সমপ্রেমী নিষিদ্ধ প্রত্যাশা

ঠিক তারিখটা মনে নেই । সেকি বিশাল ঝগড়া করে বেরিয়ে পরলাম । আর ফিরিনি । সে যে বেরিয়েছি তো আর কি ! রাগ করে বেরিয়েছিতো বটে, তা যাবো কোথায় ? মসজিদের বারান্দায় বসে বসে ভাবছি । রাতটা পার করি আপাতত । চোখ গড়িয়ে পানি বের হচ্ছে । কেউ নেই , জিকির শেষে বোধ করি সবাই বাড়ি ফিরেছে । হঠাৎ পেছন থেকে পিঠে হাত দিয়ে বললে “আল্লাহর ভয় থাকা ভালো; নাম কি ?” কোন রকম চোখ মুছে তাকিয়ে দেখলাম সুদর্শন এক মধ্য বয়েসী লোক, মুখে হালকা দাঁড়ি, মাথায় সাদা টুপি, ইতোমধ্যে নামাজে দাঁড়িয়েও গিয়েছে । আমি চুপচাপ বসে বসে তার নামাজ পড়া দেখলাম ।

রাতের আবহ কেটে সকাল হলো। ঘুম ভাঙ্গলো আজমের নড়াচাড়ায় । ফজর নামাজ কখনোই ওকে কামাই দিতে দেখিনি। বরাবরের মত আমাকেও ডেকে তোলা ওর কাছে যেন প্রতিদিনের কাজ । মসজিদ থেকে ফিরেই নাস্তা করা মোটামুটি এখন ওর শখের অভ্যেসে পরিণত হয়েছে । নাস্তা না দেখতে পেলে কিছুটা অভিমানই করে । আমার সোহাগী শখ এখন আমার সকালের ঘুমের কাল ! ও খুব সুন্দর করে কোরান তিলওয়াত করতে পারে । ওর পুরুষ্কার আর মেডেলের ময়লা পরিষ্কার করতে করতে আমি মাঝে মাঝে ভাবি এত সুর ওর গলায় ! মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরুর বহু আগে পাওয়া এসব মেডেল । এত সুর করে কোরান তিলওয়াত করার প্রতিভা সত্যি খুব বিরল । আমি ওকে প্রায়ই বলি নজরুল সঙ্গীত ওর গলায় ভালো যেত । আজম আমার তামাশায় কিছু মনে করে না বরং ও সোহাগ করে হেসে উড়িয়ে দেয় নতুবা মুচকি হেসে চুপ থাকে ।

আমাদের বাসাটা খুব ছোট । কিছু ছোট ছোট ছেলেমেয়ে আসে পড়তে আমার কাছে । আজম অবশ্য অনেক করে বলে তিন রুমের বাসা নিতে আমিই বরং খরচ না বাড়ানোর ভয়ে নিষেধ করি । আজমের মাঝে এক ধরনের বিশালতা দেখিছি আমি । ওর চোখে একধরনের অদৃষ্য কান্না দেখেছি আমি । প্রথম প্রথম মোনাজাতে ও বেশ কাঁদতো, বিড়বিড় করে কি যেন চাইতো আর কাঁদতো । এখনো মোনাজাতে চোখের পানি ফেলে তবে এখন আর বিড়বিড় করে কিছু চায় না । কি চাইতো ও আল্লাহর কাছে ? মাঝেমাঝে আমিও ভাবি ।

সেদিনের কথা ! আমি বিছানায় শুয়ে আছি । হঠাত করে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো উঠতে । জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে ! আমাকে জড়িয়ে কপালে আদর দেয়ার পর ডান হাতে বেঁধে দিল বিশাল এক তাবিজ । বললাম “এটা কি ?” ও বলে কিনা “আল্লাহর কালাম; সাথে থাকা ভালো; অশুভ সবকিছু দূরে থাকবে এটা সাথে থাকলে” । আমিও হেসে জড়িয়ে ধরলাম আর ওকেও বললাম এরকম একটা তাবিজ পড়তে । মনে মনে ভাবলাম বিশ্বাসের বাঁচপানায় আমার আহ্লাদী জীবন ।

ভালোবাসা কি পাপ ? আমি কখন ভয়ে ওকে জিজ্ঞেস করি না । কিংবা এই বিষয়ে আজমও আমাকে কিছু বলে না । তবে প্রায়ই ও আমার বুকের উপর শুয়ে বলে “আল্লাহ মহান, যে ভালোবাসতে জানে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন” । আমি ওর মতো এত ধর্ম বুঝি না তবে এতটুকু বুঝি ভালোবাসা পবিত্র আর এটা আজম আমাকে শিখিয়েছে । সৃষ্টির উৎস ঐ ভালোবাসা ।

তবে মাঝে মাঝে খুব ভয় হয় আমার । প্রচন্ড ভয় । হিংস্র পশুর ভয় না; মানুষের ভয় । মানুষ গুলো বেশ হিংস্র, পশুর চেয়েও হিংস্র । ওরা ভালোবাসতে জানে না, ভালবাসতে চায় না, ওরা মেরে ফেলে, জবাই করে, মাথা কেটে উৎসব করে, রাজনীতি করে, ধর্ষণ করে, ধর্ম দিয়ে ভালোবাসাকে বিষাক্ত করে ।

ওর দেয়া তাবিজটা বার বার হাত দিয়ে ধরে দেখি ঠিক মত আছে কিনা । সমাজের সব অশুভ যেন আমাদের এই ভালোবাসায় গড়া জীবন থেকে দূরে থাকে এই নিষিদ্ধ প্রত্যাশা ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

55 − 52 =