অন্ধ গুরুবিশ্বাস ও জাত্যাভিমান হিন্দুদের অনৈক্যের কারণ!

হিন্দুদের অনৈক্যের অন্যতম প্রথম কারণ হল এদেশে হিন্দুদের ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য গুরু! একেকজন গুরুকে ঘিরে থাকে হাজার দশেক শিষ্য। আর শিষ্যরা শুধু তার দীক্ষাদাতা গুরুকেই অনুসরণ করবে, তার বাণী শিরোধার্য বলে মেনে নেবে, তাকে শ্রেষ্ঠ পরমাত্মা বলে গ্রহন করবে। কিন্তু অন্য গুরুকে নয়। এখানে একেক গুরুকে কেন্দ্র করে থাকে কয়েক সহস্র শিষ্য। আর গুরুগুলো হল একেকটা নিষ্কর্মার ঢেঁকি। এই অপদার্থ গুরুগুলো চলে ভক্তের (শিষ্যের) টাকায়। এই গুরুগুলোর থাকে একেকটি আশ্রম। অনেক গুরুর থাকে প্রতিটি জেলায় একেকটি আশ্রমের শাখা। তারা লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করে আশ্রম-মন্দিরের উন্নতি করবে। কিন্তু অস্তিত্বের সংকটে পড়া গোটা হিন্দু জাতির অস্তিত্বের জন্য কোনো উন্নতি করবে না। মুসলমানদের দেশে অত্যাচারিত হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ হবার জন্য তারা কোনো মাথা ঘামায় না। তারা শুধু এক অস্তিত্বহীন কল্পিত ঈশ্বরের সান্নিধ্য পাবার জন্য আর নিজের মুক্তির জন্য নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। আমি মনে করি এসব ভণ্ড গুরুগুলো হল একেকটা লোভী ও স্বার্থপর। যারা শুধু নিজ ও নিজের আশ্রমের উন্নতির কথা ভাবে। তারা গোটা হিন্দু জাতির স্বার্থের কথা মোটেও বিবেচনা করেনা।

নাসিরনগরে যে অত্যাচারিত হয়ে তিনশ হিন্দু পরিবার বাড়ি-ভিটে ছাড়া হয়েছে। গোবিন্দগঞ্জে যে হিন্দুদের বাড়ি ঘর মন্দির পুড়িয়ে দেয়া হয়ছে। এই নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো গুরুকে দেখলাম না, তার শিষ্যদের প্রতিবাদ করার কোনো নির্দেশ দিতে। আজ পর্যন্ত কোনো গুরুকে দেখলাম না অত্যাচারিত হিন্দুদের পাশে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয় বরাবর একটি প্রতিবাদের স্মারকলিপি দিতে। এই নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র কোনো মাথা ব্যাথা নেই। আমি বুঝিনা হিন্দুরা গুরু ভক্তি করে এসব আত্নকেন্দ্রিক অপদার্থদের কিভাবে ভক্তির জায়গা দিয়ে পুষে রাখে? এরা হিন্দু সমাজের কি উপকারে আসে? এরা বরঞ্চ হিন্দুদের শতভাগে বিভক্ত করে রেখেছে। একেকজন গুরু সৃষ্টি হয়ে গোটা হিন্দু জাতির মধ্যে শত শত অনৈক্য ও বিভাজন সৃষ্টি করে রেখেছে এসব গুরুগুলো। গোটা হিন্দু জাতিকে বিভিন্ন গুরুরা তাদের অন্ধ ভক্ত বানিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গৌষ্ঠিতে পরিনত করেছে। শুধু তাই নয় এই গুরু নিয়ে হিন্দুদের মাঝে অনেক মারামারি হানাহানি পর্যন্ত হয়। এক গুরুকে হেয় করে আরেক গুরুকে শ্রেষ্ট করতে গিয়ে দুই গুরুর শিষ্যের মাঝে বাঁধে কলহ, ঝগড়া মারামারি! আমি অবাক হই তখন, যখন দেখি এই গুরুগুলো চুপ থেকে তার শিষ্যদের নিরবে মারামারি ঝগড়া কলহ দেখে যায়। গুরুরা একদিকে খুব ফাস্ট! তারা শুধু নিজেদের শ্রেষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরার জন্য তাদের শিষ্যদের তালিম দেন——

“গুরু ব্রম্মা, গুরু বিষ্ণু, গুরুদেব মহেশ্বর,
গুরুদেব পরমব্রহ্ম তৎমৎশ্রী গুরুবেই নম।”
মানে গুরুই হল সব। গুরুই শ্রেষ্ঠ। গুরুকেই ভক্তি কর, সেবা কর, তাকে সেবা করলে তুমি ব্রম্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বরকে পর্যন্ত পেয়ে যাবে! এসব ফ্যাসিস্ট চিন্তা ধারা শুধু ধর্মীয় গুরুদের মধ্যে পাওয়া যায়। আর গুরুর অন্ধ শিষ্যরা মনে কোনো প্রশ্ন না রেখে দ্বিধাহীন চিত্তে এক নির্বোধের মতো গুরুর কথাগুলো একবাক্যে মেনে নেয়।
এদেরকে অন্ধ নির্বোধ অপদার্থ ছাড়া আর কিই বা বলা যায়?

হিন্দুরা এমন একটা নোংরা মানসিকতার জাতি, তারা জাত-পাতের লড়াইয়ে একেকজন একেকজনকে হারিয়ে দেয়ার জন্য একজনের পেছনে আরেকজন লাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
–শালার নাপিত! ছোটলোকের বাচ্চা আমাকেই শাঁসিয়ে গেল!
–শালা কুমোরের বাচ্চা কুমোর, তাঁতির বাচ্চা তাঁতি! তোরা হলি গে নিচু জাত। সব সময় নিচে থাকবি।
–দেখ দেখ ধোপার বাচ্ছাটা বলে কিনা আমার কাপড় কাচবে না। শালার নিচু জাতের স্পর্দা কতো দেখ।
–শালা ডোমের বাচ্চা ডোম ছোট লোক পতাকার! যেমন বলব তেমন শুনবি।
–এমা! আমার ছেলে চৌধুরী বংশের, সেই নিম্ম বর্ণের মেয়ে বিয়ে করবে নাকি?
–ওমা! এটা কি বলো আমার মেয়ে রায় পরিবারের সন্তান! তাকে ধোপার পরিবারের ছেলের সাথে বিয়ে দেব নাকি?
–এই শালা আমরা সেন পরিবার! খুব উচ্চ বর্ণের। আমাদের সাথে কথা বললে খুব মাথা নিচু করে কথা বলবি।
–শালার বাইন্যা। শালার পাল। শালার মুহুরি। শালার মুচি।

উপরে উল্লিখিত গালিগুলো আমার না। এসব গালি হিন্দুরা হিন্দুদেরই দেয়। খুব গর্ব করে উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা নিম্ম বর্ণের হিন্দুদের এসব গালিগুলো ধনুকের তীর-বানের মতো নিক্ষেপ করে। এবার বুঝলেন তো হিন্দুদের অনৈক্যের কারণ কি? কোনো নাপিত গৌষ্ঠি মুসলমানদের হাতে মার খেলে, আরেক হিন্দুর পাল গৌষ্ঠি বলবে, মার খেলে নাপিত গৌষ্টি খাচ্ছে, আমাদের কি? শালাদের আরো মারুক। মুসলমানরা কোনো মাছ ধরা জেলে গৌষ্টিকে মারলে, আরেক হিন্দু উচ্চ বর্ণের গৌষ্টি বলবে, মার খেলে জেলেরা খাচ্ছে, তাতে আমাদের কি? এই হল হিন্দু জাতি! এই হল হিন্দুর মানসিকতা!

-হিন্দুরা যতদিন না হাজার হাজার গুরুকে ঘৃনাভরে ছুঁড়ে না ফেলছে, হিন্দুরা যতদিন না জাত-পাতের বড়ায় থেকে নিজেকে মুক্ত না করছে, হিন্দুরা যতদিন না জাত-পাত ভুলে গিয়ে ঐক্যবদ্ধ না হচ্ছে, হিন্দুরা যতদিন না এক বৃত্তে এসে প্রতিরোধ গড়ে না তুলছে, ততদিন এদেশ থেকে হিন্দু হ্রাস পেতেই থাকবে। কেউ হ্রাস কমাতে পারবে না! একমাত্র হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদই পারে এদেশ থেকে হিন্দুর দেশ ত্যাগ (হ্রাস) কমানোর। আশা করি হিন্দুরা একদিন ঘুম থেকে জেগে উঠবে…..

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “অন্ধ গুরুবিশ্বাস ও জাত্যাভিমান হিন্দুদের অনৈক্যের কারণ!

  1. “হিন্দু জাতি”, the whole term
    “হিন্দু জাতি”, the whole term is wrong. Hindu nation, the very conception is fanatic one, just as ‘Muslim nation’ or ‘Christian nation’ so on so forth. The civilization demands secular idea, which rejects any relationship with any religious ideas. The solution of the problems does not lie in the unity of all Hindu, rather in the committed struggle for a class less society, a society which upholds the higher culture, values, and morality.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

44 − 40 =