পাহাড় সংস্কৃতির হালচাল: ১

রনজিৎ দেওয়ান এর মত প্রবীন সংস্কৃতি কর্মীকে অনেক শ্রদ্ধা করতাম। অন্য কারোর গানে না হোক তার গানে পার্বত্য চট্টগ্রামের জীবন প্রকৃতি সংগ্রামের ঠিকানা খুজে পেতাম। সবচেয়ে অবাক হয়েছিলাম সেদিন যেদিন তিনিও সেনাবাহিনীর ফাঁদে পা দিয়েছেন। সেনাবাহিনীর সৃষ্ট মেকানিজম শান্তকরন প্রকল্পে তিনি ও সেদিন অংশগ্রহন করেছেন। তাদের টাকাই তিনি ও গান করছেন আর গন মানুষের চেতনাকে পদদলিত করছেন। সমাজের সবচেয়ে প্রগতিশীল অংশ সংস্কৃতি কর্মীদের মনে করা হয়। সংস্কৃতি কর্মীরা সংস্কৃতি চর্চাকে কখন ও কেবল বিনোদনের অংশ হিসাবে ভাবতে পারি না। শিল্প সংস্কৃতি কর্মীরা সমাজের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম ও বটে। সংস্কৃতি চর্চা কেবল নাচ গান আবৃত্তি,নাটক ইত্যাদির মাধ্যমে বিনোদন নয়।শেষের কবিতার একটি অংশে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “হীরের পাথরটা হচ্ছে বিদ্যে,আর সেখান থেকে যে আলো ঠিকরে বের হয়,সেটা হলো সংস্কৃতি।সংস্কৃতি প্রতিফলিত হয় জীবনের ক্রিয়ায়।সংস্কৃতি কেবল সংগীত নয়,সংস্কৃতি আবৃত্তি ও নয় “। আর আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতি কর্মীরা এই সমাজের বাবুদের খুশি করিয়ে বাহবা খুড়িয়ে নেওয়াকে বুঝি। সংস্কৃতি কর্মী দলগুলো ও জেলা পরিষদের আমলা আর সেনাবাহিনীর শান্ত করন প্রকল্পে নিয়োজিত।যার ফলশ্রুতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের পেইন্টিং মানে মৈত্রী আর উন্নয়নের পিংক কালার,চাকমা মেয়েটির হৈ হৈ জুম যেবং কিংবা টিপুরা রমনীর বোতল নৃত্য টি ছাড়া আর বিশেষ কিছু চোখে পড়ে না।

এখন প্রশ্ন হল,আমরা জীবন ধারনের জন্য পানি খাই। কিন্তুু পিপাসা পেয়েছে বলে, কেউ নর্দমার পানি এনে দিলেই আমি সেটা খাবো কি,? ভোগের মধ্যে একধরনের তৃপ্তি থাকলে ও তৃপ্তির মধ্যে সত্য,ন্যায় অন্যায়বোধ মানুষের হৃদয়ের আদান প্রদানের মাধুর্য থাকে তা বাদ দিয়ে সত্যিকার অর্থে তৃপ্তি হয় না।পেটে ক্ষুধার জ্বালা থাকলে ও অবমাননার অন্ন কোন বিবেকবান মানুষের গলা দিয়ে নামে না।

পৃথিবীর ইতিহাস অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াবার। শিল্প সংস্কৃতির চর্চার ইতিহাস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার। জনশ্রুতি আছে, স্পার্টাকাস নিজে গুন গুন করে গান গাইত।সেই গান তার পাশের দাসরা শুনতো। সেই গানে থাকতো দাসদের জীবনের দুঃখ বেদনার কথা,এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের বানী অন্য দাসদের কানে পৌছাতো।তারা আবার সেই গান পৌছে দিত পাশের জনকে।এভাবে সেদিন বিদ্রোহের অঙ্গীকার সংঙ্গীতের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে গিয়েছিল সমগ্র দাস সমাজের মধ্যে। সেদিন গান আর বিনোদনের অংশ হয়ে থাকেনি, বিনোদনের পরিবর্তে হয়ে উঠেছিল বিদ্রোহের হাতিয়ার।বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে স্বাধীন বাংলা বেতার শিল্পীদের অবদান ও কোন অংশে কম নয়। পুরো ভারত বর্ষের সমাজ পরিবর্তনের ও পৃথিবীখ্যাত শিল্পী সৃষ্টিতে গননাট্য সংঘ,নবনাট্য সংঘের অবদান অপরিসীম।

আজকে আমরা যারা পৃথিবী খ্যাত আমরা করব জয় গানটি করছি সেই গানের স্রষ্টা পিট সিগার কোনদিন জনমানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হন নি।এমন উদাহরণ পৃথিবীর ইতিহাসে ভুরি ভুরি। সমাজ বিবর্তনের আদি কাল থেকেই বিনোদন শিকারের জন্য আকুতি বা বৃষ্টির জন্য আকুতির মত কিছু বক্তব্য পৌছে দিয়ে শ্রমের কষ্টকে যেমন লঘু করেছে ঠিক তেমনি পরবর্তী শিকারের জন্য ও অনুপ্ররনা দিয়েছে। বিনোদনের ও কিছু উদ্দেশ্য রয়েছে, বিনোদন যেমন মনকে হালকা করে,পরবর্তী শ্রমের জন্য উজ্জীবিত করে আাবার পাশাপাশি শিল্পের মধ্য দিয়ে মনন জগতে অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াবার আকুতি সৃষ্টি করে।এই উদ্দেশ্যহীনতা হলে বিনোদনের ফলটা হয় প্রতিক্রিয়াশীল।

প্রতিবাদহীনতা,নির্লিপ্ততা, তোষামোদিতে কখন ও সৃজনশীলতা জন্মায় না। সৃজনশীলতা মানুষের চলার পথের বাধা অপসারনের উপায় শুধু বলে দেয় না,মুক্তির উপায় ও চিহ্নিত করে।পার্বত্য চট্টগ্রামের জীবন সংগ্রাম অস্থিত্ব রক্ষার,
এই অংশকে বাদ দিয়ে নাচ,গান,কবিতা,নাটক যা হোক না কেন সৃষ্টি হতে পারেনা।

পাহাড়ের গায়ের ক্ষত দিন দিন বেড়েই চলছে।
ধর্ষিত বোনের কান্নায় পাহাড় আরো ভারি হচ্ছে।ভূমি হারা জুমিয়ার আত্বনাদে বুনোপাখির কলতান থেমে গেছে।গৃহস্থের কুকুরগুলোর ঘেউ ঘেউ শব্দ আর বুটের আওয়াজে জোনাকী পোকার সাথে হেংগরং’ র সুর গুলো হারিয়ে গেছে সেই অনেক আগে।

অনুপ্রেরনার সেই কবিতা, সেই গান,সেই গিটারের টোনগুলো আজ রুদ্ধ। সমাজের অগ্রযাত্রাকে রুদ্ধ করেছে বেপরোয়া শোষন গুলো।
চলছে গোয়েন্দা নজরদারি। এমতাবস্থায় আমরা ভালো থাকতে পারি না। সময় আমাদের উঠে দাঁড়াবার জনগনের পক্ষে থেকে নিজেদের সাংস্কৃতি কর্মকান্ড পরিচালনা করার। আমরা সংস্কৃতি কর্মীরা যেহেতু সমাজের বাহিরে নই,তাই আমাদের উচিত জনগনের পক্ষে এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করার কিংবা জনগনের বিরুদ্ধ গতিপথের বিপক্ষে কলম ধরার। আমরা তখনই যথার্থ অর্থে সংস্কৃতি কর্মী হবো যখন সমাজের দন্দ্বগুলো উপলব্দি করতে পারবো।

লেখক :: অংকন চাকমা,সাংস্কৃতিক সম্পাদক,পিসিপি

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 70 = 71