কানুনে মাসউদী


কানুনে মাসউদী

কানুনে মাসউদীর কতকগুলি পাণ্ডুলিপি ব্রিটিশ মিউজিয়াম, বার্লিন ও ইস্তাম্বুল প্রভূতি নানা স্থানে বর্তমান রয়েছে ।

প্রস্থখানি ১১ খন্ডের। Schoy গ্রন্থের ওয় খণ্ডটির অনুবাদ করেছেন ও ভাষ্য লিখেছেন । আরও কয়েক খণ্ডের অংশ বিশেষ এখানে ওখানে অনুদিত হয়েছে। গ্রন্থখানি সম্পূর্ণভাবে সঙ্কলিত ও অনুদিত হোলে Astronomy-তে এই সময়কার মুসলিম বিজ্ঞানীগণ কতটা এগিয়ে গিয়েছিলেন সে সঠিক ভাবে বোঝা যেতো। osmania oriental Publications Bureau থেকে । ১৯৫০ খৃস্টাব্দে প্রথম ৪ খণ্ডের আরবী সঙ্কলন প্রকাশিত হয়েছে । গ্রন্থে আলবেরুনী তার পৃর্বেকার বহু বিজ্ঞানী বিশেষ করে জ্যোতিবিজ্ঞানী ও তাদের প্রণীত জিজ-এর কথা উল্লেখ করেছেন। এর অনেকগুলিরই কোন সন্ধান পাওয়া যায় না। এ গ্রন্থে যে সমস্ত জিজ-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হলো অস্টম শতাব্দীর–আবু ইসহাক আল ফাজারীর ‘আজ জিজ আল সিনিল আরাবী (আরবদের সন অর্থাৎ হিজরী বর্ষ অনুযায়ী জিজ), আবুল হাসান আলী বিন জিয়াদের ‘আজ জিজ আশশাহ’ ইয়াকুব ইবনে তারিকের ‘আজ জিজ আলমাহলুল মিন আস্ সিন্দহিন্দলি দারাজাত দাবাজা’, আবু আসিম ইসামের জিজ, আবু বকর মুহম্মদ বিন ও ঘর বিন আলফার-রুখানের জিজ । নবম শতাব্দীর —আহমদ বিন আবদুল্লা হাবশি আল-হাসিবের জিজ, আহমদ বিন আবু দাউদ আবু হানিফা আল দিনওয়ারীর জিজ, মুহম্মদ বিন মুসা আলখারেজমির জিজ, ব্রহ্ম সিদ্ধান্তের জিজ’ ‘আজ জিজ সিন্দহিন্দ’, আল হাসান আস্সাব্বাহের ‘আজজিজীল মুখতারী, মুহম্মদ বিন ইসহাক ইবনে ওস্তাদ বৃন্দাদ আস্সারাখসীর জিজ, আবুল মাশারের ‘জিজুল হাজারাত, আলী বিন আল হুসায়েন আবুল কাসেম আল আলাবী ইবনোম আলম তাশশাফী আল হোসায়েনীর ‘আজ জিজ আল অাদুদী’ , দশম শতাব্দীর-আলফজল বিন হাতিম আননাইরেজীর ‘আজজিজুল কবির, আলবাত্তানীর আজজিজ আস্সাবী আবুল ওয়াফা আলকুজ্জানীর’ আজজিজুল ওয়াজিহ, মুহম্মদ বিন আবদুল আজিজ আলহাশিমীর আজুজিজ আলকামিল লিল হাশিমি’ কুশায়ার ইবনে লাব্বান আজুজিলীর আজজিজ আজ্জামী আবু মনসুর বিন আলী বিন ইরাকের আলমাজিস্তি আশ্ৰশাহী’ আজুজিজ আল হারুনী প্রভূতি ।

>>কানুনে মাসউদীর ১ম ও ২য় খণ্ডে জ্যোতিবিজ্ঞানের মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে তারই সঙ্গে রয়েছে জিজের তালিকার বিষয়গুলির ধারাবাহিক আলোচনা । এই তালিকায় হিজরী, সেলুউসিদ (Suleucid), ইয়াজদিজিরদ, ইহুদী, মিশরী (Coptic) জুলিয়ান, মাজিয়ান ( জোরোস্ত্রিয়ান ) পঞ্জিকা অনুসারে পূর্ণ তালিকা দেয়া হয়েছে । এর সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন জাতির পালপবাদি এবং তাদের রাজকীয় আদেশ, বিধি ব্যবস্থা ইত্যাদি । তার “আছরুল বাকিয়া গ্রন্থে বহু মাল-মশলা এতে রয়েছে বলা যেতে পারে ।
>>৩ য় খণ্ড হলো ত্রিকোণমিতি সম্বন্ধে । এতে দুইটি তালিকা দেয়া হয়েছে। একটি হলো প্রত্যেক ১৫ মিনিটের ব্যবধানে কোণের Sine এর পরিমাণ । এই তালিকাতে দুইট কলাম ব্যবহীত হয়েছে। এক কলামে এক মিনিটের পরিবর্তনে যে বৃদ্ধি দেখতে পাওয়া যায় এবং অন্যটিতে সিকি ডিগ্রীর পরিবর্তনে যে বৃদ্ধি দেখতে পাওয়া যায় ত৷ দেখানো হয়েছে । দ্বিতীয় তালিকাটি হলো কোণের Tan এর পরিমাণ । এতে দশমিক এর ৫ম স্থান পর্যন্ত মূল্যমান দেয়া হয়েছে ।
>>৪র্থ খণ্ডে Spherical Astronomy নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। হয়েছে। এর তালিকাগুলোতে প্রত্যেক ৫ ডিগ্রীর দশমিক এর ৪র্থ স্থান পর্যন্ত মূল্যমান দেয়া হয়েছে । এর প্রথম পরিচ্ছেদে Constant 8 এর সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে । আলবেরুনীর মতে এর মূল্যমান হলো ৩৩ , ৩৫° ডিগ্রি ।

২য় পরিচ্ছেদে Ecliptic এর বিন্দুর Declination সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে । এর পর ø1 এবং ø2 এর তালিকা দেয়া হয়েছে।
৪থ ৫ম ও ৬ষ্ঠ পরিচেছদে Equatorial থেকে Ecliptic এ পরিবর্তন এবং উল্টোভাবে Ecliptic থেকে Equatorial এ পরিবর্তন করবার পন্থা দেখানো হয়েছে ।
৭ম থেকে ১৭শ পরিচ্ছেদে নমন (Gnomon) সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে ।
১০ম পরিচ্ছেদের সঙ্গে গজনীর অক্ষরেখার (Latitude ø – ৩৩ , ৩৫°) তালিকা দেয়া হয়েছে এবং সমান ঘন্টার দিনের আলোর স্থিতিকাল, অসমান ঘন্টার দৈর্ঘ,সুর্যের Meridian Altitude দেয়া হয়েছে।
১১শ পরিচ্ছদে tan max hs এবং 12 tan max hs এর তালিকা দেয়া হয়েছে ।
১৮শ পরিচ্ছেদে গজনীর Ax (লেমডা) এর তালিকা দেয়া হয়েছে।
২৬শ পরিচ্ছেদের অবশিস্ট পরিচ্ছেদগুলোতে সময় নিরুপণের জন্য জ্যোতিবিজ্ঞানের নিয়ম-কানুন, জ্যোতিষ কেন্দ্রে নিরূপণ, ভৌগলিক স্থান পরিবর্তনের জন্য সময় ও Ascension এর পরিবতন এবং উজ্জ্বায়নে (Cupola of the Earth) এর Ascendance নিরূপণ পদ্ধতি দেয়া হয়েছে ।
>>৫ম খণ্ডে Geodetic Problem নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ।
১ম পরিচ্ছেদে পর পর গ্রহণ দেখে কিভাবে কোন জায়গার দ্রাঘিমা Longitude বের করতে হয় তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে।
২য় পরিচ্ছেদে যে স্থানের Co-ordinate জানা আছে তা থেকে দ্বিতীয় অন্য স্থানের দূরত্ব দিয়ে কিভাবে দ্বিতীয় স্থানের দ্রাঘিমা বের করতে হবে তার বর্ণনা দেয়া হয়েছে।
৩য় পরিচ্ছেদে যে দুই জায়গার Co-ordinate জানা আছে তাদের Terrestrial দুরত্ব বের করার পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে ।
৪র্থ পরিচ্ছেদে কোন এক স্থান থেকে দুইটি নির্দিস্ট স্থানের দূরত্ব জেনে নিয়ে সেই স্থানের Co-ordinate বের করবার পদ্ধতি দেয়া হয়েছে ।
৫ম ও ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদে কোন জায়গার সাপেক্ষে অন্য জায়গার Azimath বের করা যেমন মক্কার বেলায় কিবলার Azimath বের করার পদ্ধতি দেয়া হয়েছে ।
৭ম পরিচ্ছেদে পৃথিবীর পরিধি (Circumference) বের করবার পদ্ধতি দেয়া হয়েছে ।
৮ম ও ৯ম পরিচ্ছেদে Latitude এর সমান্তর স্থানের জলবায় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে । এর সঙ্গে ১ম পৃষ্ঠায় একটি তালিকা দেয়া হয়েছে । ১০ম পরিচ্ছেদে নানা স্থানের ভৌগলিক অবস্থান দিয়ে ৬ পৃষ্ঠায় একটি তালিকা দেয়া হয়েছে ।
>>৬ষ্ঠ খণ্ডে প্রধানত সূর্যের গতি সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।
১ম পরিচ্ছেদে দুই বিভিন্ন দ্রাঘিমায় অবস্থিত জাগয়ার সময়ের পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
২য় পরিচ্ছেদে আলেকজান্দ্রা ও গজনীর দ্রাঘিমার পার্থক্য নিয়ে আলোচনার পর সূর্যের মধ্য গতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ।
৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদে টলেমী, হিপারকাস থেকে শুরু করে বেরুনীর নিজস্ব ২টি পর্যবেক্ষণ নিয়ে Equinox এর ২৩টি পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ।
এই তালিকাটি এবং এই সঙ্গে গ্রন্থকারের আলোচনা প্রকাশিত হোলে মুসলিম বিজ্ঞানী সূর্যের মধ্যগতি (Solar Mean Motion) কি ভাবে বের করেছিলেন তা বোঝা যাবে ।

৭ম ও ৮ম পরিচ্ছেদে Solar Apogee-র গতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে । গ্রন্থকার o: o, o, ৮, ৩8, ৩১, ২৫ এবং প্রত্যেক দিনের ১° মুল্যমান নিরূপণ করেছেন ।
তার মতে সূর্যের প্রত্যেক দিনের মধ্যগতি হলো ০ : ৫৯, ৮, ১২, ৭, ৫৬, ৩৩° ।
৯ম পরিচ্ছেদে সূর্যের মধ্যগতি (Solar Mean Motion) এবং Apsidal গতি (Apsidal Motion)-র তালিকা দেয়া হয়েছে । এতে মিশরীয় ১, ২, ৩•••৩০ বৎসরের ৬ দশমিক পর্যস্ত মূল্যে দেয়া হয়েছে ।
ইয়াজদিগির অব্দের ৪০০, ৪৩০, ৪৬০•••৮২০ অব্দের মধ্য সূর্য—(Mean Sun) 3 Apogee ø অবস্থান দেয়া হয়েছে ।
১১শ পরিচ্ছেদে Solar Fquation-র একটি তালিকা দেয়া হয়েছে প্রত্যেক ডিগ্রীর ৪র্থ স্থান পর্যন্ত (সর্বোচ্চ হলো ১ ; ৫৯, ৩১, ৪০, ৩০° । তালিকাগত পার্থক্যও এর সঙ্গে যোগ করে দেয়া হয়েছে । গ্রন্থের শেষে Equation of Tim এর একটি পরিচ্ছেদ রয়েছে ।
>>৭ম খণ্ডে চন্দ্রের গতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে । এতে রয়েছে Mean Motion Equation ও Latitude নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
১০ম ও ১১শ পরিচ্ছেদে চন্দ্র ও সূর্যের Parallax এর Latitude ও Longitude সম্বন্ধে বর্ণনা করা হয়েছে তবে কোন তালিকা দেয়া হয়নি । শেষ পরিচ্ছেদে চন্দ্রের ও ছায়ার Diameter এবং পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব সম্বন্ধে আলোচনা করা হয়েছে ।
>>৮ম খণ্ডে মোট ১৭ পরিচ্ছেদে গ্রহণ ও চন্দ্রের দৃশ্যমানতা (Lunar Visibility) নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে । চন্দ্র ও সূর্যের কৌণিক গতি(Angular Velocity), দৈর্ঘ বৃদ্ধির অনুপাত (Rate of Elongation) [১ম পৃষ্ঠা ব্যাপী তালিকা] Mean Conjunction, pposition Lunar Shadow (১ম পৃষ্ঠা ব্যাপী তালিকা ) গ্রহণ সীমা (Eclips Limits) চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণের রং, গ্রহণের স্থিতিকাল পরিমাপ, সূর্যাম্ভ ও সূর্য উদয়ের সময়ের গ্রহণ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ।
১২শ থেকে ১৭শ পরিচ্ছেদে চন্দ্রের উপরিভাগের আলো, প্রদোষ ও প্রত্যুষকালের সংজ্ঞা, চান্দ্র মাস, চান্দ্র দিবস, ভারতীয় জ্যোতিবিজ্ঞানের তিথি, চাদ দেখা যাবে কিনা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ।
>>৯ম খণ্ডে স্থির নক্ষত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে । এই খণ্ডটি ৯ পরিচ্ছেদে সমাপ্ত । এতে গ্রহ ও স্থির নক্ষত্রের পার্থক্য, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার অধিবাসীদের স্থির নক্ষত্রে অনুরূপভাবে সাজিয়ে নেয়া, স্থির নক্ষত্রের গতি, নক্ষত্রের তালিকা (১৯ পৃষ্ঠাব্যাপী), স্থির নক্ষত্রের উদয় অস্ত আরব ও ভারতীয় জ্যোতিবিদগণ যে সমস্ত নক্ষত্রকে Lunar Mansion এর সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছেন সেগুলো নিয়ে আলোচনা রয়েছে !
>>১০ম খণ্ডে মোট ১৩ পরিচ্ছেদে ৫টি গ্রহ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে । এতে দৃশ্যমানের ব্যাপার ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে টলেমীকে অনুসরণ করা হয়েছে। এখানেও নানা তালিকা দেয়া হয়েছে ।
>>১১শ খণ্ডে শুধু জ্যোতিষ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এ খণ্ডখানি ১২ পরিচ্ছেদে সমাপ্ত। এতে সম-গহ ব্যবস্থা (Equalisation of Houses) সম্বন্ধে দুইট পদ্ধতি দেয়া হয়েছে—একটি প্রচলিত পদ্ধতি অন্যটি আলবেরুনীর নিজস্ব । দিক (Aspects), আলো বিস্থরণের (Projection of Rays) সম্বন্ধে দুইটি পদ্ধতি (একটি প্রচলিত অন্যটি আলবেরুনীর নিজস্ব) Apheses (২খৃষ্ঠাব্যাপী তালিকা) এবং Progression (৬খৃষ্ঠাব্যাপী তালিকা) বর্ষ পরিবর্তন (Year Transfers) Nativity Transfesrs, Deferent, 3 Epicycle Sectors নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ।

** লেখক পরিচিতিঃ

>আল বেরুনীঃ
ইরানের একটি স্থানের নাম বেরুন। সেখানে জন্ম হয় আবু রায়হানের। সেটা ছিল ৯৭৩ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর। তাঁর আসল নাম ছিল আবু রায়হান মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বেরুনী। ইতিহাসের তিনি বেরুনী নামে সবচেয়ে বেশী পরিচিত হন।
তাঁর বাল্যকাল কাটে বাদশাহ আবু মনসুর বিন আলী বিন ইরাকের তত্ত্বাবধানে। তাঁর নিযুক্ত শিক্ষকের কাছে তিনি পবিত্র কোরআন ও হাদিস শিক্ষা করেন। পরে জ্ঞান বিজ্ঞানের সকল শাখার নাম পরা পন্ডিতদের কাছে তিনি সকল বিষয়ে অসাধারণ জ্ঞান অর্জন করেন। ২২ বছর পর্যন্ত শিক্ষালাভ করে তিনি বিখ্যাত ব্যক্তিতে পরিণত হন।

আব্বাসীয় বংশের খলিফারা তখন মুলমান বিশ্বের নেতা ছিলেন। কিন্তু খলিফাদের অযোগ্যতা ও দুর্বলতার কারণে তাদের সাম্রাজ্যের গোলযোগ দেখা দেয় এবং বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাধীন রাজাদের উদ্ভব হয়। এসময় খাওয়ারিজম প্রদেশেও দু’জন রাজা রাজত্ব করতেন। এদের একজন হলেন দক্ষিণাংশের আবু আবদুল্লাহ এবং উত্তরাংশের মামুন বিন মাহমুদ। আবু আবু আবদুল্লাহ আল বেরীন দেখাশুনা করতেন। ৯৫৫ খৃষ্টাব্দে মামুন বিন মাহমুদআবু আবদুল্লাহকে পরাজিত করে হত্যা করেন। এর ফলে তার রাজত্বও মামুনের হাতে চলে আসে। এর ফলে আল বেরুনী অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন। তিনি খাওয়ারিজম ছেড়ে চলে যান। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তাকে অনাহারে আর অর্ধাহারে থাকতে হয়েছে। কিন্তু তিনি পথে নেছেন তাকে চলতেই হবে। এসময় জুরজানে পৌঁছে সেখানকার রাজা কাবুসের সুনজরে তিনি পড়েন। রাজা জানতে পারেন এই পথিক বিশ্ববিখ্যাত পন্ডিত আল বেরুনী। তাঁর নাম ধাম জানতে পেরে রাজা তাকে অনেক যত্ন করে নিজের দরবারে নিয়ে আসেন। রাজা কাবুস জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা করতেন। তিনি জ্ঞানী ও পন্ডিতদের খুব পছন্দ করতেন।
—বাকিটা লিংকে
রাজা কাবুস আল বেরুনীর জন্য ভাল থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। এখানে দিনগুলো তার সুখেই কাটতে থাকে। কিন্তুতিনি তার তত্ত্বাবধায়ক বাদশাহের কথা কখনও ভুলতে পারেননি। রাজা কাবুসের কাছে থাকাকালে তিন ‘আসারুল বাকিয়া’ ও তাজরী দু’শ শুয়াত’ নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। রাজার প্রতি কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ তিনি তার আমারুল বাকিয়া গ্রন্থটি রাজা কাবুসের নামে উৎসর্গ করেন।

খাওয়ারিজমের রাজা সুলতান মামুন বিন মাহমুদ জ্ঞান বিজ্ঞানের সাধক ছিলেন। তিনি জ্ঞানীদের কদর করতেন। আল বেরুনীর কথা শুনে তাকে নিজের দরবারে পেতে চাইলেন। তার কাছে আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি পাঠালেন। আল বেরুনী সুলতানের অনুরোধে ১০১১ খৃষ্টাব্দে মাতৃভূমি খাওয়ারিজমে ফিরে আসেন।সুলতান তাকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ করেন। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে আল বেরুনী জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা ও সাধনা চালিয়ে যেতে থাকেন। তিন মান মন্দির প্রতিষ্ঠা করে জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেকষণ কাজ চালান। খাওয়ারিজমের তিনি ৬/৬ বছর পর্যন্ত ছিলেন। এ সময়ে বিজ্ঞানের বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেন।

গজনীর সুলতান মাহমুদ জ্ঞানী ও পন্ডিতদের খুব সম্মান করতেন। তাঁর শাহী দরবারে প্রতিদিন দেশ বিদেশে জ্ঞানী ও গুনীদের মধ্যে বিজ্ঞান ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হত। সুলতান মামুনের রাজদরবারের জ্ঞানী ব্যক্তিদের গজনীতে পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়। পত্র পেয়ে আল বেরুনী গজনীতে সুলতান মাহমুদের সঙ্গী হিসেবে ১০১৬ থেকে ১০১৯ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত গজনীতে ছিলেন। সুলতান মাহমুদ ১৭ বার ভার আক্রমণ করেন। আল বেরুনী সুলতান মাহমুদের সাথে কয়েকবার ভারতে আসেন। তিনি সে সময়কার ভারতের শিল্প, সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানের সমৃদ্ধি দেখে অবাক হন। পরবর্তীতে তিনি ১০১৯ থেকে ১০২৯ পর্যন্ত মোট দশ বছর ভারতে থাকেন। এ সময় ভারতের জ্ঞানী গুণী ও পন্ডিতদের সাথে তিনি ভূগোল, গণিত ও ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে মতের আদান প্রদান করেন। ভারত থেকে ফিরেই তিনি রচনা করেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাবুল হিন্দ।’ সে সময়ের ভারতীয় জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য ও ধর্মীয় নিয়ম কানুন জানার জন্যে এটি একটি নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ।
বিখ্যাত পন্ডিত অধ্যাপত হামার নেহের আল বেরুনী সম্পর্কে বলেন, ভারতের জনগন ও সেদেশের সম্পর্কে আল বেরুনী গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। এর ফলে তিনি তার কিতাবুল হিন্দ গ্রন্থে একাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে ভারতের সভ্যতা সম্পর্কে ব্যাপক তথ্য প্রদান করেন।

আল বেরুনী ভার থেকে গজনীতে ফেরার কিছুদিন পরেই সুলতান মাহমুদ ইন্তেকাল করেন। তাঁর পুত্র মাসউদ ১০৩১ খৃষ্টাব্দে সিংহাসনে বসেন। সুলতান মাসউদও আল বেরুনীকে খুবই সম্মান করতেন। এ সময় আল বেরুনী ‘কানুনে মাসউদী’ নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। এটি তাঁর সেরা বেই। সুবিশাল এই গ্রন্থে আলোচনা করা হয়েছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ডে জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে, তৃতীয খন্ডে ত্রিকোনমিতি, চতুর্থখন্ডে আকৃতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান, পঞ্চম খন্ডে গ্রহ, দ্রাঘিমা, চন্দ্রসূর্যে্যর মাপ, ষষ্ঠ খন্ডে সূর্যের গতি, সপ্তম খন্ডে চন্দ্রের গতি অষ্টম খন্ডে চন্দ্রের দৃশ্যমা ও গ্রহণ, নবম খন্ডে স্থির নক্ষত্র, দশমখন্ডে ৫টি গ্রহ নিয়ে েএবং একাদশ খন্ডে জোতিষ বিজ্ঞান নিয়ে আলেঅচনা করা হয়। গ্রন্থটি সুলতান মাসউদের নামে নামকরণ করায় তিনি খুশী হন ও বহু মূল্যবান পৌপ্যমুদ্রা উপহার দেন। আল বেরুনী সেসব রৌপ্য মুদ্রা রাজকোষে জমা দিয়ে দেন। কেননা নি তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোন সম্পদ বা অর্থকড়ি কখনও নিজের কাজে জমা রাখতেন না। এমনই নির্লোভ ও ভালমানুষ ছিলেন আল বেরুনী।

আল বেরুনী বিভিন্ন বিষয়ে মানব জাতির জন্য অবদান রেখে গেছেন। তিনি তার বিভিন্ন গ্রন্থে জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়, বিভিন্ন সভ্যতার ইতিহাস, মৃত্তিকাতত্ত্ব সাগর তত্ত্ব এবং আকাশ তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। ইউরোপীয় পন্ডিতগণ আল বেরুনীর জ্ঞানের প্রশংসা করেছেন। তারা বলেন, আল বেরুনী নিজেই বিশ্বকোষ। এছাড়া তিনি একজন ভাষাবিদও ছিলেন। এক্ষেত্রে তার খ্যাতি ছিল। তিনি আরবী, ফার্সী, সিরীয়, গ্রীক, সংস্কৃতি, হিব্রু, প্রভৃতি ভাষায় পন্ডিত ছিলেন। ত্রিকোনোমিতিতে তিনি বহু তথ্র আবিষ্কার করেন।

কোপার্নিকাস বলেন, পৃথিবী সহ গ্রহগুলো সূর্য্যকে প্রদক্ষিণ করে। অথচ কোপার্নিকাসের জন্মের ৪২৫ বছর আগে আল বেরুনী বলে গেছেন, পৃথিবী বৃত্তিক গতিতে ঘোরে। তিনি টলেমি ও িইয়াকুবের দশমিক অংকের গননায় ভুল ধরে দিয়ে তার সঠিক সমাধান দেন। তিনিই সর্বপ্রথম অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেন। তিনিই প্রথম প্রাকৃতিক ঝর্ণাও আর্টেজিয় কূপের রহস্য উদঘাটন করেন। তিনি একজন খ্যাতনামা জ্যোতিষী ছিলেন। তিনি যেসব ভবিষ্যদ্বানী করতেন সেগুলো সঠিক হত। তিনি শব্দের গতির সাথে আলোর গতির পার্থক্য নির্ণয় করেন। তিনি এরিষ্টটলের ‘হেভেন’ গ্রন্থের ১০টি ভুল বের করেন। ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের সম্পর্কটিও তিনি আবিষ্কার করেন।

আল বেরুনী সুক্ষ্ম ও শুদ্ধ গণনার একটি বিস্ময়কর পন্থা আবিষ্কার করেন। তার বর্তমাননাম দি ফরমুলা অব হিন্টার পোলেশন। পাশ্চাত্যের পন্ডিতরা এটাকে নিউটানের আবিষ্কার বলে প্রচার করছেন। অথচ তার ৫৯২ বছর আগেই আল বেরুনী এটি আবিষ্কার করেন। একে ব্যবহার করে তিনি বিশুদ্ধা সাইন তালিকা তৈরী করেন। এ ফর্মুলা পূর্ণতাদান করে তিনি একটি ট্যানজেন্ট তালিকাও তৈরী করেন। বিভিন্ন প্রকার ফুলের পাপড়ি সংখ্যা হয় ৩, ৪, ৫, ৬ এবং ১৮ হবে কিন্তু কখনো ৭ বা ৯ হবে না। তিনিই প্রথম এ সত্র আবিষ্কার করেন।

আল বেরুনী চিকিৎসা বিজ্ঞানে একটি অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে তিনি বহুরোগের ঔষধ তৈরীর কলাকৌশল নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা ১১৮। তিনি বিজ্ঞঅন, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ও ইতিহাস বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের নাম হচ্ছে ‘কিতাবুল তাফহিম’। এটি ৫৩০ অধ্যায়ে বিভক্ত। এতে অংক, জ্যামিতি ও বিশ্বের গঠন সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। তিনি ‘আল আরসুল বাকিয়া’ আলাল কুবানিল কালিয়া’ গ্রন্থে পৃথিবীর প্রাচীন কালের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। যিজে আববন্দ (নভোমন্ডল) ও জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত। আল ফি যিজে খাওয়ারিজমি (যুক্তিবিদ্যা সম্পর্কে) তার আরও দুটি দু’টি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

আল বেরুনী সর্বকালের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় এক মহাপন্ডিত। তাঁর ও অন্যান্য মুসলিম বিজ্ঞানী ও জ্ঞান সাধখদের মৌলিক আবিস্কারের ওপরই গড়ে ওঠেছে আজকের আধুনিক বিজ্ঞান। তাদের অবদানকে অস্বীকার করা অকৃতজ্ঞতার পরিচয়। বরং বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের অবদান স্বীকার করে নেয়াই হবে সঠিক ও যুক্তিসম্মত কাজ।

আল বেরুনী এত বড় পন্ডিত হওয়ার পরেও ছিলেন একজন সৎ ও ভাল লোক। তিনি খুবই ধার্মিক ছিলেন। তার মনে কোন গৌরব বা অহংকার ছিল না। তিনি সঠিকভাবে নামায রোজা করতেন এবং ইসলামের সকল হুকুম আহকাম মেনে চলতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, তাঁর অর্জিত জ্ঞান খুবই সামান্য। সকল জ্ঞানের উৎস হলেন আল্লাহ। তিনি ৬৩ বছর বয়সে কঠিন অসুখে পড়েন। বহু চিকিৎসার পরেও তিনি আর সুস্থ হতে পারেননি। অবশেষে ৭৫ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল ক রেন। এটি ছিল ১০৪৮ খৃষ্টাব্দের ১৩ই ডিসেম্বর রোজ শুক্রবার।

প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক জর্জ সার্টন বলেছৈন, আল বেরুনী সকল যুগের ও সকল দেশের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানের অন্যতম। সভ্যতার ইতিহাসে তাঁর যে বিরাট অবদান রয়েছে, কোনদিন তা’ মুছে যাবার নয়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

85 − 84 =