থার্টি ফাস্ট নাইট কীর্তি !!

বেশ কয়েক বছর আগের কথা, তখনও আমার বয়স আঠারো হয় নি অর্থাৎ বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী শিশু ক্যাটাগরির আওতাভুক্ত। থার্টি ফাস্ট নাইট !! এটি আসলে কিসের উৎসব বা কী এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানতাম না। আশাপাশের মানুষদের মুখে শুনতে শুনতে কৌতুহলবশত একদিন কোন এক স্মার্ট বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করে একটু লজ্জার বিনিময়ে বিষয়টা জানতে পারলাম। তার মতে পুরনো বছরের শেষ এবং নতুন বছরের শুরুটা নানা রকম আমোদ ফুর্তির মাধ্যমে শুরু করা হয় যাতে সারা বছর যেন এমনই হাশি খুশি উৎসব আমোদের মধ্য দিয়ে যায়। এই উৎসবই থার্টি ফাস্ট নাইট নামে পরিচিত। নতুন বছর উপলক্ষে উৎসব আনন্দ করে শুরু করলে সারা বছর ভাল কাটবে শুনে আমি খুবই অবাক হইলাম। ছোটবেলা থেকেই মা বলতেন নতুন বছরের শুরু করতে হবে পড়াশোনা করে , অন্যান্য ভাল কাজের মাধ্যমে। তাহলে সারা বছর ভাল কাটবে। আমিও তাই করতাম অথচ ভাগ্যের ফেরে আমার সময় তেমন একটা ভাল কখনই কাটত না। তাই সেদিন ভাবছিলাম মা মিথ্যে বলেছে। আনন্দ উৎসব করে নতুন বছর শুরু করি না বলেই আমার সারা বছর ভাল কাটে না। ভাবছিলাম এখন থেকে আমিও থার্টি ফাস্ট নাইট উৎসব পালন করব। কিন্তু কোন বন্ধুর সাথে থার্টি ফাস্ট নাইট পালনের জন্য মায়ের কাছে অনুমতি চাইতে যাওয়াটা আমার জন্য খুবই দূরহ বিষয় ছিল। পাছে আকষ্মিক প্রাণ হানির শঙ্কা থাকে কি না তাই ভেবে আর যেতে পারলাম না। মনে মনে ভাবলাম আর একটু বড় হই , যখন বাসা ছেড়ে দূরে থাকব তখন থেকে পালন করব।

দেখতে দেখতে অনেক সময় অতিবাহিত হইল। আমিও নানা সমস্যার কারণে নিজের শহর থেকে নির্বাসিত হয়ে ঢাকা চলে আসলাম। ভাবলাম এখন আমিও আর দশটা স্মার্ট বন্ধুর মত থার্টি ফাস্ট নাইটে আনন্দ উৎসব করব। সারা বছর ভাল কাটবে আরও কত কী। যথা চিন্তা তথা কম্ম। গোটা কয়েক বন্ধু ধরিয়া আবদার করিয়া বসিলাম থার্টি ফাস্ট নাইট তাদের সাথে কাটাইব। একেক জনের এক এক প্লান। কেউ নাইট ক্লাবে যাবে , কেউ কনসার্টে , কেউবা হোটেলে , কেউ আবার নিজ বাসায় …..

আমি কিছু বুঝে উঠতে না পেরে সবার প্রোগ্রামেই একের পর এক যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং সে অনুসারে চাদাও দিলাম। তবে যে বন্ধু বাসায় পার্টি করবে বলল সে চাদা নেয়া তো দূর বরং বলিয়া বসিল “তুই কেন আসবি…? বাসায় কেউ নাই তাই আমি বাসায় থাকব আমার গার্লফ্রেণ্ড নিয়া |” আমি বললাম, আমোদ ফুর্তি বাদ দিয়া গার্লফ্রেণ্ড নিয়ে কি করবি ! উত্তরে বন্ধু চটে গিয়ে বলল “পড়াশুনা করব দুজনে। আসলেই তুই আনস্মার্ট |” কথাখানা হজম করিয়া তখন আর একটু ইচ্ছা ছিল না আর একটা টু শব্দও করার। মনকে সান্তনা দিলাম এই বলে যে আসলেই হয়তো পড়াশোনা করবে দুজনে। তবে ফিজিক্স না ক্যামেস্টি পড়বে তা নিয়া কিছু ভাবলাম না। আমার কী , পরের ছেলে পরামানন্দ যত দুঃসঙ্গে যায় ততই আনন্দ !!


যা হোক যথা সময়ে বের হলাম। প্রথমে গেলাম কনসার্টে। বিশাল জনসমাগম। আমরা ছিলাম একেবারে প্রায় শেষের দিকে। তাই মঞ্চে কে গান গাইছে তা দেখার সৌভাগ্য হল না।
হঠাৎই কী যে হল আমার বন্ধুগণ একদল মেয়ের ভিড়ের মাঝে ঠেলেঠুলে ঢোকার ব্যর্থ চেষ্টা শুরু করে দিল। আমি তো দেখে অবাক। সে কী চেষ্টা পারলে একবারে মেয়েদের কোলে গিয়ে ওঠে। আমি বন্ধুগুলোর মধ্য থেকে একজনকে টেনে বের করলাম। এতে সে চটে গিয়ে তো পারলে আমার গায়েই হাত তোলে। আমি বললাম কী দরকার ভীড় ঠেলার তার মাঝে এত গুলো মেয়ে। বন্ধুটি কানের কাছে এসে বলল “আরে সুজোগ পাইছি , ফ্রিতে হাতের সুখ। তুই বুঝবি না সালা আনস্মার্ট গাইয়া |” আবারও আনস্মার্ট পাদবী হজম করিলাম। আর হাতের সুখ কথাটার মানে বুঝতে না বুঝতেই কেন যেন আমার বোনের মুখটা বারবার দুচোখে ভেসে উঠছিল। মনে হচ্ছিল ও যেন কানে কানে এসে বলছে “আমাকে আর দিদি বলে ডাকবি না , তুই খারাপ !” আর এক মুহুর্ত দাড়াতে পাড়লাম না। দ্রুত নাইট ক্লাবের উদ্দেশ্যে প্রস্থান।

নাইট ক্লাব! সে তো আরও কঠিন অবস্থা। শুরুতেই চোখে পড়ল একদল মেয়ে পাগলের মত নানা ভঙ্গিতে নেচে নেচে সবাইকে আনন্দ দিচ্ছে। তাদের পোশাক দেখে আমার মনে হল শিশুরাও হয়তো এর থেকে বেশী কাপড় পড়ে। তবে আরও অনেক মেয়ে আছে দেখলাম। কেউ গানের তালে হালকা নাচছে , কেউ কেউ সুরা পানে ব্যাস্ত ,কেউ কেউ ছেলে মেয়ে একত্রে সিগারেট ফুকছে কিংবা কেউ আবার এক কোণায় দাড়িয়ে বয়ফ্রেন্ডের সাথে চুম্বনে ব্যাস্ত। হয়তো এক রাতের বয়ফ্রেন্ড !!! আমার বন্ধুরা প্রথমেই নানা রকম সুন্দর বোতল থেকে এক বোতল সুরা কিনল। সুরার দাম দেখে আমার চক্ষু চড়কগাছ! আমি বলেই বসলাম যে এতগুলো টাকা দিয়ে এগুলো কেনার কোন মানে হয়? বন্ধুরা বলল “আরে ফরেন তো দাম একটু বেশিই হয়”। তারপর একে একে সবাই শুরু করল খাওয়া। কৌতুহলবশত আমিও একটু নিলাম গ্লাসে দেখি কেমন লাগে !! কিন্তু দুর্ভাগ্য এক চুমুকেই এমন অভিজ্ঞতা হল যে মনে হচ্ছিল আমার গলা থেকে আর কোনদিন সুর বের হবে না। তার উপর একটু পরে মনে হল আমি যেন দুলছি। ততক্ষণে আমার বন্ধুরা নাচতে শুরু করেছে সবার মাঝে। বেহুশের মত আমিও ওদের সাথে নাচতে শুরু করলাম। এখন নাচতে তো পারি না, নাচ বলতে শুধু লাফাচ্ছি। বুঝতে পারছিলাম যে আস্তে আস্তে আমার হুশেরও বাড়োটা বাজছে, চোখে ভালভাবে দেখতে পাচ্ছি না। হঠাৎ লাফাতে লাফাতে মনে হল কিছু একটার উপর জোড়েশোড়ে পাড়া দিয়ে ফেলেছি। পাড়া দেয়ার পরই পাশে একটা মৃদু শব্দ শুনলাম “উফ”। কিছু বুঝে উঠতে না উঠতেই একটা নরম মাংসাল হাত বেশ জোড়ে আমার গালের উপড় পড়ল। চড়টা একরকম ইলেকট্রিক শকের মত ছিল , সংযোগ হতেই বল্বের মত আমার হুশ ফিরে আসল। দেখলাম যে জিনিসের উপর লাফ দিয়েছিলাম তা একটা মেয়ের পা। বেশ সুন্দর দেখতে মেয়েটি। এবার আমি হ্যাঙ্গ হয়ে হা করে তাকিয়ে রইলাম তার মুখের দিকে। তা দেখে তো মেয়ে রেগে একবারে অগ্নিশর্মা। সুন্দর মুখমণ্ডলে দশখানা ভাজ করিয়া বলিল “স্টুপিড, আনস্মার্ট গাইয়া কোথাকার”। আবার একই কথা শেষপর্যন্ত একটা মেয়ের মুখে শুনিয়া মনের দুঃখে বের হয়ে আসলাম।

এবার রওনা হলাম হোটেলের দিকে। লাফালাফি করে ভালই ক্ষুধা পেয়েছে আর অনেক রাতও হয়ে গেছে। ভাবলাম হোটেলে যেহেতু পার্টি তাহলে খাবার তো নিশ্চই পাব। কিন্তু গিয়ে দেখি আবাসিক হোটেল। যা হোক ফোন করে গন্তব্যে পৌছে দেখি কয়েকজন বন্ধু একটা রুমে ঢুকেছে আর ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করা। আর বাকী কয়েকজন দুজন মেয়ের সাথে দাড়িয়ে কথা বলছে। মেয়ে দুজনের কথা বলার স্টাইল শুনে একটু অবাক হলাম| চেহারা মোটামুটি ভালই কিন্তু কথার অশুদ্ধতা এতই বেশী যে মনে হল চর থেকে উঠে এসেছে। আমার বন্ধু ও মেয়েগুলোর ভাব ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল মাছের বাজারে দর কসাকসি চলছে। আমি অপেক্ষা করতে পারছিলাম না। ক্ষুধায় আমার প্রাণ যায় যায়। আমি তাদের কথার মাঝেই বলিয়া বসিলাম ভাই আমার খুব ক্ষুধা লাগছে। খাবারের আয়োজন কই? শুনে আমাকে ধমক দিয়ে বলল “কিসের খাবার,বাসা থেকে খেয়ে আসিস নি?” আমি বললাম বাসায় কেন খাব? পার্টি দিলি হোটেলে আর খাবার বাসায় খাব মানে কী! এবার সবাই চটে গেল। বলল ” আরে ধুর কী পাগল ছাগল নিয়া পড়ছি। তোরে এখানে খাইতে কে ডাকছে। ” আমি বেআক্কেলের মত বললাম তো কী জন্য ডাকছিস? উত্তরে এমন একখান কিছু করার কথা বলিল যা সজ্ঞানে লিখার ক্ষমতা আমার নাই। আর তাহা বলিয়া সব শেষে একজন বলিল ” একটু স্মার্ট হ , এতটা ক্ষেত মানুষ হয়! ” এবার আর সহ্য হল না চিৎকার করে বলে উঠলাম হ্যা আমি আনস্মার্ট , আমি ক্ষেত ,প্রবলেম …?

আমার জন্য যাওয়ার মত এখন শুধু বাসা পড়ে রয়েছে। অনাহারে তিক্ততায় সেটাকেই গন্তব্য বানিয়ে নিলাম।

পরবর্তীতে যেদিন সব বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছিল, সবাই আমাকে গণহারে আনফ্রেণ্ড করে দিয়েছিল ফেসবুক থেকে। আমি অবশ্য এতে এতটুকু কষ্ট পাই নি। বরং সেদিন বলেছিলাম হ্যা আমি সত্যি তোদের মত না , আমি আনস্মার্ট একটা ছেলে।
তারপর কত বছর পার হইল। সময় নদীর স্রোত বইতে বইতে হাওয়া কোন দিকে গড়াইল কিছুই ঠাওর করতে পারলাম না। স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে আমি আজ অন্দরমহলে আর তারা স্রোতের পাকে ঘুরপাক খেতে খেতে নিঃশেষ প্রায়। থার্টি ফাস্ট নাইট আসছে শুনেই গত কয়েকদিন যাবত আমার এই ঘটনাগুলো খুব মনে পড়ছিল। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল আবার ছোট বেলার মত মায়ের আদর্শে নতুন বছরটা শুরু করি। কারণ আমি তো আনস্মার্ট তাই আমার জন্য থার্টি ফাস্ট নাইটের উৎসব প্রযোজ্য নয়। তাই আর দেরী না করে আজ অনেক দিন পর বাসায় মায়ের কাছে ফিরে আসলাম নতুন বছর শুরু করতে।

জানেন আমার আজকের এই লিখাটা সেই বন্ধুুগুলোর অনেকেরই টাইম লাইনে শো করবে। কিন্তু কেন আর কী করে? তারা তো আমাকে আনফ্রেন্ডই করেছে আর কেনই বা আমার লিখা পড়বে ….?
কেন জানেন …?
সেদিন যারা আমাকে আনস্মার্ট বলে আনফ্রেণ্ড করেছিল, আজ তারা অনেকেই আমার ফেসবুক একাউন্টের ফলোয়ার …

(৩১-১২-২০১৫ , Jihan Rana ফেসবুক একাউন্ট হতে প্রথম প্রকাশিত)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

96 − = 92