।। যুক্তির যৌক্তিকতা ।।

যুক্তির পেছনে আসলে যুক্তিটা কি ? এমন প্রশ্নের সহসা উত্তর অন্বেষণ অনেকের কাছেই অযৌক্তিক মনে হতে পারে। কিন্তু প্রশ্নটা ভাবনার উদ্রেক করে সন্দেহ নেই !

একটি প্রচলিত গল্প দিয়ে শুরু করি।
একবার এক রাজা ঘোষণা দিলেন, যে তাঁকে কোন কথা অবিশ্বাস করাতে পারবে, তাকে তিনি অর্ধেক রাজ্য উপহার দেবেন। এক লোক তখন এসে বলল, “রাজা মশাই, এই রাজ্যের মালিক আসলে আমিই । আপনাকে অস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় বসিয়ে আমি বেড়াতে গিয়েছিলাম। এখন সিংহাসন ছাড়ুন ।“

রাজা মশাই পড়লেন মহা বিপদে । লোকটার কথা বিশ্বাস করলে গোটা রাজ্যটাই দিতে হয়, আর বিশ্বাস না করলে অর্ধেকটা।

গল্পটাতেই আমাদের বুজতে বাকি নেই যে শুধু যুক্তির পেছনে ছুটলেই চলবে না, পারিপার্শ্বিক দিক বিবেচনায় রেখেই যুক্তিবাদী হতে হবে।

যুক্তিতে কখনো ভুল হতে পারে, এটা ঠিক। তবে যুক্তিহীন অনড় বিশ্বাসে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আরও অনেক বেশী।

মানব সভ্যতার একটি বড় হাতিয়ার হলো তার চিন্তা শক্তি, যার বলে মানবসভ্যতা বর্তমান পর্যায়ে এসেছে। এই চিন্তাও কখনো কখনো অসাবধানতা বশত দূষিত হয়ে যেতে পারে। তখন আমরা ভুল পথে চালিত হবো, ভ্রান্তিকেই মনে হবে অকাট্য যুক্তি।

যুক্তির একটা ব্যক্তির জায়গা রয়েছে তবে সেটা অ আনুষ্ঠানিক। যেমন “আজ আমার মন খারাপ কারণ বৃষ্টি হয়নি” এর পেছনে যুক্তি আর অ যুক্তি যেটাই থাকুক না কেন সেটা একান্ত আমার ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য । অন্য অনেকের ক্ষেত্রে এর পেছনের যুক্তি গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।

কিন্তু আনুষ্ঠানিক যুক্তির ক্ষেত্রে তেমনটা কমই হয়। যেমন “আজ আমার মন খারাপ কারণ আমার নিকট কেউ অসুস্থ” এটা আমার ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন তেমনি অন্য অনেকের ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতিতে মন ভালো হওয়ার কোন কারণ দেখিনা, যদিনা সে অমানবিক হয় !

আনুষ্ঠানিক যুক্তির একটা পূর্বাপর একটা ধারাবাহিকতা থাকে এবং তার সামষ্টিক, সামাজিক, মানবিক আবেদন থাকতে হয়। ধরা যাক আমরা একটি গাড়িতে করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাচ্ছি । এর মধ্যে কোন যাত্রীর গন্তব্য স্থলে দ্রুত যাওয়া প্রয়োজন, তিনি চালক কে যুক্তি দিয়ে বললেন। কিন্তু চালক তার যুক্তি মানতে গিয়ে গাড়িটি ট্রাফিক আইন ভঙ্গকরে একজনের সুবিধার জন্য মাত্রাতিরিক্ত গতিতে চালাবেন ? নাকি গাড়ির অন্য সব যাত্রীর দুর্ঘটনাজনিত নিরাপত্তার কথা চিন্তা করবেন!

তাই যুক্তির সামাজিক, সামষ্টিক, মানবিক আবেদনই বেশি। ব্যক্তির যুক্তি যে সমাজ কখনো গ্রহণ করেনা তেমনটি নয়, যতক্ষণ না পর্যন্ত সেই যুক্তি অপরের হানির কারণ ঘটে।

এবার আসা যাক চিন্তার প্রধান কিছু ভ্রান্তি সম্পর্কে। এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ এই কারণ যে চিন্তাই যদি সঠিক পথে না এগোয় তবে আর যুক্তির গ্রহণযোগ্যতা কি!

যেমন পূর্বপ্রভাবঃ ডাক্তার ফেরত ছেলেটি কে বাবা জিজ্ঞেস করলেন,“ডাক্তার ছেলেটি কি বলল ?”

আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় আমরা পুরুষতান্ত্রিকতা দিয়ে এতটাই আচ্ছন্ন থাকি যে আমাদের মনেই থাকে না, যে একজন নারীও ডাক্তার থাকতে পারেন। এটাই পূর্ব-প্রভাব বা Domination। একটা ঘটনার একাধিক ব্যাখ্যার মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম সম্ভাব্য ব্যাখ্যাটি যখন আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়, তখনই এই সমস্যার উদ্ভব হয়। তখন আমরা আংশিক সত্যকে পূর্ণ সত্য বিশ্বাস করতে শুরু করি এবং আমাদের চিন্তা দূষিত হয়ে পড়ে।

পূর্বানুমান: ধরা যাক, একটি তালিকা প্রস্তুত করতে ১০০ জন লোকের ১০০ দিন সময় লাগে, তাহলে ১০০০ জনের কত দিন সময় লাগবে?

ঐকিক নিয়মে উত্তর হয়, ১ দিন। কিন্তু বাস্তবে কি দেখা যাবে? জনবল বাড়ালেই কি সেই হারে সময় কমে আসে? প্রকৃত বিষয়টি মোটেও তা নয়। আমরা ঐকিক নিয়মে এমন অনেক কিছু ধরে নিয়েছি যা আমাদের হিসাবটা সহজ করে দিয়েছে।

আমরা ধরে নিয়েছি, সব লোকের কর্মদক্ষতা সমান, সবাই একই সাথে সমানভাবে কাজ করবে, পুরো প্রকল্পটি যিনি পরিচালনা করবেন তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা প্রশ্নাতীত ইত্যাদি। এভাবে হিসাবের সুবিধার্থে আমরা এমন অনেক কিছুই ধরে নিই, এই ধরে নেওয়াটা কোন সমস্যা নয়। সমস্যা বাধে তখনই, যখন আমরা ভুলে যাই যে, আমরা ‘ধরে নিয়ে’ শুরু করেছিলাম এবং সে কারণে আমাদের উত্তর শতভাগ নির্ভুল নয়। চিন্তার এ ধরনের দূষণকে বলে পূর্বানুমান বা assumption জনিত দূষণ।

রৈখিক চিন্তন: একটা ধাঁধা দিয়ে শুরু করি। গাছে পাঁচটা পাখি বসে ছিল, গুলি করে একটাকে ফেলে দিলে সেখানে ক’টা পাখি থাকবে? রৈখিক চিন্তনে উত্তর হবে ৫-১=৪ টি। কিন্তু বুঝতেই পারছেন এটা সঠিক উত্তর নয়। আসলে, গুলির শব্দ শুনে এবং একটা পাখির পতন দেখে বাকি পাখিগুলো আর সেখানে বসে থাকবে না। এই ধাঁধাটির সঠিক উত্তর দিতে হলে আমাদেরকে সোজা পথে চিন্তা করলে চলবে না। একটি সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে আমরা যখন তার পারিপার্শ্বিকতাকে বিবেচনায় না এনে স্রেফ সূত্র বসিয়ে কাজ চালাই, তখনই রৈখিক চিন্তন জনিত ত্রুটি আমাদের চিন্তাকে দূষিত করে।

যুক্তির জন্য এই চিন্তাশক্তিকে আমরা যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ না করতে পারি আমাদের যুক্তি, কু-যুক্তিতে রূপান্তরিত হবে। ফলে ভ্রান্ত যুক্তি নিয়েই আমরা যুক্তিবাদী হবো।

এমনটা নিশ্চয়ই আমরা আশা করতে পারি না~~

ঢাকা।
২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬
(সার্চ ইঞ্জিন গুগল থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি এবং সঙ্গে নিজের মতামতের উপর ভিত্তি করে লেখাটি তৈরি।)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

72 + = 80