হিন্দু ধর্মের ইতি বৃত্ত, পর্ব ০২

সিদ্ধিদাতা মহারাজ গণেশের মাথা ও মুখমন্ডল নিয়ে কিছু কথা। গণেশ হচ্ছেন মহাদেব শিব এবং পার্বতীর পুত্র। গণেশের জন্ম হবার পরে অনেক দেবতার সঙ্গে দেবতা শনিও দেখতে এসেছিলেন নবজাতককে। শনির স্ত্রী কোনো এক কারণে একসময় তাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, তিনি যার দিকে দৃষ্টি দেবেন, তারই সর্বনাশ হবে। তাই শনি নবজাতকের চেহারা দেখতে চান নি কিন্তু পার্বতীর একান্ত পীড়াপীড়িতে তিনি বাধ্য হন শিশুর দিকে তাকাতে। শনির দৃষ্টি শিশুমুখে পড়া মাত্র শিশুটির মুণ্ড দেহচ্যুত হয়ে যায়। খবরটি স্বর্গে মহাপ্রভু বিষ্ণুর কাছে যখন পৌছুল তিনি অতিসত্বর চলে আসার পথে মাঠে একটা হাতিকে শুয়ে থাকতে দেখে সুদর্শন চক্রের সাহায্যে সেটির মাথা কেটে নিয়ে এলেন আর গণেশের গলার সঙ্গে যুক্ত করে দিলেন। একদম পুরোপুরি ‘প্লাষ্টিক সার্জারি’।

প্রথম পর্ব-এর পর…

পশ্চিমে প্রতি খ্রিসমাসে মরিয়ম পুত্র যিশুর জন্ম নিয়ে বাঁকা কথা যৌক কৌতুক প্রায়ই শুনা যায় কারণ বিজ্ঞানের যুগে অনেকেই পিতাহীন সন্তান মানতে রাজী নয়। তবে পৃথিবীর অন্যপ্রান্থে মাতার কর্ণপথে প্রসবিত সন্তান মহাবীর কর্ণ আর মানবমস্তকবিহীন প্রভু গণেশের জন্মদিনে এমন অশুভ কথা একেবারেই কারো মুখে শুনা যায়না। সম্ভবত এর কারণ কর্ণের জন্ম হয়েছিল টেষ্ট টিউবের মাধ্যমে আর গণেশের হস্তীমস্তক ‘জেনেটিক ক্লোনিং’ বা প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে। হয়তো এভাবেই ইঙ্গীত দেয়া আছে পবিত্র গ্রন্থ বেদ ও মহাভারতে। অন্যরা না মানলেও সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তো মানতেই হয়, ধর্মগ্রন্থ বলে কথা। বিশেষ করে তা যদি হয় রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তির সমর্থনপ্রাপ্ত। ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী মোম্বাইয়ের এক হাসপাতালে প্রচুর বিদ্বান ডাক্তার ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিত সমাবেশে ঘোষণা দেন- “We can feel proud of what our country achieved in medical science at one point of time. We all read about Karna in the Mahabharata. If we think a little more, we realise that the Mahabharata says Karna was not born from his mother’s womb. This means that genetic science was present at that time. That is why Karna could be born outside his mother’s womb.” প্রধানমন্ত্রী গর্বিত কণ্ঠে আরো বলেন- “We worship Lord Ganesha. There must have been some plastic surgeon at that time who got an elephant’s head on the body of a human being and began the practice of plastic surgery.” (গার্ডিয়ান, ২৮ অক্টোবর ২০১৪।)

নরেন্দ্র মোদী মনে করেন মহাভারতের বর্ণনানুযায়ী কর্ণের জন্ম হয়েছিল তার মায়ের জরায়ুর বাইরে। তাই কর্ণ নির্ঘাত ‘টেস্ট টিউব বেবি’ কিংবা হয়তো ‘জেনেটিক ক্লোনিং’এর ফল। মোদী বলেছেন, প্রাচীন ভারতের ঋষিরা ‘জেনেটিক সায়েন্স’ জানতেন। তিনি আরো বলেন, বিজ্ঞানের যে নব নব আবিষ্কারের জন্য আমরা গর্ববোধ করি, তার সবই প্রাচীন ভারতের জ্ঞানের চর্বিতচর্বন।

এবার দেখা যাক আসল ঘটনাটা কী? কর্ণ ছিলেন পঞ্চপাণ্ডবজননী কুন্তীর প্রথম পুত্র। তার আদি নাম ছিল বসুষেণ। কর্ণের জন্ম হয়েছিল তার মায়ের বিয়ের আগে। রূপেলাবণ্যে কুন্তী ছিলেন অতীব সুন্দরী। বিয়ের আগে কুমারীকালে একদিন মুনি দুর্বাসা অতিথি হিসেবে কুন্তীর ঘরে এসেছিলেন। সুন্দরী কুমারী কুন্তী মুনি দুর্বাসার সেবা-যত্নে মনযোগী হলেন আর ঋষি মন দিলেন কুন্তীর কল্যাণে। সেবা যতনে মুগ্ধ ঋষি দুর্বাসা খুশি হয়ে কুন্তিকে একটি মন্ত্র শিখিয়ে দেন। এই মন্ত্র পড়লে কুন্তী যে দেবতাকে ডাকবেন, সে দেবতাই কুন্তীর ডাকে স্বর্গ থেকে বিলম্ব না করে ধরাতলে নেমে আসবেন। আর ঐ দেবতার ঔরসে কুন্তী এক সুপুত্র লাভ করবেন। এখানে পাঠকগণকে বিভ্রান্তমুক্ত রাখতে আগেই জানিয়ে রাখি যে, যারা ঈসা নবির মাতা মরিয়ম বিবির কাহিনি আর ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিবির ঘরে পালিত মুসা নবির কাহিনি পুরোপুরি জানেন তারা ঘটনার প্রায় হুবহু মিল দেখে মনে করতে পারেন এমন কপি পেষ্ট হলো কেমনে? না, কর্ণের জন্মে কিছুটা অমিলও আছে। সেটাই এবার বলি। সবে মাত্র কৈশোরোত্তীর্ণ কৌ্তুহলী কুন্তী একদিন বাড়ির কোণে গিয়ে ঋষির দেয়া বরের কেরামতি পরীক্ষা করতে মন্ত্র পড়ে সূর্যকে আহবান করে বসলেন। এমন ভক্তের আহবানে সাড়া না দিয়ে থাকতে পারে কোনো অন্ধ দেবতা আছে নাকি এই জগতে? মুহুর্ত দেরী না করে সূর্য দেব সহাস্য বদনে কুন্তীর সম্মুখে এসে উপস্থিত হলেন। কুন্তী এহেন আচম্বিত ঘটনা প্রত্যক্ষ করে ভয় পেয়ে গেলেন। ভয়ে অস্থির কুন্তী মিনতি করেন ‘আমি কুমারী আমার বিবাহ হয়নি আমি আমার পেটে কারো সন্তান নিতে পারবেন না’। দেবতাও নাছোড় বান্দা। মন্ত্রের টানে তিনি এতোদূর এসেছেন এখন সকল কাম না সেরে ফিরে গেলে তিনি আর কিসের দেবতা? সুতরাং কাম সারতেই হলো কুন্তীর সাথে দেবতার সঙ্গম হলো। তবে সঙ্গমের আগে দেবতা বলেছিলেন কুন্তী পুত্র সন্তান জন্ম দেয়ার পরও কুমারীই থাকবেন। কীভাবে সম্ভব হলো? কুন্তীর জরায়ুপথে কর্ণের জন্ম না হয়ে জন্ম হল কুন্তীর কর্ণ দিয়ে। আর এ জন্যেই পুত্রের নাম রাখা হয় কর্ণ।

এবার সিদ্ধিদাতা মহারাজ গণেশের মাথা ও মুখমন্ডল নিয়ে কিছু কথা। গণেশ হচ্ছেন মহাদেব শিব এবং পার্বতীর পুত্র। গণেশের জন্ম হবার পরে অনেক দেবতার সঙ্গে দেবতা শনিও দেখতে এসেছিলেন নবজাতককে। শনির স্ত্রী কোনো এক কারণে একসময় তাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, তিনি যার দিকে দৃষ্টি দেবেন, তারই সর্বনাশ হবে। তাই শনি নবজাতকের চেহারা দেখতে চান নি কিন্তু পার্বতীর একান্ত পীড়াপীড়িতে তিনি বাধ্য হন শিশুর দিকে তাকাতে। শনির দৃষ্টি শিশুমুখে পড়া মাত্র শিশুটির মুণ্ড দেহচ্যুত হয়ে যায়। খবরটি স্বর্গে মহাপ্রভু বিষ্ণুর কাছে যখন পৌছুল তিনি অতিসত্বর চলে আসার পথে মাঠে একটা হাতিকে শুয়ে থাকতে দেখে সুদর্শন চক্রের সাহায্যে সেটির মাথা কেটে নিয়ে এলেন আর গণেশের গলার সঙ্গে যুক্ত করে দিলেন। একদম পুরোপুরি ‘প্লাষ্টিক সার্জারি’।

গণেশের মাথা নিয়ে আরো অনেক রকমের কাহিনি আছে যেমন;

শিবের প্রতি কশ্যপের অভিশাপের ফলে গণেশের মুণ্ডচ্ছেদ ঘটেছিল। – ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ।
পার্বতী যখন আট মাসের গর্ভবতী তখন সিন্দুর নামে এক দৈত্য পার্বতীর গর্ভে প্রবেশ করে গণেশের মস্তকচ্ছেদন করেছিলেন। – স্কন্দ-পুরাণ।

শুধু প্রধান মন্ত্রী মোদীই নন আরো অনেক হিন্দু ভাববাদী বৈজ্ঞানিক দাবী করছেন যে, আজকের আধুনিক বিজ্ঞান যা নতুন নতুন আবিষ্কার করছে তার সব কিছুই প্রাচীনকালের মুনি-ঋষিরা বের করে তাদের ধর্মগ্রন্থে লিখে গেছেন। তারা উদাহরণও দিয়েছেন যেমন;

– মহাভারতে কৃষ্ণ অর্জুনকে যে বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন তা ‘বিগ ব্যাং’ ছাড়া অন্য কিছু নয়।
– ‘ব্রহ্মার এক মুহূর্ত পৃথিবীর সহস্র বছরের সমান’ এ বাক্য থেকে ‘কৃষ্ণ গহ্বর’ কিংবা ‘সময়ের ধারণা’ পাওয়া যায়।
– মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ছিল আসলে এক ‘পারমাণবিক যুদ্ধ’ (Atomic War)। সম্ভবত দুর্যোধনেরই কোনো মিত্রশক্তি পারমাণবিক যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে থাকবে মহেঞ্জোদারোতে।
– দ্রোণ-দ্রোণী, কৃপ-কৃপীর জন্মের পৌরাণিক কাহিনিগুলো প্রমাণ করে TestTubeBaby) আর বিকল্প মা (SurrogateMother) এর ধারনা প্রাচীন যুগের ঋষিদের ছিল।
– হিন্দু পুরাণে বর্ণিত ‘বরুণ বাণ’ আর ‘অগ্নিবাণ’ উপসাগরীয় যুদ্ধে ব্যবহৃত স্কাড আর প্যাট্রিয়ট মিসাইল ছাড়া আর কিছু নয়।

গণেশের গজমুণ্ডধারনের কাহিনি আমরা জানলাম, এবার তার জন্ম নিয়ে কিছু কথা। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের গণেশ খণ্ডে আছে – বিষ্ণুর ইচ্ছায় মহাদেবের পুত্র হিসাবে গণেশের উৎপত্তি হয়েছিল ভিন্নতর পরিমণ্ডলে। বিষ্ণু বুঝতে পেরেছিলেন যে, মহাদেব (শিব) ও পার্বতীর মিলনের ফলে পার্বতী যদি গর্ভবতী হন, তাহলে পার্বতী একটি অতিকায় দেব-পীড়নকারী পুত্র প্রসব করবেন। এই অনিষ্টকারী পুত্রের জন্মরোধের উদ্দেশ্যে বিষ্ণু একটি কৌশলের আশ্রয় নেন। শিব-পার্বতীর সঙ্গমের শেষ মুহূর্তে, বিষ্ণু দরিদ্র ব্রাহ্মণ বেশে মহাদেব -পার্বতীর মিলনগৃহের সামনে উপস্থিত হন এবং উচ্চস্বরে ভিক্ষা প্রার্থনা করতে থাকেন। শিব ব্রাহ্মণরূপী বিষ্ণুর সম্মানার্থে সঙ্গমকাম দ্রুত সেরে মিলনগৃহ ত্যাগ করেন, এর ফলে তাঁর স্খলিত শুক্র বাহিরে নিক্ষিপ্ত হয়। এই স্খলিত শুক্র থেকেই গণেশের জন্ম হয়।

পুরাণ মতে যোনীর বাহিরে নিক্ষিপ্ত বীর্য থেকে প্রচুর দেব দেবীর জন্ম হয়েছিল। আমরা তাদের জন্ম বৃত্তান্ত পরিচিতি পরে জেনে নিবো তার আগে মহাদেব শিব ও পার্বতির সংক্ষিপ্ত পরিচয় জেনে নেয়া যাক। পার্বতির পিতার নাম ছিল দক্ষ। তিনি জীব-সৃষ্টা দশ প্রজাপতির একজন। দক্ষের কন্যা সতীর (পার্বতির ওপর নাম)সাথে শিবের বিবাহ হয়। শিব তার শ্বশুর দক্ষকে খুব একটা সম্মান দেখাতেন না। জামাতার হেন কান্ডে, শ্বশুর দক্ষ বিরূপ হয়ে উঠেন। সতীর বিবাহের এক বৎসর পর, দক্ষ এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন। এই যজ্ঞে দক্ষ তার জামাতা মহাদেব (শিব) ও কন্যা সতীকে দাওয়াত দিলেন না। সতী বিষয়টা জানতে পেরে অযাচিতভাবে যজ্ঞে যাবার উদ্যোগ নেন। মহাদেব তাঁর স্ত্রী সতীকে বাধা দেয়ায় সতী ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর মহামায়ার দশটি রূপ প্রদর্শন করে মহাদেবকে বিভ্রান্ত করেন। এই রূপ দশটি ছিল- কালী, তারা, রাজ-রাজেশ্বরী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধূমাবতী, বগলামূখী, মাতঙ্গী ও মহালক্ষ্মী। শেষ পর্যন্ত শিব সতীকে তার পিতার যজ্ঞানুষ্ঠানে যাবার অনুমতি প্রদান করেন। কিন্তু যজ্ঞস্থলে পিতা দক্ষ তার মেয়ের সামনেই শিবের নিন্দা করলে- সতী তা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন। সতীর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে মহাদেব ক্রুদ্ধ হয়ে নিজের জটা ছিন্ন করে ফেলেন। সেই জটা থেকে বীরভদ্র নামক এক শক্তিশালী পুরুষের আবির্ভাব ঘটে। এরপর এই বীরভদ্র মহাদেবের অন্যান্য অনুচরসহ তার আদেশে দক্ষের যজ্ঞানুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে যজ্ঞানুষ্ঠান পণ্ড করে দেন এবং দক্ষের মুণ্ডুচ্ছেদ করেন। শিবের শাশুড়ি বীরিণী তার স্বামী দক্ষের মৃত্যুতে আকুল হয়ে ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। এরপর ব্রহ্মার অনুরোধে মহেশ্বর শিব, তার শ্বশুর দক্ষের ঘাড়ে একটি ছাগলের মুণ্ডু স্থাপন করেন।

সতীর দেহত্যাগের পর, স্ত্রী শোকে কাতর ভোলানাথ শিব তাঁর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডবনৃত্য শুরু করেন। এর ফলে সৃষ্টি ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হলে, বিষ্ণু তাঁর চক্র দ্বারা সতীদেহকে একান্নভাগে বিভক্ত করে দেন। এই একান্নটি খণ্ড ভারতের বিভিন্নস্থানে পতিত হয়। পতিত প্রতিটি খণ্ড থেকে এক একটি মহাপীঠ উৎপন্ন হয়। সতীর দেহাংশ যে সকল স্থানে পতিত হয়েছিল, মহাদেব সেখানে লিঙ্গরূপে অধিষ্ঠিত হলেন। বিশেষ করে সতীর মস্তিষ্ক পতিতস্থানে শিব শোকাহত অবস্থায় উপবেশন করেন। এই সময় দেবতারা সেখানে উপস্থিত হলে- শিব লজ্জায় প্রস্তর-লিঙ্গে পরিণত হন। পরে দেবতারা এই লিঙ্গরূপী মহাদেবকে পূজা করতে থাকেন। হিন্দু পুরাণে মহাদেবের এই লিঙ্গপ্রতীক শিবলিঙ্গ নামে পরিচিত। সতীর পূনর্জনম হয় হিমালয়ের গৃহে। এর পর থেকে সতীর বিবর্তনীয় নাম হয় পার্বতি।

দ্রোণাচার্যঃ
দ্রোণাচার্য মহাভারত মহাকাব্যের একটি চরিত্র। তিনি কৌরব এবং পঞ্চপাণ্ডবের অস্ত্রশিক্ষার গুরু ছিলেন। একদা মহর্ষি ভরদ্বাজ গঙ্গায় স্নানের সময় অপ্সরা ঘৃতাচী কে দেখে উত্তেজিত হন এবং তাঁর বীর্য স্খলিত হয়। তিনি সেই বীর্য এক কলসে সংরক্ষণ করেন। সেই কলস থেকে দ্রোণের জন্ম হয়। কলসের মধ্যে জন্মলাভ করায় তিনি পুত্রের নাম রাখেন দ্রোণ (কলস)।

দেবী সরস্বতীঃ
ঋগ্বেদে দুই ধরনের সরস্বতীর উল্লেখ আছে। একটি ত্রিলোক্য ব্যাপিনী সূর্যাগ্নি, অন্যটি নদী। ঋগ্বেদে এবং যর্জুবেদে অনেকবার ইড়া, ভারতী, সরস্বতীকে একসঙ্গে দেখা যায়। বেদের মন্ত্রগুলো পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, সরস্বতী মূলত সূর্যাগ্নি। দেবীভাগবতে সরস্বতী জ্যোতিরূপা। ভৃগুপনিষদে জ্যোতির্ময়ী সরস্বতী ও জলময়ী সরস্বতীর সমীকরণ করা হয়েছে। এই উপনিষদে জলে জ্যোতি প্রতিষ্ঠিত, জ্যোতিতে জল প্রতিষ্ঠিত। রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকি যখন ক্রৌঞ্চ হননের শোকে বিহবল হয়ে পড়েছিলেন, সে সময় জ্যোতির্ময়ী সরস্বতী তার ললাটে বিদ্যুৎ রেখার মত প্রকাশিত হয়েছিলেন। ঋগ্বেদে ইন্দ্রের সঙ্গে সরস্বতীর সম্পর্ক যেমন ঘনিষ্ঠ তেমনি ঘনিষ্ঠ মরুদ ও অশ্বিনীদ্বয়ের সঙ্গে। সরস্বতী কখনো ইন্দ্রের পত্নী আবার কখনো শত্রু, কখনো-বা ইন্দ্রের চিকিৎসক। সরস্বতীর আর-এক নাম ভারতী। সরস্বতীকে ব্রহ্মার মানসকন্যা হিসাবে কল্পনা করা হয়।

হিন্দু পুরাণে বলা হয়েছে, ব্রহ্মা তাঁর কন্যার সঙ্গে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হন। সরস্বতীর সঙ্গে ব্রহ্মার এই সম্বন্ধের সন্ধান ঋগ্বেদেও পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক এন এস ভট্টসারি একটি লেখায় বলেছেন, “একসময় ইন্দ্রের শরীরের শক্তি চলে যাওয়ার ফলে তিনি মেষ আকৃতি গ্রহণ করেন। সে সময় ইন্দ্রের চিকিৎসার দায়িত্ব ছিল স্বর্গের অশ্বিনীদ্বয়ের উপর এবং সেবা-শুশ্রুষার ভার ছিল সরস্বতীর হাতে। সংগীত ও নৃত্যপ্রেমী ইন্দ্র সরস্বতীর গানবাজনা ও সেবায় সুস্থ হওয়ার পর তাকে মেষটি দান করেন। সেই থেকেই সরস্বতীর সঙ্গী এই মেষ। তাহলে কি সরস্বতী স্বর্গের সেবাদাসীও ! সরস্বতীর বাহন বরাহ (শুয়োর), কারণ তিনি নাকি বিষ্ণুরও স্ত্রী ছিলেন। অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ রচিত ‘সরস্বতী’ গ্রন্থটিতে এ তথ্য পাওয়া যায়। শ্রীকৃষ্ণকেও স্বামী হিসাবে কামনা করেছিলেন তিনি – “ইয়েষ কৃষ্ণং কামেন কামুকী কামরূপিনী”। ‘ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ’-এ শ্রীকৃষ্ণ-সরস্বতীর কেচ্ছাকাহিনি যথাযথভাবেই বর্ণিত আছে। ডঃ শ্যামল চক্রবর্তী ‘নারী’ প্রবন্ধে বলেছেন, সরস্বতী গণেশেরও স্ত্রী। মহারাষ্ট্রের কোনো কোনো পূজারী মনে করেন, গণেশের পত্নী সরস্বতী কিংবা সারদা। আরেক তথ্য অনুসারে জানা যাচ্ছে, দুর্গার কন্যা এই সরস্বতী দুর্গার কুমারী সত্তা। আবার বাঙালিরা মনে করেন গণেশ ও সরস্বতী ভাইবোন, দুর্গার সন্তান। ব্রহ্মা তাঁর কন্যা সরস্বতীর প্রতি দুর্ব্যবহার করলে শিব তাঁকে শরবিদ্ধ করে হত্যা করেন। তখন ব্রহ্মার পত্নী গায়ত্রী কন্যা সরস্বতীকে নিয়ে স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনার জন্য গন্ধমাদন পর্বতে তপস্যা শুরু করেন। তাঁদের দীর্ঘ তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে শিব ব্রহ্মার প্রাণ ফিরিয়ে দেন।

যুগে যুগে ইতিহাসবিদরা জানিয়েছেন উপাসনালয় থেকে গণিকালয় সর্বত্র পুজো পায় সরস্বতী। সরস্বতী তাঁর কৌমার্য হারিয়েছেন বহু পুরুষের বাহুডোরে।

মনসার জন্মকাহিনি
ব্রম্মা যেমন তার সুন্দরী মেয়ে সরস্বতী্র প্রেমে পড়েছিলেন, মহাদেব শিবের দেহেও তার সুন্দরী যুবতি মেয়ে মনসার রূপে কাম বাসনা জেগে উঠেছিল। চলুন জেনে নিই দেবী মনসার জন্মকাহিনি। মনসার পিতার নাম শিব। শিব সর্বভারতীয় প্রধান দেবতা। আর্যদের সাথে অনেক কুস্তি-দুস্তি করে, প্রবল ঘাতপ্রতিঘাতের পর অগ্নি, বরুণ, মিত্র, বৃহস্পতি, পুষন, ব্রহ্মা, রুদ্র, বিষ্ণু-প্রমূখ বৈদিক দেবতাকে অপসারণ করে তিনি সর্বভারতীয় প্রধান দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত হন। এতে বড় বিজয়টা হয়েছে অনার্য ভারতীয় ভুমিপুত্রদের। শিব ভারতমাতার অনার্য দ্রাবিড় জাতির সৃষ্টি, আর্যদের বেদে শিবের নাম উল্লেখ নেই। যদিও তারা রুদ্রকে শিবই মনে করেন। শিবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল তাঁর তৃতীয় নয়ন। মহাভারতে শিবকে ত্রিনয়ন রূপে কল্পনা করা হয়েছে; তাই উক্ত নামটির আক্ষরিক অর্থ করা হয়ে থাকে “তৃতীয় নয়নধারী’’। এই নয়ন দ্বারা শিব কাম-দেবকে ভস্ম করেছিলেন। শিবকে বহু জায়গায় বহুরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। এই যে মনসা, তি্নিও প্রথমে সর্বপ্রধান দেবতা শিবের কন্যা ছিলেন না। হিন্দুধর্মের ব্রাহ্মণ্যবাদী মূলধারায় মনসা দেবীরূপে স্বীকৃতিলাভ করতে অনেক কাঠখড় পুড়েছে। তার বাবা ছিলেন কশ্যপ। পুরাণ অনুসারে তিনি ঋষি কশ্যপের কন্যা। একদা সর্প ও সরীসৃপগণ পৃথিবীতে কলহ শুরু করলে কশ্যপ তাঁর মন থেকে মনসার জন্ম দেন। ব্রহ্মা তাঁকে সর্প ও সরীসৃপদের দেবী করে দেন। মনসা মন্ত্রবলে বিশ্বের উপর নিজ কর্তৃত্ব স্থাপন করেন। এরপর মনসা শিবের সঙ্গে সন্ধিস্থাপন করেন। শিব তাঁকে কৃষ্ণ-আরাধনার উপদেশ দেন। মনসা কৃষ্ণের আরাধনা করলে কৃষ্ণ তুষ্ট হয়ে তাঁকে সিদ্ধি প্রদান করেন এবং প্রথামতে তাঁর পূজা করে মর্ত্যলোকে তাঁর দেবীত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। কশ্যপ জরুৎকারুর সঙ্গে মনসার বিবাহ দেন। ‘মনসা তাঁর অবাধ্যতা করলে, তিনি মনসাকে ত্যাগ করবেন’, এই শর্তে জরুৎকারু মনসাকে বিবাহ করেন। একদা মনসা দেরী করে তাঁর নিদ্রাভঙ্গ করলে তাঁর পূজায় বিঘ্ন ঘটে। এই অপরাধে জরুৎকারু মনসাকে ত্যাগ করেন। পরে দেবতাদের অনুরোধে তিনি মনসার কাছে ফিরে আসেন এবং আস্তিক নামে তাঁদের একটি পুত্রসন্তান জন্মায়।

শিবের নামের শেষ নেইঃ
মহাদেব শিবের বেশ কিছু গুণবাচক নাম রয়েছে যেমন- বিশ্বেশ্বর, বিষমাক্ষ, বীরেশ্বর, বৃষধ্বজ, ভবানীপতি, ভূতনাথ, ভূতপতি, ভূতভাবন, ভূতেশ, ভৈরব, ভোলা, ভোলানাথ, বাণদেব, বাণেশ্বর, বিরূপাক্ষ, বীরেশ্বর, মহাকাল, মহাদেব, মহানট, রুদ্র, মহেশ, মহেশান, মহেশ্বর, কৈলাসপতি, কৈলাসেশ্বর কাশীনাথ, কাশীশ, কাশীশ্বর, কাশীপতি, কুলেশ্বর, বিষকণ্ঠ, রুদ্র, আশুতোষ, পশুপতি ইত্যাদি। মানুষের অসাধ্য এক একটা অসাধারণ অলৌকিক কর্ম সাধনের সাথে এই গুণবাচক নামগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। যেমন; একই সাথে ইনি যখন ভয়ানক তখন রুদ্র, আর যখন কল্যাণকর তখন শিব। মহাকালরূপী রুদ্র সংহারকারক। প্রলয় শেষে ধ্বংসের মধ্য থেকেই তাঁর উৎপত্তি ঘটে। সে কারণে ইনি শিব, শঙ্কর বা ভৈরব নামে চিহ্নিত। জনন শক্তির পরিচায়ক হিসাবে শিবলিঙ্গ। তিনি ধ্বংস ও সৃষ্টি উভয়েরই কারণ তাই তিনি ঈশ্বর। তিনি অল্পে সন্তুষ্ট হন তাই আরেক নাম আশুতোষ। পশুদের অধিপতি বলে পশুপতি নামে খ্যাত। একবার সমুদ্র মন্থনে উত্থিত অমৃত দেবতারা গ্রহণ করার পর, অসুররা পুনরায় তা মন্থন করে। এই অতিরিক্ত মন্থনজনীত কারণে সমুদ্রে হলাহল নামক বিষ উত্থিত হয়। এর ফলে সমগ্র চরাচরের প্রাণীকূল বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়। এই বিষ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দেবতারা মহাদেবের শরণাপন্ন হলে, মহাদেব উক্ত বিষ শোষণ করেন। বিষের প্রভাবে তাঁর কণ্ঠ নীল বর্ণ ধারণ করেছিল বলে শিব নীলকণ্ঠ নামে পরিচিত হন। আবার হরিবংশ পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী- ‘বিষ্ণু একবার শিবের গলা টিপে ধরেছিলেন। শিব পলায়নে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ তাতে নীল হয়ে যায়’। শিব একই সাথে পরম করুণাময় আবার কঠিন শাস্তি দানকারী। শিবের স্ত্রী পার্বতীর অন্যান্য রূপ ও নামগুলো হল- সতী, উমা, গঙ্গা, দুর্গা, ললিতা, মহামায়া, চন্ডী, চামুন্ডা, ভগবতী, আদ্যাশক্তি, গৌরী, শক্তি ও কালী।

আগে জানতাম দুনিয়ায় বাইবেলের মাতা ম্যেরির পুত্র যিশুই একমাত্র বাপ-নাই সন্তান। মহাভারতে দেখি এটা কোনো ব্যাপারই না খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। এখানে বাপ হীন মা হীন সন্তানের কোনোই অভাব নাই। মা ছাড়াই মনসার জন্ম কেমনে হলো?

চলবে

আগের পর্বের জন্য এখানে ক্লিক করুন, পরের পর্বের জন্য এখানে ক্লিক করুন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “হিন্দু ধর্মের ইতি বৃত্ত, পর্ব ০২

  1. জানার আছে অনেক কিছু। জানলাম
    জানার আছে অনেক কিছু। জানলাম না কোন কিছু।

    লেখকের প্রতি অনুরোধ থাকবে। পরিপূর্ন রেফারেন্স সহ পোস্টগুলো আপডেট করতে, তাহলে আমাদের মত অধমেরা সহজেই কন্ট্রাডিকটরি টার্মগুলো বুঝতে পারবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

99 − 91 =