ভারতের মধ্য প্রদেশের ইন্দোর শহরের সেইসব দিনগুলো

১৩ সালের প্রথম দিকের কথা। তখন আমি ভারতের মধ্য প্রদেশ ইন্দোরে থাকতাম। রাস্তাঘাট খুব পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম সুন্দর একটা শহর। প্রতি রোববার ছুটিরদিনে দুয়েকজন অবাঙালীর (ওদের ভাষায় হিন্দুস্থানী) সাথে সাইকেল নিয়ে ঘুরতে বেড়ুতাম। যেদিকে দুচোখ যায় চলে যেতাম। সারাদিন ঘুরে সন্ধ্যায় সেটজীর বাসায় ফিরতাম। ওখানে কিউট কিউট অপুর্ব সুন্দরী মেয়েরা স্কুটি চালায়। দেখতে খুব ভালো লাগতো। জিন্স টপ, খোলা চুল, অমলিন হাসি…. এতো সুন্দর? ওয়াও! একটু ছুঁইয়ে দিতেও ইচ্ছে করতো! ওখানে প্রায় ছয় মাস ছিলাম। প্রতিদিন ভোর বেলায় উঠে চার কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে মর্নিং ওয়ার্কে যেতাম। পার্কে দৌঁড়াদৌঁড়ি, ব্যায়াম, প্রাণায়াম করতাম। জিন্স টপ পরে খুব সুন্দর সুন্দর মেয়েরাও আসতো। তারা প্রথমে দৌঁড়াদৌঁড়ি, তারপর ডিস্কো সাউন্ড বাজিয়ে ডান্স করতো। আমি প্রথম থেকে যে জায়গায় বসে প্রানায়াম করতাম, সেটা পার্কের শেষ মাথায়। সেখানে বেশিরভাগ মেয়েরা ব্যায়াম করে। একটি বেঞ্চে দক্ষিণমুখী হয়ে বসে প্রাণায়াম করতাম। যাতে বিশুদ্ধ বাতাসটা সহজে শ্বাসে নিতে পারি। এভাবে মাস-দুয়েক গেল। একদিন তিনজন মেয়ে এসে আমাকে খুব রাগত স্বরে বলল, -আপকো শরম নেহি আতি?
আমি খুব আশ্চর্য হয়ে বললাম, কিসলিয়ে?
-ইহা লেড়কি কা জা’গা হে।
-ইয়ে পার্কো জা’গাপে কয়ি লেড়কি কা নাম হে? দিখাও!
-নেহি হে, লেকিন তোম ইহাসে বেট নেহি শ্যাক্তা!
-আপকো নাম ক্যায়া হে?
-পুজা
-দেখো পুজাজী, মে তোমারা ফিগার, তোমারা ডান্স দেখনেকেলিয়ে এই বেঞ্চকো নেহি বেট্যা। ইধারসে সুরাজকো ধুপ নেহিএ, অর হাওয়া বহত আচ্ছি হে, ইসলিয়ে বেট্যা।
পুজা আমাকে খুব ধমক দিয়ে বল্ল, আপ ইহাসে নেহি বেটেগা! হটো!

খুব অপমানিত বোধ করলাম। একদম চুপ হয়ে চলে এলাম। দুদিন মর্নিং ওয়ার্কে যায়নি। আবার নিয়মিত যাওয়া শুরু করলাম। মেয়েদের ঐদিকে আর প্রাণায়াম করিনা। এর দুদিন পরে খুব মনযোগ দিয়ে প্রানায়াম করেছিলাম। হঠাৎ এক ভদ্রলোক এসে বললেন, – আপকো নাম ক্যায়া হে?
-অপ্রিয় (ছদ্দনাম)
-অপ্রিয়জি আপ ইয়ে প্রাণায়াম কাহাসে শিখা?
-কিউ?
-আপকো প্রাণায়াম বহত আচ্ছি হে।
-বিবেকানন্দজী ক্যা কিতাব সে পড়া।
-আপ কাহাসে আয়া?
-ক্যালকাত্তা সে…
– মে ডক্টর নিতীন। এক কাম করো, আপ ঐ লেড়কি কো পাস যাও। ওস সারা লেড়কি কো আপ প্রানায়াম শিখাও।
-সরি ডক্টরজি মে নেহি জাওয়ুনগা।
-কিউ?
মেয়েগুলো যে আমাকে অপমান করল তা ডাক্তারকে খুলে বললাম। তিনি আমাকে জানালেন তিনি একজন সরকারী ডাক্তার। তিনি পার্কে পার্কে সপ্তাহে এসে সবাইকে ব্যায়াম করার নিয়মগুলো শিখিয়ে দেন। আরেকটা জিনিস তাকে গোপন রাখলাম। আমি তাকে বলেছি, আমি কলকাতা থেকে এসেছি। কিন্তু আমি এসেছি বাংলাদেশ থেকে। তাও আবার পাসপোর্ট ছাড়া। ১২ সালে আমার আর পুরো পরিবারের জীবনে যে তান্ডব নেমে এসেছিল। সেজন্য আমি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। একথা ডাক্তারকে বলিনি। হয়তো তাকে বললে জেলে ভরে দিত। ডাক্তার আমাকে মেয়েদের কাছে নিয়ে গেলেন।
ডাক্তার বললেন, ইহাসে কন লেড়কি অপ্রিয় কো পেরেশান দিয়া?
পুজা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন, -স্যার মে….
-ইয়ে লেড়কা কাম করনেকেলিয়ে ক্যালকাত্তাসে ইন্দোর আয়া। বহত দুরসে আয়া। কিউ তোম লোক উসকো তাফলিক দিয়া? লেড়কা-লেড়কি একসাত এক্সারসাইজ করেগা তো কিউ ফারাক পরতা? তোমকো মালুম হে, ইয়ে ক্যালকাত্তা স্রেফ কাম কেলিয়ে আয়া, রুজি কেলিয়ে আয়া। তোমকো শরম আনি চাইয়ে। ইয়ে হামারা ইন্দোরকো মেহিমান হে। অর মেহমানকো সাথ ইজ্জত সে বাত করো।

পুজা আমার কাছে এসে হাত জোর করে বললেন, -স্যরি অপ্রিয়জী, প্লীজ স্যরি স্যরি স্যরি…
পুজা আমার কাছে এসে এতোই অনুনয় বিনয় করছে যে আমি নিজেই লজ্জা পেয়ে গেলাম। আমি বললাম, পুজাজী এসা মাত বলো, মুজে শরম আতি হে। আফ সুধার গেয়া তো মাফি মাগনা জরুরত নেহি হে।
-থ্যানক ইউ অপ্রিয়জী।
-ওয়েল কাম।

এরপর পুজার সাথে প্রতিদিন ভোর বেলায় পার্কে দেখা হতো, কথা হতো। প্রানায়ামটা তাকে শিখিয়ে দিয়েছি। ভাল একটা বন্ধুত্ব হলো। কোনো এক রবিবারে তার স্কুটির পেছনে বসে ইন্দোর ঘুরেছিলাম। ফুসকা খেয়েছিলাম। খুব চমৎকার একটা মেয়ে। সব সময় হাসিখুশি থাকে। আমি কেন এদেশে এলাম, কোন বিপদে পড়ে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম। তাকে সব বললাম। সেই শুনে আঁতকে উঠে। সেই বলল, বংলাদেশ ক্যা মোহামেডানস ইতনা ভায়োলেন্ট? অপ্রিয় তোম বাংলাদেশী হে ইয়ে বাত কিসিকো নেহি বাতানা, টিগ হে?
-ইয়া।

আমার সেটজী, (যার কাজ করতাম) তিনি ভালো খুব মানুষ। আমার ঘটনাটা সেই জানে। আমরা দুজন একসাথে কাজ করতাম, আমাদের তৈরি অলংকারগুলো দুজনে বাজারে গিয়ে সেল করতাম। আমার অধ্যবসায় দেখে সেই বলেছিল, -অপ্রিয় তোমকো মুজে বহত আচ্ছা লাগা। তোম ইহাসে সেটেল্ট হো যাও। সাদী বানাও। তোমকো জিৎনা হেল্প জরুরত হে মে করুনগা।
-ঠিগ হে, লেকিন কোন লেড়কি মুজে সাদী করেগা? মেরা পাস তো কুচবি নেহি এ।
-কুচ জরুরত নেহিএ। লেকিন তোম আচ্ছা ইনসান হো। মেরা মামতো বইন তোমুকো বহত লাইক করতা। উসকো সাদী বানাও। ও আচ্ছা লেড়কি হে। কয়ি টেনশান নেহি এ। সবকুছ মে সামালুংগা। ইস্কে বাদ তোমারা আই কার্ড, পেন কার্ড, রেশন কার্ড সব হো যায়েগা।

আমি তো পুরা হতভম্ব হয়ে গেলাম। এখন বুঝতে পারছি আমি কাজ করার সময় ঋতু (সেটজীর মামাতো বোন) কেন আমার কাছে ঘন ঘন আসতো, আর বলতো- চা পিয়েগা? পানি পিয়েগি? ইয়ে লো, এই খানা খালো। কারনে অকারণে ও আমার কাছে আসতো। কি লাগবে জানতে চাইতো। আমি বলতাম, -এক গোল্ড প্ল্যাক পিয়াও।
ও বলতো, -আপ বহত সিগারেট পিয়েগা ইয়ার, ইতনা সিগারেট পিয়েগা তো সিনে সে বিমার হো যায়েগা।

একদিন রবিবার সে লাল স্কার্ফ পরে ট্যাম্পলে (মন্দিরে) যাচ্ছিল, হঠাৎ আমার কাছে এসে বল্ল, -হেই অপ্রিয় মুজে ক্যাসা লাগতা হে?
আমি তাকে পুরো নিচ থেকে উপর পর্যন্ত দেখে ডান হাতে ok চিহ্ন দেখিয়ে বললাম, -হু বহত আচ্ছা লাগতা হে।
-থ্যাংক ইউ। অপ্রিয়….
-ক্যা?
-তোম আচ্ছাসে হিন্দি বাত শিখ গেয়া।

সেটজী নিলেশ সোনি যখন আমাকে ঋতুকে বিয়ে করার কথা বলল। আমি তো ভিতরে ভিতরে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলাম! আমি এখানে ঋতুকে বিয়ে করে সংসার পাতবো? সেটেল্ট হবো? আমার বাংলাদেশ? আমার জম্মভুমি, আমার শৈশব-কৈশর, আমার মা-বাবা ভাই বোন এদের মনে পড়তেই বুকটা হু হু করে উঠল। চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। এখানের সবকিছু বাঙালী সংস্কৃতি থেকে আলাদা। আর এখানে বাঙালী খুব কম দেখা যায়। তাদের সাথে তেমন একটা পরিচয় ও নেই। আমি খুব রুপবতী ঋতুকে বিয়ে করার কথা কোনো ভাবেই ভাবতে পারছিনা। এর দুদিন পর আমি নিলেশকে বললাম, মুজে ক্যালকাত্তা ভেজদো। মে বাংলাদেশ চলা যাওয়ুনগা।
-ক্যা হুয়া অপ্রিয়? তোমকো কয়ি কুচ বোলা?
-নেহি, ইহাসে আচ্ছা নেহি লাগতা। মে দেশপে চলা যাওয়ুনগা। প্লিজ মুজে ভেজদো।
-তোম আচ্ছি তারা ছোঁচো, ফিরবি বাংলাদেশ গেয়া তো তোমকো প্রবলেম নেহি হুয়া?
-পাতা নেহি। মে চলা যাওয়ুনগা।
-ঠিহ হে, তোমকো মে নেহি রুখেগা। চলা যাও। তোমকো বাংলাদেশ কয়ি প্রবলেম হুয়া তো ফিরবি ক্যালকাত্তা চলা আও, মুজে ফোন লাগাও, মে তোমকো ক্যালকাত্তা সে লে আওয়ুনগা।

যেদিন আমি ইন্দোর ছেড়ে চলে আসছি আমার নিজের ও খুব খারাপ লাগছিল। আন্টি (নিলেশের মা) আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ছিলেন। ঋতু সেদিন অভিমান করে আমাকে দেখতে আসেনি। নিলেশ ভাইয়ের বঊ ও (ভাবিজী, ওখানে বৌদিকে ভাবী বলে) কান্না করেছিল। তারা আমাকে বলেছে, যদি কখনো ইন্ডিয়া আসি যেন তাদের বাড়িতে একবার আসি। যেন তাদের সাথে দেখা করে যায়। পুজা দিল্লি বেড়াতে চলে যাওয়ায় পর তাকেও আর ফোন করে বলা হয়নি। ওখানে একেক রাজ্যের আলাদা আলাদা সিম। অবশ্য দিল্লি যাওয়ার আগে আমাকে বলে গিয়েছিল। পুজার নাম্বারটা সিম-এ সেভ ছিল। আসার সময় সিম নিলেশ ভাইয়াকে দিয়ে এসেছিলাম। তাড়াহুড়োর মধ্যে পুজার নাম্বারটা আর টুকে নিইনি। পুজা হয়তো মর্নিং ওয়ার্কে পার্কে এসে আমাকে এদিক সেদিক খুঁজবে। একদিন, দুদিন, পাঁচদিন, দশদিন, একমাস? তারপর তো ভুলে যেতে বাধ্য হবে। আমি যেদিন রাত আটটায় ট্রেনে উঠি, সেদিন ছিল মঙ্গলবার। শনি, মঙ্গল বৃহস্পতিবার, সপ্তাহে এই তিনদিন ইন্দোর থেকে কলকাতা হাওরার উদ্দেশে ট্রেন ছাড়ে। ট্রেন চলছে খুব গতিতে। ইন্দোরের একেকটি স্টেশন পিছনের দিকে সরে যাচ্ছে। কোন এক অজানা ব্যাথায় বুকটা ভারী হয়ে উঠল। মনে হচ্ছে কি যেন ইন্দোরে রেখে আসলাম। কি যেন হারিয়ে আসলাম।

অনেক বিরোক্তিবোধ সহ্য করে, বেশ কিছু মানুষের সাথে গল্প করতে করতে, দুই হাজার কিলোমিটা পাড়ি দিয়ে, পাক্কা দুদিন ট্রেনে চড়ে, বৃহস্পতি বার দুপুরে ইন্দোরের ট্রেন হাওড়া এসে ভীড়ল। কলকাতায় আগে বেলঘড়িয়ায় যেখানে তিন মাস ব্যাগের কারখানায় কাজ করেছিলাম, আবার সেখানে গিয়ে ঊঠি। ওখানে কিছুদিন থাকার পর বাংলাদেশে চলে আসি।

১৩ সালের জুন মাসে এসে শুনি আসিফ মহিউদ্দিন, পারভেজ আলম, শুভ্রত শুভ, আল্লামা শয়তানকে গ্রেপ্তার করা হল। রাজীব হাইদারকে কুপিয়ে হত্যা করা হল। দেশে পুরো একটা গনজাগরন সৃষ্টি হয়ে গেল। লাকী-ইমরান রা তখন রাজপথ কাঁপাচ্ছে। অথচ আমি কোনো খবরই পায়নি। এসেই একটা দোকানে চাকরী নিই। আবার মাল্টিমিডিয়া সেট কিনি। এবার আর রিয়েল আইডি নয়, প্রায় দীর্ঘ এক বছর পর ফেসবুকে ছদ্দ নাম নিয়ে গত ১৩ আগস্টে ঢুকি। এর মধ্যে আগের অনেক বন্ধু ফেইসবুকে তথাকথিত সেলিব্রটি হয়ে উঠেছে। আমার আগের আইডিটা পুলিশ জব্দ করেছিল। যে আমার বিরূদ্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের অনুমোদন কর্তৃক ২৯৫ ক ধারায় মামলা করেছিল। নির্লজ্জ-এর মতো আমার আগের আইডিটা এস আই এখনো ব্যবহার করে। মাঝে মাঝে এখনো ওখানে ঢু মারি।

(আরেক দিন কলকাতার গল্প নিয়ে হাজির হবো)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

15 − = 12