সিরিয়াস ট্রিটিজ অন ফেমিনিজম-১ , আদিপর্ব

দীর্ঘ ক্লান্তিকর কোন এক বিমানযাত্রায় সাথে নিয়েছিলাম রাহুল সাংকৃত্যায়ন এর ভোলগা থেকে গঙ্গা বইটি । পূর্ব এশিয়ার কোন এক বিমানবন্দরে লেওভারের একঘেয়ে সময়ে পড়তে শুরু করি । কিছুদূর পড়ার পর আর আগাইতে পারলাম না । গল্প শুরু কোন একটা মাতৃতান্ত্রিক গোত্রের শিকার কাহিনী দিয়ে । মাতৃতান্ত্রিক গোত্র জিনিসটা এমন উদ্ভট কিছু না । উদ্ভট ছিলো সেই গোত্রে চলমান অজাচার বর্ণনার কাহিনী । রাহুল এমনভাবে সেই গোত্রের জীবনাচরণ ও মেইটিং সিস্টেম এর বর্ণনা দিচ্ছেন যে কিছুদূর পড়ার পর ভিতর থেকে বৈজ্ঞানিক মন বলে উঠলো , ইহা একটি ধোঁয়া উঠা গোবরস্তুপ ছাড়া আর কিছুই নহে হে ।

মাতৃতান্ত্রিক সে গোত্রের সমস্ত খবরদারি আসে কেন্দ্রীয় মাতার কাছ থেকে । সেই মাতা তার নিজের গর্ভজাত সন্তানদের মধ্যে থেকে সবচে সাহসী আর সবচে টগবগে তরুণটিকে বেছে নেন তার নিজের জন্য । গোত্রের মধ্যে অন্যদেরও সঙ্গী, সঙ্গীনি ঠিক হয় কেন্দ্রীয় মাতার ইশারাতেই । সেইসব সঙ্গী সঙীনিরা বায়োলজিক্যালি বাপ-কন্যা, অথবা ভাই-বোন অথবা মা-পুত্র এসব সম্পর্কের ।

বৈজ্ঞানিক সত্য হচ্ছে অজাচার সব ধরণের মানব সমাজেই, যতদূর পর্যন্ত আমাদের হাতে তথ্য আছে , নিষিদ্ধ বিষয় ছিলো । অজাচারের বিরুদ্ধে আমাদের স্বয়ংক্রিয় বিকর্ষণ, রিভালসন কাজ করে । কারণ অজাচার একদিকে আমাদের জিন পুলকে ভয়াবহ রকমে বৈচিত্রহীন করে দেয়, যার ফলে নতুন নতুন জীবাণুর বিরুদ্ধে অনন্তকাল থেকে চলে আসে ইঁদুর-বিড়াল দৌড়ে আমাদের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা দূর্বল হয়ে যায় । অন্যদিকে আবার অজাচারের কারণে কিছু কিছু ক্ষতিকর জিন, যেগুলো এককভাবে কোন ক্ষতি করতে পারেনা কিন্তু বাপ এবং মা দুইপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া ক্রোমোসোমের মধ্যে যদি জোড়া হয়ে যায় তাহলে তার ক্ষতিকর প্রভাব ফলাতে পারে সেগুলোকে সুযোগ করে দেয় ।

অজাচার প্রতিরোধে বিভিন্ন প্রাণীর নানান রকম ব্যাবস্থা আছে । প্রাইমেটদের মধ্যে সাধারণত দুইভাবে অজাচার প্রতিরোধ হয় । দীর্ঘ শৈশব এবং গোত্রত্যাগ ব্যাবস্থা । দীর্ঘ শৈশবের কারণে মাতা-পুত্রের মধ্যে একধরণের ডোমিনেন্স ও সাবমিশন সম্পর্কের তৈরী হয়, যার কারণে পুত্রের পক্ষে মায়ের দিকে যৌন এপ্রোচ করা সম্ভব হয় না । অনেক প্রাইমেট গোত্রেই দেখা যায় যৌন প্রজননক্ষম বয়সে পৌঁছানোর পর বয়ঃস্বন্ধিকালীন পুরুষ কিশোরকে গোত্র থেকে বের করে দেয়া হয় যাতে সে অন্য নতুন গোত্র খুঁজে নিতে পারেও নিজ গোত্রের রক্তসম্পর্কের কাছাকাছি মেয়েদের সাথে যৌনসম্পর্ক না করতে পারে । অন্যদিক দীর্ঘ শৈশব একসাথে কাটানো ভাইবোনের মধ্যে কয়েকটা এখনো পুরোপুরি অপরিষ্কার মেকানিজমের মাধ্যমে যৌন আকর্ষণ দমে গিয়ে উদারতামূলক আকর্ষণ তৈরী হয় । কিছু কিছু প্রাইমেট গোত্রে প্রজনন বয়সের তরুণী অন্য গোত্রে চলে গিয়ে পিতা-কণ্যার অজাচার প্রতিরোধ হয় । তিনটা কম্বিনেশনের মধ্যে সবচে দুর্বল এই প্রকারের অজাচার প্রতিরোধ ব্যাবস্থা । যার ফলাফল সভ্য দুনিয়ার প্রাইমেট মানুষের মধ্যেও যে ক্ষুদ্র পরিমাণে অজাচার চালু আচ্ছে তার মধ্যে সবচে বেশি হচ্ছে পিতা-কণ্যার অজাচার ।

অজাচারের সমস্যা, প্রতিরোধ ব্যাবস্থায় বিভিন্ন প্রাণীর নেয়া ব্যাবস্থা এইসব নিয়ে আরো বিস্তারিত পাওয়া যাবে Joseph Shepher ও Arthur P Wolf এদের লেখাজোকা ফলো করলে । এখানকার আলোচনায় সেটা গুরুত্বপূর্ণ না । গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাহুল সাংকৃত্যায়ন যে সময়ে লায়েক হয়েছেন সে সময়কালে মানুষের ইতিহাস, মানুষের জীববিজ্ঞান নিয়ে যেসব চুলচামড়া তত্ত বেশ দাপটের সাথে দাবড়ে বেড়াচ্ছিলো সমাজ বিজ্ঞান ও দর্শণের আকাশ-বাতাস সেগুলো ।

যেই সময়ের কোন প্রমাণযোগ্য ইতিহাস নাই, সেই সময় অর্থাৎ মানুষের আদি ইতিহাস হইলো গরীবের বউয়ের মত । সকলের ভাবী । যে যার মত করে সে সময় মানুষ এমন ছিলো, তেমন ছিলো এসব ধরে নিয়ে নিজেদের ভারী ভারী তত্ত প্রসব করতে পারে, কিভাবে মানুষ এমন হলো তা নিয়ে । আমূল নারীবাদীরা , যারা সমাজ রাস্ট্র ও আইনের চোখে নারীপুরুষের সমান অধিকার নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না বরং চেয়েছিলেন মানুষের গোটা সমাজ ও সংস্কৃতিব্যাবস্থার আমূল পরিবর্তন- পুরুষকেন্দ্রীকতা থেকে নারীকেন্দ্রীয়কতায়- তারা মার্ক্সের ভাবী মানুষের আদি ইতিহাসকে গ্রহণ করলেন । তারা বললেন, কৃষি ও ব্যাক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভবের আগে মানুষের সমাজ ছিলো মাতৃতান্ত্রিক । কোন তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে তারা এই স্বিদ্ধান্তে আসলেন সেটা নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে তারা নারাজ । আদি ইতিহাস তাদেরও ভাবী লাগেন । তার সাথে ঠাট্টা মশকরা তারাও করতে পারেন । তাদের ন্যারেটিভ দাঁড়ালো এমন যে কৃষির উদ্ভবের আগে, মানুষের বোহেমিয়ান জীবন থেকে উর্বরা ক্ষেতের পাশে গ্রাম গড়ে স্থায়ী জীবনে গেঁড়ে যাবার আগে মানুষের সমাজ ছিলো মাতৃতান্ত্রিক । রাহুল সাংকৃত্যায়ন যেভাবে বর্ণনা করেছেন সেরকমের মাতৃতান্ত্রিক । সমস্ত ক্ষমতা ও বিলাস মাতার হাতে । সেসময় যুগের হাওয়া ছিলো রোমান্টিসিজম । শিল্প বিপ্লবের ফসলে তৈরী হওয়া ইটকাঠপাথরযন্ত্রের শহরে সবাই হাঁপিয়ে গেছে । প্রাচীন মানবের প্রকৃতির কোলে চমৎকার ভারসাম্যে বসবাসের স্বপ্নের সবাই বিভোর । যা কিছু প্রাচীন, যা কিছু প্রাকৃতিক তার সবই ভালো ছিলো এমন একটা আবহ সবার মধ্যে । এর মধ্যে আমূল নারীবাদীরা প্রস্তাব করলেন তাদের ভাবী মানুষের আদি ইতিহাস ছিলো মাতৃতান্ত্রিক ও প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানের ইতিহাস । সবাইকে ফিরে যেতে হবে সেই আদি অবস্থায় । প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানের সবকিছু হয়তো পূরণ সম্ভব না । তাহলে খরগোশের মত বিয়ানোর ফলে সৃষ্টি হওয়া বিশাল এই জনসংখ্যার খাদ্যবস্ত্রবাসস্থানশিক্ষাচিকিৎসার বন্দোবস্ত করা সম্ভব হবে না । তবে মাতৃতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় ফিরে যাওয়া যেতেই পারে । শ্রমিক কলে কাজ করবে মায়ের জন্য, কৃষক কোমর ভাঙ্গা পরিশ্রমে ফসল ফলাবে মায়ের জন্য ।

বাঁধ সাধলো বিজ্ঞান ব্যাটা । গ্রিসের রসকষহীন ব্যাটা ও ব্যাটিরা বৈজ্ঞানিক সিদ্ধতার জন্য , কোন তত্ত ও বিবৃতি মেনে নেয়ার জন্য যে ধরণের প্রমাণ ও তথ্যের যোগান চায় তা জোগাড় করা দরকার হয়ে দাঁড়ালো । রোমান্টিক বিজ্ঞানীরা ছুটলেন পৃথিবীর বিভিন্ন অজানা প্রান্তে এখনো যেসব মানবগোত্র আদি ও অকৃত্তিম জীবনধারায় পড়ে আছে তাদের অবস্থা দেখার জন্য ।

যা দেখা গেলো তা আমূল নারীবাদী বা রাহুল সাংকৃত্যায়ণ কারো জন্যই সুখকর ছিলো না । আধুনিক দুনিয়াতে প্রাচীন জীবনধারা বয়ে চলা মানব গোত্রগুলোর মধ্যে খুব কম সংখ্যাতেই মিললো আমূল নারীবাদী অথবা মার্ক্সবাদীদের তত্তের মত মাতৃতান্ত্রিক সমাজ । বরং বেশিরভাগ সমাজই বর্তমানের বা তখনকার বর্তমানের মতই আধাখ্যাঁচড়া সমাজ । যে সমাজে পুরুষ কিছু কাজ করে একেবারে এক্সক্লুসিভলি, নারী কিছু কাজ করে একেবারে এক্সক্লুসিভলি । কোন পক্ষেরই একেবারে শতভাগ আধিপত্য নাই । দুয়েকটা সমাজ পাওয়া গেলো মাতৃতান্ত্রিক । অবাক করা ব্যাপার হলো এর বিশাল বড় একটা অংশ পাওয়া গেলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে । গারো, খাসি এইসব আদিবাসী গোত্রে দেখা যায় মাতৃতান্ত্রিক ও মাতৃপরিচয়ভিত্তিক সমাজ ব্যাবস্থা । ক্যাম্বোজিয়াতে পাওয়া গেলো এই ব্যাবস্থা । এই সমাজগুলোর কোনটাই জ্ঞানে বিজ্ঞানে বা উন্নতিতে শিল্পবিপ্লব পরবর্তী এমনক শিল্পবিপ্লবের আগেকার সাম্রাজ্যবাদী সমাজগুলোর মত অবস্থাতেও নাই । বরং আদি শিকার ও সংগ্রহভিত্তিক সমাজ-ব্যাবস্থার মধ্যে কোনরকমে ধুঁকে ধুঁকে টিকে আছে । কেউ কেউ এককাঠি বিজ্ঞান থেকে বাইরে গিয়ে প্রমাণ ও মেকানিজমের ব্যাখা ছাড়া বলে বসলো মাতৃতান্ত্রিক ব্যাবস্থায় থাকার কারণেই এদের কোন উন্নতি হয় নাই ।

এতদূর বলা নিশ্চয় অতিরঞ্জন , সে বিষয়ে সন্দেহ নাই । সমাজের বৈষয়িক উন্নতি সমাজের মাতৃতান্ত্রিকতা বা পুরুষতান্ত্রিকতা ছাড়াও আরো অনেক ভৌগোলিক সাংস্কৃতিক বিষয় এবং অনেকাংশে অন্ধ ভাগ্যের উপরও নির্ভর করে । তবে প্রমাণ যেটুকু হয় তা হচ্ছে আদি সমাজ, গরীবের বউ, সকলের ভাবী, মাতৃতান্ত্রিক ছিলো এই দাবী ভুল । অথবা এর পক্ষে কোন প্রমাণ নাই । কারণ আদি সমাজ সংজ্ঞাগতভাবেই সেই সমাজ , যে সমাজের কোন নিশ্চিত তথ্য আমাদের হাতে নাই । বিশুদ্ধ জীববিজ্ঞানের দিক থেকেও কোন আইডিয়া করা যাচ্ছে না । প্রাইমেটদের মধ্যে যাদের সমাজ “হারেম” সিস্টেমের , অর্থাৎ যে সমাজের কয়েকজন নারীর উপর একচ্ছত্র আধিপত্য থাকে একজন আলফা পুরুষের তাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় পুরুষের শারিরীক আকার নারীর শারিরীক আকারের চাইতে উদ্ভটভাবে বিশাল হয়, যেমন হয় গরিলার ক্ষেত্রে । দ্বিগুন তিনগুন । মানুষের ক্ষেত্রে নারীর আকার পুরুষের আকারের চাইতে কিছুটা ক্ষুদ্র বটে, তবে কখনোই এমন না যে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলে দেয়া যায় মানুষের সমাজ প্রাকৃতিকভাবে পুরুষতান্ত্রিক । আলফা পুরুষ সবকিছুর নিয়ন্ত্রণে ছিলো এমন বলা যায় না । আবার বনোবো বা বেবুনে যেমন দেখা যায় নারী পুরুষ আলাদা আলাদা গোত্রে ছিলো তেমনও বলা যায় না । বনোবো বা বেবুনদের মত নারী পুরুষ একেবারে সমান সমান নয় । যদ্দুর বলা যায় মানুষের সমাজ ছিলো শিম্পাঞ্জি ও গরিলার মাঝামাঝি কিছু একটা ।

আদি হান্টার গ্যাদারার সমাজের মানুষের গোত্রের মধ্যে পুরুষতান্ত্রিকতা বা নারীতান্ত্রিকতার গুরুত্বও কতটুকু ছিলো সেটা নিয়েও সন্দেহ করা যায় । মানুষ যখন দেড়শ জনের মত ছোট ছোট গোত্রে বিভক্ত ছিলো, একটা অঞ্চলে পাওয়া শিকার ও গাছ-গাছালির ফলমূল সংগ্রহ করে পেটের ক্ষুধা মিটাতো তখন নারী বা পুরুষের লিংগের ভিত্তিতে মতামতের গুরুত্ব বাড়তো কি কমতো সেটা নিয়ে কোন নিশ্চিত তথ্য দেয়া যায় না । প্রজনন প্রক্রিয়ার বৈষম্যের জন্য আন্দাজ করা যায় কোন অঞ্চলে শিকার পাওয়া যাবে কি যাবে না সেবিষয়ে পুরুষের মতামতের গুরুত্ব ছিলো বেশি । কোন অঞ্চলে ভক্ষণযোগ্য ফল ও সবজি ও মূল পাওয়া যাবে কি যাবে না সে বিষয়ে নারীর মতামতের গুরুত্ব ছিলো বেশি । শেষমেশ এক জায়গা ছেড়ে অন্য যায়গার উদ্দেশ্যের রওনা দেয়ার ক্ষেত্রে কার মতামত গুরুত্বপূর্ণ বেশি সেটা লিংগের ভিত্তিতে ভাগ হওয়ার চাইতে বরং কে কতটা প্রেজেন্টেশনে দক্ষ ছিলো, কথার যাদুতে, আত্নবিশ্বাসের ঝলকে অন্যদের প্রভাবিত করতে পারতো তার ভিত্তিতে ঠিক হতো, সেটাই বরং আন্দাজ করা যায় । এই প্রবণতা বর্তমানের অতি-আধুনিক কর্পোরেট দুনিয়াতেও দেখা যায় ।

কেবলি ধারণা যদিও, তবে কিছুটা আন্দাজ করা যায় যে মানূষের সমাজে বৈষম্যে মূলত লিংগের ভিত্তিতে নয় বরং ইন্ডিভিজুয়ালের যোগ্যতার অথবা যোগ্যতার পরিবেশনার ভিত্তিতেই তৈরী ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “সিরিয়াস ট্রিটিজ অন ফেমিনিজম-১ , আদিপর্ব

  1. পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।
    পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। নারীবাদীদের নিয়ে প্রকৃত অর্থেই সমস্যা। নারী-পুরুষের সমানধিকারও চাইবেন আবার নারীর বিশেষ সুবিধাও চাইবেন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 3 =