আর্যরা বহিরাগত নয়…. আর্য দ্রাবির বরং একক জনগোষ্ঠী (দেবযানী ঘোষ) দ্বিতীয় পর্ব

‘আর্যরা বহিরাগত’ এই তত্ত্ব সম্পূর্ণ ভাবে ইউরোপীয় মস্তিষ্ক প্রসূত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। ইউরোপীয়রা এসেই আগে ভারতীয় ভাষা শিখে নেয়। তারপর সব পুঁথি, মহাকাব্য পড়ে ও এত বিস্তৃত, এত সভ্য সমাজের খোঁজ পেয়ে ওরা বিস্মিত হয়ে যায়। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার দর্শন, বিজ্ঞান, আয়ুর্বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, স্থাপত্য বিজ্ঞান এতটাই উন্নত ছিল যে অষ্টাদশ শতাব্দীতেও ইউরোপীয় পণ্ডিতদের ভাবনার বাইরে ছিল। কিন্তু আত্ম অহংকারী শ্বেতাঙ্গরা মেনে নিতে পারেনি যে কৃষ্ণাঙ্গরা তাদের থেকে উন্নত। তাই শুরু হলো ক্ষমতা ও বুদ্ধির অদ্ভুত নোংরা রাজনীতির খেলা।

⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛⚛
‘আর্যরা বহিরাগত’ এই তত্ত্বের উদ্ভাবনের কারণ
******************************************************
‘আর্যরা বহিরাগত’ এই তত্ত্ব সম্পূর্ণ ভাবে ইউরোপীয় মস্তিষ্ক প্রসূত ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। ইউরোপীয়রা এসেই আগে ভারতীয় ভাষা শিখে নেয়। তারপর সব পুঁথি, মহাকাব্য পড়ে ও এত বিস্তৃত, এত সভ্য সমাজের খোঁজ পেয়ে ওরা বিস্মিত হয়ে যায়। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার দর্শন, বিজ্ঞান, আয়ুর্বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, স্থাপত্য বিজ্ঞান এতটাই উন্নত ছিল যে অষ্টাদশ শতাব্দীতেও ইউরোপীয় পণ্ডিতদের ভাবনার বাইরে ছিল। কিন্তু আত্ম অহংকারী শ্বেতাঙ্গরা মেনে নিতে পারেনি যে কৃষ্ণাঙ্গরা তাদের থেকে উন্নত। তাই শুরু হলো ক্ষমতা ও বুদ্ধির অদ্ভুত নোংরা রাজনীতির খেলা।

বিখ্যাত French Philosopher Voltaire প্রায় 200 বছর আগে বলে গেছেন

“I am convinced that everything has come down to us from the banks of the Ganges, astronomy, astrology, metempsychosis, etc. . . It does not behove us, who were only savages and barbarians when these Indian and Chinese peoples were civilized and learned, to dispute their antiquity.”

আর্যদের এই জন্য ইউরোপীয়দের মত দেখতে বলা হলো, সংস্কৃত ভাষার সাথে ইউরোপীয় ভাষার মিল দেখিয়ে ভারতীয়দের বোঝানো হলো যে বহু আগে আর্য এসেছিল আর অষ্টাদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ এসেছিল। দুজনেই একি রকম দেখতে, দুজনের ভাষার মূল ভাষাও এক। সেদিন আর্যরা তাদের সাথে বেদ নিয়ে এসেছিল ও আদি ভারতীয়দের শিক্ষিত করেছিল। ঠিক ব্রিটিশও তার সাথে ইংরাজী শিক্ষা এনেছে যা ভারতীয় সেই সময়ের শিক্ষার থেকে গুণমানে অনেক উন্নত।

এর সাথে সূক্ষ্ম ভাবে বিভাজনের নীতিও চালু হলো। উত্তর ভারতীয়দের সাদা আর্যদের বংশধর ও কালো দক্ষিণ ভারতীয়দের আদি ভারতীয় বলা হলো। ভারতীয় জাতিকে আর্য ও দ্রাবিড়, দুই ভাগে ভাগ করে দিলো। কোনো নৃতত্ত্ব, পুরাতত্ত্ব প্রমাণ দেওয়া হলো না। অবিশ্বাস ও ঘৃণার বীজ বোনা হয়ে গেলো।

অন্যদিকে ইংরেজী শিক্ষা চালু হলো। কলকাতা ছিল সে সময় ব্রিটিশ রাজধানী। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রতিষ্ঠা হলো। ভারতীয় প্রথাগত শিক্ষা উঠিয়ে ব্রিটিশ শিক্ষা পদ্ধতি শুরু হলো। এই সব শিক্ষা পদ্ধতি মূলতঃ মিশনারী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হলো। সনাতনী হিন্দু ধর্মের কোনো ভাল দিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে তুলে ধরা হলো না। কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু ধর্ম, এটাই প্রচার হলো। ঠিক এই সময় ইউরোপীয়রা বেদ, মনুসংহিতার অনুবাদ করলো। সেখানেও অনেক অসত্য ও ভুল ব্যাখ্যা হলো। শিক্ষিত সমাজ ধীরে ধীরে হিন্দু ধর্মের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে গেলো। যেহেতু বাংলায় প্রথম ইংরেজি শিক্ষা শুরু হয়েছিল, বাঙালি হিন্দু ধর্ম বিমুখ হয়ে গেলো। স্বামী বিবেকানন্দ ও ঋষি অরবিন্দ ছাড়া অন্য কেউ হিন্দু ধর্মের হয়ে কথা বললেন না। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস হারিয়ে গেলো।

প্রাচীন কাল থেকে ভারতীয় সভ্যতাই একমাত্র সভ্যতা যার ধর্ম অপরিবর্তিত আছে। আর তার ভিতরের সত্যতা কেউ অনুভব না করে বিদেশী শিক্ষা পদ্ধতি যে উন্নততর, সবাই এক বাক্যে মেনে নিলো। আর এই ভাবেই শুরু হলো দেশীয় সভ্যতার প্রতি অবজ্ঞা ও অবহেলা। আর্যভট্ট, বরাহমিহির, সুশ্রুত, ধন্বন্তরি, কপিল মুনি, ঋষি গৌতম বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেলো। হিন্দু ধর্মের বদলে অন্য ধর্মের কথা বলা ফ্যাশন হয়ে গেলো। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য বলিদান হয়ে গেলো আমাদের সভ্যতা আর আমরা নির্বিকারে সেটা মেনে নিলাম।

এদিকে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় ও দক্ষিণ ভারতে শুরু হলো অন্য খেলা। আর্যদের জন্য যে তারা তাদের বাসস্থান হারিয়েছে, সেটা মগজ ধোলাই করে ঢোকানো হলো। শুরু হলো মিশনারীদের ধর্মান্তর অভিযান।

ঋষি অরবিন্দ সঠিক মূল্যায়ন করেছিলেন যে ভারতে বহু পূর্বে আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক সম্পূর্ণ ঐক্য ছিল যা হিমালয় পর্বত ও সমুদ্রের মাঝখানের ভূমিতে মানবতার বিকাশ ঘটিয়েছিল। পাশ্চাত্য সভ্যতা শিল্প বিপ্লবের তিনশ বছর পরেই শ্বাসরোধ হয়ে যাচ্ছে। এর কোনো দিশা, সুস্থ সীমা নেই, লোভ ও স্বার্থপরতা ছাড়া কিছু বেঁচে নেই। আর ভারত একাই এমন এক গভীরতর মূল্যবোধ সংরক্ষণ করে এসেছে যে মানুষ থেকে মানবে পরিণত হয়েছে। যেদিন আমরা ভারতের প্রাচীনত্ব বুঝতে পারবো, আমরা তার এত বছর ধরে বেঁচে থাকার শক্তি ও উৎস খুঁজে পাবো। এই ভাবেই ভারত বেঁচে থাকবে, এই অবক্ষয়ের মধ্যেও। আর ভবিষ্যতে সমগ্র বিশ্বকে আবার পথ দেখাবে কিনা, সেটা একটা প্রশ্ন।

?w=485&h=322″ width=”512″ />

আর্যরা বহিরাগত আক্রমণকারী – একটি ভুল তত্ত্ব
**********************************************

ডঃ আম্বেদকরের একটি উক্তি দিয়ে শুরু করছি।

” The theory of (Aryan) invasion is an invention. It’s a perversion of scientific investigation, it is allowed to evolve out of facts…… It falls to the ground at every point. All available evidence shows that India’s civilization, whose roots go back even before the Harappan Civilization, grew on Indian soil. As the US Archaeologist Jim Shaffer puts it. “

১. আর্যরা ঘোড়ায় টানা রথে উত্তর পশ্চিম ভারতের দূর্গম পার্বত্য অঞ্চল পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করে। সঙ্গে তাদের লোহার আধুনিক অস্ত্র ছিল। হরোপ্পা সভ্যতায় এই দুটোর কোনটাই পাওয়া যায়নি বলা হয়।
** সম্পুর্ন ভূল একটি ধারনা। এই দূর্গম পার্বত্য অঞ্চল কোনভাবেই রথে করে অতিক্রম করা সম্ভব ছিল না। পরবর্তী সময়ে খননকার্যে শুধু সিন্ধু সভ্যতা নয় তারও আগের সময়েও ভারতে ঘোড়ার ব্যবহার হত বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। সিন্ধু সভ্যতার একটি সীলমোহরে চাকার চিহ্ন পাওয়া যায়। অর্থাৎ তারা চাকার ব্যবহার জানতো।

বেদে ‘আয়াস’ শব্দের মানে লোহা বলা হয়। যদিও জার্মান ও ল্যাটিনে ‘আয়াস’ শব্দের মানে ধাতব আকরিক। যজুর্বেদ ও অথর্ববেদে বিভিন্ন রঙের আয়াস যেমন লাল, সবুজ এর উল্লেখ আছে। অর্থাৎ এটা একটি শব্দ যেটা সম্ভবত ধাতুর পরিবর্তে ব্যবহৃত হত।

ঋকবেদে আর্যদের শত্রুরাও ‘আয়াস’ তৈরী অস্ত্র ব্যবহার করে তাদের নগর তৈরী করেছিল। অর্থাৎ সেই হিসেবে সেই সময় লোহার ব্যবহার সবাই জানতো।
বালুচিস্তানের বর্ডারে খ্রীঃ পূঃ ৩৬০০ তে ঘোড়ার নমুনা পাওয়া যায়। গুজরাট উপকুলে খ্রীঃ পূঃ ২৩০০ তে ঘোড়ার জিনের নমুনা পাওয়া যায়।

২. আর্যদের আক্রমনে সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস হয়নি, সেটা এখন পুরাতাত্বিকভাবে প্রমানিত সত্য। আভ্যন্তরীন কারন ও ভয়াবহ বন্যা ছিল ধ্বংসের কারন। S R Rao এবং The national Institute of Oceanography র খননকার্যে দ্বারকা ও বেট দ্বারকা দুই শহরের নমুনা পাওয়া গেছে যা সিন্ধু সভ্যতা ও আর্য সভ্যতার মধ্যবর্তী। সেখানেও কোন বিদেশী প্রভাব দেখা যায়নি।

৩. সিন্ধু সভ্যতার ধর্ম ও আর্য সভ্যতার ধর্ম আলাদা ছিল বলে Wheeler উল্লেখ করেন যিনি ধর্ম বিষয়ে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন না। তিনি সিন্ধু সিভ্যতার মানুষ শৈব ছিলেন বলেন। গুজরাটের লোথাল, রাজস্থানের কালিবাঙ্গান অঞ্চলে বৈদিক শাস্ত্র অনুযায়ী ব্যবহৃত পূজা ও যজ্ঞের জিনিসপত্র পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ধর্ম একই ছিল। শৈব ধর্ম বৈদিক ধর্মেরই একটি শাখা, সেটা আমরা সবাই জানি।

. সিন্ধু সভ্যতা সিন্ধু নদীর পশ্চিমে নয়, পূর্বে বিস্তৃত ছিল, সেটা পরবর্তী খননকার্যে প্রমানিত। পাঞ্জাব ও রাজস্থানের এইসব অঞ্চল প্রাচীন সরস্বতী যা বর্তমানে অবলুপ্ত নদীর ধারে ছিল। ঋকবেদে সরস্বতী নদী সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত হয়েছে ও ‘নদীমাতা’ বলে অভিহিত হয়েছে। কাজেই সিন্ধু সভ্যতার সাথে বৈদিক সভ্যতা যুক্ত ছিল। বর্তমান গবেষণায় দেখা যাচ্ছে সরস্বতী যা একসময় বিশাল এক নদী ছিল তা ধ্বংস হয়ে যায় ১৫০০ খ্রীঃ পূঃ এর আগেই। সেক্ষেত্রে ঋকবেদে সরস্বতীর উল্লেখ আশ্চর্যজনক কারণ এই তত্ত্ব অনুযায়ী আর্যদের ভারতে আগমনের সময় খ্রীঃ পুঃ 1500 শতাব্দী।

৫. ঋকবেদে বিভিন্ন নক্ষত্রের হিসেবে যে সময়ের হিসাব পাওয়া যায় তা খ্রীঃ পূঃ ২৪০০ এর। তারা সেই সময়েও জ্যোতির্বিজ্ঞান শাস্ত্রে পারদর্শী ছিল ও ভারতে বসবাস করতো।

৬. ঋক বেদের অনুবাদ করেন গ্রিফিথ ও তাতে বলেন যে আর্যরা সমুদ্র সম্বন্ধে অবগত ছিল। 100 বারের মত ‘সমুদ্র’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে, বহুবার জাহাজের উল্লেখ আছে, নদী যে সমুদ্রে মিশেছে তার উল্লেখ আছে। অর্থাৎ আর্যরা খুব ভাল ভাবেই সমুদ্রের সাথে পরিচিত ছিল। গ্রিফিথ সমুদ্রের মানে ocean লিখেও যখন অন্য ইউরোপীয় পণ্ডিতরা বললেন যে আর্যরা সমুদ্র মানে বড় জলাশয় বা নদী অর্থে ব্যবহার করেছে, উনি কিন্তু একবারো তাঁর নিজের লেখার উল্লেখ বা ব্যাখ্যা করেননি।

৭. সমগ্র ঋক বেদে আর্যদের আদি ভূমি হিসাবে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলকে বলা হয়। অন্য কোনো বিদেশী স্থানের উল্লেখ পর্যন্ত নেই। বহিরাগত কোনো জাতির পক্ষে তার নিজের মাতৃভূমি এত সহজেই ভোলা সম্ভব নয়

৮. আলেকজান্ডারের আগে ভারতে বড় রকম বহিরাগত আক্রমণকারী আসেনি। কোথাও তার কোনো প্রমাণ নেই।

৯. বৈদিক সংস্কৃতি যদি ভারতের বাইরের মানে ইউরোপীয় সংস্কৃতি হয়, তবে অন্য কোনো ইউরোপীয় জন গোষ্ঠীর মধ্যে বৈদিক সংস্কৃতির ছাপ পাওয়া যেতো। তেমন কোনো প্রমাণ কিন্তু নেই। বৈদিক স্লোক ভারত ছাড়া অন্য কোথাও উল্লেখ নেই।

১০. ঋক বেদে যে সমস্ত গাছপালার নাম পাওয়া যায়, তারা কেউ উত্তরের ঠাণ্ডা অঞ্চলের নয়, বরঞ্চ ভারতীয় উপমহাদেশের।

১১. সংস্কৃত ভারতের বাইরের ভাষা নয়। ঋক বেদের বৈদিক সংস্কৃত বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়ে আজকের সংস্কৃত হয়েছে। ভারতের বাইরে অন্য কোথাও সংস্কৃত ভাষার প্রয়োগ বা প্রচলন নেই। ইউরোপীয় ভাষার সাথে সামঞ্জস্য প্রমাণ করে না যে সংস্কৃত ইউরোপের ভাষা। ভাষা বিভিন্ন ভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং তার উৎস দিয়ে জনজাতির উৎপত্তি খোঁজা বৈজ্ঞানিক ভাবে সিদ্ধ নয়।
সংস্কৃত সব ভাষার আদি এটা প্রমাণিত। সব থেকে বেশি ব্যঞ্জন বর্ণের ব্যবহার সংস্কৃত ভাষায় দেখা যায়।

ক্রমশ…

প্রথম পর্বঃ এখানে
© দেবযানী ঘোষ

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 17 = 19