খৃষ্টধর্মের উৎপত্তি ২: যীশুর নৈতিক শিক্ষায় সক্রেটিস ভাবনা?

[ প্রথম পর্ব ]
যীশুর প্রসিদ্ধ নৈতিক ও আধ্যাত্বিক শিক্ষাগুলো, যেমন সুবর্ণ নীতি, শত্রুকেও ভালবাস, ডান গালে থাপ্পর মারলে বাম গালও এগিয়ে দাও, সীজারকে দাও সীজারের প্রাপ্য ঈশ্বরকে ঈশ্বরের, ইত্যাদি সক্রেটিসের নৈতিক ভাবনা থেকে ধার করা মনে হয়।

যীশুর মিশন ও প্রকৃত ইহুদী মেশিয়া মিশনের মাঝে বৈপরীত্য
নিউ টেস্টামেন্টে যীশুর প্রাথমিক বাণীগুলো স্পষ্ট করে তোলে যে, খৃষ্টধর্ম ছিল মূলত মুসার আইনসমূহ তথা ইহুদী ধর্মের সংস্কারের প্রচেষ্টা। যেমন যেমন ম্যাথিউ ৫:১৭ঃ “ভেবো না যে আমি ধর্মীয় বিধান বা নবীদেরকে ধ্বংস করতে এসেছি; ধ্বংস করতে নয়, আমি এসেছি পরিপূর্ণতা দিতে।” অথচ যীশু প্রচারিত কিছু কিছু আইন বা নৈতিক ভাবনা তৌরাত-এর বিরোধী, যেমন ব্যভিচারের ক্ষেত্রে। তৌরাতে ব্যভিচারের শাস্তি পাথর-ছুড়ে হত্যা (লেভিটিকাস ২০:১০), অথচ যীশুর সামনে এক ব্যভিচারী মহিলাকে হাজির করলে যীশু তাকে অনুতপ্ত হওয়ার উপদেশ দিয়ে বেকসুর মুক্ত করে দেন (জন ৮:৩-১১)। মুসা নবী ইহুদীদের জন্য একটা ধর্মীয়-রাজনৈতিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা মুসার তথা ইহুদীদের ধর্মীয় আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, অথচ গস্পেলে যীশু ইহুদীদের প্রতি পৌত্তলিক গ্রিকো-রোমান সাম্রাজ্যবাদী শাসনের আনুগত্য প্রচার করেন [ম্যাথিউ ২২:২১]। ইতিহাস থেকে আমরা জানি যে, যে কোন বিশেষ সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলনের পেছনে সে স্থানের সমকালীন আর্থ-সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিস্থিতি উদ্দীপক অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। কাজেই যীশুর ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলন প্রসঙ্গেও এ প্রশ্নটির যথাযথ বিবেচনা অপরিহার্য যে, কেন ঠিক ঐ সময়ে হঠাৎ মেসিয়া দাবীকারী যীশু এভাবে ইহুদী আইন সংস্কারের চেষ্টায় ব্রতী হবেন?
প্রশ্নটির সহজ জবাব হচ্ছে – ইহুদীরা বরাবরই বিশ্বাস করতো যে, তাদের সঙ্কটের সময়ে ঈশ্বর তাদের জন্য একজন নবী (মেসিয়া?) প্রেরণ করবেন তাদেরকে সঙ্কটমুক্ত করতে। মুসা নবী ইহুদী জাতির জন্য নবীর আগমণের ভবিষ্যতবাণী করতঃ বলেছেন: “ঈশ্বর তোমাদের জন্য তোমাদের ভ্রাতৃকূলের মধ্য থেকেই আমার মত একজন করে নবী খাড়া করবেন” (ডিঃ ১৮:১৫)। যীশুর শিষ্য এ্যাপোসল পিটার নিউ টেস্টামেন্টে সেই আয়াতটি উদ্ধৃত করেন যীশুর মেসিয়া হওয়ার দাবীকে বৈধতা দিতে (এ্যাক্টঃ ৩:২২)।
কিন্তু ইহুদীদের জন্য যুগে যুগে নবী এসেছে। তবে ব্যবিলোনীয় রাজা নেবুকাদনেযার কর্তৃক তাদের ‘প্রতিশ্রুত বাসভূমি’ ফিলিস্তিন থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর থেকে ইহুদীদের ভাবনায় মেসিয়ার বৈশিষ্টে ও মিশনে বেশ কিছুটা ভিন্নতা যোগ হয়। এসময় থেকে এক ‘পরিত্রাণদাতা’ মেসিয়ার আগমণের ভাবনাটি ঘনীভূত হতে থাকে প্রধানত বিদেশ-বিভূইয়ে নির্বাসিত ইহুদীদের মাঝে। পবিত্র পিতৃভূমিতে ফেরার প্রত্যাশায় মশগুল নির্বাসিত ইহুদীরা স্বপ্ন দেখতে থাকে যে, এক পরিত্রাণদাতা মেসিয়া এসে তাদেরকে পবিত্র বাসভূমি ফিলিস্তিনে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, যেখানে তারা নিজ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে বসবাস করতে পারবে। পরবর্তীতে ব্যবিলোনীয়দেরকে হটিয়ে পারস্য শাসক সিরাস দ্যা গ্রে’ট ফিলিস্তিন দখলের পর নির্বাসিত ইহুদীদেরকে পিতৃভূমিতে ফেরার অনুমতি দিলে তারা এতই ধন্য বোধ করে যে, সম্রাট সিরাসকে তৌরাতে ‘ঈশ্বরের anointed one’ তথা ‘মেসিয়া’ হিসেবে অভিষিক্ত করা হয় (ইসাঃ ৪৫:১)। কিন্তু নানান দুর্ভাগ্যজনক কারণে পরবর্তী গ্রিক ও রোমান দখলদারদের হাতে ইহুদীরা নির্যাতিত হতেই থাকে। সেই সাথে ইহুদী মানসে ঘনীভূত হতে থাকে মেসিয়ার আগমণের স্বপ্নও। স্পেনের মুসলিম শাসকের অমানুষিক অত্যাচারে বিমর্ষ দ্বাদশ শতকের সুখ্যাত ইহুদী দার্শনিক ও শাস্ত্রবিধ মাইমোনিদিস ইহুদীদের প্রত্যাশিত মেসিয়ার ব্যাপারে লিখেছেনঃ ‘আমি পূর্ণ আস্থাসহ মেসিয়ার আগমণে বিশ্বাসী। যদিও তিনি বিলম্ব করে চলছেন, তথাপি আমি প্রতিনিয়ত তার আগমণের প্রত্যাশায় থাকি।

ইহুদী ধর্মগ্রন্থে মেসিয়ার আগমণের কথা বলা থাকলেও এবং ইহুদী জনগোষ্ঠীর মাঝে মেসিয়ার আগমণের প্রত্যাশা জোরদার থাকলেও, ঠিক এই সময়ে তাদের জন্য যীশুর মত একজন মেসিয়া কেন আসবে, তার কিছুটা সঙ্গত কারণ থাকা আবশ্যক। মেসিয়ার আগমণের মূল উদ্দেশ্য হবে ঈশ্বরের চয়নকৃত ইহুদী জাতিকে সঠিক পথে চালিতকরণ, যখন তারা ঐশ্বরিক আইন থেকে বিচ্যুত হবে। তৌরাত মতে, ঐশ্বরিক আইন, যা ইহুদীরা মুসার মাধ্যমে পেয়েছিল, তা শ্বাশ্বত, চিরন্তন। তৌরাত কোনই ইঙ্গিত দেয় না যে, সে আইন কখনো পরিবর্তিত বা বাতিল হতে পারে। অথচ যীশু তা পরিবর্তিত, এমনকি বাতিল, করার চেষ্টা করেছেন। তবে যীশুর প্রাথমিক বক্তব্যগুলো ইহুদী ধর্মগ্রন্থে উল্লেখিত মেসিয়ার মিশনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইহুদীরা বিপথে গিয়েছে তথা ইহুদী আইন থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তাই তাদেরকে রক্ষা করতে হবে, অর্থাৎ সঠিক পথে আনতে হবে। একবার তার ১২জন শিষ্যকে ধর্ম প্রচারের কর্তৃত্বদানকালে যীশু বলেন, ‘পৌত্তলিকদের মাঝে যাবে না, না ঢুকবে সামারিতানদের শহরে। বরং যাবে হারিয়ে যাওয়া ইহুদী ভেড়ার পালের মাঝে’ (ম্যাথিউ ১০:৫-৬)। অর্থাৎ ইহুদী জনগোষ্ঠী হারিয়ে গেছে, মানে ঈশ্বরের আইন থেকে দূরে সরে গেছে। এবং তার মিশনের উদ্দেশ্য শুধুই পথভ্রষ্ট ইহুদীদেরকে রক্ষা করা, পৌত্তলিকদেরকে নয়।
অথচ যীশু বেশকিছু বিধান প্রনয়ণের চেষ্টা করেন, যা তৌরাত বিরোধী। ইহুদী মেসিয়ার অন্যান্য প্রধান কর্মপ্রচেষ্টা হবে, নির্বাসিত ইহুদীদেরকে তাদের পবিত্র ভূমি ফিলিস্তিনে ফিরিয়ে আনা (ইসাঃ ১১:১২) এবং ফিলিস্তিনের ধ্বংসকৃত শহরগুলোর পুনঃনির্মাণ (এজিঃ ১৬:৫৫), ইত্যাদি। অথচ যীশু এ কর্মগুলো সাধনের প্রতি কোন আগ্রহই দেখান নি।

মোট কথায়, যীশুর কর্মকাণ্ডকে ইহুদী ধর্মশাস্ত্রে উল্লেখিত মেসিয়া মিশন বলা যেত যদি তা কেবল বিপথগামী ইহুদীদেরকে মুসা নবী প্রণীত তৌরাতের মূল হুকুম প্রতিষ্ঠার জন্যে চালিত হতো। এ বিচারে মার্টিন লুথারের কর্মকাণ্ডকে খৃষ্টীয় মেসিয়া মিশন বিবেচিত হয়, কেননা খৃষ্ট বাইবেলে নির্দেশিত পথ থেকে বিচ্যুত রোমান ক্যাথলিকদেরকে বাইবেলীয় হুকুমের পথে ফিরিয়ে আনাই ছিল লুথারের সংস্কার কর্মের মূল উদ্দেশ্য। কাজেই যৌক্তিক বিচারে যীশুর কর্মকাণ্ডকে ইহুদী মেসিয়া মিশন হিসেবে গণ্য করা কঠিন। এ প্রেক্ষাপটে, যীশুর সমসাময়িককালে ফিলিস্তিনে ইহুদীদের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি বা সঙ্কট আমাদেরকে ধারণা দিতে পারে যে, কেন যীশু এই সময়ে ‘মেসিয়া’ দাবী তোলে ইহুদীবাদের এমন অপ্রত্যাশিত একটা সংস্কারমূলক প্রচেষ্টা হাতে নিয়েছিলেন।

গোড়া ও হেলিনিস্ট ইহুদীদের মাঝে টানাপোড়েন
যুগযুগ ধরে ইহুদীদের ধর্মীয় ও সামাজিক বিধান ছিল খুবই অনমনীয়, বিচ্যুতির প্রতি খুবই অসহনশীল, এবং তাদের প্রতিশ্রুত বাসভূম ফিলিস্তিনে অন্য ধর্মের চর্চার প্রতি অত্যন্ত ঘৃণাত্মক ও সহিংস। তৌরাতের বেশকিছু বিধানও অত্যন্ত সহিংস, নির্মম ও বর্বরতামূলক। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে সেকালীন জগতের প্রধান ধর্ম পৌত্তলিকতা চর্চার প্রতি ইহুদীরা ছিল রক্তক্ষয়ীভাবে সহিংস। তা সত্ত্বেও ইহুদী সমাজ ও জনগোষ্ঠী কখনোই পুরোপুরি একরোখা ও গোড়া ছিল না। রাজনৈতিক বাঞ্ছনীয়তা কিংবা শুধুই সহনশীলতা ও প্রগতিশীলতার খাতিরে সমাজের উচ্চতর অংশ, বিশেষত রাজকীয় কর্তৃপক্ষ, বরাবরই সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ছাড় দিতে প্রস্তুত থেকেছে। জুদিয়ার ইহুদী রাজা মানাসেহ (খৃঃপূঃ ৭০৯-৬৪২) পিতার অসহনশীল ধর্মীয় শুদ্ধি প্রক্রিয়া ছুড়ে ফেলে জেরুজালেম গীর্জায় মূর্তি স্থাপন করেছিলেন, যা কিনা ইহুদী জাতির কাছে সর্বোচ্চ ঘৃণাত্মক ও অসহনীয়, এবং তিনি সেটা করেছিলেন দৃশ্যতঃ কোন রকম রাজনৈতিক বা অন্য সুবিধা হাসিলের উদ্দেশ্য ছাড়াই। অন্যদিকে এমন ধর্মীয় বিচ্যুতি বা অবমাননাকে বারবার ভীষণ নির্মমতার সাথে দমন করা হয়েছে – প্রত্যেকবারই একজন অত্যুতসাহী গোড়া বিদ্রোহী উঠে দাঁড়িয়েছে এবং সহিংস অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিচ্যুত ব্যক্তিবর্গকে সমূলে উৎখাত করেছে, অনেকক্ষেত্রে তাদের পরিবার ও সমর্থককেও ছাড় দেওয়া হয় নি।

আগ্রাসী নেবুকাদনেযার (খৃঃপূঃ ৬০৫-৫৬২) কর্তৃক ফিলিস্তিন থেকে ব্যাবিলোনে নির্বাসিত হওয়ার পর ইহুদীরা পরবর্তী পারস্য ও গ্রিক শাসনকালে সেখান থেকে ধীরে ধীরে পুরো সাম্রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে তারা বিচিত্র ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সম্মুখীন হয়। প্রতিশ্রুত বাসভূমি ফিলিস্তিনে তারা ভিন্ন ধর্মাচারের প্রতি সর্বদাই অসহনশীলতা দেখিয়েছে, অথচ নির্বাসনে তারা ধর্মীয় বৈচিত্র এবং নানান ধর্মের একে অন্যের প্রতি সহনশীলতা দেখতে থাকে; এমনকি সাম্রাজ্যোবাদী ব্যবিলোনীয় প্রভূরা তাদের নিজ ধর্ম চর্চার প্রতিও সহনশীল ছিল। পরবর্তীতে ব্যবিলোন পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনস্ত হওয়ার পর নির্বাসিত ইহুদীদের প্রতি নতুন শাসকদের সহনশীলতা আরও বেড়ে যায় – এতটাই বেড়ে যায় যে, সম্রাট সিরাস দ্যা গ্রেইট তাদেরকে ফিলিস্তিনে ফেরার অনুমতি দিলেও অনেকেই ফিরে না গিয়ে নির্বাসিত বাসভূমেই থেকে যায়। এরপর আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেইট-এর বিজয়ের মাধ্যমে তারা গ্রিক সাম্রাজ্যের অধীনে এলে তাদের প্রতি সহনশীলতা না বাড়লেও কমে নি পারস্য শাসনামলের তুলনায়।

ইহুদী সমাজে বরাবরই একটা সামাজিক বিভাজন বর্তমান থেকেছে – যার এক অংশে থেকেছে নমনীয়, সহনশীল ও সমন্বয়মুখী উচ্চস্তর ও রাজপরিবার; অন্যদিকে থেকেছে গোড়া ধার্মিক ও অসহনশীল শ্রেণী। ফিলিস্তিন সাম্রাজ্যবাদী পারস্য ও গ্রিক শাসনে আসার পর শাসকগোষ্ঠীর বিভিন্ন ধর্মের প্রতি সার্বজনীন সহনশীলতার অভিজ্ঞতা ইহুদী সমাজের এ বিভাজনকে আরও প্রসারিত ও প্রকট করেছিল। ফলে আমরা দেখি যে, সিলিউসিদ (গ্রিক, খৃঃপূঃ ৩১২-৬৩) দখলে আসার পর ফিলিস্তিনের ইহুদী জনগোষ্ঠী দু’টি সুস্পষ্ট ভিন্ন শিবিরে বিভাজিত হয়ে পড়েঃ (১) সাজুসী শ্রেণী, যারা ছিল নমনীয়, সহনশীল ও হেলিনিস্ট; (২) ফারিসী শ্রেণী, যারা ছিল গোড়া ও অসহনশীল এবং সাধারণ জনতার মাঝে অধিক সমর্থনপুষ্ট। অনুমান করা যায় যে, ফিলিস্তিনি ইহুদী সমাজে নমনীয়তা ও সহনশীলতা তখন চাঙ্গা হয়ে উঠছিল, যার ফলে আমরা দেখি যে জেরুজালেম গীর্জার প্রধান পুরোহিত জেইসন (175—172 BC) ও মেনিলাউস (171-161 BC) সেলিউসিদ সম্রাট এ্যান্টিওকাস এপিফেনিস-এর জবরদস্তিমূলক হেলিনাইজেশন-এর প্রতি অবারিত সমর্থন, বলা যেতে উৎসাহ, প্রদান করেন। হেলিনাইজেশন-এর বিরুদ্ধে গোড়া ইহুদীবাদী হাসমোনিয়ান বিদ্রোহ শুরু হলে মেনিলাউস ইহুদীবাদের অবলুপ্তি ঘোষণা করতেও দ্বিধা করেন নি।

সম্রাট এ্যান্টিওকাস ফিলিস্তিনে আগ্রাসী প্রক্রিয়ায় হেলিনাইজেশন শুরু করলে আমরা সেখানকার ইহুদী সমাজের বিভাজিত রূপ বেরিয়ে আসতে দেখি – সাজুসীরা হেলিনাইজেশকে সমর্থন করে, ফারিসীরা করে বিরুদ্ধাচারণ। আরও লক্ষ্যণীয় যে, যে হাসমোনিয়ান গোষ্ঠী সম্রাট এ্যান্টিওকাস-এর হেলিনাইজের বিরুদ্ধে সহিংস বিদ্রোহ শুরু করে ক্ষমতা আসে, তারাই পরবর্তীতে নিজ রাজত্বকালে (~140-116 BC) ক্রমান্বয়ে হেলিনিজমের প্রতি ঝুকে পড়ে, শুরুতে যে হেলিনিজমকে সমূলে উৎপাটন করতে তারা বদ্ধপরিকর ছিল।
বোঝা যায় যে হেলিনিজম – যা ছিল প্রধানত গ্রিক সংস্কৃতি ও সভ্যতা – তার প্রতি ফিলিস্তিনের জনগণের মাঝে বিশেষ আকর্ষণ ছিল। এমনকি ভিন্ন আচার-সংস্কৃতির প্রতি অত্যন্ত অসহনশীল ও বিরুদ্ধাচারী ইহুদীরাও ক্রমান্বয়ে হেলিনিক ভাবধারায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আলেকজান্ডার কর্তৃক এশিয়ায় বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর হেলিনিক ভাবধারা যেভাবে সারা সাম্রাজ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি মিশরীয় ও পারস্যীয়দের মত উন্নত জাতির মাঝেও – তা থেকে সহজেই হেলিনিজমের আকর্ষণীয়তা অনুমাণ করা যায়। এমনকি প্রাচীন মানব সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া শীঘ্রই হয়ে উঠে হেলিনিক সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র। প্রাচ্যে আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্যবাদী বিজয়াভিযানের পূর্বে গ্রিক সভ্যতার আবির্ভাব ও বিবর্তন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হেলিনিজমের প্রতি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর এরূপ আকর্ষণের কারণ অনুধাবনে সহায়ক হবে। গ্রিক সভ্যতার ভাবধারা ও চিন্তাচেতনা ফিলিস্তিনি ইহুদী সমাজে কেবল এক অমোচনীয় প্রভাবই ফেলে নি, সম্ভবত ইহুদীবাদের প্রথম শতাব্দের প্রশাখা খৃষ্টবাদের সূচণাকেও অনুপ্রাণিত করেছিল, যা শুধু ইহুদীবাদেরই নয়, পুরো মানব সভ্যতারই গতিধারাকে চিরতরে ঘুরিয়ে দিয়েছে।

গ্রিক সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক ভাবধারা ও তাতে সক্রেটিসের ব্যাপক প্রভাব
প্রাচ্যে আলেকজান্ডারের বিশাল বিজয়াভিযানের ফলে গ্রিক সংস্কৃতি ও সভ্যতা বিশ্বের রূপকে বিশেষভাবে বদলে দেয়। এতে করে গ্রিক সংস্কৃতি, জ্ঞান ও ভাবধারা শুধু বিজিত অঞ্চলেই বিস্তৃত হয় নি, প্রাচ্যীয় (আরব, ভারতীয়, মিশরীয় এবং পারস্যীয় ইত্যাদি) সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও ধর্মীয় ভাবনাও পুরো সাম্রাজ্যে বিস্তৃত হওয়ার পথ সুগম করে, যার ফলে একটি সঙ্কর ভাবধারার উদ্ভব ঘটে, যাকে বলা হয় হেলিনিজম। এটা সর্বজনবিদিত যে, খৃষ্টপূর্ব প্রথম শহস্রাব্দে গ্রিক সমাজে নৈতিক, দার্শনিক, সাহিত্যিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তাচেতনায় এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটে। বিশেষত সক্রেটিসের (মৃঃ 399 BC) দার্শনিক ও নৈতিক ভাবনা গ্রিক সমাজে এক বলিষ্ঠ প্রভাব ফেলে। সক্রেটিসের চিন্তাচেতনা ও শিক্ষা পরবর্তীতে প্লেটো, এ্যারিস্টোটল ও ইউক্লিদের মত মহান দার্শনিক ও চিন্তাবিদের আবির্ভাব-ই ঘটায় নি, তাঁর বেশকিছু সহচর সক্রেটিসের শিক্ষার অনুকরণ করতঃ বেশ কয়েকটি কখনো কখনো বিরুদ্ধাচারী, এমনকি উদ্ভট দার্শনিক ভাবধারা ও সামাজিক আন্দোলনের উদ্ভব ঘটায়।[1]

(১) প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ — সক্রেটিসের না স্বয়ং প্লেটোর? সক্রেটিস নিজে কোন লেখা রেখে যান নি। ফলে তাঁর সবচেয়ে স্বনামধন্য শিষ্য প্লেটোর লেখা থেকে আমরা সক্রেটিসের চিন্তাচেতনা ও ভাবধারা সম্পর্কে জানতে পারি। সক্রেটিস অনেকাংশে অরাজনৈতিক ছিলেন। তবে প্লেটো আমাদেরকে জানান যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা সক্রেটিসের অপছন্দ ছিল, সক্রেটিসের সে অপছন্দের ভিত্তিতেই প্লেটা তার ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থে এক স্বৈরাচারী ও অসমানাধীকারী রাজনৈতিক ভাবনার রূপরেখা চিত্রিত করেন। তবে বাস্তবে গণতন্ত্রের প্রতি সক্রেটিসের ছিল সুদৃঢ় সমর্থন এবং প্লেটোর ‘রিপাবলিক’ ছিল গণতন্ত্রের প্রতি তার নিজস্ব অনাস্থার ফসল মাত্র কিংবা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে তার প্রিয় গুরু সক্রেটিসের মৃত্যুতে তার আক্রোশের ফসল হিসেবে।

(২) এ্যারিস্টিপাস – সুখের খোজে আত্মনিয়ন্ত্রণ না আত্মনিবেদন? বর্তমান লিবিয়ার সাইরীনি শহরের এ্যারিস্টিপাস ছিলেন সক্রেটিসের আরেক নামকরা শিষ্য। সক্রেটিসের মৃত্যুর পর এ্যারিস্টিপাস সাইরীনিতে কথিত সক্রেটিসের শিক্ষার ভিত্তিতে এক জীবনাচরণ মূল দার্শনিক ভাবধারা প্রতিষ্ঠিত করে, যাকে বলা হয় সাইরীনিয়াক। সক্রেটিস মনে করতেন যে সুখের খোজে মানুষের যৌক্তিক আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সদাচার ও ন্যায়পরায়ণতা চর্চা প্রয়োজন। এ্যারিস্টিপাস সক্রেটিসের আত্মনিয়মানুবর্তিতাকে শুধুই সুখের তরে উৎসর্গ করেন। সক্রেটিস মনে করতেন, সুখী হওয়ার জন্য সততা ও সৎপন্থা চর্চা আবশ্যক। এ্যারিস্টিপাস এর ব্যাখ্যায় ভাবতেন, যতক্ষণ সে সুখী ততক্ষণ সে সৎপন্থা চর্চা করছে। এভাবে এ্যারিস্টিপাস সক্রেটিসের ভাবনাকে এক অবারিত ও বিশ্রী উপভোগ-ভিত্তিক আনন্দবাদী আন্দোলনে রূপান্তরিত করে। সক্রেটিসের প্রত্যাশিত সৎপন্থা ও ন্যায়পরায়নতা চর্চার তাতে কোন গুরুত্ব ছিল না। তারা বিশ্বাস করতো – জীবনে আনন্দ-ফূর্তি হচ্ছে একমাত্র ভাল জিনিস এবং ব্যাথা-বেদনা শুধুই মন্দের প্রতীক। যদিও সাইরীনিয়াক ভাবধারা এক শতাব্দের মধ্যেই উঠে যায়, পরবর্তীতে তা এপিকিউরিয়ান নামক আরেকটি অধিক নান্দনিক ভাবধারা ও সামাজিক আন্দোলনের মাঝে পুনর্জীবন লাভ করে।

(৩) এ্যান্টিসথিনেস – সুখের তরে সন্যাস চর্চাঃ আরেক শিষ্য এ্যান্টিস্থিনেস সক্রেটিসের সুখের খোজে আত্মনিয়ন্ত্রণ চর্চার উপদেশের ভিত্তিতে আরেক সামাজিক আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন, যাদেরকে বলা হত ‘সিনিক্স’ এবং তার মূল কথা ছিল এ্যারিস্টিপাসের সাইরিনিয়াক তত্ত্বের ঠিক বিপরীত। সুখ অর্জনের মনের দৃঢ়তা ও সহজ-সরল জীবন চলা – সক্রেটিসের এ দু’টো উপদেশের উপর জোর দেন এ্যান্টিসথিনেস। সক্রেটিস আকাঙ্ক্ষা পূর্তি চেয়ে আকাঙ্ক্ষা বর্জনের উপর জোর দিতেন এবং ব্যক্তি জীবনে তিনি অর্থ-সম্পদ ও আরাম-বিলাসিতা বর্জন চলতেন। সে ভিত্তিতে এ্যান্টিসথিনেস একটা দারিদ্র্য আলিঙ্গনকারী সন্যাসী আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। সক্রেটিস ভাল মানুষ হওয়া ও ভাল কাজ করার উপর জোর দিতেন এবং বলতেন – যে ভাল কাজ করে কেউ তার ক্ষতি করতে পারে না। সে ভিত্তিতে সিনিকরা অপকার ও ক্ষতি থেকে নিজেদেরকে আড়াল করার জন্য শুধুই ভাল হওয়া, ভালোত্ব অর্জন করার উপর জোর দিতেন। এ বাইরে তাদের আর কিছুরই প্রয়োজন ছিল না। এভাবে সক্রেটিসের সৎ ও পূণ্যবান জীবন লাভ বিষয়ক শিক্ষাকে সিনিকরা এক চরম অস্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে যায়, যেখানে স্বাভাবিক জীবনের যাবতীয় পার্থিব বিষয় ও কর্মকাণ্ড একেবারেই বিবর্জিত। ভাল হোক কিংবা মন্দ – তারা এসবকে বোকামি, অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাকৃতিক মনে করতো। প্রাকৃতিক ও সহজ-সরল জীবন চলাই ছিল তাদের জাগতিক দর্শনের মূল মন্ত্র।

সিনিক আন্দোলনের এক অনুসারী ছিল কৃষ্ণ সাগর অঞ্চলের সিনোপির অধিবাসী ডিওজিনিস (~৪০০-৩২৫ খৃঃপূঃ)। ডিওজিনিস ছিলেন এক চরমপন্থী প্রকৃতিবাদী, যিনি সিনিক আন্দোলনকে আরও চরম সন্যাসী ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় উন্নীত করেন। তিনি মনে করতেন যে এ্যান্টিসথিনেস তার নিজ শিক্ষা অনুসরণ করতে ব্যর্থ ছিলেন। সে ভাবনা থেকে তিনি সিনিক সন্যাসবাদকে এক চরম ‘পাগলামী ও অস্বাভাবিক জীবনাচার’ প্রক্রিয়ায় উন্নীত করেন। কিংবদন্তি আছে যে, ডিওজিনিস এক মাটির ভাড়ে বাস করতেন এবং সিনিকদের মাঝে প্রকাশ্যে হস্তমৈথুন চর্চা চালু করেন। সত্যি কি মিথ্যা, তাকে লোকে ‘কিয়ন’ (কুকুর) বলে ডাকত, কেননা তিনি ‘জটিলতাহীন, প্রবৃত্তি-ভিত্তিক ও লজ্জাহীন প্রাণীর মত জীবন চলায় নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন, কেননা প্রাণীকূলকে তিনি প্রাকৃতিক গুণাবলীর সত্যিকার প্রতিনিধি বা উপস্থাপক বিবেচনা করতেন।[2]

সত্যিকার প্রাকৃতিক জীবন চলতে গিয়ে তিনি সবরকম ধন-সম্পদ, আরাম-আয়েস ও আনুষ্ঠানিক পারিবারিক জীবন বর্জন করেন, এমনকি নাগরিক জীবনের সকল বাধা-নিষেধ – যেমন অজাচার কিংবা মানব মাংস খাওয়ার নিষিদ্ধতা, বিবাহ প্রথা, সামাজিক শ্রেণী বিভাজন এবং গতানুগতিক ধর্ম। আদর্শ সমাজ হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও বিচার-বিবেচনা সম্পন্ন এক ঢিলেঢালা ত্যাগী সম্প্রদায় – যারা যে কোন সামাজিক সম্পর্কেই যুক্ত হতে পারবে সকল পক্ষের অনুমোদনের ভিত্তিতে এবং সেখানে থাকবে না কোন গতানুগতিক বাধা-নিষেধ। [3]

প্লেটো ডিওজিনিসকে ‘এক পাগল বনে যাওয়া সক্রেটিস’ বলেছিলেন সঙ্গত কারণেই। তথাপি মনে হচ্ছে, তার অস্বাভাবিক কার্যকলাপ তাকে যথেষ্ট জনপ্রিয় করে তুলেছিল – কেননা যখন তার মাটির ভাড়টি ভেঙ্গে যায় তখন এ্যাথেন্সবাসী একসাথে হয়ে তাকে আরেকটা কিনে দিয়েছিল। ডিওজিনিসের আন্দোলনটি অনেক শতাব্দী টিকে ছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় খৃষ্টীয় শতাব্দে সমাজের যাবতীয় ভবঘুরে হিপ্পি, উন্মুক্ত ভালবাসা পন্থী ও তল্পিতল্পা সহ ঘুর্ণমান ভিখারীরা আন্দোলনটিতে আকর্ষিত হয়। ডিওজিনিসের খ্যাতনামা ছাত্র ও দার্শনিক থিবসের ক্রেইটস (~365–285 BC) নিজের সব ধনসম্পত্তি বিলিয়ে দিয়ে সিনিক সম্প্রদায়ে যোগদান করেন। হিপার্কিয়া নামের ধনী পরিবারের এক মেয়ে ক্রেইটসের সাথে পরিচয়ের পর তার প্রেমে পড়ে যায় এবং তার সাথে যোগ দেওয়ার জন্য আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে বাবা-মার অনুমতি আদায় করে। দম্পত্তিটি এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াতো, এ্যাথেন্সের রাস্তায় দারিদ্রের জীবন যাপন করতো এবং ‘প্রকাশ্যে যৌনকর্মের পর নৈশভোজে যেত’।

(৪) ইউক্লিদের যুক্তির কারখানা – সক্রেটিসের আরেক নিবেদিতপ্রাণ শিষ্য মেগারার ইউক্লিদ (~435-365 BC) সক্রেটিসের শিক্ষায় নৈতিক শুদ্ধি ও যুক্তিবাদের প্রতি অনুরক্ত হন। তিনি যৌক্তিক তর্কাতর্কিতে, বিশেষত আপাতবিরোধী যুক্তিতর্কে, আসক্ত হয়ে পড়েন, এবং তার নিজ বাসভূম মেগারাতে এক পাঠচক্র প্রতিষ্ঠা করেন, যার সম্পর্কে তার এক প্রতিদ্বন্দ্বী বলেছিলেন, ‘ঝগড়াটে ইউক্লিদ মেগারাবাসীকে বাদানুবাদের প্রতি উন্মত্ত ভালবাসায় উদ্বুদ্ধ করতেন’। ইউক্লিদের পাঠশালা ‘যুক্তি ও ভাষা বিষয়ক অনেকগুলো সর্বোচ্চ দীর্ঘস্থায়ী দ্বাঁদ্বার জন্ম দেয়’ এবং মেগারাকে এক হাস্যকরভাবে অতিরঞ্জিত ‘যুক্তিতর্কের কারখানায়’ রূপান্তরিত করে।

যীশুর শিক্ষায় হেলিনীয় প্রভাব
সক্রেটিসের ধ্যানধারনা ও চিন্তাচেতনা, যার কিছু কিছু কিছুটা পাগলাটে হলেও নিঃসন্দেহে এক বৈপ্লবিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও দার্শনিক স্বর্ণখনি রেখে যায়, যা অনুসরণ করতে গিয়ে তার শিষ্যরা এতটা হাস্যকর রকম চরমে নিয়ে যেতে সমর্থ হয়। এ প্রেক্ষাপটে যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রূপে প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে, তা হচ্ছেঃ গতানুগতিক চালচলন, প্রজ্ঞা ও ঐতিহাসিক অর্জন বিরোধী যাবতীয় সব উদ্ভট সামাজিক আন্দোলনের প্রতিও পৌত্তলিক গ্রিক সমাজের অবিশ্বাস্য রকমের সহনশীলতা। প্রাচ্যে হেলিনিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিস্তার ইহুদীদেরকে সে সহনশীলতার মুখোমুখী করে। সক্রেটিসের কিছু কিছু উর্বর ভাবনা ফিলিস্তিনের ইহুদীদ সমাজের অংশবিশেষকে এতটাই প্রভাবিত করে যে, তাদের কেউ কেউ — যেমন প্রধান পুরোহিত জেইসন ও মেনিলাউস এবং তাদের সমর্থকরা হেলিনিজমের সংস্পর্শে তাদের সমাজ থেকে কট্টর ও অসহনশীল ইহুদী ভাবধারা উঠিয়ে দিতেও প্রস্তুত ছিল। আর অন্যদিকে যীশু সংস্কারের নামে ইহুদী ধর্মের অনেক মৌলিক শিক্ষা উঠিয়ে দিয়ে সক্রেটিস উদ্ভূত নৈতিক ভাবনা প্রচলনের জন্য এক নৈতিক ও সামাজিক আন্দোলন শুরু করেন, যা নিম্নে আলোচনা করা হবে।

যীশুর সুবর্ণ নীতি না সক্রেটিসের? জীবন চলা সম্পর্কে সক্রেটিসের মূল সুর ছিল ভাল ও পুণ্যবান জীবন যাপন করা। যে ভাল তার কেউ ক্ষতি করতে পারে না। ভাল হওয়ার জন্য, অন্যের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়ার জন্য, তোমাকেও অন্যের ক্ষতি বা অপকার করা থেকে বিরত থাকতে হবে – যা কিনা সুখ্যাত ‘সুবর্ণ নীতি’র (গোল্ডেন রুল) মূল ভিত্তি।

৩৯৯ খৃষ্টপূর্বাব্দে আলাদতে বিচারে এ্যাথেন্সের নবীনদেরকে কলুষিত করার দায়ে সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযোগটির বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘কাউকে কলুষিত করা মানে তার ক্ষতি করা… এবং কারও ক্ষতি করলে সে তোমার পালটা ক্ষতি করবে।’ অর্থাৎ সক্রেটিস কখনোই অন্যের ক্ষতি করে নিজের ক্ষতি ডেকে আনবে না।[4]

সক্রেটিসের এই নীতিই ৪ শতাধিক বছর পর যীশু প্রচারিত ‘সুবর্ণ নীতি’তে রূপ নিয়েছেঃ ‘সুতরাং সবকিছুতেই অন্যের প্রতি তোমরা শুধু এমন কাজই করবে, যা তোমরা চাও অন্যেরাও তোমাদের প্রতি করুক…’ (ম্যাথিউ ৭:১২)।

ডান গালে চড় মারলে বাম গালও এগিয়ে দাওঃ সক্রেটিস শুধু অন্যের ক্ষতি বা অপকার করা থেকেই বিরত থাকাতেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন নি, বরং আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছেন। যে সক্রেটিসের ক্ষতি করবে, তার ক্ষতি করারও বিরোধী ছিলেন তিনি; অপকর্মের জবাবে অপকর্মের বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি। অনেকটা সক্রেটিসের এই নৈতিক অবস্থানই ধ্বণিত হয়েছে যীশুর আরেক প্রসিদ্ধ বাণীতেঃ ‘কেউ তোমাকে ডান গালে আঘাত করলে, বাম গালটিকেও তার প্রতি এগিয়ে দাও’ (ম্যাথিউ ৫:৩৯)। আঘাতের বিপরীতে পালটা আঘাত থেকে বিরত থাকাই যীশুর এই বাণীটির মূল বক্তব্য। এবং যদিও খুব কম খৃষ্টানই আজ এ উপদেশ অনুসরণ করবে, ব্যক্তিগতভাবে সক্রেটিস এর প্রয়োগের পক্ষে দৃঢ় ছিলেন। কেননা এর মাঝে নিহিত ছিল সক্রেটিসের আধ্যাত্বিক ভাবনার সবচেয়ে বিষয় – আত্মার কল্যান।

শত্রুকেও ভালবাসঃ সক্রেটিস বলতেন, সব ধরনের অপকর্ম থেকে বিরত থাকো, কেননা আত্মা ‘খারাপ কর্ম দ্বারা আহত হয়, আর ভাল কর্ম দ্বারা লাভবান হয়’। তাঁর মতে, সবাইকে ভাল কাজ করতে হবে, তা যে পরিস্থিতিতেই হোক না কেন, কেননা সেটাই সঠিক পন্থা। অপকর্মে নিযুক্ত হওয়া, কিংবা অন্য কেউ খারাপ কাজ করে বলে নিজেও খারাপ কাজ করা, ইত্যাদির মাধ্যমে কেউ শুধু নিজেরই ক্ষতি করে, নিজ আত্মাকে আহত করে। ‘ভাল মানুষকে কোন কিছুই ক্ষতি করতে পারে না – না এ জীবনে, না পরকালে’, মনে করতেন সক্রেটিস।[5]

শত্রুর ক্ষতি করা গ্রিক সমাজে গ্রহণযোগ্য ছিল এবং সক্রেটিসের এ কঠোর নৈতিক অবস্থান গ্রিক সমাজের সে গতানুগতিক নৈতিক ভাবনাকে চ্যালেঞ্জ করে। সক্রেটিসের মতে, শত্রুর ক্ষতি করাও উচিত নয়; যদি কিছু করতেই চাও উপকার কর – যা কিনা যীশুর সুপ্রসিদ্ধ ‘শত্রুকেও ভালবাস’ (ম্যাথিউ ৫:৪৪) শিক্ষাটির মূল কথা।

সক্রেটিসের শিক্ষায় এসব নৈতিক ভাবনার অবতারণা এবং ৪ শতাধিক বছর পর কথিত যীশু কর্তৃক খৃষ্ট বাইবেলে সেগুলোর চমৎকার ভাষায় উপস্থাপন – এ দু’য়ের মাঝে একটা মৌলিক ব্যবধান রয়েছে। যীশুর ক্ষেত্রে এগুলোর একটা স্বর্গীয় উদ্দেশ্য ও অনুপ্রেরণা রয়েছে, যে ভক্তরা সেগুলো অনুসরণের মাধ্যমে বহুল লাভবান হবে, পর জীবনে ঈশ্বরের অশেষ কৃপা ও প্রতিদান উপভোগ করবে। কিন্তু সক্রেটিসের জন্য এমন প্রাচুর্যপূর্ণ দৈবধনের কোন প্রত্যাশা ছিল না, না ছিল কোন স্বর্গীয় শক্তির ইচ্ছে বা ইঙ্গিত। তার মতে, কেউ এসব নৈতিক গুণাবলী চর্চা করবে শুধু পার্থিব ও মানবীয় কারণে – শুধুই একটা ভাল, নৈতিক ও ন্যায়পরায়ন জীবন যাপনের উদ্দেশ্যে, পৃথিবীতে শুধুই একটা আদর্শ, সম্মানজন ও সুখী জীবন অতিবাহিত করার লক্ষ্যে, এবং তা কারও নিজেরই স্বার্থে, মানবিক ও নৈতিক হওয়ার উদ্দেশ্যে। তিনি মনে করতেন, ‘সৎ জীবনযাপন মানেই সম্মানজনক জীবনযাপন’ এবং ‘ন্যায়পরায়ন ব্যক্তি সুখী, অন্যায়কারীর জীবন শোচনীয়।’[6]

সিজারকে তার প্রাপ্য দাও, ঈশ্বরকে তার প্রাপ্যঃ যীশুর আরেকটি সুপ্রসিদ্ধ বাণী হচ্ছে, ‘সিজারকে দাও যা তার প্রাপ্য এবং ঈশ্বরকে দাও যা ঈশ্বরের প্রাপ্য’ (ম্যাথিউ ২২:২১), যা কিনা পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে রাষ্ট্রকে উপাসনালয় থেকে পৃথক করতে সাহায্য করেছে। এ বাণীর মূলমন্ত্রটিও সক্রেটিসের শিক্ষার মাঝে অন্তর্নিহিত। একদিকে সক্রেটিস অন্যায় সরকারী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পক্ষে ছিলেন যাতে রাষ্ট্র সেগুলোকে সংশোধন কোরে ভালতর সমাজব্যাবস্থা অর্জনের লক্ষ্যে, অন্যদিকে তিনি ভাবতেন নাগরিকদের উচিত রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অনুগত হওয়া, রাষ্ট্র-বিবেচিত শাস্তি মেনে নেওয়া ইত্যাদি। তাইতো মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত সক্রেটিসকে এক বন্ধু জেল থেকে পালানো ও এ্যাথেন্স ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ তিনি মনে করতেন ‘বৈধ সরকারের ও সঠিক আইনী প্রক্রিয়ার অনুগত হওয়া ছিল তাঁর নৈতিক দায়বদ্ধতা, এবং সক্রেটিস এ্যাথেন্সকে ভালবাসতেন এবং অন্যত্র জীবনকে উপভোগ করবেন না মনে করতেন’।[7] যীশুকে পাকড়াও করার পরও আমরা তার মাঝে অনুরূপ দৃষ্টিভঙ্গির চিহ্ন দেখি। তার গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে যীশু অনুসারীদেরকে সহিংসতা থেকে নিরুৎসাহিত করেন, এবং অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই রোমান কর্তৃপক্ষের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি মেনে নিয়ে এটাকে ‘স্বর্গীয় অভিপ্রায়’ হিসেবে উপস্থাপন করতঃ বলেন, ‘শাস্ত্রীয় বিধান অবশ্যই পূর্ণতা পাবে’ (মার্ক ১৪:৫১, ম্যাথিউ ২৬:৫৪)।

গস্পেলে যীশুর এসব বিশেষ শিক্ষাগুলো ছাড়াও তার আরেক প্রসিদ্ধ শিক্ষা, ব্যাভিচারীকে শাস্তি না দেওয়া, মুসার আইনে যার শাস্তি পাথর-ছুড়ে হত্যা, সেটাও তার ভাবনায় সেকালে ফিলিস্তিনে বিরাজমান সহনশীল হেলিনীয় সংস্কৃতির প্রভাবেরই ফসল মাত্র। যীশু গসপেলে ‘অমর আত্মার’ ধারনা উপস্থাপন করতঃ বলেন, ‘যারা দেহকে হত্যা করতে চায় তাদেরকে ভয় করো না, কেননা তারা আত্মাকে হত্যা করতে পারবে না’ (ম্যাথিউ ১০:২৮)। ইহুদী ধর্মশাস্ত্র তৌরাত বা ওল্ড টেস্টামেন্টে আত্মার ধারনা অনুপস্থিত। অথচ গ্রিক দার্শনিক ও আধ্যাত্বিক ভাবনায় আত্মার ধারনাটি যীশুর জন্মের বেশ কয়েক শতাব্দী আগেই সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। উল্লেখ্য সক্রেটিসের নৈতিক ও আধ্যাত্বিক ভাবনার মূলে ছিল ‘আত্মার কল্যান’ সাধন – যা ইতিমধ্যে আলোচণা করা হয়েছে।


[1]Gottlieb, Anthony (2001), in R. Monk and F. Raphael ed., The Great Philosophers: From Socrates to Turning, Phoenix, London, p. 37–44
[2]Gottlieb, p. 41
[3]Gottlieb, p. 41
[4]Gottlieb, p. 14
[5]Gottlieb, p. 33
[6]Gottlieb, p. 34
[7]Gottlieb, p. 45

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “খৃষ্টধর্মের উৎপত্তি ২: যীশুর নৈতিক শিক্ষায় সক্রেটিস ভাবনা?

  1. অনেক সুন্দর লেখা। পাঠে আনন্দ
    অনেক সুন্দর লেখা। পাঠে আনন্দ পেলাম

    ==============================================
    আমার ফেসবুকের মূল ID হ্যাক হয়েছিল ২ মাস আগে। নানা চেষ্টা তদবিরের পর গতকাল আকস্মিক তা ফিরে পেলাম। আমার এ মুল আইডিতে আমার ইস্টিশন বন্ধুদের Add করার ও আমার ইস্টিশনে আমার পোস্ট পড়ার অনুরোধ করছি। লিংক : https://web.facebook.com/JahangirHossainDDMoEduGoB

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

91 − = 90