মীরের স্ট্যাটাসঃ মুসলিমের ক্রিসমাস ক্যাচাল……………

মীরাক্কেল এর মীর। আসল নাম মীর আফসার আলী। তার অসাধারণ উপস্থাপনার জন্য, দুই বাংলার এমন কম মানুষই পাওয়া যাবে, যে তাকে চেনে না। গতকাল সকালে তিনি ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা জানিয়ে পিক আপ করেছিলেন একটা। আর এজন্য তার শিক্ষাটা হয়ে গেল ভাল করেই। আমাদের বাংলাদেশের মুসলিমেরা যে কেমন, কেমন এদেশের মানুষের মানসিকতা তা জানতে তার একটুও বাকি রইল না।

এদেশের বাঙালিরা নিজেদের বাঙালি মনে করে না, সে তো জানা কথা। বাঙালি মুসলিম, মুসলিম বাঙালি না শুধু বাঙালি পরিচয়ে বাংলাদেশের মানুষেরা পরিচিত হবে, এ নিয়ে চলছে বিতর্ক অনেকদিন থেকেই। যেকোন সময় এবিতর্ক আবার চালু হয়ে যেতে পারে। তবে এখন বোধহয়, মানুষ পরিচয়ে পরিচিত হওয়াটাও নফরমানি। কেউ মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করলে, তাকে স্রেফ মুসলমান পরিচয়েই পরিচিত হতে হবে।

যাক, আমাদের, বাঙালির পরিচয় অনুসন্ধানে শতশত বুদ্ধিজীবি মাথা ঘামিয়ে চুল হারিয়েছেন। যেহেতু আমি বুদ্ধিজীবি নই, মাথার চুলকেও আমি ভালবাসি- তাই সেবিষয় এখন স্থগিত। আমরা বরং অন্য কিছু নিয়ে কথা বলি।

বাংলাদেশের মুসলমানেরা বোধহয় মনে করে, ধর্মবিষয়ে জ্ঞান দেয়ার একচেটিয়া অধিকার নিয়েই তারা দুনিয়ায় ল্যান্ড করেছে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের মতো এটাও তাদের মৌলিক অধিকার। (নিরাপত্তাকে এতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিৎ নয়। নিরাপত্তার অধিকার বাঙালির কোন কালেই ছিল না)। রণে বনে জলে জঙ্গলে এরা ধর্ম নিয়ে উপদেশ দিয়ে বেড়ায়। কেউ একজন মাথায় কাপড় না দিলেই হলো। তাদের “উহ আহ” শুরু। এটা মনে করিয়ে দেয়া তখন তারা কর্তব্যজ্ঞান করে যে, মাথায় কাপড় না দিলে আখিরাতে কীকী শাস্তি পেতে হবে, মাথায় কাপড় না দেয়া দেশসমাজ কীকরে ধ্বংস হয়ে যায়, কীভাবে এদেশের তরুণ সমাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে- ইত্যাদি। আর তাদের উহুআহুর প্রথম শিকার সেলিব্রেটিরা। সাকিব আল হাসান ও তার বৌয়ের পিকে তারা যেভাবে কমেণ্ট করে, এতে মনে হতেই পারে, তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল পিক আপ করা।

এদেশের সেলিব্রেটিরা বাঙালি মুসল্লির ন্যাচার জানেন। কিন্তু পাশের দেশ ভারতের সেলেবরাও এই ধর্মিয় কচকচানি থেকে মক্ত নন। প্রায়ই এদেশের ধার্মিকেরা লুঙ্গিতে কোচা বেঁধে নেমে পড়েন ধর্মশিক্ষা দিতে। একআধজন এ কাজে নামলে তাও না হয় হতো। কিন্তু তারা কাজটা করেন দলবেঁধে। একজনের দেখাদেখি আরেকজন অনুপ্রাণিত হয়ে উপদেশবাণ ছুড়তে আরম্ভ করেন। পতিতজনে, দুস্থজনে শিক্ষাদানের চাইতে বেশি মাহাত্ম যে আর কিছুতে নেই, এটা তাদের চেয়ে বেশি হয়তো কেউ জানে না; জানলেও মানে না।

মীরাক্কেল এর মীর। আসল নাম মীর আফসার আলী। তার অসাধারণ উপস্থাপনার জন্য, দুই বাংলার এমন কম মানুষই পাওয়া যাবে, যে তাকে চেনে না। গতকাল সকালে তিনি ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা জানিয়ে পিক আপ করেছিলেন একটা। আর এজন্য তার শিক্ষাটা হয়ে গেল ভাল করেই। আমাদের বাংলাদেশের মুসলিমেরা যে কেমন, কেমন এদেশের মানুষের মানসিকতা তা জানতে তার একটুও বাকি রইল না।

আজ তারই একটা পোস্ট দেখলাম ফেবুতে। এই ধর্মশিক্ষকদের নিয়ে। সেটাই বাংলায় অনুবাদ করে দিলাম।-
“অসাধারণ একটা ক্রিসমাস পার করলাম এবছর।

সকালে সবাইকে ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা জানিয়ে আমার ফেসবুক অফিশিয়াল পেজে একটা পিক শেয়ার করেছিলাম। মাত্র বারো ঘণ্টার মধ্যেই আঠাশ হাজারের উপরে লাইক, চারশো প্লাস কমেণ্ট, ২০০ এর মত শেয়ার!

না, আমি সেসব নিয়ে এই পোস্টে কথা বলতে চাচ্ছি না। আমি সেই আবালগুলোকে নিয়ে বলতে চাচ্ছি যারা আমাকে উপদেশ দিচ্ছিল। বলছিল কেন একজন মুসলমান হিসেবে আমার ক্রিসমাস পালন করা উচিৎ নয় বা কেন ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা জানানো উচিৎ নয়।

তারা আমাকে খোদার কাছে এজন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার কথাও বলছিল। একজন মুসলিম হিসেবে যে এটা করা একদম উচিৎ হয়নি, সেসব বিষয়ে বলছিল একজন।

নাহ, আমি রেগে যাইনি একটুও। তাদের উপর প্রতিশোধও নিচ্ছি না এই পোস্টে। আমি আসলে আমাদের চারপাশের এমন অবস্থা দেখে আমোদিত হয়েছি অনেকটা। আর দুঃখের সাথে দেখে যাচ্ছি আসলে আমরা ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে। আমি এটা বুঝে গিয়েছি যে, কাল যদি আমি মিশনারি অফ চ্যারিটি বা রামকৃষ্ণ মিশনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই তাহলে হয়তো কিছু মুসলিম আমার সমালোনা করবে।

“আরে, তওবা তওবা, আমি তো টাকাটা কোন এতিমখানা বা মাদ্রাসাতেও দিতে পারতেন!”(যাক গে, এসব নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি না। আসলে আমি চাই না আমার মানবসেবামূলক কার্যকলাপগুলো প্রকাশিত হোক!)

এটাও বুঝলাম, যদি আমি কোন মুসলমানদের অর্গানাইজেশনে সাহায্য করি (তারা মনে করে এটাই করা আমার উচিৎ) তাহলেও আমি সমালোচনার হাত থেকে রেহাই পাবো না। “আরে ও তো মুসলিম। সে তো মুসলমানদের অর্গানাইজেশনে ডোনেট করবেই। তার কাছ থেকে কীই বা আর আশা করা যায়!”

আসলে আমরা একটা স্টেইন্জ দুনিয়ায় বসবাস করি। সময়টাও বড় উদ্ভট। মনে হয়, তারা আমার প্রতিবেশি দেশের (বাংলাদেশ) নাগরিক। কিন্তু বিশ্বাস করুন, ধর্মান্ধদের কোন দেশ নেই, কোন তারকাঁটা নেই। এটা এখন সারাবিশ্বের দুশ্চিন্তার মূল কারণ।

এটা শুধু আজকালকার ব্যাপার নয়। অনেকদিন থেকেই আছে এই ধর্মান্ধেরদল। এদের মনমানসিকতা কতোটা নিচু! এসব যেন এখন ডালভাত হয়ে গিয়েছে।

আমি আমার জীবনের পনেরোটা বছর মিশোনারি স্কুলে কাটিয়েছি। The Assembly of God Church এ। রিপন স্ট্রিটের একটা মসজিদে পবিত্র কোরান শিখেছি। আর তিন বছর অধ্যয়ন করে ইসলামি অনেক বইপত্র। আর আমি বিয়ে করেছি একজন হিন্দু ব্রাহ্মণকে। তাকে আমি জোরপূর্বব মুসলমানে কনভার্ট করিনি।

পোস্টের শেষে জেসাস ক্রিস্টের বানীতেই বলতে চাই, “হে প্রভু, এদের ক্ষমা কর, কারণ, এরা জানে না এরা কী করছে।” (Book of Luke; Chapter 23, Verse 34)
এই ক্রিসমাস যতোটা “আমার” ততোটা তোমারও। আফসোস যে তুমি সেটা বুঝলে না। ”
স্ট্যাটাসটার লিঙ্ক- https://www.facebook.com/story.php?story_fbid=10154785430065987&id=677885986&refid=17&_ft_=top_level_post_id.10154785430065987:tl_objid.10154785430065987:thid.677885986:306061129499414:2:0:1483257599:-1567844999255872912#footer_action_list

উপরের স্ট্যাটাসটা পড়ে কার কী প্রতিক্রিয়া হবে জানি না। তবে আমার প্রতিক্রিয়া যদি জানতে চাওয়া হয় তবে বলব, “এ আর নতুন কী? সবাই জানে।,মীর জাস্ট সেটা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ তো অনেক আগেই নানা কারণে হাসির খোরাক হয়েছে, এটা তো তার তুলনায় কিছুই নয়।”

এদেশের মানুষ ক্রিসমাসের ছুটি ভোগ করতে রাজি আছে কিন্তু ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা জানালেই চিত্তির। এবিষয়ে অবশ্য মুক্তমনারাও কম যান না। তারা ঈদের শুভেচ্ছা জানানোটাকে ট্যাবু মনে করে থাকেন। অন্যদিকে দূর্গাপুজা, ক্রিসমাসে জানানোই যায় শুভেচ্ছা! যাক গে, এসব কথা বলতে গেলে অনেক কথা এসে যায়। আসলে উৎসবকে উৎসব হিসেবে নিলেই ল্যাঠা চুকে যায়। কচকচানির কিছুই থাকে না।
সত্যি কথা বলতে, উৎসবকে উৎসব হিসেবে নিতেই এখনো আমরা শিখিনি।উৎসবে অংশগ্রহন নাই না হয় করলাম। কিন্তু শুভেচ্ছা জানানো, খোঁজ খবর নেয়া- এসব যে সাধারণ ভদ্রতা- এটা হয়তো এদেশের ধার্মিক, অধার্মিক, নাস্তিক- কেউ জানে না। কিছুদিন আগে, বিজয় দিবস গেল- সেবিজয় দিবস পালন নিয়েও কি কম কথা হয়েছে? একটা দল বলে বসল, যতদিন না স্বপ্নপূরণ হচ্ছে- একাত্তরে যে আকাঙ্খা নিয়ে দেশ স্বাধীন করা হয়েছে- সে আকাঙ্খা সাধিত হচ্ছে- ততোদিনে বিজয় দিবস পালন করাটা বৃথা। কী হাস্যকর! এরা আসলে জনগণ থেকে, বন্ধুবান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন। বন্ধু, পরিবার, স্বজন এদের সাথে মেশা, হাসিখুশী থাকা- এসব থেকে তারা দূরে। নাহলে একথা কেন বলবেন?
আমি প্রতিবার দূর্গাপুজোয় অনেক আনন্দ করি, হিন্দু বন্ধুদের বাড়িতে যাই। পিক তুলি, নাড়ু খাই, ঠাকুর দেখি, মন্ডপে মন্ডপে ঘুরি। উৎসব উৎসব আমেজটা মনে লেগেই থাকে। দূর্ভাগ্য যে কোন ক্রিশ্চান বন্ধু নেই আমার। থাকলে হয়তো ক্রিসমাসটাও হতো আমার জন্য সমান আনন্দের।
আমি আমার অনেক মুসলিম বন্ধুকে দেখেছি দূর্গাকে নিয়ে কটাক্ষ করেছে, বাস্তব জগতেও, ভার্চুয়াল জগতেও। আমার এক জিগ্রি দোস্ত বলেছিল একদিন পুজোর সময়, “রাস্তাঘাট দেখলে মনে হচ্ছে, দেশেটা হিন্দুর হয়ে গেছে!”
এমন মন্তব্য করার লোকের অভাব নেই এদেশে। এদের কারণেই হিন্দুরা এই দেশটাকে নিজেদের দেশ মানতে পারে না। আপনদেশে কেউ এভাবে অপমানিত হয় না। সেখানে যদি কেউ, সে হোক অবিশ্বাসি নাস্তিক- শুভেচ্ছা জানিয়ে পাশে থাকার অনুভুতিটা অন্তত জাগায়- ক্ষতি কোথায়? অন্তত এটা তারা মনে করবে যে, তারা একদম অসহায় নয়।ক্রিসমাসের শুভেচ্ছা জানানো, ঈদের শুভেচ্ছা জানানো, পুজোর শুভেচ্ছা জানানো- এসব বিষয়কে ঘোলা করাটা স্রেফ অসুস্থতা। এই ঘোলা করার কাজে মুসলিম, হিন্দু, মুক্তমনা কেউ কম যায় না। তাদের প্রতি ঘৃণা।
বাংলাদেশের রোগমুক্তি হোক।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 2