… আর তুমি এখন পালন কর থার্টি-ফার্স্ট-নাইট!

তোমার বুকের ভিতরে এখনও বাজে না বাংলা-শব্দের সুমধুর-বাজনাধ্বনি। আর তোমার এখনও মনে হয় না—এই বাংলা পৃথিবীর অন্যতম একটি শ্রেষ্ঠ ভাষা। আর বাঙালি সেই শ্রেষ্ঠ জাতি। নিজের বাপ-দাদাকে তুমি স্বেচ্ছায় বদখেয়ালের বশে অবজ্ঞা করে অজ্ঞতার সন্ধানে আজও ঘোরাফেরা করছো। তুমি এমনই অবিবেচক আর এমনই এক নরাধম-নরপশু আর অতিশয় পাষণ্ড-বর্বর!

তুমি এখনও গাইতে পারো না শুদ্ধস্বরে-শুদ্ধভাবে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। এমন সুন্দর সঙ্গীত শুনে তোমার মনে এখনও দেশপ্রেমভাব-জাগ্রত হয় না! আর তুমি আজও প্রাণভরে একদিনের জন্যও গাইতে পারোনি ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। আর সেই তুমি কিনা ঘরে-বাইরে সমানে উচ্চস্বরে গাড়িতে-বাড়িতে-রাস্তায় আর পাবলিক-প্লেসে বাজাচ্ছো ইংরেজি রক-সঙ্গীত! ধিক্ তোমাকে ধিক্।

তুমি ইংলিশ-মিডিয়াম-স্কুলে ভর্তি হয়েছো! ভালো কথা। কে তোমাকে নিষেধ করেছে? তোমার বাপের টাকায় তুমি স্বাধীনভাবে যা-খুশি তা-ই করতো পারো। এতে কারও কোনো বাধা নাই। আর একটি গণতান্ত্রিকরাষ্ট্রে এব্যাপারে কেউ তোমাকে বাধা দিতেও আসবে না। আর তুমি স্বাধীন ও মুক্ত। আর একেবারে মুক্তবিহঙ্গের মতো! তা-ই তুমি বাংলা ভুলে এখন বিদেশীগানে ব্যস্ত। বাংলাভাষা তোমার ভালো লাগে না। ‘বাংলা-সাহিত্য’ তোমার পছন্দ হয় না। আর ‘বাংলা-সংস্কৃতি’ বা বাঙালির জীবনে সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান—জাতীয় উৎসব ‘বাংলা-নববর্ষ’ বা ‘পহেলা বৈশাখ’ তোমার একেবারে ভালো লাগে না। জানি, তুমি হয়তো পাকিস্তানী কিংবা বিহারী কিংবা রোহিঙ্গা! নইলে, বাংলাদেশে বসবাস করে তোমার কেন ‘বাংলা-সংস্কৃতি’ বা ‘পহেলা বৈশাখ’ ভালো লাগবে না? কেন ভালো লাগবে না? আর কেন ভালো লাগে না? এর কোনো সদুত্তর আছে তোমার কাছে? থাকলে এখনই দিতে পারো।

আসলে কে তুমি? পাকিস্তানী? বিহারী? রোহিঙ্গা? ইরানী-তুরানী? সৌদিয়ান? নাকি আফগানী? আর যে-ই হও না কেন তুমি বাংলাদেশে বসবাস করতে হলে তোমাকে এই বঙ্গীয়-সংস্কৃতিই ভালোবাসতে হবে। তবুও তুমি সবকিছু তুচ্ছ করে বিজাতীয়-সংস্কৃতি আজ ঘরে তুলে নিয়েছো। আর তুমি এই ঢাকা-শহরের একটি ‘ইংলিশ-মিডিয়াম-স্কুলে’ পড়ার সুবাদে বাংলার জাতীয় উৎসব ‘পহেলা বৈশাখ’কে বাদ দিয়ে জীবনের জন্য আদর্শস্বরূপ বেছে নিয়েছো ‘থার্টি-ফার্স্ট-নাইট’কে—আর তোমার সবসময় ভালো লাগে ‘ইংরেজি-নববর্ষ’! তুমি তো বাঙালি নও! তবে কেন এদেশে ঘোরাফেরা করছো? আবার দেখি তোমার মতো অনেক পাগলছাগল এদেশের তথাকথিত-ইংলিশ-মিডিয়াম-স্কুলে পড়ালেখা করে জঙ্গি, সেমি-জঙ্গি, তালেবান, আফগানী হচ্ছে! ধিক্ তোমাদের ধিক্। আবারও ধিক্ তোমাদের মতো কুলাঙ্গারদের—যারা আজও বাংলাকে ভালোবেসে পহেলা বৈশাখকে ভালোবাসতে পারেনি কিংবা আজও বাংলাকে ভালোবাসার কোনোপ্রকার চেষ্টাও করোনি। আর তোমাদের মতো পাষণ্ডদের এই দীনতা এই রক্তস্নাত-জাতি কখনও ক্ষমা করবে না। আর তোমাদের যদি হাজার-বছরের ঐতিহ্যবাহী এই ‘বঙ্গীয়-সংস্কৃতি’ ভালো না লাগে—তবে তোমরা তোমাদের ভালোলাগার যেকোনো দেশে চলে যেতে পারো। এতে এই মহান জাতি উপকৃত হবে।

তোমাদের এই অযাচিত ‘থার্টি-ফার্স্ট-নাইট-পালনে’র বিরুদ্ধে আমাদের মনে কোনো ক্রোধ নাই। তবে একটুখানি ক্ষোভ আছে। আর তা হলো: তোমরা সাদামাটাভাবে ‘ইংরেজি-নববর্ষ’পালন করতে পারো। কিন্তু এভাবে ঘটা করে আর আদিখ্যেতা করে নয়। আর ‘থার্টি-ফার্স্ট’কে জীবনের সেরা নাইট মনে করে নয়। আরও একটি কথা: সবার আগে চাই নিজের দেশ-কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। আর এর পাশে অত্যন্ত সাদামাটাভাবে সামান্য একটুখানি ‘ইংরেজি-নববর্ষ’ রাখা যেতে পারে। তাই বলে ‘থার্টি-ফার্স্ট-নাইটে’র নামে ‘বাঙালিসত্তা-বিসর্জন’ দিয়ে—রাত জেগে, অশ্লীল-উদ্দামনৃত্যসহকারে, অকারণে রাস্তায় বেপরোয়া গাড়ি-ছুটিয়ে কিংবা হর্ন-বাজিয়ে কিংবা সীমাহীন-হৈহুল্লোড় করে মানুষের শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্ন করাটা মোটেও সমীচীন নয়। আমরা বাঙালি। আর আমাদের ‘পহেলা বৈশাখ’ কত সুন্দর কাব্যময়, ছন্দময় আর অলংকারসমৃদ্ধ। আশা করছি: তোমরা এর থেকে চিরদিনের জন্য শিক্ষা নিতে পারবে।

আমরা কাটমোল্লাদের মতো ‘থার্টি-ফার্স্ট-নাইটে’র বিরুদ্ধে কোনো ফতোয়াবাজি করতে বসিনি। শুধু তোমাকে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, এই জাতির জীবনে একটি নববর্ষ আছে—আর তার নাম: পহেলা বৈশাখ। আর বাঙালি-মাত্রেই ভালোবেসে সেটি পালন করে থাকে।

তোমাদের ‘পহেলা বৈশাখ’ ভালো লাগে না। কিন্তু তথাকথিত-থার্টি-ফার্স্ট-নাইট তো খুব ভালো লাগে! তোমরা নিজের বাড়িতে থেকে আর কত নিজের ঘরে আগুন দিবে? এখন তোমাদের দেখাদেখি ঢাকা-শহরের বস্তিতেও ওই ‘থার্টি-ফার্স্ট-পালনে’র হিড়িক পড়ে গেছে। আর তাই, কতকগুলো আবর্জনার মতো ছেলে-ছোকরা এখন রাত জেগে ‘ড্রাম-বাজিয়ে’ উদ্দাম-নৃত্যের সাহায্যে ‘ইংরেজি-নববর্ষে’র শ্রাদ্ধ করছে।

তোমরা আগে মানুষ হও। আর বাঙালি হও। আর যদি সত্যিকারের ধার্মিক হতে চাও—তবে তাও হও। তবুও এইরকম ভিন্নজাতের কিংবা কিম্ভূতকিমাকার পশু হয়ো না।

আর-একটি কথা গুরুবাক্য হিসাবে চিরদিন মনে রেখো: তোমাদের বাপ-দাদা-পূর্বপুরুষেরা ছিলেন এই বঙ্গেরই সন্তান। আর তারা চিনতেন না, জানতেন না, মানতেন না ‘থার্টি-ফার্স্ট-নাইট’ কিংবা কথিত-‘হ্যাপি-নিউ-ইয়ার’। আর তারা চিনতেন শুধু বাংলা-নববর্ষ—পহেলা বৈশাখ। আর তাই, তৎকালে এই বাংলার হাজার-হাজার গ্রামে শুধু ‘পহেলা বৈশাখ’, ‘হালখাতা’, আর ‘বৈশাখীমেলা’ দেখা যেতো। আর তখন তোমাদের বাপ-দাদা-পূর্বপুরুষেরা বৈশাখীমেলা থেকে বাঁশের বাঁশি কিনে বাড়ি ফিরতেন। সেই সময় মানুষের মনে অন্য-কোনো ভাবনার উদয় হয়নি। আর সেই ‘বৈশাখীউৎসব’ জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-নির্বিশেষে সকল মানুষের সমন্বয়ে পালিত হতো। আবারও বলছি মনে রেখো: তোমাদের বাপ-দাদা-পূর্বপুরুষেরা বৈশাখীমেলা থেকে বাঁশের বাঁশি কিনে মনের আনন্দে বাড়ি ফিরতেন। আর তুমি কর থার্টি-ফার্স্ট-নাইট!

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
৩১/১২/২০১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “… আর তুমি এখন পালন কর থার্টি-ফার্স্ট-নাইট!

  1. আমার দাদার পাকা টয়লেট ছিল না,
    আমার দাদার পাকা টয়লেট ছিল না, মাঠে যাইতেন। আমার বাবা কমোড ইউজ করতেন না। আমি কি বাপ দাদার ঐতিহ্য ধইরা রাখতে প্রথমে ইটের প্যানের টয়লেটে নামবো এরপর খোলা মাঠে প্রত্যাবর্তন করবো? আপনার বাপ দাদা পূর্ব পুরুহ সম্পর্কিত উদাহরণের পরিপ্রেক্ষিতে তো তাই মনে হয়…

    অতি ভক্তি ভালো না ভাই। যুগটা বিশ্বায়নের। ইংরেজী ভাষার প্লাটফর্ম ফেসবুক তো নিশ্চয়ই ব্যবহার করেন, করেন না? ২১শে ফেব্রুয়ারীকে কি বাংলা তারিখ হিসেবে বলেন?

    ইংরেজী নববর্হ উদযাপন এখন একটা বৈশ্বিক উৎসবের মতন। এর সাথে জাতি ধর্ম বরণে স্থানের সম্পর্ক নাই। আমার বাপ দাদা ১০ মেইল হেঁটে স্কুলে গেছে, আমি রিক্সায় গেছি, আমার পোলাপান গাড়িতে যাবে। এইসবই অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তন।

    আমি পান্তা খাইনা, আমার গন্ধ লাগে। ওই বস্তু আমারে জোর কইরাও গেলানো যাবেনা বাঙ্গালীপনার দোহাই দিয়া। আমিও আমার সন্তানদের বাধ্য করবো না। সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল। ৫০ বছর আগে লুঙ্গি সংস্কৃতির অংশ ছিল, মানুষের অভ্যাসে ছিল, ছিল ওইতিহ্যের অংশ। এখন কমে আসতেছে। এখন ট্রাউজার পড়াই সংস্কৃতির অংশ হইতেছে, এই পরিবর্তন ঠেকাইয়া রাখা সম্ভব না।

    বাংলা নববর্ষের ইতিহাসও পড়েন, ওইটা তো মোঘলদের দেয়া। ওইটা আমরা মানছি, এর আগে যা ছিল তা কি ধরে রাখছি? মানুষ সেটাই করবে যা তার ব্যক্তিগতভাবে পছন্দের। দেশের আইনে তো মানা করা নাই যে এইসব করা যাবে না। আপনার কোক খাইতে ইচ্ছা না করলে বোরহানী খান, যদিও এইটাও মোঘলদের থেকেই বিবর্তিত।

    আমি চাই আমার চেলেপেলে বাশের বাশির স্বপ্নে পইড়া না থাকুক। নতুন অনেক বাদ্যযন্ত্রও আছে, সেইসব আরও আকর্ষণীয় হইলে সেইটাই নিক যদি নিজের তাই ভালোলাগে। মানুষের যাত্রা হোক প্রগতির দিকে, মধ্যযুগ কিংবা গুহামানবের জীবনে ফিরা যাওয়ার কোন মানে নাই। পুরা বিশ্বই হোক একটা পরিবারের মতন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

41 − = 40