এটা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বিশ্বের দ্বিতীয় দরিদ্রতম দেশ ছিল বাংলাদেশ। আর সেই বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন জিডিপির ভিত্তিতে বিশ্বে ৪৫তম এবং ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে ৩৩তম স্থান অধিকার করেছে। বাংলাদেশ এখন আর ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নয়, বরং ঐ ঝুড়ি এখন পরিপূর্ণ হয়ে উপচে পড়ছে। দেশে এখন আর দুর্ভিক্ষ হয় না, মঙ্গা শব্দটিও নির্বাসিত। মানুষের জীবনযাত্রায় ঘটে গেছে এক নিরব পরিবর্তন। দেশব্যাপী শুরু হওয়া কর্মযজ্ঞে শহর-গ্রামের পার্থক্য অনেকটাই কমে যেতে শুরু করেছে। পুরোপুরি পাল্টে গেছে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনযাত্রার চিত্র। রঙিন টিভি, ফ্রিজ, খাট-পালঙ্ক থেকে শুরু করে আধুনিক গৃহসজ্জার প্রায় সব সামগ্রীই বিদ্যমান এসব পরিবারে। পরিবারের আকার সীমিত করার জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা থেকে শুরু করে সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সব ক্ষেত্রেই পরিবারগুলো যথেষ্ট সচেতন। উন্নয়নের যে সূচকগুলো সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখে সেগুলো এই সচেতনতার কারণে আমাদের অগ্রগতিতে এক বিরাট ভূমিকা পালন করে চলেছে। কৃষিতেও বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। কৃষি জমি কমতে থাকা, জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। সরকারের যুগোপযোগী পরিকল্পনা, পরিশ্রমী কৃষক এবং মেধাবী কৃষি বিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণবিদদের যৌথ প্রয়াসেই এ সাফল্য। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে যেখানে হেক্টর প্রতি ৩ টন ধান উৎপন্ন হতো, এখন তা ৬ টনেরও বেশি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে কৃষি ক্ষেত্রে ভর্তুকিসহ নানা প্রণোদনামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করাতে আজকে প্রায় ১৭-১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে ভাতের যোগান দিতে এক কেজি চালও আমদানি করতে হয় না। ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সফলতা বাড়ছে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) বেশ কয়েকটি জাত ছাড়াও পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) মোট ১৩টি প্রতিকূল পরিবেশ সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। ২০১৩ সালে বিশ্বে প্রথমবারের মতো জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশের কৃষি গবেষকরা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ২০১৩ সালে সর্বপ্রথম জেনেটিক্যালি মোডিফায়েড ফসল বিটি বেগুনের চারটি জাত অবমুক্ত করেছে। মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন চতুর্থ। মাছ রফতানি বেড়েছে ১৩৫ গুণ। ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মাছের উৎপাদন ৫৩ শতাংশ বেড়েছে। দেশের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে গার্মেন্টস শিল্প। গত ৩০ বছরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বাংলাদেশের সর্বমোট প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয়ের ক্ষেত্রে এককভাবে শতকরা ৮০ ভাগ অর্জনের পাশাপাশি গার্মেন্টস খাত প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪০ লক্ষাধিক দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি পরোক্ষভাবে আরও প্রায় এক থেকে দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থানে করেছে। দেশে নীরব বিপ্লব ঘটেছে পোল্ট্রি শিল্পেও। এছাড়াও বাংলাদেশ এখন ওষুধ রফতানিকারক দেশ। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, পাবনা, খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ২৬৯টি ছোট-বড় ওষুধ কারখানার মধ্যে বেশ কিছু কারখানা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়েছে। বিশ্বমানের ৪২টি ওষুধ কারখানাতে উৎপাদিত কোটি কোটি টাকার ওষুধ আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, জাপান, ইতালি, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ বিশ্বের ৮৭টি দেশে রফতানি করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এক অন্যরকম কর্মযজ্ঞের পেছনে ছুটছে। বর্তমানে সরকার যেমন দারুণ আত্মবিশ্বাসী তেমনি দেশের প্রতিটি কাজপাগল মানুষও আত্মবিশাসী। তবে এই আত্মবিশ্বাসকে জাগিয়ে রাখতে হলে দেশবাসীর সকলকেই সচেতন থাকতে হবে, কেউ যেন এই অপার সম্ভাবনা আর অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে। সবার সম্মিলিত কর্ম প্রচেষ্টাতেই বাংলাদেশ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এক উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে ঠাঁই নেবে – এটা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

94 − 89 =