উৎসবের স্বাভাবিকতা ও ধর্মের অস্বাভাবিকতাঃ বাঙালি সংস্কৃতি ও থার্টি ফার্স্ট নাইট

৩১শে ডিসেম্বরের পুর্বেই আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘোষণা দেয়- সন্ধ্যার মধ্যে সবার বাড়ি ফিরতে হবে, শহরের সকল পানশালা বন্ধ থাকবে, পতিতালয় বন্ধ থাকবে, আতশবাজি ফাটানো যাবে না, গাড়ি নিয়ে রাতে বের হওয়া যাবে না ইত্যাদি।

সারা বছর মদ পান করা যাবে তাতে সমস্যা নেই, সারা বছর পতিতালয় খোলা থাকবে তাতেও সমস্যা নেই। কিন্তু ‘থার্টি ফার্স্ট এলেই নিরাপত্তা জোরদার, টহল বাড়ানো, নিষেধাজ্ঞা। সারা বছর ধর্ষণ চলবে, সারা বছর বোমা হামলা চলবে, আল্লাহু আকবর বলে জবাই চলবে, রেস্তোরা জিম্মি করে বিদেশী খুন করবে- তাতে কোন সমস্যা নেই কিন্তু ৩১শে ডিসেম্বর এলেই দুনিয়ার সকল দুশ্চিন্তা তাদের মাথায় ভর করে। এমন দুশ্চিন্তা আসাটাও অস্বাভাবিক নয়। কারণটা কী?

কারণ মুসলমান সমাজে উৎসব মানে নারী। উৎসব মানে নারীর শরীর। উৎসব মানে অনুমতি ব্যতীত নারীর শরীরে ছোঁয়া, উৎসব মানেই নারীকে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য করে অশ্লীল, অসভ্য আচরণ করা, উৎসব মানেই ধর্ষণ, উৎসব মানেই বোমা হামলা। কথাগুলো খুবই অপ্রিয় বাস্তব সত্য।

পুলিশ কেনো মানুষের উৎসব নিয়ন্ত্রণ করবে? উপভোগের সবখানেই কেনো সীমারেখা টানা হবে? লেখায় সীমারেখা, উৎযাপনে সীমারেখা! উৎসব উৎযাপনে ও লেখায় সীমারেখা না টেনে অসুস্থ, বিকৃত চিন্তাধারা, মন মানসিকতা পরিবর্তনে কেনো কোন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয় না? পাঠ্যসূচিতে কেনো সৃষ্টিশীল রচনা অন্তর্ভুক্ত করা হয় না? শিক্ষার্থীদের কেনো মননশীলতায় উদ্বুদ্ধ করা হয় না? বিদ্যালয়ের বাঙলা পুস্তকে কেনো ধর্মের হিংস্রতা শেখানো হয়? মাদ্রাসায় শিক্ষাব্যবস্থা কেনো নিয়ন্ত্রণ করা হয় না? মাদ্রাসার শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, ধর্মান্ধ রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে কেনো নজরে রাখা হয় না? জামায়াতে ইসলামিকে কেনো নিষিদ্ধ করা হয় না? ওয়াজ মাহফিল কেনো নিষিদ্ধ করা হয় না? জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কেনো যুদ্ধ ঘোষণা করা হয় না? ধর্মান্ধদের কেনো আইনের আওতায় আনা হয় না? মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কেনো বাস্তবায়িত করা হয় না? মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের নিশ্চয়তা কেনো দেওয়া হয় না? উলটো মিথ্যে, ভুল, অসৎ, বিকৃত, জঙ্গিবাদকে উৎসাহ দেওয়ার মতন রচনা, গদ্য, পদ্য সংযোজন করা হয়। সীমারেখা যে সব ক্ষেত্রে টানা উচিত, সেখানে সীমারেখা টানার কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় না। অথচ যেখানে সৃষ্টিশীলতা, মননশীলতা, মুক্তচিন্তা, মুক্তবুদ্ধি, স্বাধীনতা জড়িত- সেখানেই কেনো বারবার আঘাত করে যাওয়া হয়।

প্রায় গত আড়াই দশক ধরে থার্টি ফার্স্ট নাইটের মতো বাঙালির উৎসব এলেও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘোষণা দেয়-দ্রুত অনুষ্ঠান শেষ করতে হবে, সন্ধ্যার মধ্যে স্থান খালি করতে হবে, কখনো কখনো নির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারণ করে দেয়া হয়। দুশ্চিন্তা, দুশ্চিন্তা। কীসের দুশ্চিন্তা! এই নির্দিষ্ট সময়সীমা টেনে দেওয়ার কারণ কী?

কারণ ধর্মান্ধ মুসলমান আত্মপরিচয় সংকটে ভোগে। তারা না পারে নিজের ভূমিকে সুরক্ষিত রাখতে, না পারে অন্য ভূমিকে আগলে নিতে। তারা শুধু পারে পার্থক্য করতে। সমস্যা তৈরি করতে। ধর্মান্ধ মুসলমান বাঙালি সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে। পূর্বে তারা একাধিকবার আঘাত করেছে এবং পরিকল্পনা ও প্রোপাগান্ডা এখনো বিদ্যমান।

২০১৫ সালের পূর্বে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ দেশের সাধারণ মানুষ সতর্কতার সাথে আনন্দ উপভোগের পাশাপাশি আতঙ্কে থাকতো যে বোমা হামলা হলেও হতে পারে। কিন্তু গত বছর থেকে বোমা হামলার পাশাপাশি প্রকাশ্যে নারী ধর্ষণ, নিপীড়নের ঘটনা পরিলক্ষিত। যদিও এর সূত্রপাত ২০০০ সালের থার্টি ফার্স্ট নাইট উদযাপনে টিএসসিতে বাঁধন নামের একটি তরুণীকে বিবস্ত্র করা হয়। অর্থাৎ উৎসব মানেই ধর্মান্ধ মুসলমানদের কাছে নারী।

সেটা বিদেশী হোক, আর বাঙালি সংস্কৃতি’ই হোক। বাঙালির উৎসবের সময় আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রকাশ্যে বলে না যে- পানশালা বন্ধ থাকবে, পতিতালয় বন্ধ থাকবে! বন্ধ থাকেও কিন্তু।

কিন্তু আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী কেনো প্রকাশ্যে এগুলো বলে না? কারণ নিজের সংস্কৃতির উৎসবের সময় এমন কথা বলা লজ্জার। থার্টি ফার্স্ট যেহেতু বাঙালি সংস্কৃতি নয়, সেহেতু পানশালা ও পতিতালয় বন্ধ প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়া লজ্জার নয় বরং প্রশংসা প্রাপ্তির সুযোগ। বছরে দু’তিনটা দিনই তো পুলিশবাহিনী নিজেদের উপস্থাপনের সুযোগ পায়।

থার্টি ফার্স্ট ও পহেলা বৈশাখ দুটি দুই সংস্কৃতি। একটি আমাদের দেশীয় এবং আরেকটি বিদেশী। দুটিই নতুনকে বরণ করে নেওয়ার উৎসব।। এই দুটি সংস্কৃতিকেই বাঙালি কমবেশি পালন করে থাকে। শুধুমাত্র ধর্মান্ধ মুসলমান দুটি উৎসবকেই অস্বীকার করে। দুটি উৎসবই আনন্দের, খুশির, উৎযাপনের। তাহলে সমস্যা কোথায় পালনে? এমন তো নয় যে, এই দুটি সংস্কৃতি মানুষকে হত্যা করতে শেখায়! ধর্ষণ করতে শেখায়! দুর্নীতি করতে শেখায়! এসিড নিক্ষেপ করতে শেখায়! পুরুষতন্ত্র শেখায়! বোমা হামলা করতে শেখায়! চাপাতি দিয়ে মানুষের মাথা শরীর থেকে ছিন্ন করতে শেখায়! ধর্মান্ধ হতে শেখায়!

আবার এমনও নয় যে, বাঙালি শুধু নিজ সংস্কৃতিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে! যে সংস্কৃতি আনন্দ বয়ে আনে, ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায়, নতুনকে বরণ করতে শেখায় সে সংস্কৃতি পালন করা যেতেই পারে। পৃথিবীতে ভালোবাসার প্রয়োজন আছে, হিংস্রতা যথেষ্ট আছে।

এ-বছর অর্থাৎ ২০১৬ দেখা গেছে, ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দুটো সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের একটি ঈদুল ফিতর। ঈদ মুসলিম উম্মাহর জাতীয় উৎসব। বাংলাদেশে ঈদের সবচেয়ে বড় জামাতটি হয় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় এবং সেই ঈদগাহের অদূরে পুলিশের চেকপোস্টে হামলা চালায় ধর্মান্ধ মুসলমানেরা। চলে ব্যাপক পরিমাণে গোলাগুলি ও বোমা বিস্ফোরণ। ঘটনায় নিহত হয় দুই পুলিশ কনস্টেবলসহ চারজন।

বিদেশী সংস্কৃতি হোক, বাঙালি সংস্কৃতি হোক আর মুসলমানদের ঈদই হোক! আক্রমণ করে ধর্মান্ধ মুসলমানেরা। কিন্তু বাঙলাদেশের মিডিয়া থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী কেউই স্বীকার করে না যে আক্রমণ মুসলমানেরা করে। মুসলমান প্রধান দেশে অবস্থান করে মুসলমানজঙ্গি কিংবা ইসলামিকজঙ্গি বলা বোমা হামলা করার চেয়েও বড় অপরাধ। এবং এ- অপরাধে অনেক ব্লগার নিহত হয়েছেন। অনেক লেখক দেশান্তরী হয়েছেন। সমস্যা বাঙালি সংস্কৃতি বা থার্টি ফার্স্ট নাইটে নেই। সমস্যা মুসলমানদের চিন্তাচেতনায়, শিক্ষায়, আদর্শে।

উল্লেখ্য, ভারতীয় উপমহাদেশে ক্ষমতার রাজনীতির সাথে ধর্ম এত জড়িয়ে গেছে যে এখন দুই ক্ষেত্রেই জোর যার, মুলুক তার অবস্থা। যার হাতে ধর্মীয় সাংগঠনিক শক্তি, তার হাতেই রাষ্ট্র শক্তি প্রখর। এই দুইয়ের মিশ্রণেই উৎসব, উদযাপন থেকে শুরু করে মানুষের স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক জীবনযাপনের অঙ্গ এমন সব কাজই বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এই সমস্যা সকল ধর্মব্যবস্থার ভেতরে কমবেশি সমানভাবে অবস্থিত একটি পুরুষতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী আদর্শের, এবং এই আদর্শের চর্চার।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

75 − 70 =