কাঠামো যেখানে অধিক সাম্প্রদায়িক, পাঠ্য বইয়ের ঘটনা সেখানে তুচ্ছ..

কোন দূর্ঘটনা ও অপকর্মের দায় কি বাঙালি কখনো স্বীকার করেছে? ইতিহাসে এমন কোন নজীর আছে..? কিন্তু কৃতিত্বের দায় নিয়ে কাড়াকাড়ি, মারামারি, দলাদলি, আইন-আদালন, সংবিধান পরিবর্তন, আর কোন জাতি নয়, বাঙালি করেছে! পাঠ্যবইয়ের ভুল নিয়েও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না! কোন বিভাগ-ব্যাক্তি, মন্ত্রী, মন্ত্রনালয় কারো কোন দায় নেই! কেউ দায় স্বীকার করছে না! দায় নেবে না! এই অসহায় নাবালক শিশুদের দায় নেয়ার কেউ নেই, এই দেশে! দল, সমাজ, সরকার কেউ তাদের কথা ভাবছে না! তারা হচ্ছে বেওয়ারিশ! আল্লাহর মাল..!

তীর থেকে ‘দূর সমুদ্রের বিশাল ঢেউ সাধারণ চোখে দৃশ্যমান নয়! কাছের ঢেউয়ের ঝাপটা দেখে, সেটাকেই আমরা সমুদ্রের মূল ঢেউ মনে করে বসি! যে কারনে কথাটা বলছি, আমাদের দেশের সরকার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাই অনৈতিক! কোথায় অনিয়ম ও তুঘলকি কান্ড ঘটছে না? যেখানে কেবল দারিদ্রের কারনে, প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে শিশুদের মেধাকে অবিচার করা হয়! অন্যদিকে যুদ্ধবিমান-সাবমেরিন-গোলাবারুদ কিনতে চলে বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য! শিশু-কিশোররা সমাজে যে অন্যায়-অবিচার দেখছে, তার স্বীকার হচ্ছে, সেটা কি এই ভুলভাল-দূরভিসন্ধির চেয়ে ছোট কোন কিছু? গত কয়েক দশকে জাতীয় ভাবধারা, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে যে পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে সে তুলনায় এই ভুল-দূরভিসন্ধি বড় কোন কিছু নয়, কিছুটা সুড়সুড়ি মাত্র! তবু এই বিষয়ের যৌক্তিক প্রতিবাদকে সাধুবাদ জানাই!

একটি দেশের সমগ্র সামাজিক কাঠামোই যেখানে সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠছে, সাম্প্রদায়িকতায় পরিণত করা হচ্ছে! কিভাবে, কত পরিকল্পিত ভাবে সেই কাজটা করা হচ্ছে, সেটা কি আপনারা দেখতে পাচ্ছেন না? শিশুদের বইয়ে ওড়নার কথা বলায় অনেকেই বেশ বিচলিত হচ্ছেন, কিন্তু আমিতো দেখছি অনেক স্কুলে শিশুরা ওড়না ব্যবহার করছে। কেবল ওড়নাই নয়, তারা মাথায় স্কার্ফ ও ওড়না দুটোই ব্যবহার করছে! কেউ ফ্যাসান ও নিরাপত্তার জন্য করছে! ছোট ছোট ছেলেরা টুপি ব্যবহার করছে! দিন দিন যার ব্যাপক প্রসার ঘটছে! কোথাও নানা অজুহাতের সুযোগে- এই কাজ করা হচ্ছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নানা ধর্মীয় প্রশ্নে শিক্ষার্থীরা বিব্রত হয়ে, বাধ্য হয়ে সেই কাজটা করছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে এই ধরনের ইউনিফর্মের নির্দেশনাই আছে! আমি কোন মাদ্রাসার কথা বলছি না! সাধারণ শিক্ষার ধারাতেই এর প্রভাব প্রবল ও দৃশ্যমান হচ্ছে।

প্রথম শ্রেণী থেকে বার ক্লাস অবধি আলাদা করে বাধ্যতামুলক ধর্মশিক্ষা/ইসলামিয়াত থাকার পরও কেন বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে ধর্মের ভাবধারা প্রবেশ করাতে হবে? ধর্মশিক্ষার এই ব্যবস্থা তাদের সন্তষ্ট করতে পারছে না! এটা নিয়ে আর কোন লুকোচুরি না খেলে ক্রমে এই ধারাকেই সেদিকে নিয়ে যাবার পায়তারা চালাচ্ছে! বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি প্রধান ধারাও ধর্মভিত্তিক-সাম্প্রদায়িক এবং সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি সেটা চলছে! দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিক্ষার ধারা! যারা নিজেদের সন্তানকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চান, সেটা করার শতভাগ সুযোগ থাকার পরও- কেন সাধারণ শিক্ষার অসম্প্রদায়িক চরিত্রকে তারা মেনে নিতে পারছেন না? এসব ঘটনার পরও কি বলতে হবে এগুলো নিছক-নীরিহ, অনিচ্ছাকৃত, স্বাভাবিক বিষয়? এতে কোন দূরভিসন্ধি নেই?

পাঠ্যপুস্তকে সাম্প্রদায়িক ভাবধারা নিয়ে আসার ক্ষেত্রে কে দায়ী, সেটাও সংশ্লিষ্টরা জানে না! বিষয়টা যেন গায়েবী, যেমনটা ধর্মে বিশ্বাস করা হয়! সেখানেও অদৃশ্য ক্ষমতার গায়েবী হাত! তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার লেবাসে ক্ষমতায় আসলে কারা? জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান নারায়নচন্দ্র সাহা, আগে ছিলেন নারায়নচন্দ্র পাল, এই পাল-সাহাদের হাত দিয়ে কারা এই কাজ করাচ্ছে? ভিতর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে মন্ত্রনালয়ে নিয়োগ পাওয়া ২৪ জনের ২০ জনকে নিয়ে? প্রশ্ন উছেছে সামগ্রিক প্রক্রিয়া নিয়েই।

সাধারণ শিক্ষার ধর্মীয়করণ নিয়ে সরকারের মধ্যে কোন উদ্বেগ নেই! ২০১২ সালে মাদ্রাসাগুলোর জন্য একটি শিক্ষানীতির প্রস্তাবনায়, শিক্ষার সামান্য স্বীকৃত বিষয়ের অর্ন্তভূক্তি নিয়ে কথা উঠতেই হেফাজতিরা সরকারকে চ্যালেঞ্জ করে বসে, এবং সরকারও সেখান খেকে পিছিয়ে আসে! অধ্যাপক জাফর ইকবালকে বিধর্মী বলে সুপরিশ প্রত্যাখান করা হয়! কিন্তু সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে চরমোনাই-হেফাজতিদের সুপারিশ গ্রহন করা হয়! কি বিচিত্র দেশ! যে দেশে ধর্মভিত্তিক শিক্ষা বা কওমী মাদ্রাসা নিয়ে কিছু করাতো দূরের কথা, কিছু বলাও যেখানে মহা অন্যায় ও ধর্ম বিরোধীতার সমার্থক মনে করা হয়! সেখানে সাধারণ শিক্ষায় ক্ষেত্রে তারা পাঠ্যক্রম পরিবর্তনে পরামর্শ দিচ্ছে এবং গ্রীহিত হচ্ছে! তারপরও কি বলতে হবে ক্ষমতা ও রাজনীতির কেন্দ্রে তাদের প্রভাব প্রবল হচ্ছে না!

পাঠ্যপুস্তকে ছবি, শব্দ চয়ন, ভিন্নধর্মের লেখকদের লেখা বাদ দেয়ার সমালোচনার প্রেক্ষিতে তা সংশোধন করা হলে কি আমরা সাম্প্রদায়িক থেকে অসাম্প্রদায়িক হয়ে যাব? সেটা হলেই কি আমরা সভ্য, আধুনিক, উন্নত হয়ে যাব? এজন্য পুরো ব্যবস্থারই আমুল পরিবর্তন ও সংস্কার দরকার।

শিক্ষা নিয়ে গতকিস্তির লেখার প্রতিক্রিয়ায় এক বন্ধু বলল, সবতো ঠিক আছে, কিন্তু পরিবর্তনটা করবে কে? আমি বলি, যাদের দরকার, তারাই করবে! প্রয়োজনই পরিস্থিতি পাল্টাবে! আমাকে কেউ বলেনি, এটা লিখতে, তবু লিখছি। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাট বিরোধী সংগ্রামের সময়ও লিখেছি। আমাকে কেউ বলেনি সুন্দরবন নিয়ে লিখতে, পথে দাড়াতে। নিজ তাগিদ ও প্রয়োজনেই করছি। একদিন, অন্যরাও করবে। এই বিশ্বাস ও বিজ্ঞানে আজও আস্থা রাখি।

ড. মঞ্জুরে খোদা (টরিক), লেখক-গবেষক, ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়, কানাডা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “কাঠামো যেখানে অধিক সাম্প্রদায়িক, পাঠ্য বইয়ের ঘটনা সেখানে তুচ্ছ..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

42 + = 49