অনুভূতি যখন সাম্প্রদায়িক

ইয়াসমিনের কথা মনে আছে আপনাদের ?

গরীব রিকশাচালকের মেয়েকে বাংলার রক্ষকবাহিনী পুলিশ ভ্যানে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছিল। এই ইয়াসমিন হত্যাকান্ডের বিচার চাইতে গিয়ে কারফিউতে ৭ জন প্রাণ দিয়েছে। সেই ইয়াসমিন হত্যার দিন এখন নারীজাগরণের “নারী নির্যাতন ও প্রতিরোধ দিবস” হিসেবে পালিত হচ্ছে।

তনু মেয়েটার কথা কি মনে আছে ?

সেনা নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে যাকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছিল। মনে আছে আপনাদের সেই কুমিল্লা সেনানিবাসের কথা। বাঙালি জাতি যে অন্যায়ের সাথে আপোষ করেনা সেসময় দেখেছিলাম। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ আপামর বাঙালি জনতা রাস্তা দখল করে নিয়েছিল বিচারের দাবিতে।

আচ্ছা আপনারা কি কল্পনা চাকমার নাম কখনো শুনেছেন ?

মাঝে মধ্যে হয়তো নিউজপেপারে আসা কলাম দেখে নামটা পরিচিত পরিচিত লাগতে পারে। আবার নাম দেখে জানার আগ্রহটা নাও থাকতে পারে। কি হয়েছিল এই কল্পনা চাকমার জানেন ? সত্যি বলতে কি আমি নিজেও জানিনা এই কল্পনা চাকমার কি পরিনতি হয়েছিল। ইয়াসমিনের মত কি তাকেও ভ্যানে তুলে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে, না তনুর মত যৌনাঙ্গ ছিড়ে হত্যা করা হয়েছে।

শুধু জানি কালো রাত্রিতে হঠাৎ তার বাড়িতে সেনা পোশাকে কিছু মানুষ কড়া নারে। তার পরিবারের সামনেই সেই সেনা পোশাকধারীরা বন্দুকের নলা উচিয়ে তাকে নিয়ে যায়। অন্ধকারে তরুণী বোনকে নিয়ে যাচ্ছে দেখে বড় ভাই বোনের পিছন পিছন গিয়েছিল কিন্তু ফাঁকা বুলেটের আওয়াজে আর এগোতে পারেনি। অন্ধকারে বুলেটের আওয়াজের সাথে সাথে তকবগে তরুনী কল্পনা চাকমাও হারিয়ে যায়। তার পরিবার বলছে সেদিন সেই সেনা পোশাকের ব্যক্তিরা ছিল সেনাবাহিনীর মেজর গং ও আনসার সদস্য। কিন্তু রাষ্ট্র বলছে তারা জানেনা, তাদের কাছে কোন প্রমাণ নেই।

আর আজ সেই কল্পনা চাকমা লাল গালিচা বিছানো কর্পোরেট নারীবাদী প্রোগ্রামে একটা ইস্যু মাত্র আর কিছুই না। উদ্ধারের দাবিতে রাজপথে দাড়ানোর কেউ নেই, সেই মেজর গং দের বিচারের দাবিতে কথা বলার কেউ নেই।

আপনারা সিলেটের খদিজাকে তো চিনেন ? প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখান করায় প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে যখম করা হয়েছিল। সেদিনও দেখেছিলাম মানুষের জন্য বাঙালি জাতির অনুভূতির আবেগ।

জানেন এই খদিজার মতই কাপ্তাইয়ে ছবি মারমা নামে এক পাহাড়ি কিশোরিরও একি পরিণতি হয়েছিল। তবে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখান করায় নয়, বাড়ি থেকে জুমে যেতে নির্জন জঙ্গলে একা পেয়ে দুই বাঙালি যুবক ধর্ষণের চেষ্টা করে। কিন্তু মেয়েটি নিজের আত্মরক্ষার চেষ্টায় ধর্ষণে ব্যার্থ হয়ে গলা কেটে হত্যা করেছে।

কিন্তু কেউ জানতেও পারলোনা। গণমাধ্যমেও এই ছবি মারমা হত্যার ঘটনাগুলো শিরোনাম হয়না। কেন জানেন, কারন তাদের নামের শেষে মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা ইত্যাদি নিজ নিজ জাতিয়ত্ব বহন করে। ইয়াসমিন, তনু, খদিজাদের জন্য বিচার চাইতে বামপন্থী, ডানপন্থী, সব পন্থী রাজপথে নেমে আসলেও কল্পনা চাকমা, থুইমাচিং মারমা, ছবি মারমাদের হত্যার বিচার চাইতে রাজপথে কোন বাম ডান কে দেখা যায়না।

কিছুদিন আগেও মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর মানবিক বিপর্যয়ে বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতি দেখেছিলাম। শাহবাগ, প্রেসক্লাব, রাজু ভাস্কর্যে সমানে প্রতিবাদ জানিয়েছে এই মানবিক বিপর্যয়ে। মায়ানমার দূতাবাস ঘেরাও থেকে শুরু করে যুদ্ধের হুশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল। আর নিজ দেশের আলাদা জাতিগোষ্ঠীর মানবিক বিপর্যয়ে সবাই যেন নীরব দর্শক। মানবাধিকার প্রশ্নের সম্মুখীন হলে পর্দার সমানে একটু অনুভূতির বন্যা দেখিয়ে দিলাম, অনুভূতির কথা বলে দু-তিনটা লাইন লিখে একটা কলাম লিখে দিলাম। বাস…… এতেই অনুভূতির দায়িত্ব ফুঁড়িয়ে গেল। আর এটাই হচ্ছে আমার অসম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। এটাই বীর বাঙালিদের অনুভূতির দেশ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “অনুভূতি যখন সাম্প্রদায়িক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

41 + = 42