সন্ত্রাসীর ধর্ম, ধর্মের সন্ত্রাস

“সন্ত্রাসীর কোন ধর্ম নেই ” কথাটার মধ্যে ভাবাবেগ এবং ভণ্ডামি আছে অপরিমেয় পরিমানে, সারবস্তুু নেই তিলার্ধ পরিমাণ। যারা এই বাক্যটা বেশি বেশি বলে তারাই আবার ভারত, আমেরিকা, ইসরায়েল এবং মায়ানমারের সন্ত্রাসী বা আধা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলার সময় ঐসব রাষ্ট্রের যথাক্রমে হিন্দু, খিষ্ট্রান, ইহুদি ও বৌদ্ধ পরিচয়টাকেই বড় করে তোলে। ফিলিস্তিনের উপর ইসরায়েলের ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ এবং জোরপূর্বক ভূমি অধিগ্রহণ করে বসতি স্থাপনকে এরা ফিলিস্তিনের উপর ইসরায়েলের আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত না করে মুসলিম উম্মাহর উপর ইহুদিদের আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করে। সাম্প্রতিককালে মায়ানমার সরকার কর্তৃক সেদেশের রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনকেও মুসলমানেরা ইসলামের উপর বৌদ্ধদের হামলা বলে চিহ্নিত করেছে এবং ইসলামিক ঐক্যের ডাক দিয়েছে। আর বাংলা নববর্ষ, বসন্ত উৎসব, রবীন্দ্রসংগীত, এমনকি পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির ছায়া খুজেঁ পেয়ে এসব উৎসবকে বাতিল করার দাবী অনেক পুরানো। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই এরা বিদেশী রাষ্ট্রের সামরিক, কূটনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক কার্যকলাপকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পর্যবেক্ষণ না করে সাম্প্রদায়িক বিভাজনরেখা অনুসারে ব্যাখ্যা করে এবং বিধর্মী উপাদান খুঁজে পেয়ে সেগুলো পরিত্যাগ করতে আহবান করে।

কেন পরিত্যাগ করতে বলে? কারণ বিধর্মীয় জিনিস খারাপ।এটা যে খারাপ সেই তত্ত্ব এরা পায় কোথা থেকে? নানান ধর্মীয় পুস্তক থেকে। এখন হয়তো আপনি বলবেন যে ওই বইয়ের ব্যাখ্যা সহীহ না । কিন্তুু এই কথা বলে পার পাওয়ার উপায় নেই আপনার।কারন বইতো একটা না, হাজারটা বইতে ওই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দেওয়া আছে, বিধর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী, ভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি ঘৃণার বীজ ছড়ানো আছে। এখন আপনি বলবেন যে ওই সব বই অসহীহ। আচ্ছা মানলাম অসহীহ। তাহলে স্যোসাল মিডিয়ায় নাস্তিক, মুক্তচিন্তক, পরিচিত ব্লগার প্রভৃতিদের সম্পর্কিত নিউজের নিচে যেসব কমেন্ট জমা হয় সেগুলো কোথা থেকে আসে? মানুষই তো ওইসব কমেন্ট লিখে। কমেন্টগুলো কখনো পড়ে দেখছেন? এখন আপনি বলবেন যে ওরা সহীহ ধার্মিক(মুসলমান) না । সারা পৃথিবীর কথা বাদ দিলাম। বাংলাদেশের নাস্তিক লেখক, মুক্তচিন্তার মানুষ এবং ব্লগারদের ফেসবুকে যতসংখ্যক মানুষ যে ভয়াবহ কমেন্ট করে, বিবিসির ওয়েবসাইট, বিডিনিউজের ‘মতামত’ নামের যে কন্টেন্টটা আছে সেখানকার কিছু কলামে যে পরিমাণে মুমিনদের হিংস্রতার ছাপ পড়ে আছে, তাতে এমনটা সন্দেহ করার যথেষ্ঠ কারণ আছে যে সহীহ ধার্মিক বলতে আপনারা যা বোঝাচ্ছেন সেটা একটা কাঠালের আমসত্ত্ব। একটা মরীচিকা। নিজের আচরিত ধর্মকে সমালোচনার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য আপনি অন্য একজন ধার্মিককে অসহীহ বলে খারিজ করে দিচ্ছেন। এটা আপনার একধরনের মাস্তানি, ফতোয়াবাজি এবং ধর্মব্যবসা।হিসাব করলে দেখা যাবে চিরুনি তল্লাশি চালিয়েও আপনার মতের সাথে মেলে এমন একটাও সহীহ ধার্মিক খুজে পাওয়া যাবেনা।তখন আপনার কাছে আমার বিনীত প্রশ্ন,যে ধর্ম এতো এতো হিংস্র অসহীহ অনুসারী জন্ম দেয় সেই ধর্ম দিয়ে আমাদের কাজটা কি? ধর্ম তো মানুষে পালন করে,তা ধর্মগ্রন্থের পাতা থেকে উঠে এসে নিজে নিজে পালিত হয়না। মানুষ ছাড়া ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থের কোন অস্তিত্ব নেই, অর্থও নেই। ধর্ম টিকে থাকে মানুষকে আশ্রয় করে,মানুষের বাইরে কোন ধর্ম নেই। ধর্ম মানুষেরই সৃষ্টি। তবে মানুষ সেটাকে সৃষ্টি করার পর তার ওপর অলৌকিকত্ব আরোপ করেছে। ধার্মিকরা এমন একটা ভাব করে যেন ধর্ম উপর থেকে পড়েছে, পরম পবিত্র, এবং শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয়। কিন্তুু বিষয়টা ঠিক তার উল্টো। কিছু মানুষ ধর্মীয় বিধিবিধান তৈরী করে অন্যের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। এর কোন অলৌকিকত্ব নেই।মানুষ নেই তো ধর্মও নেই।অর্থাৎ ধর্ম একপ্রকার পরজীবী। যে ধর্ম যে মানবগোষ্ঠীকে আশ্রয় করে বেচেঁ থাকে,সেই মানবগোষ্ঠীর জীবনদর্শন, জীবনাচরণ এবং নীতি নৈতিকতার বোধ থেকেই সেই ধর্মের স্বরূপ বোঝা যায়। ব্যক্তিগত জীবনাচরণে যদি কেউ খুব ধর্মগ্রন্থানুসারী হয়, তো সেই ব্যক্তির আচরণ থেকেই তার অনুসৃত ধর্মের পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তুু ধর্মানুসারী না হয়েও মানুষ অত্যন্ত উৎকৃষ্ট বা নিকৃষ্ট হতে পারে। ইওরোপের বেশীরভাগ লোকই যারা অনুসারী হিসেবে বিভিন্ন গোত্রের খ্রিস্টান, তারা ধর্মের ধ্বজাধারী না। কিন্তুু সেটা না হয়েও তাদের মধ্যে নিকৃষ্ট এবং উৎকৃষ্ট মানুষ আছে। অর্থাৎ এদের ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগত চরিত্রের বিচারের মাধ্যমে তাদের ধর্ম সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবেনা। কারণ এরা ধর্ম বিশ্বাস করে কম, ধর্ম মানে আরও কম। কোরানের চেয়ে বাইবেলে হিংস্রতা দ্বিগুণ বেশী, সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। http://www.independent.co.uk/arts-entertainment/books/violence-more-common-in-bible-than-quran-text-analysis-reveals-a6863381.html
কিন্তুু খ্রিস্টানরা এখন আর ধর্মীয় সহিংসতায় জড়িত নেই। কারণ তারা ওই গ্রন্থগত ধর্ম থেকে দূরে সরে এসেছে।

খেয়াল করলে দেখা যাবে মুমিনেরা যতবার” ইহুদিদের ষড়যন্ত্র” শব্দযুগল উচ্চারণ করে, ততবার কিন্তু “ইসরায়েলের ষড়যন্ত্র ” শব্দযুগল ব্যবহার করে না। অর্থাৎ অন্যের বেলায় ঠিকই ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে ষড়যন্ত্রকারীর পরিচয় নির্ধারণ করে, কিন্তুু নিজের বেলায় ‘সন্ত্রাসীর কোন ধর্ম নেই’। অর্থাৎ মূল কথাটা হবে “পৃথিবীর সব সন্ত্রাসীকে ধর্মীয় পরিচয়ে আখ্যায়িত করা যায়েজ, একমাত্র মুসলমান সন্ত্রাসীকে ধর্মীয় পরিচয়ে আখ্যায়িত করাটা নাজায়েজ, ইসলামফোবিয়া। ”

“চক্রান্ত ” এবং “ষড়যন্ত্র ” এই দুটো বহুল ব্যবহৃত (অপব্যবহৃত) শব্দ।রাজনৈতিক পরিসরে এবং বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে এদুটো হরহামেশাই ব্যবহৃত হয়। সমস্ত সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে উপরে উল্লেখিত দুটি শব্দ এবং একটি বাক্য দ্বারা জাস্টিফাই করা হচ্ছে এবং সাথে সাথে সন্ত্রাসীকে একপ্রকার দায়মুক্তি দিয়ে দেওয়া হয়। এর অন্তর্নিহিত অর্থ যে সন্ত্রাসবাদকে পরোক্ষে সমর্থন দেওয়া সেটা তারা হয় বোঝে না, অথবা বুঝেও না বোঝার ভান করে। দ্বিতীয়টা হবার সম্ভাবনাই বেশী। কথায় কথায় মন্ত্রি থেকে শুরু করে নিরাপত্তা বাহিনী হয়ে আমজনতা পর্যন্ত সবাই বলে যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। প্রশ্ন হচ্ছে একটা দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসন এবং দেশের জনগন যদি বুঝেই থাকে যে এটা ষড়যন্ত্র, তাহলে এই ষড়যন্ত্র কেন নস্যাৎ করতে পারছে না? কেন ঘটনাগুলো ঘটে যাওয়ার পরই শুধু ষড়যন্ত্র ষড়যন্ত্র বলে ক্যাসেট বাজানো হয়? এই যে ওলামালীগ নানান দাবি দাওয়া করে যখন তখন, এটা কি ষড়যন্ত্র? শফী হুজুর নাস্তিক কতলের ফতোয়া দেয়, এটা ষড়যন্ত্র? যদি ষড়যন্ত্র হয়ে থাকে, তবে এটা দেশি না বিদেশি ষড়যন্ত্র? যদি বিদেশী হয়ে থাকে তবে আপনাদের ভাষ্যমতে ধরে নিলাম এটা ইসরায়েল, আমেরিকা এবং ভারতের ষড়যন্ত্র। প্রশাসন বা সরকার যদি জেনেই থাকে এটা ওদের ষড়যন্ত্র তবে ওদের কাছে কৈফিয়ত চায় না কেন? আর যদি দেশি ষড়যন্ত্র হয় তবে কে সে ষড়যন্ত্রকারী? ধরতে পারেনা কেন? কতগুলো বছর ধরে শুধু বলে আসছেন এটা ষড়যন্ত্র, একটা গোষ্ঠীর চক্রান্ত, অথচ চক্রান্তকারীকে ধরতে পারেন না। এতোদিনেও ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করতে পারলেন না, তবে কেমনে নিশ্চিত হলেন যে এটা ষড়যন্ত্র? আর এতোদিন ধরে যখন ষড়যন্ত্র স্মুথলি চলতে থাকে তখন সে আর ষড়যন্ত্র থাকে না, যন্ত্রে পরিণত হয়। ষড়যন্ত্রের একটা টাইম লিমিট থাকে। সেটা দীর্ঘদিন চলতে পারেনা। কিন্তুু দেখুন বিশ্বের দুইশো কোটি মুসলমান বহু বহু বছর ধরে বিশ্বাস করে তাদের বিরুদ্ধে ইহুদীরা, খ্রিস্টানরা ষড়যন্ত্র করে আসছে। অথচ কত প্রতিপত্তিশালী ইসলামিক রাষ্ট্র রয়েছে, কত শত কোটি ইসলাম ধর্মাবলম্বী রয়েছে, এরা সবাই মিলে ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করতে পারছে না। তাই প্রশ্ন জাগে, এই সন্ত্রাস আদৌ কি বাইরের ষড়যন্ত্র, নাকি নিজেদের ধর্মীয় মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করার একটা যন্ত্র। সবশেষে যে লোকগুলো মারা যাচ্ছে, যে লোকগুলো আহত হচ্ছে, আর যে লোকগুলো নিরন্তর নিরাপত্তাহীনতার বোধ নিয়ে দিন পার করছে, সেই মৃত্যু, সেই পঙ্গুত্ব, সেই পেনিক এগুলো তো ষড়যন্ত্র নয়। যে মারা গেল, সে তো সত্যিই মারা গেল। সে তো আর ফিরবে না। আপনাদের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব পঙ্গু লোকটার জীবনকে স্বাভাবিক করতে পারবে না।পেরেছে কি এই নিউ ইয়ার উদাযাপনে আমাদের স্বত:স্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে? সামনের বইমেলা, ঈদের নামাজ অথবা পূজার অনুষ্ঠানগুলোতে আগত মানুষগুলোকে নিরুদ্বিগ্ন রাখতে, নিরাপদ রাখতে?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

62 + = 70