ট্যাবু, লজ্জা, কুসংস্কার ভাঙ্গার আনন্দ

পিরিয়ড একজন নারীর জন্যে যতই স্বাভাবিক ঘটনা হউক না কেন আদতে নারী পুরুষ কেউই এটাকে স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারেনা। প্রায় সবাই পিরিয়ড, স্যানিটারি ন্যাপকিন বা প্যাড নিয়ে এক ধরনের হীনমন্যতায় ভোগে। অশুচি, খারাপ, লজ্জার, অত্যন্ত গোপণ কোন ‘রোগ’ বলে মনে করে। আর পিরিয়ড যদি হয় পরিবারের কোন টিনএজ সদস্যের তবে তো কথাই নেই। তারা মনে করে পিরিয়ডের কথা প্রকাশ পেলে ইজ্জত চলে যাবে, পরিবারে অন্যান্যদের সামনে মুখ দেখাতে পারবে না, অন্যরা কী মনে করবে বলে নিজেকে প্রায় লুকিয়ে রাখে। পেটে ব্যথা শুরু হলেও কাউকে বলতে পারে না। মারাত্মক পেট ব্যথায় অস্থির হয়ে বিছানায় গড়াগড়ি খাবে, পেটে চাপ দিয়ে রেখে ব্যথা সয়ে নেবার চেষ্টা করবে তবুও বলতে পারবেনা আমার একটু অষুধ লাগবে, একটা প্যাড লাগবে, অথবা এক খন্ড পরিষ্কার কাপড় লাগবে। ব্লিডিং হয়ে জামাকাপড় নষ্ট হলেও না। যেন পিরিয়ড হওয়া অসামাজিক কাজ!

টিনএজদের এই মানসিকতা আমরা বড়রা’ই তৈরি করে দিয়েছি। তাদের মনে গেঁথে দিয়েছি পিরিয়ড খুব খারাপ জিনিস, গোপণ রোগ, পিরিয়ড হলে শরীর অপবিত্র থাকে, নাপাক থাকে, পিরিয়ড হলে রান্না ঘরে যেতে পারবে না, খাবার ধরতে পারবে না, নামাজ-পূজা করতে পারবে না। পরিবারের অন্যদের বুঝতে দিলে চলবে না যে পিরিয়ড শুরু হয়েছে! সব সময় লুকিয়ে, আড়ালে রেখে চলতে হবে।

এই পিরিয়ড নিয়ে শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষের মানসিকতা অনেক বেশি কনজারভেটিভ। ওরা পিরিয়ডকে রোগ মনে করে। মনে করে নারীর প্রতি আল্লাহর অভিশাপ আছে বলেই পিরিয়ড হয়। শহরের তুলনায় গ্রামের নারীরা পিরিয়ডকে অনেক বেশী গোপন করে চলে। ওরা জানে না যে পিরিয়ড নারী শরীরের জন্যে অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। মাতৃত্বের জন্যে পিরিয়ড হওয়া আবশ্যক।

দেশের অধিকাংশ নারী জানেন না যে পিরিয়ডের সময় অপরিষ্কার কাপড় তুলা, এমনকি খারাপ কোয়ালিটির প্যাড ব্যবহারের কারনে মারাত্মক রোগ হতে পারে। জীবাণু সংক্রামিত হতে পারে। সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা হারানোসহ জরায়ুমুখের ক্যান্সার, ত্বকের ক্যান্সার, যৌনাঙ্গে চুলকানি, ভেজা স্যাতস্যাতে, ফাঙ্গাস, অনিয়মিত মাসিকসহ মারাত্মক ধরনের রোগ হতে পারে।

গ্রামের অধিকাংশ মেয়েকে পিরিয়ড শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। ওরা ভালো ভাবে বুঝতেই পারেনা পিরিয়ড কী! কেন পিরিয়ড হয়? এটা রোগ কিনা। পিরিয়ডের সময় কী করতে হয়! লজ্জায় স্বামীর কাছেও বলতে পারে না। একসময় দেখা যায়- না বুঝতে পারার কারনে, অপরিষ্কার থাকার ফলে, জীবাণু যুক্ত কাপড়-তুলা ব্যবহারের ফলে কিশোরী মেয়েটি নিজের শরীরে মারাত্মক রোগ বাঁধিয়ে ফেলে। রোগাক্রান্ত হয়ে স্বামীর চোখে, শশুর বাড়ির মানুষের চোখে বোজা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে দেখা যায় স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করছে নয়তো তালাক দিচ্ছে।

পিরিয়ডের সময় নিজেকে পরিষ্কার রাখা, সচেতন থাকা যে একজন নারীর জন্যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বোধহয় আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু নারী বা কিশোরী মেয়েটির এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমরা ছেলেরা বা পরিবারের অন্যরা কি কখনো কোন ভূমিকা রেখেছি? কখনো কি তাদের লজ্জা ভেঙ্গে দিয়ে জিজ্ঞেস করেছি —তোমার কিছু লাগবে কিনা? কখনো কি বলেছি পিরিয়ড কোন লুকানো বিষয় নয়। অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ঘটনা। এতে লজ্জার কিচ্ছু নেই। কখনো কি বাজার করার সময় কিংবা অষুধ কেনার সময় বাড়তি এক প্যাকেট প্যাড কিনেছি? হয়তো পরিবারের কিশোরী মেয়েটি লজ্জায় বলতে পারছে না, নিজে গিয়েও কিনতে পারছে না অথবা টাকা ছিল না। এসময় আপনার আমার মতো বড়দের এগিয়ে যাওয়া উচিৎ নয় কি? বাজারের সাথে, ওষুধের সাথে বাড়তি এক প্যাকেট প্যাড নিয়ে এসে বলুন না, এটা তোমার জন্য।

সত্যি কথা বলতে কি অনলাইনের বাহিরে আমি অনেক বেশী কনজারভেটিভ। কনজারভেটিভ মানে খুব বেশি লাজুক, কথা কম বলা মানুষ। যেটা করতে চাইছি সেটা করা আমার জন্যে উচিৎ হবে কিনা। করলে লোকে কি বলবে ভেবে অস্থির থাকি। যদিও ট্যাবু, কুসংস্কার ভাঙ্গার নেশা আমার সবসময় থাকে।

বাড়িতে আমার ছোট এক বোন আছে। টিনএজ। বাড়িতে গেলে যে কিনা আমার একমাত্র বন্ধু হয়েই থাকে বলতে পারেন। আমার যা কিছু কথা, মজার ঘটনা কিংবা নতুন ক্রাশ সবই তাকে বলি। তার যা প্রয়োজন আমার কাছ থেকে ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে নেয়। যেমন কসমেটিকস, ড্রেস, টাকা, বই ইত্যাদি। কিন্তু কখনো বলেনি আমার স্যানিটারি প্যাড লাগবে। সে জানে যে ভাইয়ের কাছে এসব বলা যায় না। বাবার কাছে এসব বলা যায় না। এসব কিছু লজ্জার, গোপন এবং একান্ত মেয়েদের ব্যপার। আমিও কখনো বলতে পারিনি কিংবা এনে দিয়ে বলিনি —এটা তোর জন্যে। এসবে লজ্জার কিছু নেই। নিজর মাঝে সবসময় লজ্জা ও দ্বিধা কাজ করে যে, এটা আমার কাজ নয়, এটা উচিৎ নয়, এটা করা খারাপ, সে কি ভাববে, লজ্জা পাবে কিনা ইত্যাদি। কিন্তু নিজের ভেতর প্রচন্ড উত্তাপ অনুভব করি যে, আমি এ লজ্জা ভাঙ্গি। ট্যাবু ভেঙ্গে বলি, এটা তোর জন্যে। এটার প্রয়োজনীয়তা কতখানি।

গতকাল আমি সেই ট্যাবু ভাঙ্গার কাজটিই করেছি। পরিচিত এক ফার্মেসিতে গিয়ে বললাম, এক প্যাকেট স্যানিটারি প্যাড দেন। ফার্মাসিস্ট আমার খুবই পরিচিত বলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। কিছু বলতে পারছিলেন না। উনার তাকিয়ে থাকার রহস্য আমি জানি। বোঝাতে চাইছেন, তুমি তো বিয়ে করনি তবে প্যাড কার জন্যে? বোনের জন্যে কেউ প্যাড কিনে এটা হয়তো উনি প্রথম দেখলেন!

স্বচ্ছ পলিথিনের প্যাকে করে যখন প্যাড নিয়ে বাড়ি ফিরছি তখন দুই বন্ধুর সাথে দেখা। প্যাডের প্যাকেটের দিকে আশ্চর্যবোধ নিয়ে তাকিয়ে থেকে মজা করার ভঙ্গিমায় একজন বললো, এইটা কার জন্যে কিনলি? আমি কণ্ঠকে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি স্পষ্ট করে বললাম, ‘বোনের জন্যে।’ বন্ধুদের মাঝে একজন বিয়ে করেছে দুই বছর হবে। সে ইয়ার্কির সাথে হাসির রং মিশিয়ে বলল, আমি আজ পর্যন্ত বউয়ের জন্যে প্যাড কিনিনি আর তুই বোনের জন্যে প্যাড কিনসিস?

বাড়ি ফিয়ে বোনের হাতে প্যাডের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বললাম, এটা তোর জন্যে। প্যাকেটটি হাতে নেয়ার পরে বোনের ঠোঁটের কিনারায় যেরকম উতফুল্ল এক মিষ্টি হাসি দেখেছি সেরকম হাসি আমি আগে কোন দিন দেখিনি। অন্য কোন দামি উপহারেও না।

নিজের ভেতর একধরনের আনন্দধারা বয়ে যাচ্ছে। ট্যাবু, লজ্জা, কুসংস্কার ভাঙ্গার আনন্দ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

50 + = 59