ইসলামের ইতিহাস বদলে যাওয়া সেই হামলাটি

মদিনায় বসবাসরত আরব ও ইহুদীদের মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে যে চাপা প্রতিযোগিতা চলছিল সে সময়কালের মধ্যে মক্কায় হযরত মুহাম্মদ নিজেকে নবী হিসেবে ঘোষণা করেন। মক্কার কুরাইশ বংশ মক্কা ও আশেপাশে ক্ষমতা ও শক্তিতে অন্যদেরকে পিছনে ফেলেছিল। প্রধানত আরব পৌত্তলিক ধর্মের অন্যতম তীর্থ কাবাঘর তাদের হাতে ন্যাস্ত হওয়ায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায় কুরাইশরা এগিয়ে ছিল। মক্কার সমাজে বৈষম্য ছিল। ছিল দরিদ্র ও বংশ মর্যাদাহীনদের শোচনীয় অবস্থা। হযরত মুহাম্মদ তার ধর্ম ঘোষণার প্রথম দশ বছর সমাজের এই শ্রেণীদের কাছ থেকেই সাড়া পেয়েছিলেন মূলত। এদের সংখ্যাও দেড়শো জনের বেশী হবে না। ঠিক এরকম পরিস্থিতিতে যখন হতাশায় নিমজ্জিত মুহাম্মদ তখন তার কাছে মদিনা থেকে হজ করতে আসা তীর্থ যাত্রীদের অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়। মদিনার লোকজনও কুরাইশদের বংশ গরিমা ও দাপটে বিরক্ত এবং এ থেকে নিষ্কৃতির কথা চিন্তা করত। তারা ছিল অর্থ সম্পদে সমৃদ্ধ। মক্কার লোকদের মত কোন্দল আর কলহ প্রবণও না। এদিকে মদিনার ইহুদীরাও কৃষিকাজ করে অর্থে বিত্তে সমৃদ্ধ ছিল। কাজেই মদিনার সমাজে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু দখলের একটা অদৃশ্য প্রতিযোগিতা কাজ করছিল। ইহুদীরা আরবদের ধর্মবিশ্বাস নিয়ে তাচ্ছিল্য করত। আরবী ভাষাকেও কবি ও মদখোরদের ভাষা ভিন্ন শ্রদ্ধা করত না। প্রতিবেশিদের কাছে নিজেদের ধর্ম ও সংস্কৃতির খোটার প্রেক্ষাপটে আবদুল মোতালিবের মত কাবার প্রধান পুরোহিতের নাতি মুহাম্মদ যে সংস্কারমূলক পৌত্তলিক ধর্মের কথা বলছিলেন তাতে মদিনা থেকে আসা হাজীদের কাছে আস্তে আস্তে গ্রহণযোগ্য মনে হতে লাগল। মুহাম্মদ তাদের পবিত্র কাবাঘরকে বাতিল করেননি। হজকে, বাইতুল্লাহ (আল্লাহ ঘর)-কে একইভাবে মান্য করে। তবে সে শুধু কুরাইশদের একচ্ছত্র ক্ষমতার বিরোধী। ধর্মকে কুঠিগত করে যে ব্যবসা তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এক আল্লাহ ছাড়া বাকী দেব-দেবীদের অস্বীকার করে তাদের কায়েমী স্বার্থে আঘাত করেছেন। মুহাম্মদ কথাও বলেন অত্যন্ত শান্তভাবে এবং শান্তিপূর্ণ তার বাণী। ইচ্ছে হলে তার কথা মানো, ইচ্ছে না হলে মেনো না। অন্যদিকে কুরাইশরা বদমেজাজি। কথায় কথায় যুদ্ধ আর রক্তপাত। মুহাম্মদের নবুয়তের দ্বাদশ বছর অতিবাহিত হবার পর মদিনা থেকে বারোজন ব্যক্তি এসে মুহাম্মদের হাতে বায়য়াত হোন বা দীক্ষা নেন। এটিকে ইসলামের ইতিহাসে ‘মাতৃশপথ’ নামে অভিহত করা হয়।

আশার আলো দেখতে পেলেন মুহাম্মদ। নতুন ম্বপ্ন মনে দানা বাধতে শুরু করল। মুসয়াব বিন উমাইর নামের একজনকে মুহাম্মদ মদিনায় প্রেরণ করলে যে নব দীক্ষিতদের কুরআনের আয়াত ও মুহাম্মদের বাণী তাদের মধ্যে প্রচার করবে। একই সঙ্গে অন্যদের মাঝে ইসলাম প্রচারের চেষ্টা চালাবে। কুরাইশ প্রতিপ্রত্তির বাইরে থেকে নতুন একটা শক্তি তৈরি করতে মদিনাবাসী দ্রুত মুহাম্মদের দীক্ষা নিতে শুর করল। মদিনায় ততদিনে বলার মত একটা সংখ্যা তৈরি হলো যারা মুহাম্মদের অনুসারী। হজের মৌসুম এসে গেলে মদিনা থেকে হজ করতে আসা লোকজন যারা মুহাম্মদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন তারা ফের শপথ নিলেন। অনুসারীদের সংখ্যার বিচারে এবার শপথে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের অবস্থায় গিয়েছিল। এতে মুহাম্মদ ও মদিনাবাসীদের দুজনেরই যার যার মত সুযোগ তৈরি হলো। মদিনাবাসী তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ ইহুদীদের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। তারা আলাপ করল এবার ফিরে গিয়ে ইহুদীদের সঙ্গে সমস্ত চুক্তি ভঙ্গ করে ফেলবে। অন্যদিকে মক্কায় মুহাম্মদের অনুসারীদের জীবন অভাব-অনটনে প্রায় স্থবীর। সিদ্ধান্ত হলো মক্কার মুসলমানরা (মুহাম্মদের অনুসারীরা) মদিনায় গিয়ে আশ্রয় নিবেন এবং এতে তাদের নব দীক্ষিত ভাইরা তাদের সহযোগিতা করবেন। এরপরই শুরু হবে কুরাইশদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা। এ কারণেই এই বায়য়াতকে “বায়য়াতুল হারব” বা “সামরিক অঙ্গীকার” বলে ডাকা হয়।

মদিনার পূর্ব নাম ইয়াসরিব। এই দেশ মূলত ইহুদীদের হাতে গড়া। তাদের প্রতিবেশী আরব যারা ধর্মে পৌত্তলিক তাদের দেশ ছিল আসলে ইয়ামানে। ইয়ামানের ইতিহাসে ভয়াবহ বন্যায় যে ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছিল তাতে তারা শরণার্থী হয়ে আশেপাশের দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। মদিনায় ইহুদিদের প্রতিবেশীরা তাদেরই বংশধর। তাদেরকেই ইসলামের ইতিহাসে ‘আনসার’ বলা হয় যার অর্থ সাহায্যকারী অর্থ্যাৎ তারা নবী মুহাম্মদকে সাহায্য করেছিল। অন্যদিকে ইহুদিরা গোটা আরব ভূখন্ডে এসে জড়ো হয়েছিল মূলত তাওরাতে ঈশ্বরকৃত তাদের দানকৃত দেশে বসবাস করতে (বাইবেল দেখুন: http://biblehub.com/deuteronomy/1-8.htm)।

এই তাওরাতের ঈশ্বরই নাকি মুহাম্মদকে নবী মনোনীত করেছেন। যদিও আরবদের কাছে ‘আল্লাহ’ নামের যে ঈশ্বর পুজিত হতো তার সঙ্গে ইহুদী-খ্রিস্টানদের ঈশ্বরের কোন সম্পর্ক ছিল না। বরং ওজ্জা দেবীর বাবা আল্লাহ তাওরাতের জিহোবার চেয়ে অনেক শান্তিপ্রিয়। ইহুদীরা তাওরাতের নির্দেশ পেয়ে অত্যন্ত নির্মমভাবে আজকের ইজরাইল ও আশেপাশের অঞ্চলগুলো দখল করে নেয় স্থানীয়দের তাড়িয়ে এবং কাজটি ঘটে নবী ইব্রাহিম, দাউদ, ইসহাকের ঈশ্বরের রক্তলোলুপ উশকানিতে। যাই হোক, ধর্মীয় কিতাবের সার্টিফিকেট দেখিয়ে ইহুদীদের শক্ত অবস্থান এই অঞ্চলে থাকলেও তারা কখনই পরবর্তীকালে অন্যের জন্য হুমকি ছিল না। কৃষিজীবী ইহুদীরা তাদের প্রতিবেশীদের উচ্ছেদ করেছে কয়েক শতাব্দীতে এরকম কোন নজির নেই। বরং নবী মুহাম্মদ যখন মদিনায় পৌছান তখন আনসারদের মত ইহুদীরাও তাকে স্বাগত জানিয়েছিল। তখন ইহুদীদের যে প্রভাব ছিল তারা বৈরী হলে আনসারদের পক্ষে একজন বিদেশীকে তার শ’খানেক অনুসারীসহ আশ্রয় দিতে পারত না। মদিনায় নবী মুহাম্মদ নিজের জন্য ঘর ও মসজিদ বানাতে যে জমি ব্যবহার করেন সেটিও ইহুদীদের দানকৃত। এর জন্য ইহুদীরা কোন অর্থ নেয়নি। শুরুতে মুহাম্মদকে ইহুদীরা পছন্দই করত। মুহাম্মদও ইহুদীদের অনেক প্রশংসা করতেন। মদিনার ইহুদীরা মহরম মাসের ১০ তারিখ রোজ রাখে জেনে তিনিও সেই মোতাবেক রোজা রাখা শুরু করেন। কিন্তু মক্কার ক্ষমতা ও সমগ্র অঞ্চলের শাসন দখল করতে প্রতিনিয়ত তাকে কঠর হতে হয়। তাবলিগি ধর্মপ্রচারকের খোলস ছেড়ে দ্রুতই একজন সেনাপতি হয়ে উঠেন মুহাম্মদ।

মদিনায় পাকাপাকি চলে আসার পর নবী মুহাম্মদ যে বড় সমস্যা পড়েছিলেন তার অন্যতম ছিল মক্কা থেকে আগত শ’দেড়েক অনুসারীর খাওয়া-পরা নিয়ে। মক্কা থেকে এরা এসেছিল খালি হাতে। অবশ্য মক্কাতেই এদের শোচনীয় অবস্থা ছিল। শুরুতে মদিনার ‘আনসারা’ এইসব ‘মোহাজেরদের’ থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করলেও আজীবন এদের ভারণপোষণ করা সম্ভব ছিল না। নিজদের কোন সম্পদ ছিল না যা দিয়ে নিজের পায়ে এরা দাঁড়াতে পারে। পরাশ্রয়ী এইসব লোকের মদিনায় আসার স্রোতও দিনকে দিন বাড়ছিল। যারাই খবর পাচ্ছিল মদিনায় গিয়ে মুহাম্মদের দলে নাম লেখালেই খাওয়া পরা নিশ্চিত- তখন মক্কা থেকে এই সকল লোকদের আসা দিনকে দিনই বাড়ছিল। এর দরূণ মদিনায় শরণার্থীদের চাপে অথনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হবার পথে চলেগিয়েছিল। এরকম সময়ে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ (রা.) যিনি মক্কা থেকে এসেছিলে হিযরত করে, তিনি নাখলাহ নামক জায়গায় গিয়ে শোনেন এই পথ দিয়ে মক্কায় একটি বাণিজ্য বহর যাবে। জাহাশ তার দলবল নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন এই বাণিজ্য কাফেলায় হামলা করে লুট করা হবে। কিন্তু কুরাইশদের বিশ্বাস ছিল রজব মাস হচ্ছে হারাম মাস- এ মাসে কোন রকম যুদ্ধ বা হানাহানি করা নিষেধ। এ নিয়ে একটা দ্বিধা কাজ করছিল জাহশদের। কিন্তু এই বাণিজ্য বহর হামলা চালিয়ে নিজেদের কব্জায় নিতে পারলে বিপুল পরিমাণ সম্পদ তাদের হাতে চলে আসবে। এই লোভ সামলানো কঠিন। যারা খেতে পাচ্ছে না, সহায় সম্বল নেই, অন্যের দয়ায় জীবন চালাতে হয় তাদের পক্ষে চুরি-ডাকাতির সহজ সুযোগ চলে আসছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া কঠিন। শেষে হামলা চালানোই সিদ্ধান্ত হলো। সিদ্ধান্ত মতে আগে থেকে ওঁত পেতে থেকে মুসলমান বাহিনী বাণিজ্য কাফেলায় হামলা চালিয়ে একজনকে হত্যা করে মালামাল লুটপাট করে মদিনায় চলে আসে। এটাই ইসলামের ইতিহাসে প্রথম ‘গণিমতের মাল’ এবং মুসলমানদের হাতে প্রথম হত্যা ও আটকের ঘটনা। নবীর কাছে মালামাল নিয়ে আসার পর তিনি বলেন, আমি তো নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ (?) করতে বলিনি। কিন্তু মালামাল ফিরিয়ে দেয়া বা গ্রহণ না করার কোন ব্যবস্থা না করে তিনি নিজেদের মধ্যে তা বন্টন করে দেন। এখানে যে বিষয়টা লক্ষ্য করার যে, নবী কিন্তু পৌত্তলিকদের নিষিদ্ধ মাসের মত একটা কুসংস্কারকে মান্য করে চলছেন। শুধু তাই নয় যখন মক্কার পৌত্তলিকরা নিষিদ্ধ মাসে মুহাম্মদের লোকজন হামলা চালিয়েছে বলে চরম সমালোচনা শুরু করেছিল তখন কুরআনে আয়াত নাযিল হয়-

“পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে লোকে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে। বলো, তাতে যুদ্ধ করা ভীষন অন্যায়। কিন্তু আল্লাহর পথে বাধা দান করা, আল্লাহকে অস্বীকার করা, মসজিদুল হারামে বাধা দেয়া এবং তার বাসিন্দাকে তা থেকে বহিস্কার করা আল্লাহর কাছে তদপেক্ষা বড় অন্যায়। ফেতনা হত্যা অপেক্ষা ভীষন অন্যায়” ( সূরা বাকারা, আয়াত ২১৭ )।

অর্থ্যাৎ খোদ আল্লাই কথিত নিষিদ্ধ মাসকে মান্য করছেন যা পৌত্তলিকদের বিশ্বাস ছিল এবং বলছেন এ মাসে যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায়। কিন্তু এই আয়াতে যে অনৈতিকতা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ নিষিদ্ধ মাসে হামলা করার অন্যায়কে জাস্টিফাই করছেন কুরাইশদের করা একটা অন্যায়কে দিয়ে! এ কেমন কথা! এ কেমন ঈশ্বর যিনি একটা অন্যায় হয়েছে স্বীকার করে বলছেন তারচেয়ে বেশি অন্যায় অন্যরা করেছে? এরকম যুক্তি তো কেবল মানুষের পক্ষেই সম্ভব। মানুষই একটা অন্যায় করে নিজের অন্যায়কে অন্যের অন্যায় দিয়ে তুলনা করে নিজের অপরাধকে লঘু করার চেষ্টা করে। সেটাই এখানে ঘটেছে আসলে। কিন্তু এসব যুক্তি যদি আল্লাহ তার আয়াত দ্বারা প্রতিষ্ঠা করেন তাহলে আর যুক্তিতর্কের কোন প্রশ্ন আসে না। বিশ্বাসীরা সেটাকেই সর্বোচ্চ নৈতিকতা বলে মনে করে। তাই মদিনার এই হামলাকে একটা নৈতিকতার সার্টিফিকেট দিয়ে মুসলমানদের লুটপাটে উৎসাহিত করা হলো। মদিনার এই ছোট্ট হামলাটি ছিল ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম মাইলফলক। এর মধ্য দিয়ে দাওয়াতি ইসলামের পরিবর্তে গায়ের জোড়ে ইসলাম প্রচারের সূচনা ঘটে। আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশ (রা.) এই হামলার পর মুসলমানদের জন্য দ্বিতীয় হিজরীর শাবান মাসে জিহাদ ফরজ বা অবশ্যই পালনীয় করা হয় কুরআনের সূরা বাকারা ১৯০-৯৩ আয়াত দ্বারা। বস্তুত ধর্ম প্রচারের পরিবর্তে মক্কার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ইসলাম আর কোন ধর্ম থাকেনি, পুরোটাই রাজনৈতিক একটি সশস্ত্র অভিযানে পরিণত হয়। মক্কার কুরাইশরা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ভীত হয়ে উঠেছিল। সিরিয়া থেকে বাণিজ্য কাফেলা মক্কার যাবার একমাত্র পথ মদিনার পাশ দিয়েই যেতে হবে। সেখানে মুহাম্মদের বাহিনী তাদের জন্য নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠল। এই লুটপাট বেড়ে যাবার পেক্ষাপটই বদর যুদ্ধের একমাত্র কারণ ছিল। মুসলমানরা বাণিজ্য কাফেলায় হামলা করাকেও জিহাদ বলত। আর এই জিহাদ যখন প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ হয়ে গেলো তখন মদিনার অবস্থাসম্পন্ন লোকজন একে অপছন্দ করতে শুরু করল। আড়ালে কেউ কেউ এইসব হামলার সমালাচনা শুরু করেছিল। মদিনার আনসাররা অভাবী ছিল না। কৃষিকাজ ও ব্যবসা বাণিজ্য করে অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থ মদিনাবাসী রাতের আধারে মক্কার বাণিজ্য কাফেলায় হামলাকে মেনে নিতে পারছিল না। মদিনার স্থানীয় অধিবাসীদের এই হামলা-লুটতরাজে অনিহা দেখে কুরআনে আয়াত নাযিল হয়-

“অতপর যদি দ্ব্যর্থহীন কোন সূরা অবতীর্ণ হয় এবং ওতে জেহাদের কোন নির্দেশ থাকে, তুমি দেখবে যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, তারা মৃত্যু ভয়ে বিহব্বল মানুষের মতো তোমার দিকে তাকাচ্ছে। শোচনীয় পরিণাম ওদের” (সূরা মোহাম্মদ, আয়াত ২০ )।

মুহাম্মদ তখন আর কোন নবী নন। আগে তিনি মক্কা থাকাকালে নিজেকে কেবল একজন সতর্ককারী বলে দাবী করতেন। তার দ্বিন গ্রহণের জন্য কাউকে জোরাজোরি করতেন না। কেউ তাকে অপমান করলে পরকালে আল্লার কাছে তার সাজা চাইতেন। কিন্তু এখন তিনি মুসলমানদের সশস্ত্র জিহাদ (হামলা) করতে নির্দেশ দিচ্ছেন। এ সময়ে ৬১৪ হিজরীতে হঠাৎ করে নামাজের কিবলা বাইতুল মোকাদ্দেস থেকে সরিয়ে মক্কার কাবাঘর বরাবর করা ছিল নবীর রাজনৈতিক অভিলাষের পরিস্কার ইশারা। এতদিনে ইহুদীরা তাকে নবী হিসেবে মেনে না নেওয়ায় তিনি বুঝে গিয়েছেলেন ইহুদী-খ্রিস্টানরা একজন আরব পৌত্তলিককে কখনো নবী হিসেবে মেনে নিবে না। বাইতুল মোকাদ্দেস ইহুদীদের পবিত্র মন্দির। সেখান থেকে মক্কার পৌত্তলিকদের মন্দির কাবাঘর বা বাইতুল্লাহকে কিবলা করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তার লক্ষ মক্কা দখল করা। ঘটনা প্রবাহ তাই দ্রুত ঘটে যাচ্ছিল। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্রে কুরাইশদের বিরাট বাণিজ্য কাফেলা হামলা চেষ্টা বদর যুদ্ধকে অবধারিত করে তোলে। শুরু হয় আরবের বুকে এক ভ্রাতৃঘাতি রক্তপাতের ইতিহাস। পিতা তার পুত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। স্বজনের হাতে স্বজনের রক্তে লেগে। মক্কার অলিতে গলিতে নারীদের বুক চাপড়ে আহাজারি ক্রমশ ভারী হতে থাকে। মদিনার ইহুদীরা যারা একদা নবীকে জমি দান করেছিলেন বাসবাস করতে তাদের নির্মম পরিণতি অনেকটাই চাপা পড়ে যায় মক্কার কথিত সাধারণ ঘোষণার আড়ালে। বস্তুত মক্কা দখল রক্তপাতহীন ছিল না। খালিদ বিন ওয়ালীদের তলোয়ার রক্ত পিপাসু পিশাচের মত মক্কার অলিগলি চোষে বেড়ায়। রক্তপাত ও সাধারণ ঘোষণা (ইসলাম গ্রহণের শর্তে) দ্বৈত নীতিতে মক্কা দখল হয় মুসলমানদের হাতে। শুরু হয় ইসলামী শাসনের এক নয়া যুগ।

যে সব গ্রন্থের সহায়তা নিয়েছি: যাদুল মায়াদ (২য় খন্ড), ইবনে হিশাম (১ম খন্ড), রহমাতুল লিল আলামীন (১ম খন্ড- ২য় খন্ড)।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “ইসলামের ইতিহাস বদলে যাওয়া সেই হামলাটি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

52 + = 56