৪৭-এর দ্বিজাতিত্বের সেই ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতা আজো আমরা বহন করে চলেছি

১৯৪৭ সালে ধর্মকে পুঁজি করে যে দ্বিজাতিত্বের ভিত্তিতে গোটা ভারতবর্ষ আলাদা (ভারত-পাকিস্তান) হয়েছিল, সেই ধর্মীয় রেশ একটুও ঘুছেনি। সেই ধর্মীয় বিদ্বেষ, জাতি বিদ্ধেষ বরঞ্চ আজ উওরোত্তর বেড়েছে এই উপমহাদেশ জুড়ে। ব্রিটিশের শেষ লর্ড মাউন্ট ব্যাটন যে চাতুরতা করে জিন্নাহ আর জহুরলাল নেহেরুর মধ্যে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বিষ বীজ বপন করে গিয়েছিল, সেই বিষক্রিয়া আমরা এখনো ৭০ বছর ধরে বহন করে চলেছি। এখানে একটা কথা সুস্পষ্ট উল্লেখ করা দরকার যে, স্বাধীনের পর পাকিস্তান গনতন্ত্রের পথে না হেঁটে, হেঁটেছে রাষ্ট্র-ধর্মের পথে। ইসলামের পথে। মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গির পথে। রাষ্টীয় ভাবে সন্ত্রাসীর পথে আর রাষ্টীয় দমন নীতির পথে। মুসলমানের ধর্ম ইসলামকে রাষ্টের ললাটে ধারন করেছে পাকিস্তান। কিন্তু ভারত হেঁটেছে গনতন্ত্রের পথে। তাঁরা হিন্দুজম রাষ্ট-ধর্মের পথে হাঁটেনি। ভারত স্বাধীনের প্রথম সারির নেতারা চাইলে আওয়াজ তুলতে পারতো ভারতে রাষ্টধর্ম হিন্দু করার। কিন্তু গনতান্ত্রিক ও উদার মনস্ক নেহেরু সেই পথ মারায়নি। এই নিয়ে মৌদির বক্তব্যে সত্যতা আছে, “একই দিনে ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে আজ পাকিস্তান সন্ত্রাসী রপ্তানি করছে, আর ভারত সফটওয়্যার রপ্তানি করছে।

শুধু মাত্র নেতৃত্বের জন্য যেসব ব্যক্তিরা ১৯৪৭ সালে চুক্তির ভিত্তিতে গোটা একটা দেশকে আলাদা করে ফেলল, তার মাসুল দিয়েছে হিন্দু-মুসলমান নিরীহ জনগনগুলো। একটা জম্মভুমিতে জম্ম থেকে বেড়ে উঠা মানুষগুলো নেতাদের দেশ ভাগ সিদ্ধান্তের বলি হয়ে ছুটোছুটি করেছিল দেশ ত্যাগের জন্য। হিন্দু যাবে হিন্দুর দেশ ভারতে। মুসলিমরা যাবে মুসলমানের দেশ পাকিস্তানে। সেই সময় পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের হিন্দুরা জম্মের ভিটাবাড়ি ছেড়ে চোখের জল মুছতে মুছতে দেশ ত্যাগ করেছিল। একি ভাবে মুসলিমরাও। সেই সময় পাকিস্তানের জনক মোহম্মদ আলী জিন্নাহ হেলিকপ্টারে ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন, হিন্দুদের পাকিস্তান ছেড়ে চলে যাবার পিঁপড়ার মতো জনস্রোত! একটা সিদ্ধান্তেই বাড়ি-ভিটা ওয়ালা হিন্দু-মুসলিম সহায় সম্বল মানুষগুলো হয়ে গেল উদ্ধাস্তু! দলিত। নিঃস্ব। দেশ ছেড়ে যাবার সময় কেউ হারিয়েছিল, ভাইকে, কেউ হারিয়েছিল বোনকে, কেউ হারিয়েছিল পিতাকে, কেউ হারিয়েছিল মাকে। শুধু কি তাই? লুট হয়েছিল সর্বস্ব। তবে হিন্দুরা যে হাড়ে পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান ছেড়েছিল, সে হাড়ে মুসলিমরা ভারত ত্যাগ করেনি।

যে মুসলিম মুসলিম ভাই ভাই স্লোগানকে সামনে রেখে পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নিজেদের একাত্ন ঘোষনা করেছিল, মুসলিমরা মিলেমিশে একাকার হয়ে বসবাস করার যে গর্ব ভাবটা মনের কোনে লালন-পালন করেছিল। দুঃখের বিষয় মুসলিম মুসলিম সেই ভাতৃত্ব ২৫ বছরও টিকেনি! কারন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা চায়, পুর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীরা তাদের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে চলুক। মনের কোনো মুসলিম সাম্প্রদায়িকতা লালন করে বঙ্গবন্ধুও পুর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তানীদের স্বায়ত্ত শাসনে চলতে চেয়েছিল। তাঁর ৬ দফায় তা বঃহিপ্রকাশ ঘটে। ৭১ এ এসে কি হল? মুক্তিযুদ্ধ? স্বাধীনতা সংগ্রাম? কিসের জন্য হয়েছিল, পাকিস্তানিত্বের কঠোর দমননীতি, কট্টর সাম্প্রদায়িকতা, বাঙালীদের উপর অবিরাম শোষন ও নির্যাতন থেকে মুক্ত হবার জন্যই তো স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম হয়েছিল তাই না? এই স্বাধীনতার যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি প্রাণ খুঁইয়েছে হিন্দুরা। সবচেয়ে বেশি মেয়ে ধর্ষিতা হয়েছিল হিন্দুদের। সর্বস্ব হারিয়েছে হিন্দুরা। বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তান থেকে মুক্তি লাভ করে সদ্য স্বাধীন বাংলার মাটিতে পা রাখে, তখন তাঁর পায়ের মাটির তলায় শুয়ে আছে ৩০ লক্ষ শহীদ! সেখানে ছিল অধিকাংশ হিন্দুর লাশ। আর তিনি সেই লাশের উপর দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, নয় মাস যুদ্ধ করে আমরা একটা মুসলিম রাষ্ট পেলাম! বাহ! কি নির্মম প্রতিদান! বিশ্বের মুসলিম নেতাদের সাথে একাট্টা হওয়া। ও আইসি সম্মেলনে যোগদান। বাংলাদেশের কোনো হিন্দুর রাষ্ট-প্রধান হবার অধিকার না থাকা। বন্ধবন্ধু এসব মুসলমানিত্বের গর্ব থেকে করেছিলেন।

দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু বাঙালী মুসলমান শাসকদের রাষ্টনীতি পাকিস্তানী মনোভাব থেকে তেমন একটা সরে এসেছে কি? এখনো হিন্দুরা মুসলমানের হাতে নির্যাতিত। এখনো হিন্দুরা মার খেয়ে, লুট আর ধর্ষনের শিকার হয়ে, জম্মের বাড়ি ভিটা ছেড়ে চোখ মুছতে দেশ ত্যাগ করে। জিয়া থেকে এরশাদ, খালেদা থেকে হাসিনা, সবাই ৯০% মুসলিমের ভোট পাবার নেশায় মত্ত থেকেছে। সবাই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট দেশে, কার দল বেশি ইসলামিক, কে বেশি মুসলমান প্রেমী দল এটা প্রমাণ করার প্রতিযোগিতায় মেতেছে। তথাকথিত গনতন্ত্রের মানস কন্যা শেখ হাসিনাই তো বলেছিলেন, মদিনা সনদে রাষ্ট চালানোর কথা। ৫শ মসজিদ নির্মান করে ঢাকা শহরকে ইসলামিক চাদের ডেকে দেবে বলেছিলেন। এটা এক গনতান্ত্রিক মানস কন্যার চিন্তা হতে পারে?

রাষ্ট কি ব্যক্তি? রাষ্টের কি মানুষের মতো অনুভূতি আছে? না নেই। একটা দেশের নির্দিষ্ট মানচিত্র ও সেই দেশের মানুষের চলার নিয়ম কানুন নিয়ে একটা রাষ্ট গঠিত। সেই দেশের কি করে রাষ্টধর্ম হয়? সেই রাষ্ট কি মানুষের মতো করে পাঁচ বেলা নামাজ আদায় করতে পারে? না পারেনা। তারপরও আমাদের রাষ্টধর্ম ইসলাম! একটা রাষ্টে বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষ বসবাস করে, বিভিন্ন আদিবাসী জনগৌষ্টি থাকে। তো সে রাষ্ট কি করে একটা নির্দিষ্ট ধর্মের দাসত্ব করে? ব্যক্তি সেক্যুলার হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। কিন্তু একটা রাষ্টকে তো সেক্যুলার হতেই হবে, এবং হতে বাধ্য! কারণ সেই রাষ্টে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ বাস করে। এটাই তো গনতান্ত্রিক নিয়ম।

পাকিন্তানামলে এদেশে হিন্দু ছিল ২১%। পাহাড়ে আদিবাসী ছিল ৯০%। আজ বাংলাদেশে হিন্দুর জনসংখ্যা ৮%! আর পাহাড়ে আদিবাসী জনসংখ্যা ৫০%! এক সময় হয়তো আমাদের হিন্দু আর আদিবাসীদের খুঁজতে জাদুঘরে যেতে হবে। নাহয় ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে খুঁজতে হবে। একদা এদেশে হিন্দু-আদিবাসীদের বসবাস ছিল……

এককালে পাকিস্তানী হানাদাররা বাঙালীদের উপর হত্যা ধর্ষন নির্যাতন চালাতো। আজ বাঙালী সেনাবাহিনী আর মুসলমান সেটেলাররা পাহাড়ের আদিবাসীদের উপর হত্যা ধর্ষন নির্যাতন চালায়। তো পাকিস্তানী হানাদার আর বাঙালী মুসলিম শাসকদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? সেই হিসেবে তো পাকিস্তানই ভালো ছিল। কি দরকার ছিল মুক্তি সংগ্রামের? কি প্রয়োজন ছিল ৩০ লক্ষ শহীদের প্রাণ উৎসর্গ করার? কিসের জন্য দু লক্ষ মা বোন ধর্ষিত হয়েছিল? শুধু মাত্র বাঙালী মুসলমানদের স্বাধীনতার জন্য? এইদেশটা যে শুধুই মুসলমানদের তা বুঝি তখনই। যখন মুসলমানের আজানের কালে হিন্দুদের পুজো ও সন্ধ্যা আরতির মাইক বন্ধ রাখতে বলা হয়। আচ্ছা একটা গনতান্ত্রিক রাষ্টে মুসলমানের আজানের সময় কেন হিন্দু জনগৌষ্টিকে তাদের পুজা-অর্চনার মাইক বন্ধ রাখতে হবে? ধর্মীয় স্বাধীনতা কি শুধু মুসলিমের আছে, হিন্দুদের থাকতে নেই? আর ইসলাম ও আল্লাহ কি এতোই অহিষ্ণু যে একটু পুজার মাইকের শব্দ সহ্য করতে পারেননা? দেশটা যে শুধুই মুসলমানের তা বুঝি তখনই, যখন দেখি মুসলমানরা মুর্তির ভাঙার মধ্য দিয়ে শারদ আগমনের বার্তা দের। আর তাদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তিও প্রদান করেনা এই রাষ্টের প্রশাসন। এটাকে নির্লজ্জের মতো গনতান্ত্রিক রাষ্ট বলি কি করে? এটা ইসলাম ও মুসলমানতন্ত্র নয়কি?

বর্তমান বিশ্বে ইসলাম প্রেমী মুসলমান রাষ্টের কোনো মানুষই সুখে নেই। সেখানে সবসময় হানাহানি, মারামারি, সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গি হামলা লেগেই থাকে। ইরাক-সিরিয়ায় চলছে ইসলামি জিহাদী আইএসদের ইসলাম প্রতিষ্টার নামে গনহত্যা। নারীদের নগ্ন করে বাজারে যৌনদাসীর বেচাকেনা। আফগানিস্তানে চলছে ইসলামি সন্ত্রাসী তালেবানের হামলা। পাকিস্তানে রাষ্টীয় সেনাবাহিনীর মদদে চলে সন্ত্রাসী হামলা। সেখানে মাঝে মাঝে রাজপথ রক্তাক্ত হয়। নাইজেরিয়ার চলে ইসলামি জিহাদী বোকো হারামদের বিধর্মী হত্যার উৎসব। আল-কায়দা, আইএস, হামাস, আল শাবাব, লস্করই তৈয়বা, তালেবান, হিজবুত তাহেরী, এগুলো বিশ্বের বাঘা বাঘা ইসলামিক সন্ত্রাসী গৌষ্ঠি। হামলার সময় এদের স্লোগান একটাই, “আল্লাহু আকবর”! জবাই করার সময় এদের স্লোগান একটাই, আল্লাহু আকবর! বাংলাদেশেও আত্নপ্রকাশ করেছে, জে এম বি, আনসারুল্লাহ, বাংলাদেশ আইএস শাখা।

-গুলশান হামলার পরিকল্পনাকারী তাহমিদ জড়িত থাকার এতো তথ্য প্রণাম থাকা স্বর্ত্তেও মহামান্য আদালত তাহমিদকে কিভাবে জামিনে দেয়? আর পুলিশও কি করে তাহমিদেকে জামিন দেয়ার জন্য আদালতের কাছে সুপারিশ করে? পাকিস্তানের রাষ্টীয় গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই জঙ্গি উৎপাদন করে। আবার সেই জঙ্গিদের তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহারও করে। আমাদের রাষ্ট, আমাদের প্রশাসন, পাকিস্তানের রাষ্টীয় সন্ত্রাসবাদের নীতি অনুকরণ করছে না তো???????

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “৪৭-এর দ্বিজাতিত্বের সেই ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতা আজো আমরা বহন করে চলেছি

  1. অপ্রিয়দা আপনি লিখেছেন
    অপ্রিয়দা আপনি লিখেছেন পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে শেখ মুজিব বলেছেন, ” নয় মাস যুদ্ধের পর আমরা একটি মুসলিম রাষ্ট্র পেয়েছি”।

    এই কথাটি কতটুকু যুক্তিসঙ্গত আমার জানা নেই।তাই আশা করি রেফেরেন্স দিবেন।

  2. পড়লাম। যৌক্তিক লেখা
    পড়লাম। যৌক্তিক লেখা
    ==============================================
    ফেসবুকে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 2