? ধর্মের বিরূদ্ধে লিখলে টাকা আসে? কয় টাকা পেয়েছিস তুই?
-আমি চুপ।
-তুই মরতে পারিস না? এখন কি হবে বলে দিদি অঝোরে কাঁদতে লাগলেন।
-আমি চুপ।

এর কিছুক্ষন পরে আমার মোবাইলে ফোন আসে। ফোনটা ছিল থানার ওসির।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on ““এক নাস্তিকের জবানবন্দী” ৩ পর্ব

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

76 + = 79