বাঙালি নাকি মুসলমান?

বাঙালি নাকি মুসলমান? জাতির জনক কে, ইব্রাহীম নাকি শেখ মুজিব? এ প্রশ্ন দু’টো বাংলাদেশে বেশ প্রচলিত। উত্তরটাও মোটে অপ্রচলিত নয়। এদেশের আমার মনে হয় নব্বই ভাগ মানুষই নিজেকে বাঙালি হিসেবে কল্পনা করতে লজ্জাবোধ করলেও তিনি যে মুসলমান সেটা অকুণ্ঠ স্বীকার করেন। আর শেখ মুজিব যে জাতির জনক নন বরং ইব্রাহীম সে ব্যাপারেও এই নব্বই জন বেশ অটল। মজার বিষয় হচ্ছে ইনাদের জিয়াকে অথবা জিন্নাহকে জাতির পিতা মানতে কখনোই কোন সমস্যা হয়নি। অবশ্য পালিত প্রাণী কখনোই তার পালকের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনা।

আমি লেখাটা এভাবে শুরু করলাম কারণ এদেশে ধর্মীয় গোঁড়ামি কোন পর্যায়ে আছে এবং সে যে নিজেই নিজের সাথে সাংঘর্ষিক তার এর চেয়ে বড় চাক্ষুষ প্রমাণ আর হতে পারেনা। ঐতিহাসিক বইগুলো একটু ঘাঁটলে দেখা যায় এদেশে ধর্মের জন্য এই যুক্তিহীন উন্মাদনার বীজটা আমাদেরই স্বনামধন্য রাজনীতিবীদরা (আমি পূর্ণ সম্মান দেখিয়ে বলছি) চল্লিশের দশকে বপন করেছিলেন। এর আগে পর্যন্ত প্রতাপ মজুমদার আর মামুন মিয়া একই ছিলেন, বাঙাল ছিলেন, বাঙালি ছিলেন। লাহোর প্রস্তাব উত্থাপিত হয় আর প্রতাপ মজুমদার হিন্দু হতে থাকেন, মামুন মিয়া মুসলমান। অবশ্য হিন্দুরা হিন্দু হওয়ার আগে বাঙালি হওয়া পছন্দ করলেও মুসলমানরা মুসলমান হওয়ার আগে মুসলমান হতেই পছন্দ করলেন এবং পরেও মুসলমান হয়ে বাঙালিত্বের ‘কালিমা’ মুছে দিতে উদ্ধত হলেন। সাদরে ‘পাকিস্তান’ গ্রহণ করলেন যার পাক বা পবিত্রতা চিরকাল লক্ষ মানুষের রক্ত দিয়ে ওযু করার মাধ্যমে রক্ষিত হয়। আমাদের মুসলমানরাও সে অমৃতে ওযু করে পবিত্র হলেন।

ধর্মের ব্যাপারে এদেশের মানুষের সুড়সুড়িটা যুগযুগ ধরেই মাত্রাতিরিক্ত। এরা সকল যৌক্তিকতা মানতে চাইলেও ধর্মের ব্যাপারে বড় বেশি অযৌক্তিক। তাই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকেও এ ব্যাপারে সর্বাত্মক রাজনৈতিক খেলা খেলতে কুণ্ঠাবোধ করতে দেখিনা। তাইতো এখনো আমাদের সংবিধানে ধর্ম নিরপেক্ষতা নামক শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে দেখা যায়। আমাদের প্রধান বিমানবন্দরের নাম কোন জাতীয় বীরের নামে না হয়ে বরং একজন ধর্ম প্রচারকের নামে হয়। তাইতো এদেশে বারবার ধর্ম কোথায় যেন উড়ে যাওয়ার হুমকিতে পড়ে গিয়ে নাসিরনগর বা সাঁওতালপল্লী করে। এ অবশ্য আমাদের ধর্মপ্রাণ মুসলিম ভাইদের মহান কর্তব্য। এ কর্তব্য আমাদের মুসলিম ভাইরা ওয়াজে দেয়া ‘জিহাদ’-এর ডাক থেকেই পেয়ে থাকেন। একবার এক হুজুরকে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম ওয়াজ হল ধর্ম প্রচার। কিন্তু সে প্রচার যে অন্য ধর্মের শবের আহ্বান সেটা জানা ছিলনা। আরেকটি ক্ষেত্র অবশ্য আছে। কওমি মাদ্রাসা। বর্তমানে মাঝে মাঝে মনে হয় দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে কওমি মাদ্রাসা সর্বোপরি মাদ্রাসা বৃদ্ধির হার বেশি। বেশ ভালই হচ্ছে এতে। দেশের অধিকাংশ মানুষই বিজ্ঞানের যৌক্তিক ভুবনকে ঠেলে দিয়ে সন্তানদের অযৌক্তিকভাবে ধর্মান্ধ করে শক্তপোক্ত ‘আস্তিক’ বানাচ্ছে। এরা ‘ধর্ম’ শব্দটির অর্থ হিসেবে ‘আদর্শ’ না জেনে বরং ‘অন্ধ বিশ্বাস’ জানে। অথচ কত ফারাক ‘আদর্শ’ আর ‘অন্ধ বিশ্বাস’ এ দুটির মাঝে! আদর্শ যৌক্তিকতা মানলেও আমাদের কাছে অন্ধত্বই শ্রেয়। এতে কোনকিছু করলেও সেটা না দেখে হয় আর এতেই সাত খুন মাফ।

কওমি মাদ্রাসা বা যেকোন মাদ্রাসাকেই শুধু দোষ দিবো কিভাবে? আমরা যারা স্কুলে পড়েছি তারাও বাংলা বইয়ে কবিতার মাধ্যমে ‘মোনাজাত’ করার কথা ভেবেছি আর ‘ধর্মশিক্ষা’ নামক পাঠ্যে ক্লাস করতে গিয়ে স্পষ্টভাবে অন্য ধর্মাবলম্বী থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছি। আমি বরং বলবো মাদ্রাসা শিক্ষা যা প্রকাশ্যে করছে স্কুলশিক্ষা সেটাই অসাম্প্রদায়িকতার চাদরে ঢেকে করছে। ফলস্বরূপ আমি যখন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে যাই তখন জনৈক শিক্ষিকার রোষানলে দগ্ধ হই মুক্তচিন্তার অধিকারী হওয়ায়। ক্লাসে বসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার মুখে শুনতে হয় ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের ‘মাহাত্ত্ব’। দেশ এই পর্যায়ে পঁচেছে, আরো পঁচবে। তাই মাঝে মাঝেই সমাজতন্ত্রীদেরও মৌলবাদের পা চাটতে দেখা যায়। আর আমাদের সরকার পক্ষ যাদের কিনা আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সবচেয়ে বড় ধারক হিসেবে চিনতাম তাদেরও আজ তাই সে চেতনার বাহক দেহের গোড়ালি পঁচে গেছে। এ বস্তগায় দেহের দাঁড়িয়ে থাকাটা বেশ কষ্টকর। অবশ্য মানুষের মনে যেখানে পাকিস্তানের কাছে পরাধীনতাটা সমর্থন করে সেখানে মৌলবাদের চেতনাকে দাঁড়াতে দিয়ে তাঁরা বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন যা হাততালি পাবার যোগ্য। বামপন্থীরাও এ যোগ্যতা রাখেন অবশ্যই।

দেশ এভাবে পঁচবে, পঁচতে থাকবে। যতদিন না এই পঁচে যাওয়া বৃক্ষের সার থেকে নতুন বৃক্ষ হচ্ছে দেশ ততদিন পঁচবে। এখন আর আফসোস হয়না এই পঁচে যাওয়া নিয়ে। শুধু আফসোস হয়ত নতুন বৃক্ষ দেখা হবে না। কারণ এ পঁচন বড় ধীর। শীতকাল চলছে আরো বহুকাল চলবে। তবে বসন্ত আসবে। আমরা হয়ত কৃষ্ণচূড়া ফুলটা দেখে যেতে পারবো না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + 4 =