তুরস্ক কি রাষ্ট্র? নাকি তালেবানখানা?

তুরস্ক কি রাষ্ট্র? নাকি তালেবানখানা?
সাইয়িদ রফিকুল হক

খ্রিস্ট্রিয় (ইংরেজি) নতুন-বছরের দিনে তুরস্কে মানুষের উপর হামলা করেছে ধর্মব্যবসায়ী পশুর দল। আর তাই, বিশ্বজুড়ে এখন মানুষের চোখে জল। তবুও নাই ওই পশুদের বোধোদয়!
তুরস্ককে অনেকে এখনও রাষ্ট্র মনে করে। কিন্তু আমি, আমরা ও আরও অনেকে এটিকে আর রাষ্ট্র মনে করি না। কারণ, আধুনিকরাষ্ট্র হওয়ার জন্য একটি ভূখণ্ডের যে-যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন—এর তা নাই। এটি এখন সরাসরি একটি মোল্লাতান্ত্রিক তাঁবুতে বা ঘাঁটিতে পরিণত হতে চলেছে।

সাম্প্রতিককালে তুরস্কের মানবতাবিরোধী বিবিধ-কর্মকাণ্ডে বিশ্ববিবেক কেবলই বীতশ্রদ্ধ হচ্ছে। আর বর্তমানে তুরস্কের কোনো রাষ্ট্রদর্শন নাই। কতকগুলো আগাছা আর পরগাছার সমন্বয়ে ‘তুরস্ক’ নামক একটি জনপদ পরিচালিত হচ্ছে। পূর্বেই বলেছি, এটি আজ আর কোনো রাষ্ট্র নয়—তবুও এটিকে কেউ যদি ‘রাষ্ট্র’ বলতে চায় তবে তাকে একটি সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। আর এক্ষেত্রে তাকে এটিকে পাকিস্তানের মতো একটি ‘শয়তানরাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করতে হবে। হ্যাঁ, তা-ই। বর্তমান বিশ্বে ‘তুরস্ক’ নামক জনপদটি পাকিস্তানের মতোই একটি শয়তানরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আর এখানে, বর্তমানে মৌলবাদীপশুশক্তির দাপট সর্বাপেক্ষা বেশি। আধুনিকমানুষগুলো এখানে দীর্ঘদিন যাবৎ একেবারে কোণঠাসা হয়ে আছে। এজন্য গত-বছরের শেষদিকে তুরস্কে বর্তমান-শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘গণবিপ্লব’ সংঘটিত হওয়ার সুবর্ণ সুযোগসৃষ্টি হয়েছিলো। কিন্তু ধূর্ত-এরদোগান ও তার পারিষদবর্গ দলীয় লোকজনের যোগসাজশে তা নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়।

তুরস্কে বেশ কয়েক বছর আগে মৃত্যুদণ্ডবিরোধী-আইনপাস হয়েছে। আর তারা এটির অজুহাতে আমাদের দেশের একাত্তরের চিহ্নিত-যুদ্ধাপরাধীদের প্রাণ-বাঁচাতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বাতিল করতে নানারকম ষড়যন্ত্র করেছে (সে সম্পর্কে পরে সংক্ষেপে বলা হবে)। কিন্তু নিজের স্বার্থে এই তুরস্কের বর্তমান-শাসকগোষ্ঠী নিজেদের বিরুদ্ধে ‘অভ্যুত্থানসৃষ্টিকারীদের’ এখন খুঁজে-খুঁজে নির্মমভাবে হত্যা করছে। ভণ্ড আর কাকে বলে! এদের কাছে নিজেদের রাষ্ট্রক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে যেকোনো মানুষকে হত্যা করা জায়েজ।

তুরস্কের বর্তমান শাসক-প্রেসিডেন্ট এরদোগান নিজে একটা কাটমোল্লা। আর তার পারিষদবর্গ নিঃসন্দেহে শয়তানের অনুচর। এরদোগান-শয়তান ধীরে-ধীরে তুরস্ককে মোল্লাঘাঁটিতে পরিণত করতে চলেছে। তার সমস্ত কার্যকলাপ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আধুনিক-জীবনদর্শনের প্রতি তার কোনো আস্থা বা বিশ্বাস নাই। আর আধুনিক-পোশাকআশাক-পরিহিত একটা আস্ত-কাটমোল্লা ও আপাদমস্তক-ভণ্ড হচ্ছে এই এরদোগান। অথচ, সে রাষ্ট্রক্ষমতারক্ষা করার জন্য সাম্রাজ্যবাদীঅপশক্তির দালাল হতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেনি। আর আমেরিকার পা-চাটা-গোলাম এরদোগান এখন একসময়কার আধুনিক-তুরস্ককে সাম্প্রদায়িক-পশুরাষ্ট্রে পরিণত করার চক্রান্ত ভালোভাবেই এগিয়ে নিচ্ছে। এরদোগানের সমস্ত শয়তানী দেখে মনে হচ্ছে: এটি তালেবানীরাষ্ট্র হতে আর বেশি বাকী নাই।

বাংলাদেশে ২০১০ সালে স্বাধীনতার ৪২বছর পরে আবার একাত্তরের চিহ্নিত-যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্যক্রম শুরু হয়েছে। আর এতে বাধাদানকারী-প্রথম রাষ্ট্র হলো তুরস্ক। আর এর প্রথম বিরোধিতাকারী-শয়তান হলো প্রেসিডেন্ট-নামধারী এরদোগান। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী কসাই কাদের মোল্লার বিচার শুরু হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে তুরস্কের এরদোগান এর বিরুদ্ধে অবস্থানগ্রহণ করেছে। আর সে আন্তর্জাতিক-অঙ্গনে বাংলাদেশের একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নানারকম অবান্তর প্রশ্ন তুলেছে। এরপর সে একে-একে অপরাপর আরও চারটি শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দণ্ড মওকুফের জন্য আন্তর্জাতিক-অঙ্গনে নানান রকম দেন-দরবার করে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। শুধু এখানেই একটা এরদোগান-শয়তান কিংবা তার পারিষদবর্গ থেমে নাই। তারা এখনও বাংলাদেশের একাত্তরের চিহ্নিত-যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া বানচালের জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে একযোগে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ইতঃপূর্বে তারা আমাদের দেশের পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় নরপিশাচ, নরঘাতক, যুদ্ধাপরাধীর প্রাণ বাঁচাতে তাদের দেশে মিটিং-মিছিল পর্যন্ত করেছে!

এবছর ইংরেজি-নববর্ষের দিন এই এরদোগানের মুরীদগণ একটি ‘নাইট-ক্লাবে’ ভয়াবহ হামলা চালিয়ে ৩৯-৪০জন নিরপরাধ-মানুষকে হত্যা করেছে! আর আহত করেছে কমপক্ষে ৭০ জনের মতো! কী ভয়ানক আর কী পৈশাচিক অপকর্ম! আর যারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তারা কি মানুষের সন্তান? নিশ্চয়ই না। এরা মানুষ হলে বনের পশুও লজ্জা পাবে। এই পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষেরই তার গণতান্ত্রিক অধিকার-ভোগের অধিকার রয়েছে। ইংরেজি-নববর্ষে মানুষজন আনন্দ করছে। আর সেখানে নির্বিচারে হামলা চালিয়েছে কতকগুলো নরপশু। এও কি মেনে নেওয়া যায়? না। এতে মানুষ আর মানবতার বিপর্যয় ঘটেছে।
এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের দায় যে-ই স্বীকার করুক না কেন—এর পিছনে তুরস্কের শাসকদলের তথা মৌলবাদীঅপশক্তির ইন্ধন রয়েছে। আর দীর্ঘদিন যাবৎ তুরস্কের বর্তমান-শাসকগোষ্ঠী এদের সযত্নে লালনপালন করছে। আর তাই, এর দায় এদেরই নিতে হবে।

তুরস্কে এখন তালেবানীঅপশাসন চলছে। নতুন-বছরের এই একটিমাত্র ঘটনাই তার প্রকৃষ্ট-উদাহরণ। যেকোনো মানুষের মৃত্যুই আমাদের বেদনার কারণ। আর আজ দেশে-দেশে এভাবে একদল সাম্প্রদায়িকপশুশক্তির হাতে মানুষ মারা যাচ্ছে। এর প্রতিকার কী? আজ বিশ্ববিবেক কোথায়? আর কে ভেঙে দিবে তুরস্কের এই তালেবানীঅপশাসন?

চলতি-বছরের ইংরেজি-নববর্ষের দিন তুরস্কে ঘটে গেল এক বেদনাদায়ক ঘটনা। আর এসব কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। আর সবকিছু দেখেশুনে আজ মনে প্রশ্ন জাগে: তুরস্ক কি রাষ্ট্র? নাকি নব্য-তালেবানখানা?

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০২/০১/২০১৭

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

74 − 68 =