“এক নাস্তিকের জবানবন্দী” ৪ পর্ব

দিদির বাড়ি আসছি দুইদিন দিন হয়ে গেল। সময়গুলো ভালো কাটেনি, ভয় আর উৎকন্ঠার মধ্যে কেটেছে। গতরাতে আমাদের বাসায় নাকি সিভিল ড্রেসে পুলিশ গিয়েছিল। আমার ছোট ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিল, আমি কোথায়? সেই বলেছিল, জানেনা। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে চা-নাস্তা খেয়ে দিদির বেড রুমে ছোট ভাইগ্নাকে নিয়ে খেলা করছি, এমন সময় দিদি রান্নাঘর থেকে কান্না করতে করতে আমার কাছে এল, বলল, -আমার মা, বাবা আর সজীবকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। দিদি আমাকে অনর্গল বকতে থাকে। কেন এগুলি ফেইসবুকে লিখতে গেলাম। কেন নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে গেলাম।

আগের পর্বগুলোর জন্য ক্লিকানঃ ১ম পর্ব, ২য় পর্ব , ৩য় পর্ব

গাড়ি চলছে। বসে বসে মোবাইলে হিগস বোসনের ঈশ্বর কনা তত্ব পড়ছি। হিগসকে নাকি নোবেল পুরস্কারে ঘোষনা করা হতে পারে। ভারতের জাতীয় অধ্যাপক সত্যেন বোস আর হিগসের যৌথ গবেষনার ফসল ঈশ্বর কণা তত্ত্ব। এই সত্যেন বোস নাকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪১ বছর ছিলেন। মহাবিশ্বের সৃষ্টি তত্ব ঈশ্বর কনা নিয়ে এখানে গবেষনা করেছিলেন। তাঁর গবেষনার সুত্রগুলো এখান থেকেই চিঠি পাঠিয়েছিলেন জার্মানে বৈজ্ঞানিক আইনস্টনকে। আমি বিজ্ঞানের অত ভাল বুঝিনা। সেদিন ফেসবুকে হিগস-বোসন কণার তত্ব নিয়ে আলোচনা ছিল। প্রায় সবার এই নিয়ে স্ট্যাটাস দিল। আমি কিছু লিখিনি। লেখার মানসিকতা নেই। আমি ছিলাম আতংকে। কিছুক্ষন পর পর ফেসবুক বন্ধুদের ফোন। কি করছি, কেমন আছি, কি অবস্থা এখন। সমস্যা সমাধান হল কিনা।

ফোন আসল অমিতের। তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, আমার ঘটনাটা নিয়ে মুক্তমনা ব্লগে লিখবেন কিনা। আমি বলে দি, না না এগুলো ব্লগে প্রকাশ করার দরকার নেই। দেখি আগে সমস্যা কোন দিকে যায়। এর আগে আমার সংগঠনের বন্ধু কিছু স্থানীয় পত্রিকার সাংবাদিক জিজ্ঞেস করেছিল, এটা নিউজে দেবে কিনা। আমি বললাম, -ভাই আমার জীবনের বারোটা বাজাইয়েন না! এটা নিউজে গেলে আমার পরিবারের মানুষগুলো আরো ভয়ংকর পরিস্থিতির সন্মুখীন হবে। গাড়িতে আমার পাশের সিটে বসা এক দাড়ি ওয়ালা ইয়ং যুবক। দেখতে কত শান্ত ভদ্র মনে হচ্ছে। হয়তো কোনো মসজিদের মুয়াজ্জিন হবে, নয়তো মাদ্রাসার শিক্ষক টিক্ষক হবে। এই যুবকটি যদি জানে আমি এক নাস্তিক। নবীকে লুইচ্চ্যা বলায় এলাকাবাসী আমার উপর ক্ষুব্ধ। কিছু উগ্র ধর্মান্ধ ছেলে পুলে আমাকে মারা জন্য বাইকে করে ঘুরে খুঁজে বেড়াচ্ছে পুরো শহর। তাই বাঁচার জন্য এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পালাচ্ছি। এই শান্ত ভদ্র দাঁড়িওয়ালা যুবকটি যদি জানে আমি নবীকে কুটূক্তি করেছি, তখন আমাকে কি আর আস্ত রাখবে? মুহুর্তে এই যুবকের শান্ত চেহেরাটা কি হিংস্র হয়ে উঠবে না?

বিকেলের দিকে দিদির শশুর বাড়ি এলাম। তাদের বাড়ির ছাদে ভাইগ্নাদের সাথে সময় কাটালাম। রাতে দিদি-দাদাবাবু খাওয়ার সময় দুজনেই শাঁসালো। খুব বকাবকি করল। কেন লিখতে গেলাম এসব। কি প্রয়োজন, কি লাভ এতে? এখন কি হবে? দোকান টোকান সব গেল। ওখানে আর তো যেতে পারবো না।

পরদিন সকালে ব্লগার অমিত ভাইয়ের দেয়া নাম্বার লয়ার+এথিস্ট ভাইকে ফোন করলাম।
ওদিক থেকে, -হ্যালো কে বলছেন?
-আমি অপ্রিয় বলছি।
-হ্যাঁ আপনার ঘটনা অমিতের মুখে শুনেছি। আপনি এখন কোথায় আছেন?
-দিদির শশুর বাড়ি আসছি।
-যেখানেই থাকেন, একটু সেফ থাকবেন। আর হ্যাঁ আপনি তো ওদের বিরোদ্ধে মামলা করতে পারেন।
-আমার পুরো পরিবার এখন ওদের কাছে দৃষ্টিবন্ধী, আমি ওদের বিরূদ্ধে কিভাবে মামলা করবো? ওরা আমার পরিবারের মানুষগুলোর আস্ত রাখবে?
-আপনার ফ্যামিলি কি ঐ এলাকায়?
-হ্যাঁ।
-আচ্ছা ঠিক আছে পরে কথা হবে বলে তিনি রেখে দেন।

আমি মনে মনে বললাম, এমনিতে নিজে চলার সামর্থ্য নেই, আবার মামলা করবো?

বিকেলে ছোট ভাই সজীব ফোন করেছিল, বলল, -একজন ডিবি পুলিশ আর আওয়ামিলীগের নেতা জমিস (ছদ্দনাম) এসেছিল।
-কি বলল?
-জসীম নাকি তোকে তিন ভরি ওজনের একটা হাড় বন্ধক দিয়েছিল।
-তুই কি বললি?
-আমি বললাম আপনি যদি হাড় বন্ধক দিয়ে থাকেন অবশ্যই পাবেন। আপনি বন্ধকের রশিদটা নিয়ে আসেন। এটা অবশ্যই খাতায় লিখা থাকবে।
-আর কি বলল?
-তুই কোথায় আছিস জিজ্ঞেস করল। আমি বললাম জানিনা। আর তুই যেন এসে ওর সাথে দেখা করার জন্য বলে গেল।
-আর কেউ এসেছিল?
-সকালে সাত আটটা ছেলে বাসায় এসেছিল তোকে খুঁজতে। তোকে না পেয়ে চলে গেল।
-কিছু বলেছিল?
-ঐ একই কথা, তোকে এখানে হাজির করতে বলেছে। আর হ্যাঁ…
-কি?
-আজ তোর ব্যাপার নিয়ে মসজিদে আলোচনা হল। ঈমাম সাহেব তোকে এখানে যেভাবে হোক হাজির করার জন্য বলল।
-হুম।
-আসলে আমরা খুব চাপের মধ্যে আছি।
-রাশেদ, জোদ্দিন, রাইসার, রাপ্পি, আবুলদের সাথে দেখা হয়েছিল?
-ওরা দেখলেও এখন এড়িয়ে চলে। মনে হয় যেন ঘৃনায় কথা বলতে চায়না।

আমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। বললাম, আচ্ছা দোকান খুলেছিস?
-না। অচল দা এসে খুলবে।
-আচ্ছা একটা কাজ করলে কেমন হয়?
-কি?
-তোরা থানায় গিয়ে একটা জিডি কর নিরাপত্তার জন্য। ওখানে গিয়ে আমার মাকে বলতে বলবি আমাকে মন থেকে তাজ্যপুত্র করে দিয়েছে….
-না না এগুলো হবেনা। তখন সাপ খুঁড়তে কেঁচো বেড়িয়ে আসবে। আমরা আরো বিপদে পড়বো।
-আমি কি অপরাধী নাকি? কোনো মেয়েকে রেপ করেছি নাকি? নাকি কাউকে অপহরণ করেছি? নাকি দু চারটা মার্ডার করেছি…
-না না ঐ নবীকে লুইচ্চ্যা বলাটা সবচেয়ে বড় অপরাধ এদেশে! এটা কাদের দেশ জানিস না?
আমি চুপ।
সজীব বলল, আচ্ছা রাখ পরে কথা বলব।

সন্ধ্যায় অচলকে ফোন করি, ওদিক থেকে, -হ্যালো?
আমি বললাম, -কি অবস্থা এখন? তুই কোথায়?
-কি অবস্থা বলিস না, এখানে তোর উপর সবাই ক্ষেপে আছে। এখন তোর দোকানে বসে আছি।
-কেউ আসছিল?
-না। কিছুক্ষন আগে এ্যানি এসে জিজ্ঞেস করেছিল, অপ্রিয় দা কই। আমি বলেছি জানিনা।
-আচ্ছা এখন পরিস্থিতি কি ঠান্ডা হলো? আসতে পারবো?
-তুই এখানে ভুলেও আসার কথা চিন্তা করিস না। তুই ভুলে যা এই এলাকার কথা। এখানে কেউ কেউ বলছে, তুই এখানে এলে তোর আগা কেটে মসজিদে নিয়ে গিয়ে মুসলমান বানাবে। কেউ বলছে তোর মুণ্ডু কেটে মাথা দিয়ে ফুটবল খেলবে….
-আচ্ছা কোনো কাস্টমার আসছিল?
-না এই পর্যন্ত আসেনি।
-আচ্ছা ঠিকাছে আর কোনো সমস্যা হলে জানাস। রাখি, পরে কথা হবে।

দিদির বাড়ি আসছি দুইদিন দিন হয়ে গেল। সময়গুলো ভালো কাটেনি, ভয় আর উৎকন্ঠার মধ্যে কেটেছে। গতরাতে আমাদের বাসায় নাকি সিভিল ড্রেসে পুলিশ গিয়েছিল। আমার ছোট ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিল, আমি কোথায়? সেই বলেছিল, জানেনা। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে চা-নাস্তা খেয়ে দিদির বেড রুমে ছোট ভাইগ্নাকে নিয়ে খেলা করছি, এমন সময় দিদি রান্নাঘর থেকে কান্না করতে করতে আমার কাছে এল, বলল, -আমার মা, বাবা আর সজীবকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। দিদি আমাকে অনর্গল বকতে থাকে। কেন এগুলি ফেইসবুকে লিখতে গেলাম। কেন নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে গেলাম।

হঠাৎ আমার ফোনে কল আসল, -হ্যালো?
-আমি হাফেজ (ছদ্দনাম)। আমি ওমুক থানার অসি বলছি, অপ্রিয় আমরা জানি আপনি কোথায় আছেন। আপনি বার ঘন্টার মধ্যে থানায় এসে হাজির হোন।
-আমার মা বাবা আর ছোট ভাইকে থানায় এনে জেরা করার অধিকার আপনাকে কে দিছে? এটা রাস্তার ফ্যামিলি পাইছেন নাকি? ওরা কি অপরাধ করছে যে থানায় এনেছেন?
-না না অপ্রিয়, ওদেরকে একটু জিজ্ঞাসা করার জন্য থানায় এনেছি। আবার ছেড়ে দেব।
-আবার ছেড়ে দেব না, না। যে গাড়ি করে এনেছেন, সেই গাড়ি করে দিয়ে আসবেন। নাহলে আপনার বিরূদ্ধে অভিযোগ করতে বাধ্য হবো।

ওসি বলল, আচ্ছা আপনার মায়ের সাথে কথা বলুন বলে ফোনটা মাকে দিল। মার কথাগুলো কান্না জড়িত। মা শুধু বারবার একটা কথাই বলছেন, -অপ্রিয় তুই চলে এখানে আয়, বাবা তুই চলে আয়। এরা তোর কোনো ক্ষতি করবে না। কিছু জিজ্ঞেস করে আবার ছেড়ে দেবে।
থানায় কিভাবে ব্রেন ওয়াশ করেছে কে জানে।

আধ ঘন্টা পর বাবা মা ছোট ভাইকে পুলিশ আবার গাড়ি করে বাসায় পৌঁছে দেয়। এদিকে দিদি খুব উদ্ভিগ্ন, আমাকে যখন তখন বকছেন। আজ আমার জন্য মা, বাবা, ভাই, বোনের এই করুন অসহায়ত্ব ও বিপদ দেখে অঝোরে কাঁদলাম। তারা কখনো কল্পনাও করেনি তাদের থানায় এনে পুলিশ জেরা করবে। মধ্যবিত্ত পরিবারের আত্নসম্মান বোধহয় খুব বেশি। ফোন করে বাবা লজ্জায় কাঁদলেন। বললেন, তোকে জম্ম দিয়ে আজ আমি খুব লজ্জিত। তুই নিজেকে তসলিমা নাসরিন মতো বড়ো লেখক মনে করিস, না?

আমি অমিত, লয়ার, আরো একজন কলামিস্টকে ফোন করে পরামর্শ চাইলাম, এখন কি করবো? তাদের একই পরামর্শ, আপনি কোনোভাবেই থানায় আত্নসমর্পন করবেন না। মামলা হলে হোক। আপনি কোর্টে স্যারেন্ডার করে জামিন নেবেন।

ফোনে কথা বলতে বলতে মাথা অনেকটা হ্যাং হয়ে গেছে। আত্নীয় স্বজনেরনের একই কথা, একই চাপ, থানায় আত্নসমর্পন কর। না হলে তোর মা বাবাকে আবার থানায় এনে টরচার করবে। মান সম্মান বলতে কিছুই থাকবে না। মা, বাবা, ছোট ভাই, মামা, দাদা, সবাই ফোন করে বলে আত্নসমর্পন করতে চলে আসার জন্য। আর পুলিশ তাদের বলে দিয়েছে, আমি যেন কোনো সংগঠন, মিডিয়া, সাংবাদিকের সাথে যোগাযোগ না করি। এগুলো মিডিয়ায় গেলে দেশে দাঙ্গা লাগবে। মনে মনে বললাম, এদেশে দাঙ্গা হয় নাকি? এদেশে তো সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর রীতিমত নির্যাতন করা হয়। এদেশের হিন্দুরা আবার দাঙ্গা কখন করেছে? তাদের দাঙ্গা করার মতো শক্তি-সামর্থ আছে নাকি? আমি তো জানি এটা পুলিশের চালাকি। কিন্তু আমি আমার আত্নীয় সজ্জনকে বোঝাবো কি করে? তারা তো বুঝতেই চাইছে না। এদিকে দিদি বারবার তাগাদা দিচ্ছে, চলে যাবার জন্য। আত্নসমর্পন করার জন্য।

আমি ওদের চাপে থাকতে না পেরে সেদিন সন্ধ্যা আটটায় চট্টগ্রামের উদ্দেশে গাড়িতে উঠি। এসে পৌঁছতে রাত ১২ টা হয়ে গেল। পরদিন সন্ধ্যার রাত সাড়ে আটটায়, মামা, দাদা, দাদার এক রাজনৈতিক পর্যায়ের বন্ধু, আর ছোট ভাই মিলে আমাকে থানায় নিয়ে গেলেন। ওসির কাছে বুঝিয়ে দিয়ে আসলেন আমাকে।

সেদিন আমার জন্য অপেক্ষা করছিল, শারিরিক নির্যাতন ও তীব্র মানসিক চাপের একটি ভয়ংকর রাত!

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on ““এক নাস্তিকের জবানবন্দী” ৪ পর্ব

  1. নিয়মিত অাপনার লেখা পড়ছি;
    নিয়মিত অাপনার লেখা পড়ছি;
    দারুন লিখছেন!

    ইস্টিশন ইবুক সাইটে
    “একুশে বইমেলা-২০১৭”
    উপলক্ষে কিছু ইবুক প্রকাশ করতে যাচ্ছি..
    যদি অাপনি অনুমতি দেন, এবং ফেব্রুয়ারীর অাগে অাপনার সিরিজটি শেষ হয়; তবে এটি একটি ইবুক হিসেবে প্রকাশ করা যেতে পারে!

    মতামতের অপেক্ষায় রইলাম!

  2. নরসুন্দর মানুষ ভাই,মনে হয় শেষ
    নরসুন্দর মানুষ ভাই,মনে হয় শেষ করতে পারবো না, তারপরও চেষ্টা করবো। যদি পারেন আমার অনকেগুলো কবিতা লেখা আছে। কবিতার ইবুক প্রকাশ করবেন?

    1. কবিতা যদি মুক্তচিন্তা বিষয়ক
      কবিতা যদি মুক্তচিন্তা বিষয়ক হয়, অবশ্যই করা সম্ভব…!
      অাপনি এ্যাডমিনকে লেখাগুলো{কবিতা} পাঠান; উনি অামাকে পাঠিয়ে দেবেন!
      এই সিরিজটি শেষ হলে অবশ্যই ইবুক করা হবে।
      ধন্যবাদ অাপনাকে!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

83 + = 92