সরকার-দলীয় এমপি ‘লিটন’ খুন—আর অসহায় রাষ্ট্রের আর্তনাদ

সরকার-দলীয় এমপি ‘লিটন’ খুন—আর অসহায় রাষ্ট্রের আর্তনাদ
সাইয়িদ রফিকুল হক

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে, আওয়ামীলীগের শাসনামলে সর্বপ্রথম একজন সংসদ-সদস্যকে প্রকাশ্য-দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আর এভাবে, ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত লাগাতার হামলা চালিয়ে একের-পর-এক হত্যা করা হয়েছে আরও ৮জন এমপি-কে। সেই সময় একটি চিহ্নিত-দুর্বৃত্তশ্রেণী এই অপকর্মটি সাধন করেছিলো। এরপর কেটে গেছে অনেক বছর। তারপর ২০০৪-২০০৫ সালে, সেই দুর্বৃত্তশ্রেণীরই উত্তরাধিকার চারদলীয়-রাজাকারজোট-সরকারের আমলে আরও ২জন সংসদ-সদস্যকে হত্যা করা হয়েছিলো। ২০০৪ সালে, গাজীপুরে নিজ-বাসভবনের কাছে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন সংসদ-সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার। আর ২০০৫ সালে, হবিগঞ্জের বৈদ্যের বাজারের কাছে একটি রাজনৈতিক জনসভায় প্রকাশ্য-দিবালোকে ‘গ্রেনেড-হামলা’ করে হত্যা করা হয় বাংলাদেশের মাস্টার-মাইন্ড ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ কিবরিয়াকে। আর ২০১৬ সালে, বছরের শেষদিনে দিনদুপুরে এমপি-লিটনের বাসভবনে ঢুকে এমপি-লিটনকেই গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এ পর্যন্ত স্বাধীনবাংলাদেশে ১২জন সংসদ-সদস্য আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন। দুঃসাহস, স্পর্ধা, ত্রাস আর ধৃষ্টতার একটা সীমারেখা থাকে। এর সবকিছুই আজ অতিক্রম করেছে। সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হলো: এ যাবৎকালে যারা নিহত হয়েছেন, তারা সবাই আওয়ামীলীগদলীয় এমপি। তবুও এই দুর্বৃত্তগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আওয়ামীলীগ নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে।

বাংলাদেশে একটি চিহ্নিত-হত্যাকারীগোষ্ঠী তথা খুনীবংশের স্পর্ধা দিনের-পর-দিন কেবল বেড়েই চলেছে। আর এর পিছনে কাজ করছে সরকারের ব্যর্থতা। তারা এই হত্যাকারীগোষ্ঠীকে সাময়িকভাবে বশ করে বা বগলদাবা করে রাজনীতিতে টিকে থাকতে চাইছে। কিন্তু এটি যে অসম্ভব—তা এরা বুঝতে পারছে না।
বাংলাদেশে এরা (হত্যাকারীরা) প্রথম নয়—রীতিমতো লাগাতারভাবে মানুষহত্যা করে চলেছে। ১৯৭১ সালে, এরা সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে—আর বাংলাদেশরাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে—ভয়ানক কাপুরুষের মতো পাকিস্তানীনরপশুদের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। এই নরপশুরা ‘জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান’ গঠন করে ‘পাকিস্তান-মুসলিম-লীগে’র সঙ্গে সবসময় বাংলাদেশরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী-অপকর্ম করেছে। এরা এখনও ইসলামের নামে পুনরায় সংগঠিত হয়ে মানুষ ও মানবতার বিরুদ্ধে তাদের অপকর্মপরিচালনা করছে। আর নিজেরা বাঁচার জন্য সবসময় ব্যবহার করছে ধর্মকে।

এই দেশে কিছুদিন আগে দিনদুপুরে একের-পর-এক ব্লগারদের হত্যা করা হয়েছে। আর হত্যাশেষে তাদের ‘নাস্তিক-অপবাদ’ দেওয়া হয়েছে। যাতে, এদেশের সাধারণ মানুষ মনে করে—ধর্মের শত্রুদের হত্যা করা হয়েছে। আর তখনও রাষ্ট্র এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাগ্রহণ করেনি। আর এক্ষেত্রে সরকার নিজেদের ষোলোআনা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। ব্লগাররা যে মানুষ—তা সরকারও হত্যাকারীদের সঙ্গে অস্বীকার করেছে। এতে হত্যাকারীগোষ্ঠী সরকারের পরোক্ষ-মদদে আরও উৎসাহিত হয়েছে।
বাংলাদেশে লেখকদের উপর সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে আঘাত করা হয় ২০০৫ সালের ২৭-এ ফেব্রুআরি। এই সময় আঘাত করা হয় ‘বাংলার সক্রেটিস’ হুমায়ুন আজাদের উপর। তাঁর উপর আঘাতকারীগোষ্ঠী এখনও জীবিত ও বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে। আমাদের একটি কথা মনে রাখতে হবে: হুমায়ুন আজাদ স্যার কখনও কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে লেখেননি। তিনি ছিলেন সত্যভাষীলেখক। আর সত্যিকারের একজন লেখক। তাঁকেও হত্যা করে হত্যাকারীরা ধর্মের দোহাই দিয়েছে। সরকার কোনো হত্যার বিচার আজও করেনি। আর ড. হুমায়ুন আজাদের মতো মহামানবের হত্যাকারীকে আজও শাস্তি দেওয়া হয়নি বলেই সেই একই হত্যাকারীগোষ্ঠী এখন একজন সংসদ-সদস্যকে প্রকাশ্য-দিবালোকে হত্যার করার দুঃসাহস দেখিয়েছে! কালসাপ কখনও দুধ-কলা দিয়ে পুষতে হয় না। আর কালসাপ মারতে কখনও বিলম্ব করতে হয় না। তা-না-হলে নিজের গাফিলতীর কারণে কালসাপের দংশনেই জীবনসংহারের সমূহ সম্ভাবনা থেকে যায়। আর হাতে ক্ষমতা থাকতে এই দুনিয়ায় কে কালসাপকে ছেড়ে দেয়?

বাংলাদেশআওয়ামীলীগ ২০১০ সালে, স্বাধীনতার ৪২ বছর পরে পুনরায় একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ শুরু করেছে—আর এটি নিঃসন্দেহে ভালো কাজ। কিন্তু এই পাঁচ-বছরে মাত্র পাঁচজন যুদ্ধাপরাধীর বিচারসম্পন্ন হয়েছে। আর বাইরে রয়েছে এখনও হাজার-হাজার যুদ্ধাপরাধী আর তাদের হিংস্র-বংশধর। এরা আগের মতোই কিংবা গুপ্তভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে সমানভাবে সক্রিয়। পাঁচ-বছরে মাত্র পাঁচজন কুলাঙ্গারের ফাঁসি দিয়ে দেশরক্ষা করা যায় না। এভাবে বিচারও হয় না। আর এদের ফাঁসি দিতেই বা এতো কার্পণ্য কেন? আর কীসের এতো মায়া-দয়া? আর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীরা এই সরকারের কার এতো আত্মীয়? আর বিচারে বিলম্ব হলে এদের ধরে-ধরে কেন ক্রসফায়ারে দেওয়া হচ্ছে না? রাষ্ট্রের গুলি খরচ করে রাষ্ট্রবিরোধী-কুলাঙ্গারনাশ করতে মনে এতো দ্বিধা কেন? আর একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের কেন জামাইআদরে জেলে রাখা হয়? জাতি এসব আজ জানতে চায়।
সরকারের ব্যর্থতা আছে, থাকবে—আর তা মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতা মেনে নেওয়া যায় না। আর রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে আমাদের কী থাকে? আর আমাদের কী হবে? আর তাই, রাষ্ট্রকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী-অপশক্তির বিরুদ্ধে এখনই আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে। এভাবে রাষ্ট্র চলতে পারে না। আর এইজন্য ত্রিশলক্ষ শহীদের রক্ত দিয়ে এই রাষ্ট্র বানানো হয়নি।

শোনা যায়: নিহত এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন তার সংসদীয় এলাকা—গাইবান্ধা-১ (সদর-আসন) সুন্দরগঞ্জে ‘জামায়াত-শিবিরে’র বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অবস্থানগ্রহণ করেছিলেন। তিনি ওই এলাকায় তাদের রাজনীতিও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এটি জাতির জন্য আশার কথা ছিল। এদেশের প্রতিটি সংসদ-সদস্যেরই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একাত্তরের নরঘাতক জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে সদাসর্বদা রুখে দাঁড়াতে হবে। তবেই রাষ্ট্র সোজা হয়ে চলতে পারবে। আর রাষ্ট্র সোজা হয়ে দাঁড়াবে।
এজন্য সবার আগে ক্ষমতাসীন-আওয়ামীলীগকে—একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে আরও আন্তরিক ও সাহসী হতে হবে। আর দলের নেতা-কর্মীদের ‘চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি-মাস্তানি’ ছেড়ে দিয়ে একাত্তরের নরঘাতক ‘জামায়াত-শিবির-জঙ্গিদের’ বিরুদ্ধে সর্বাত্মক-ব্যবস্থাগ্রহণের মাধ্যমে সত্যিকারের রাজনীতিবিদ হতে হবে। তবেই আমাদের রাষ্ট্র সম্পূর্ণ রাহুমুক্ত হতে পারবে।

সংসদ-সদস্য নিহত হওয়ার খবরটা শুনে মনে হলো: শুধু সরকার নয়—আজ যেন রাষ্ট্রও হত্যাকারীগোষ্ঠীর কাছে অসহায় হয়ে পড়েছে। আর তাই, সরকার-দলীয় এমপি ‘লিটন’ খুন হওয়ায় অসহায় রাষ্ট্রের যেন আর্তনাদ শুনতে পাচ্ছি।
কবে এই রাষ্ট্র আর এই সরকার একটুখানি সবল হবে? আর কবে এদের সামান্য বোধোদয় হবে?

পরিশেষে, নিহত সংসদ-সদস্য লিটনের বিদেহীআত্মার শান্তি কামনা করছি।
জয়-বাংলা।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০১/০১/২০১৭

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 2 =