তাবলীগজামাত বাংলাদেশের যুবসমাজকে ধর্মান্ধ ও বিকলাঙ্গ বানাচ্ছে

বাংলাদেশের একশ্রেণীর সস্তা-মুসলমান তথা নামধারীমুসলমান এখনও ইসলাম বলতে বোঝে শুধু দাঁড়ি—টুপি আর পায়জামা-পাঞ্জাবি—কিংবা আলখাল্লা-জোব্বা। আর এরা মনে করে থাকে এগুলো জীবনে ব্যবহার করতে পারলেই সে একচান্সে মুসলমান। এই নামধারীমুসলমানের মধ্যে সবসময় এই চেতনাই কাজ করছে। আর তাই, এরা শুধু আজকের দিনে বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে দাঁড়ি-টুপি আর পায়জামা-পাঞ্জাবির জোরে মুসলমান হতে চাইছে।

বাংলাদেশের একশ্রেণীর সস্তা-মুসলমান তথা নামধারীমুসলমান এখনও ইসলাম বলতে বোঝে শুধু দাঁড়ি—টুপি আর পায়জামা-পাঞ্জাবি—কিংবা আলখাল্লা-জোব্বা। আর এরা মনে করে থাকে এগুলো জীবনে ব্যবহার করতে পারলেই সে একচান্সে মুসলমান। এই নামধারীমুসলমানের মধ্যে সবসময় এই চেতনাই কাজ করছে। আর তাই, এরা শুধু আজকের দিনে বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে দাঁড়ি-টুপি আর পায়জামা-পাঞ্জাবির জোরে মুসলমান হতে চাইছে।

ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামপ্রচার করেছেন মুসলিম সাধকগণ—এরা ইসলামের ও মুসলমানের কাছে ‘ওলীআল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর ওলী’ হিসাবে সুপরিচিত। এঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন ভারতের খাজা মাঈনুদ্দীন চিশতী রহ., হজরত মোজাদ্দেদে আলফেসানী রহ., আর বাংলাদেশের হজরত শাহজালাল রহ., হজরত শাহ পরান রহ. প্রমুখ। কিন্তু এঁদের বাদ দিয়ে কয়েকটি গোষ্ঠী ইসলামধর্মকে নিজস্ব চিন্তাভাবনায় একসময় নিজের স্বার্থে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে শুরু করে দেয়। আর এদের গুরু হিসাবে আবিভূত হয় মক্কার কুখ্যাত ধর্মপ্রচারক মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নজদী। মূলত তার শিষ্যরাই ঘুরেফিরে বাতিলআকিদাহগ্রহণ করে ভারতবর্ষে ইসলামের নামে বিবিধ ফিতনাফাসাদ শুরু করে দেয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভণ্ডপীর, ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর শিষ্য ও একসময়কার দস্যু সৈয়দ আহমেদ বেরেলভী; ইংরেজআমলে ইসলামধর্মের অপব্যাখ্যাকারী মৌলোভী ইসমাইল দেহলভী; বিভ্রান্তধর্মপ্রচারক, বাংলাদেশের অধিবাসী ও ইবনে আব্দুল ওহাব নজদীর শিষ্য হাজী শরীয়তুল্লাহ; ইংরেজ-দালাল ও জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের আবিষ্কর্তা আবুল আলা মওদুদী ইত্যাদি। এদের পথ অনুসরণ করে ১৯৪১ সালে ইলিয়াস মেওয়াতী নামক একজন বিভ্রান্ত ব্যক্তি ইসলামপ্রচারের নামে নিজের ব্যক্তিগত-মতের ভিত্তিতে ‘ছয়-উসুলে’র সাহায্যে ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠা করে তাবলীগজামাত। পরবর্তীকালে এটি বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে প্রচার ও প্রসার লাভ করে। আজকের আলোচনা এই তাবলীগজামাত নামক বিভ্রান্তগোষ্ঠী নিয়ে। এরা বর্তমানে ইসলামের নামে মানুষকে শুধুই গোমরাহ বানাচ্ছে। আর মানুষকে আধুনিকচিন্তাভাবনা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
এরা মুখে-মুখে দুনিয়াকে অস্বীকার করে কিন্তু দুনিয়াতে কোনোকিছুই ভোগ করতে বাকী রাখে না। আর ব্যক্তিগত-জীবনে এরা সম্পূর্ণ দুনিয়াকেন্দ্রিক।

ইলিয়াসীতাবলীগের স্বরূপ:

এটি কোনো দার্শনিক মতবাদ নয়। কিংবা কোনো নবীরাসুলদের প্রচারিত মতবাদও নয়। এটি শুধুই একজন মৌলোভী ইলিয়াসের নিজস্ব চিন্তাভাবনা মাত্র। আর এটি প্রচারের ও প্রসারের জন্য সে কোনো ঐশীআদেশ বা মদদপ্রাপ্তও হয়নি। শুধু নিজের স্বপ্নে পাওয়া একটি ঘটনার উপর ভিত্তি করে সে এই তাবলীগজামাত-প্রতিষ্ঠা করেছে। এব্যাপারে তার নিজের সাফাই রয়েছে তারই রচিত গ্রন্থ ‘মলফুজাতে ইলিয়াস’-এ। সে নিজেই স্বীকার করেছে, এটি আমার স্বপ্নে পাওয়া। আর কারও স্বপ্নে পাওয়া কোনোকিছুর উপর ভিত্তি করে কোনো ধর্মপ্রচার করা সম্ভব নয়। এগুলো বাতুলতা মাত্র। আর এই বাতুলতায় আক্রান্ত বাংলাদেশের একশ্রেণীর সস্তা-মুসলমান। এরা বছরের তিনটি দিন ঢাকার টঙ্গির তুরাগ-নদীর তীরে উন্মুক্তস্থানে শুয়ে থাকে, নামাজ পড়ে, আর অধিকাংশ সময় তাদের কথিত-মুরুব্বিদের বয়ান শোনে। এই হলো তাদের ইসলাম। এছাড়াও তারা সারাবছরে বিভিন্ন সময় মসজিদে-মসজিদে তিনদিন, চল্লিশদিন বা একচিল্লা, ১২০দিন বা তিনচিল্লা ইত্যাদিতে সময় ব্যয় করে থাকে। এদের বাংলাদেশের প্রধান মারকাজ হলো ঢাকার কাকরাইলের ‘কাকরাইল-মসজিদ। আর সমগ্র বিশ্বে তাবলীগের প্রধান মারকাজ হলো ভারতের দিল্লিতে। মূলত ভারতীয় উপমহাদেশে এটির প্রচলন শুরু হয় ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ভারতের নিজামউদ্দীন মসজিদের “নুহ-মাদ্রাসায়” আনুষ্ঠানিকভাবে মৌলোভী ইলিয়াস-প্রবর্তিত “তাবলীগজামাতের” প্রথম-ইজতেমার সূচনা ঘটে। এরপরে ১৯৪৪ সালে ভারত থেকে এটি বাংলাদেশে সর্বপ্রথম রফতানি করা হয়। আর এরা বাংলাদেশের বিভিন্নস্থান ঘুরে-ঘুরে অবশেষে ১৯৬৬ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অদূরে টঙ্গীর “তুরাগ-নদীর” তীরে স্থায়ীভাবে ঘাঁটি তৈরী করে প্রতিবছর ইজতেমাঅনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।
এরা জামাতবদ্ধভাবে বা দলবদ্ধভাবে থাকতে ভালোবাসে। আর এদের মাথার উপরে থাকে এক বা একাধিক মুরুব্বি। আসলে, এরা মূলত মুরুব্বিশাসিত একটি জনগোষ্ঠী।
এখানে, এদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা বলে কোনোকিছু নাই। এরা, এদের নির্বাচিত-মুরুব্বিদের কথা মতো সবকিছু পালন করে থাকে। এদের (মুরুব্বিদের) অনুমতি ছাড়া এদের কোনোকিছু বলা বা কোনোকিছু করার কোনো পারমিশন নাই। আর এদের সবারই ব্যক্তিজীবনে ইলিয়াসীদর্শন অনুসরণ ও অনুকরণ করতে হয়। মূল-ইসলামের সঙ্গে এদের আকিদাহগত অনেক বিরোধ রয়েছে।

ইসলামের সঙ্গে এদের বিরোধগুলো এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

১. ইসলামের মূলস্তম্ভ পাঁচটি। আর এরা এই পাঁচটির জায়গায় এদের নেতা ইলিয়াস মেওয়াতীর স্বপ্নে পাওয়া, মনগড়া ও বানোয়াট ছয়-উসুল কায়েমের অপচেষ্টা করে যাচ্ছে। এদের ছয়-উসুল হলো: (১) কালেমা (২) নামাজ (৩) এলেম ও জিকির (৪) একরামুল মুসলিমীন (৫) ছহী নিয়ত এবং (৬) দাওয়াত। আর কারও আবিষ্কৃত-মতবাদ ইসলামধর্ম সমর্থন ও গ্রহণ করে না। এগুলো বিদআত ও নাজায়েজ।
২. কুরআন-হাদিসের পাঠ বা চর্চা বাদ দিয়ে এদের রচিত ও নির্ধারিত তাবলীগীকিতাবসমূহ পড়া ও পড়ানো হয়। তাদের রচিত কিতাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: তাবলীগী নেছাব, ফাজায়েলে আমল, ফাজায়েলে রমজান ইত্যাদি।
৩. এরা রাসুল সা.-কে পুরাপুরি অনুসরণ না করে এদের মুরুব্বিদের কথামতো তাদের পথই বেশি পছন্দ ও অনুকরণ করে থাকে।
৪. এরা ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল হজরত মোহাম্মদ সা.-এর শানে পবিত্র মিলাদশরীফ পড়ে না। আর পবিত্র রাসুল সা.-এর শানে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ সা.ও পালন করে না। এই একই কাজটি করে থাকে মওদুদী-জামায়াত-শিবির।
৫. এরা রাসুলুল্লাহ সা.-এর শানে কখনও দরুদশরীফ পাঠ করে না। অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিকভাবে এরা কখনও-কোনোদিন রাসুলুল্লাহ সা.-এর শানে মিলাদমাহফিল বা দরুদপাঠের আয়োজন করে না।
৬. এরা ধর্মের যেকোনো ব্যাখ্যার ব্যাপারে তাদের মনোনীত-মুরুব্বিদের উপর সদাসর্বদা নির্ভরশীল। আর এব্যাপারে একজন ইলিয়াস মেওয়াতী তাদের শ্রেষ্ঠ রাহবার।

বর্তমানে তাবলীগজামাত ইসলামের নামে যুবসমাজকে গোমরাহ বানাচ্ছে। এরা ধার্মিকও হচ্ছে না আবার আধুনিকমানুষও হচ্ছে না। এরা হচ্ছে একপ্রকার গোঁড়া ও অসামাজিক মানুষ। কারণ, এরা সামাজিক নয়। আর এরা শুধু নিজেদের বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ লোকদের সঙ্গেই চলাফেরা ও মেলামেশা করতে ভালোবাসে। আর যারা তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে ঐক্য বা একমতপোষণ করে না এরা তাদের সদাসর্বদা এড়িয়ে চলে। একটি মনগড়া-বিশ্বাসের ভিত্তিতে ভারতীয় উপমহাদেশে তাবলীগজামাত একটি স্বতন্ত্র-ধর্মীয়-গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

আধুনিকবিশ্বে ইলিয়াসী-তাবলীগজামাত নিজেরা ইসলামের নামে নতুন এক ধর্মপথ আবিষ্কার করেছে। এদের কাছে দেশ, সমাজ, জাতি, আর মানুষ কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। এদের একমাত্র কথা হলো: মসজিদে গিয়ে এদের মতো করে নামাজআদায় করতে হবে। আর এদের মতো করে ধর্মকে বুঝতে হবে। আর এদের মতো করে ধর্মকে ব্যাখ্যা করতে হবে। আর সবকিছু তাবলীগের বয়ানের মধ্যে দিয়ে শিখতে হবে। এদের শেখার আর কোনো জায়গা নাই। এসব কথা এরা কখনও মুখে স্বীকার করবে না। কিন্তু এদের কার্যকলাপে, আচার-আচরণে, আর জীবনের সামগ্রিক-ব্যবহারে সর্বক্ষেত্রে তা-ই প্রতীয়মান হয়। আর তাই, বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মতো এরাও একটি গোষ্ঠী মাত্র—তবে এরা উগ্রবাদী নয়। এরা মূল-ইসলাম থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। আর নিজেদের মতো করে ইসলামধর্মকে ব্যাখ্যা করে তা-ই পালনের সর্বাত্মক-প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কালের বিচারে এরাও একটি বিভ্রান্ত-ধর্মীয়-গোষ্ঠী।

আমাদের দেশের তরুণসমাজ তাবলীগজামাতের নামে সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত হচ্ছে:

এই দেশের একশ্রেণীর তরুণ তথা মানুষজন যেমন ইসলামকে ভুলবুঝে কিংবা ইসলামের ভুলব্যাখ্যা করে স্বেচ্ছায় জঙ্গি হচ্ছে। আর তারা নিজের পরিবারের, মানুষের, আর রাষ্ট্রের বিরাট ক্ষতিসাধন করছে—ঠিক একইভাবে আরেকটিশ্রেণী—এরা সাহসের অভাবে হয়তো জঙ্গি হতে পারছে না—আর এরাও নানাভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে—আর সেই বিভ্রান্তগোষ্ঠী হলো আজকের তাবলীগজামাত।
বর্তমান-তাবলীগজামাতে আধুনিকমানুষ কোথায়? এখানে, আজকাল দেখছি সব মুরুব্বিগোছের আর মান্ধাতার আমলের লোকজন। এদের নাই বিজ্ঞানশিক্ষা, নীতিশিক্ষা, সাহিত্যচর্চা, ইতিহাসপাঠ, যুক্তিবিদ্যা-দর্শন, আর সর্বোপরি অসাম্প্রদায়িক-মানুষগড়ার প্রচেষ্টা। এরা ধর্মের নামে মানুষকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন করে তুলছে। আর সবখানে এদের একজন করে মুরুব্বি! এদের যুক্তি কোথায়? এদের বিজ্ঞাননির্ভর দর্শন কোথায়? আর এরা কি ধর্মপ্রচারের যোগ্য? এদের কি ধর্মব্যাখ্যা করার যোগ্যতা আছে? অবশ্যই না। এখন দেখি রিক্সাওয়ালাও তাবলীগের আমির সেজে বসে আছে! এভাবে ধর্মচর্চা হয় না।
ধর্ম মানে শুধু একটুখানি নামাজ-রোজা নয়। আরে ধর্ম মানে মানবপ্রেম আর দেশপ্রেম। এই তাবলীগজামাতের মধ্যে সে-সব আজ কোথায়? এরা নিজেরা ধর্ম না-বুঝে আজ দেশের টগবগে তরুণদের বিভ্রান্ত করতেই ‘বয়ানে’র নামে তাদের মগজধোলাই করছে। আর তাই, যে যুবক হতে পারতো দেশের—সে এখন কোনোকিছু না বুঝেই গাট্টি-বোচকা মাথায় নিয়ে বিকলাঙ্গ-বৃদ্ধের বেশধারণ করে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে কাকরাইল-মসজিদে কিংবা টঙ্গির ইজতেমা-মাঠে! আজ জাতির এই দুঃখ রাখার জায়গা নাই।
আমি তরুণদের নামাজ পড়তে নিষেধ করছি না। সে অধিকার আমার নাই। প্রত্যেকেরই তার নিজ-নিজ ধর্মপালনের অধিকার রয়েছে। কিন্তু আমি তাদের আগে মানুষ হতে বলছি। আর আধুনিকমানুষ হয়ে তারপর ধর্মসাধনা করতে বলছি। আর আধুনিকমানুষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আত্মার মুক্তি ঘটবে না। আর মানুষ হতে না পারলে আমাদের ধর্মপালন বা ধর্মচর্চা কোনো কাজে আসবে না। অতএব আসুন, আগে মানুষ হই। তারপর ধার্মিক হই।

ইলিয়াসী-তাবলীগজামাতের অন্যান্য বিভ্রান্তিকর দিকসমূহ:

১. এরা নিজেদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। আর ইসলামের মর্মবাণী হলো: নিজআত্মাকে পরিশুদ্ধ করা বা তাকে সমূলে পাপশূন্য করে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা। কিন্তু এরা মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ না করে নিজেদের মুরুব্বিদের কাছে আত্মসমর্পণ করছে। এদের কাছে একমাত্র মুরুব্বিরাই ধর্মের মূল চালিকাশক্তি। আর তাবলীগজামাতের লোকেরা হজরত মোহাম্মদ সা.-কেও পুরাপুরি অনুসরণ করে না। তারা মুখে এটিকে (তাদের কাজকে) নবীওয়ালী কাজ বলে থাকে মাত্র। প্রকৃতপক্ষে, তারা নবীর তেমন কোনোকিছুই জীবনে গ্রহণ করেনি। তারা হয়তো বলতে পারে—আমরাতো রাসুলের দাঁড়ি, টুপি, আর জোব্বাকে গ্রহণ করেছি। আসলে, এটি সত্যের অপলাপ মাত্র। আমাদের নবীজী সা. কখনওই দাঁড়ি, টুপি, আর জোব্বা কায়েম করার জন্য পৃথিবীতে আসেননি। এসবকিছু এই শ্রেণীর মোল্লা আর মৌলোভীদের পবিত্র রাসুলের নামে অপপ্রচার মাত্র। এরা এখন এই তিনটির জোরে—দাঁড়ি, টুপি, আর জোব্বার সাহায্যে নিজেদের মুসলমান হিসাবে প্রচার করতে চাচ্ছে। কিন্তু একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে: ইসলাম কখনও দাঁড়ি, টুপি, আর জোব্বা বা পায়জামা-পাঞ্জাবির জন্য নাজিল হয়নি। আর মুসলমানদের প্রধান ও একমাত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কুরআনের কোথাও এই তিনটি রাখা বা ধারণ করার কথাও বলা হয়নি। বরং সেখানে জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। আর সেখানে তাক্বওয়া-অর্জনের কথা বলা হয়েছে। আর এরা নিজের আত্মাকে কলুষিত রেখে—তাকে পরিশুদ্ধ না করে শুধুই ধর্মপ্রেম দেখাচ্ছে। আর এটি কখনও ইসলামত্ব নয়। এটি আসলে একপ্রকার মোল্লাগিরি। আর তাবলীগজামাত এই মোল্লাগিরি বা মোল্লাকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাবলীগজামাতের সাধারণ অনুসারীরা ধর্মের অপব্যাখ্যার শিকার হচ্ছে। এরা কেউই পরিশুদ্ধ নয় কিংবা তাদের চিত্তকে বিশুদ্ধ করছে না। কিন্তু রাতারাতি তাদের পোশাকপরিচ্ছদ আর ভাবভঙ্গিমার পরিবর্তন ঘটছে। এরা তাবলীগে গিয়ে তিনদিনের সময় ব্যয় করে আর মুরুব্বিদের বয়ান শুনে কেউ হয়তো লম্বা দাঁড়ি রাখছে, আর লম্বা-জোব্বা পরছে—কিন্তু তাতে এদের ধর্মবোধ জাগ্রত হচ্ছে না। আর শুধু এই কাজের জন্য তাদের ধার্মিকও বলা যায় না। একজন ধার্মিকের মধ্যে যে-সব গুণাবলী থাকা প্রয়োজন তা এই প্রচলিত তাবলীগজামাতের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। এরা শুধুই পোশাকিধর্মগ্রহণ করেছে। আর তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতিকে বিসর্জন দিয়ে শুধু তাবলীগের কতিপয় কাজের মধ্যে ইসলামত্ব বা মুসলমানিত্ব খুঁজে বেড়াচ্ছে। এরা একটি ঘোরের মধ্যে বসবাস করছে। আর নিজেদের বানানো পথকে আজ ইসলাম বলে প্রচার করছে। আর ধর্মের মধ্যে ফিরকারই জন্ম দিচ্ছে। ইসলামধর্ম আজ পর্যন্ত কাউকেই ইসলামের নামে এভাবে ধর্মীয় মতবাদ বানাতে পারমিশন দেয়নি। গায়ের জোরে নিজের খেয়াল-খুশিমতো একজন ইলিয়াস মেওয়াতী ইসলামধর্মের মধ্যে নিজের বানানো মতামতকে এতোকাল ‘ইসলাম’ বা ‘ইসলামের দাওয়াতী-কাজ’ বলে অপপ্রচার করেছে। আর তার শিষ্যরা এখনও সেই বিভ্রান্তির বেড়াজালে বন্দী হয়ে সেই একই ভুল করে যাচ্ছে। ইলিয়াস মেওয়াতীর সময়কালে ইসলামধর্মের অপব্যাখ্যাকারী ও পাকিস্তানের একনিষ্ঠ-দালাল আবুল আলা মওদুদীও ইসলামধর্মকে বিকৃত করে নিজের মতবাদে প্রতিষ্ঠা করে ‘জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান’। ১৯৭১ সালে, আমরা এই বাংলাদেশে ইসলামের নামে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের অপকর্ম দেখেছি। এরা (মওদুদীজামায়াত) ধর্মের নামে আজও ভারতীয় উপমহাদেশে এক জীবন্তশয়তান।

২. বর্তমানে তাবলীগজামাতের আরেক বিভ্রান্তির বড় দিক হলো তাদের বার্ষিক-ইজতেমা। এখানে, তাদের সারাদেশ থেকে অনুসারীদের ডেকে আনা হতো। সবাই শীতকালে তুরাগ-নদীর পাড়ে সমবেত হয়ে দিল্লি থেকে আগত বুজুর্গদের বয়ান শুনতো। আর এখনও তা-ই করা হচ্ছে। আর বর্তমানে তাবলীগকে সরকারি-পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন জোনে ভাগ করে তাদের বার্ষিক-ইজতেমা-আয়োজনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে ঢাকার তুরাগ-নদীর দখল তারা ছাড়েনি। তাদের এই নদীপ্রেম এখনও চলছে। ইজতেমায় আগত মুসল্লীদের ভাবসাব দেখে মনে হয় তারা এখানে একবার হাজির হতে পারলেই হলো—তাদের জীবনে আর-কিছু লাগবে না। অনেকে এটিকে বেহেশতের বালাখানা বা জান্নাতের অংশ বলে মনে করে থাকে। একবার ভাবুন তো—এটি কতবড় ধৃষ্টতা! আর এই ধৃষ্টতাই আজকাল অনেকের ধর্মচর্চার বিষয়। এখানে, পাঠক একবার ভাবুন তো, তুরাগ-নদীর পাড়ে বার্ষিক-ইজতেমায় অংশগ্রহণ করলেই কি বেহেশতের ‘টিকিট’ বা ‘সার্টিফিকেট’ পাওয়া যাবে? নিশ্চয়ই না। কিন্তু এমনতর বিভ্রান্তিকর ধারণা নিয়েই বেড়ে উঠছে আমাদের যুবসমাজের একটি অংশ। তাবলীগের খাতায় নাম-লিখিয়ে জীবনে এরা গোঁড়ামি আর ভণ্ডামিই শিখছে। একঅর্থে এরাও একপ্রকার জঙ্গি। তবে এরা মানসিকভাবে জঙ্গি। তাই, এরা মসজিদে বসে ধর্মের নামে নিজস্বার্থের দুনিয়াবী-কাজে মেতে উঠতে দ্বিধা করে না। আর এরা ধর্মান্ধ আর সম্পূর্ণ গোঁড়া। আধুনিকরাষ্ট্রের জন্য এরা একেবারে অনুপযুক্ত।

অনেকে বলে থাকে, তাবলীগের ভিতরে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অ্যাডভোকেট, অফিসার, কৃষিবিদ ইত্যাদি আছে। থাকতে পারে। কিন্তু এরা ইসলামধর্মের কেউ নয়। কিংবা এরা শিক্ষিত-মানুষও নয়। এরা সমাজের কতিপয় অর্ধশিক্ষিত-জীব মাত্র। আর এগুলো সামাজিক কিছু পদ ও পদবী মাত্র। তার মানে এই নয় যে, শিক্ষতজনেরা তাবলীগ করে। আসলে, একশ্রেণীর মূর্খ এখন তাবলীগের নামে ইসলামধর্মের অপব্যাখ্যা করার অপকর্মে মেতে আছে। এদের হাত থেকে ধর্ম আর মানুষ উভয়কেই বাঁচাতে হবে। ১৯৭১ সালে, বাংলাদেশরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মানুষের জন্য তাবলীগওয়ালাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। আর এখনও এই তাবলীগওয়ালারা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের জন্য কিছুই করছে না। তারা শুধু নামাজ-দ্বীনীকাজ, আর ইকরামুল মুসলিমীনের কথা বলছে। এখানে, সব মানুষের কথা নাই। আর সবার প্রতি ভালোবাসার কথাও এখানে বলা হয়নি।
৩. সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের সঙ্গে এদের যোগসূত্র নাই। এরা কখনও মানুষের কথা বা মানবজাতির কথা ভাবে না। এরা শুধু কিছুসংখ্যক নামাজীর পিছনে লেগে থেকে তাদের স্বভাব বদলাতে চায়। কিন্তু এদের কারও স্বভাবই বদলায় না। তাই, দেখা যায়, তারা একজন ব্যক্তির পিছনে বছরের-পর-বছর লেগে থাকারও পরও বা সে নিয়মিত তাবলীগ করার পরও তার আচরণের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। এর মানেটা কী? এর মানে হলো—এইসব তাবলীগ তার জীবনমানের কোনো পরিবর্তন আনতে সক্ষম নয়। আর এক্ষেত্রে, একজন ব্যক্তির শুধুই বাহ্যিক পরিবর্তন ঘটেছে। অর্থাৎ, তার চেহারার পরিবর্তন হয়েছে। আর সে লম্বা-দাঁড়ি রেখেছে, উঁচু বা গোল-লম্বা টুপি পরেছে, আর একটা লম্বা-জামা গায়ে দিয়েছে। কিন্তু তার ভিতরের পশুত্বের সামান্য পরিবর্তনও হয়নি।
৪. এরা সাম্প্রদায়িক—এদের অসাম্প্রদায়িক হওয়ার কোনো সুযোগ নাই। তাই, এখানে যে-সব যুবক চিল্লায় যায়—একঅর্থে তারা গোল্লায় যায়। এইসব যুবক পরমতসহিষ্ণু বা পরধর্মসহিষ্ণু হতে শেখে না। এরা নিজেদের মুসলিম ভেবে সবসময় গর্ববোধ করে—আর অন্য সব ধর্মের মানুষদের জাহান্নামী ভেবে বসে থাকে। এভাবে, এরা মানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করছে।
৫. এরা দেশে বসবাস করেও দেশকে ভালোবাসে না। আর এদের কাছে দেশ আপন নয়। এদের কাছে আপন হলো: তাবলীগজামাত, এর মুরুব্বিগণ, তাদের তাবলীগী-সাথীভাই, মসজিদ, আর তাবলীগের জন্য নির্ধারিত কতিপয় কিতাব।
৬. এদের মধ্যে আধুনিক-জীবনবোধের বড়ই অভাব। আর এরা খাওয়াদাওয়ায়, পোশাকআশাকে, প্রাতিষ্ঠানিক-শিক্ষায় কেতাদুরস্ত হলেও জীবনমানে কখনও আধুনিকমানুষ নয়। এরা চিন্তাভাবনায় গোঁড়া ও ধর্মান্ধ।
৭. তাবলীগজামাতের কোনো বয়ানে দেশের কথা বলা হয় না। এখানে, তারা শুধু নামাজ-রোজা, আর তাবলীগীবিষয় নিয়ে আলোচনা করে থাকে।

বর্তমান বিশ্বে তাবলীগজামাত নামাজের কথা বলে যুবসমাজকে ‘পাতিহুজুর’ বানানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু এভাবে কোনো মানুষ কখনও ধার্মিক হতে পারবে না। কারণ, মানুষকে ধার্মিক হতে হলে সর্বাগ্রে তাদের মনে আল্লাহভীতি জাগিয়ে তুলতে হবে। শুধু লোকদেখানো নামাজ দিয়ে তার মনের পশুত্ব দূর করা সম্ভব নয়। এভাবে, একটি যুবক কয়েকদিন নামাজ পড়ে চেহারার পরিবর্তন করে নিজেকে ‘পাতিহুজুর’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে—এর বেশি কিছু নয়। ফলে, সে হবে এক বিকলাঙ্গ জীব। সে ধার্মিকও হবে না—আবার আধুনিকমানুষও হতে পারবে না। আর সে হবে এক ভয়ানক ধর্মান্ধ, গোঁড়া, আর সাম্প্রদায়িক। জাতি এই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকে মুক্তি চায়। আর সমগ্র জাতি তার তরুণদের একাত্তরের অসাম্প্রদায়িক-চেতনায় গড়ে তুলতে বেশি আগ্রহী। সেখানে ধর্মের নামে আজকের তাবলীগজামাত পরিকল্পিতভাবে যুবসমাজের দেশপ্রেমের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিচ্ছে। আর এব্যাপারে রাষ্ট্রকেই যথোপযুক্ত পদক্ষেপগ্রহণ করতে হবে।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
১৯/০১/২০১৭

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “তাবলীগজামাত বাংলাদেশের যুবসমাজকে ধর্মান্ধ ও বিকলাঙ্গ বানাচ্ছে

  1. তাবলিগ, হেফাজত, চরমোনাই…
    তাবলিগ, হেফাজত, চরমোনাই… এগুলারে দৌড়ের উপর একমাস রাখতে পারলে ঘরে হান্দায়া যাইব। ব্লগার একটিভিস্টদের মত এত সাহস এদের নাই। শেখ হাসিনার মহব্বতে এরা জামাইমার্কা আচরন করতেছে। মতিঝিলের কান ধরা উৎসব মনে আছে? ঐ রকম একটা ধাবড়ানী খাইলে খুঁজেও পাওয়া যাবেনা একটারে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 3 =