হিন্দু ধর্মের ইতি বৃত্ত, পর্ব ০৪

‘অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তি, তারা, মন্দোদরী তথা।
পঞ্চ কন্যাং স্মরেন্নিত্যং মহাপাতক নাশনম্ ।।’

অর্থাৎ অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তি, তারা ও মন্দোদরী এই পঞ্চ কন্যার নিত্য স্মরণে মহাপাপ নাশ হয়। আমরা এই পবিত্র পাঁচ কন্যা থেকে শুধু দ্রৌপদীতে আলোচনা সীমিত রাখবো।

মহাভারতের কেন্দ্রীয় ও বহুল আলোচিত চরিত্র দ্রৌপদী সাধারন কন্যা নন। সাধারন নারীর মতো তাঁর জন্মও হয়নি। তিনি অযোনিসম্ভবা। যজ্ঞবেদী থেকে তাঁর জন্ম। তাই তিনি জন্মাবধি পবিত্র। জরায়ুর অপবিত্রতা তাকে স্পর্শ করেনি। এই হল দ্রৌপদীর প্রাথমিক পরিচয়।

মহাভারতের আদিপর্বের অন্তর্গত চৈত্ররথপর্বের ১৬৬তম অধ্যায়ে এইভাবে দ্রৌপদীর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে :

কুমারী চাপি পাঞ্চালী বেদীমধ্যাৎ সমুত্থিতা ।
সুভগা দর্শনীয়াঙ্গী স্বসিতায়তলোচনা ।
শ্যামা পদ্মপলাশাক্ষী নীলকুঞ্চিতমূর্ধজা ।
তাম্রতুঙ্গনখী সুভ্রূশ্চারুপীনপয়োধরা ।
মানুষং বিগ্রহং কৃত্বা সাক্ষাদমরবর্ণিনী ।
নীলোৎপলসমগন্ধ যস্যাঃ ক্রোশাৎ প্রবায়তি ।
যা বিভর্তি পরং রূপং যস্যা নাস্ত্যুপমা ভুবি ।
দেবদানবযক্ষাণামীপ্সিতাং দেবরূপিণীম ।

অর্থ : তখন যজ্ঞবেদী থেকে এক কুমারীও উৎপন্ন হলেন যিনি পাঞ্চালী নামে পরিচিতা হলেন । তিনি সৌভাগ্যশালিনী, সুদর্শনা এবং কৃষ্ণ আয়তচক্ষুযুক্তা । তিনি শ্যামাঙ্গী, পদ্মপলাশাক্ষী, কুঞ্চিত ঘনকালো কেশবতী এবং তাম্রবর্ণ নখ, সুন্দর ভ্রূ ও স্তনযুক্তা । তিনি মানুষের শরীরে সাক্ষাৎ দেবী । তাঁর নীলপদ্মের ন্যায় অঙ্গসৌরভ একক্রোশ দূরেও অনুভূত হয় । তিনি পরম সুন্দর রুপধারিণী এবং সমগ্র বিশ্বে তুলনাহীনা । এই দেবরূপিনী কন্যা দেব, দানব ও যক্ষেরও আকাঙ্ক্ষিত ।

পাণ্ডবদ্বেষী দুর্যোধনের চক্রান্তে একবার মাতা কুন্তী সহ পঞ্চপাণ্ডবকে বারণাবতনগরে পুরিয়ে মারার চেষ্টা করা হয়। পান্ডব হিতৈষী বিদুরের পরামর্শে ও সাহায্যে তাঁরা কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে গেলেন। প্রাণভয়ে পালিয়ে তাঁরা গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ চলতে থাকেন। পাছে কৌরবরা চিনতে পেরে পুনরায় ক্ষতি করে দেয় সেই আশঙ্কায় তাঁরা ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ ধরেন। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে পথে পিতামহ ব্যাসদেবের সাথে দেখা হল। ব্যাসদেব তাদের একচক্রানগরে এক ব্রাহ্মণের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। পাণ্ডবগণ একচক্রানগরে দিনের বেলায় ব্রাহ্মণবেশে ভিক্ষা করে ভিক্ষালব্ধ সামগ্রী মায়ের চরণে অর্পণ করতেন। মা সকলকে সমানভাবে ভাগ করে দিতেন। এভাবে দিন কাটছিল। একদিন পাণ্ডবগণ লোকমুখে জানতে পারেলেন যে পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ তাঁর কন্যা যাজ্ঞসেনীর (দ্রৌপদীর অপর নাম) স্বয়ম্বর সভা আহ্বান করেছেন। পাণ্ডবগণ সেই সভায় সমবেত হলেন। ঘটনাক্রমে ব্রাহ্মনবেশী অর্জুন দুরূহ লক্ষভেদ করে কন্যাপণের শর্ত পূরণ করলে, পাঞ্চালরাজ তাঁর হাতে কন্যা সমর্পণ করেন। পান্ডবজননী কুন্তী এসব কিছুই জানতেন না। তিনি কুটিরে একা ছিলেন। ভিক্ষা থেকে ফিরে এসে ভীম-অর্জুন বাইরে থেকে ডেকে বললেন, ‘মা দেখ, আজ ভিক্ষায় এক অপূর্ব জিনিস পেয়েছি ।’ পুত্রদের কণ্ঠস্বর শুনে মা কুটিরের ভিতর থেকেই কিছু না দেখে উত্তর দিলেন, যা এনেছ, পাঁচজন মিলে ভোগ কর। ‘কুটীগতা সা ত্বনবেক্ষ্য পুত্রৌ প্রোবাচ ভুঙ্ ক্তেতি সমেত্য সর্বে।’ – এ খবর জানতে পেরে দ্রৌপদীর বাবা রাজা দ্রুপদ এই অশাস্ত্রীয় বিয়েতে আপত্তি জানালেন। স্বয়ম্বর উপলক্ষে অনেক মুনি-ঋষি দ্রুপদ রাজ্যসভায় উপস্থিত ছিলেন। দ্রুপদের আপত্তি শুনে ব্যাসদেব বললেন, ‘দ্রৌপদীর পঞ্চপতি বিধিনির্দিষ্ট।’ এই বলে তিনি পুরাণের গল্প শোনালেন – ত্রেতাযুগে পূর্বজনমে দ্রৌপদী ব্রাহ্মণকন্যা ছিলেন। সেই জন্মে তিনি পতি কামনায় ভক্তিভরে নিত্য শিবপুজা করতেন । মাটির শিবলিঙ্গ তৈরি করে পুস্প, ঘী, মধু ইত্যাদি পঞ্চপচারে বাজনা বাজিয়ে তাঁর পুজো করতেন। পুজো শেষে, ‘পতিং দেহি, পতিং দেহি’ এভাবে পাঁচবার পতি প্রার্থনা করতেন। দীর্ঘকাল শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠা সহকারে দেবাদিদেবের পুজো করার ফলে দেবাদিদেব সন্তুষ্ট হয়ে মহাদেব স্বয়ং ব্রাহ্মণ কন্যাকে দেখা দিয়ে বললেনঃ ‘কন্যে, আমি তোর পুজোয় সন্তুষ্ট হয়েছি। আমার বরে তোর পরম সুন্দর পাঁচজন পতি হবে।’

শিবের কাছ থেকে এই অদ্ভুত বর পেয়ে কন্যা চমকে ওঠেন এবং বলেন, ‘হে শূলপাণি, তুমি আমাকে ঠাট্টা করছো কেন? বেদবিধি বহির্ভূত এ কোন বর দিচ্ছ ?’ মহাদেব স্মিতহেসে বললেন, ‘কন্যে, এতে আমার দোষ কোথায়? ভেবে দেখ তুই পাঁচবার “পতিং দেহি” বলেছিস। যতবার বলেছিস ততবার একজন করে পতি দিয়েছি। অতএব পঞ্চপতি তোরই চাওয়া। যা চেয়েছিস, তাই পেয়েছিস ।’ – এই বলে মহাদেব অন্তর্হিত হলেন। কন্যা মনের দুঃখে গঙ্গাজলে দেহ বিসর্জন দিলেন। ব্যাসদেব বলে চললেন, ‘সেই কন্যা পরজন্মে কাশীর রাজ বাড়িতে জন্মগ্রহণ করলেন। যৌবনে বর না জুটায় আত্মগ্লানিতে তিনি কঠোর তপশ্চর্যায় রত হলেন। হিমালয় পর্বতে তাঁর সুকঠোর তপস্যায় দেবগণ মুগ্ধ হয়ে তাঁর সামনে আবির্ভূত হলেন। ধর্ম, ইন্দ্র, পবন ও অশ্বিনীকুমারদ্বয় সমবেত ভাবে বললেন, ‘সুন্দরী, তুমিতো পতিলাভের আশায় এত কঠোর তপস্যা করছ ? তাই যদি হয়, তুমি আমাদের এই পাঁচজনের মধ্যে থেকে যাকে ইচ্ছা বেছে নাও ।’ একথা শুনে কন্যা পাঁচজনের মুখপানে চাইলেন। দেখলেন, সকলেই অনিন্দ সুন্দর কেও কারো থেকে কম নয়। পাঁচজনের রূপে মুগ্ধ কন্যা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। পাঁচজন দেবতা তখন কন্যার মনোভাব বুঝতে পেরে বললেন, ‘এ জন্মে তোমার কিছু হবে না। তাই এ দেহ তুমি ত্যাগ কর। পরজন্মে এই পাঁচজনকেই পতিরূপে পাবে ।’ দেবগণ অন্তর্নিহিত হলে ঐ কাশীরাজকন্যা তপস্যার দ্বারা দেহ ত্যাগ করলেন। এই হলো দ্রৌপদীর পূর্বজনমের কাহিনি।

গল্প শেষ করে ব্যাসদেব বললেন, ‘হে দ্রুপদরাজ! সেই কন্যা আজ আপনার ঘরে দ্রৌপদী হয়ে জন্মেছেন। ধর্ম, ইন্দ্র, পবন ও অশ্বিনীকুমারদ্বয় দ্রৌপদীর পতি হওয়ার জন্য যথাক্রমে যুধিষ্ঠির, অর্জুন, ভীম, নকুল ও সহদেব নামে জন্মেছেন। অতএব, বুঝতে পারছেন মহারাজ! দ্রৌপদীর পঞ্চপতি বিধিনির্দিষ্ট। এর অন্যথা হওয়ার উপায় নেই ।’

এ সব শুনে পান্ডবজননী কুন্তী চিন্তিত হয়ে বললেন, দ্রুপদ কন্যা পাঞ্চালীর (দ্রৌপদীর অপর নাম) যেন অধর্ম না হয়,সে যেন বিভ্রান্ত না হয়। মায়ের এই কথা শুনে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির কিছুক্ষণ চিন্তা করে মাকে তাঁর সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেন। তারপর অর্জুনকে বললেন, ‘ভাই তুমিই তো যাজ্ঞসেনীকে (দ্রৌপদীর অপর নাম) জয় করেছ। তাই তোমারই প্রাপ্য এই রাজকন্যা। তোমার সঙ্গে মানাবেও ভালো। অতএব যথোচিত অগ্নিসাক্ষী করে তুমিই পাঞ্চালীকে গ্রহণ কর ।’ অর্জুন বললেন, ‘হে নরশ্রেষ্ঠ, আপনি আমাকে অধর্মভাগী করবেন না। জ্যেষ্ঠ বর্তমানে অন্যের বিবাহ অশাস্ত্রীয় । সবার আগে আপনি যা আদেশ করবেন তাই হবে। আমরা সকলেই আপনার শাসনের অধীন।’ অর্জুনের একথা শুনে পান্ডুপুত্রগন সকলে দ্রৌপদীর দিকে তাকালেন। তাঁরা দ্রৌপদীর রূপ-লাবন্যে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তাঁদের সকলেরই মনে হল – ‘কাম্যং রূপং পাঞ্চাল্যা বিধাত্রা বিহিতং স্বয়ম্ ।’ – (ব্যাস-মহাভারত)। অর্থাৎ কামনা উদ্রেগকারী পাঞ্চালীর এই রূপ বিধাতা নিজহাতে নির্মাণ করেছেন। যুধিষ্ঠির ভাইদের আচার ইঙ্গিত দেখে তাঁদের মনোভাব বুঝে নিলেন। তিনি দূরদর্শী। তাই তাঁর বুঝতে অসুবিধা হল না, দ্রৌপদীকে কোন এক ভাই বিয়ে করলে ভাতৃবিরোধ অবশ্যম্ভাবী । মহামুনি ব্যাসদেবের কথাও তাঁর মনে পড়ে গেল। ব্যাসদেব বলেছিলেন, দ্রৌপদীর পঞ্চপতি বিধিনির্দিষ্ট। অতএব সবদিক বিবেচনা করে, সর্বপরি ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ পরিহারের উদ্দেশ্যে মতিমান যুধিষ্ঠির আদেশ দিলেন- ‘সর্বেষাং দ্রৌপদী ভার্যা ভবিষ্যতি হি নঃ শুভা ।’ -(ব্যাস-মহাভারত)। দ্রৌপদী আমাদের সকলের ভার্যা হবে। এতে আমাদের মঙ্গল।

পাঞ্চালরাজ দরবারে দ্রৌপদীর স্বয়ম্বর সভায় উপস্থিত ছিলেন কৃষ্ণ-বলরাম দুই ভাই। ব্রাহ্মণবেশী যুবককে লক্ষ্যভেদে সফল হতে দেখে শ্রীকৃষ্ণের মনে দৃঢ় ধারনা হল, ঐ যুবক অর্জুন ছাড়া আর কেউ নন। এদিকে দ্রৌপদীকে ব্রাহ্মণের গলায় মালা পরাতে দেখে সভায় তুমুল কোলাহল উঠল। ক্ষত্রিয় রাজন্যবর্গ পাঞ্চালরাজ দ্রুপদকে প্রবঞ্চক বলে বিদ্রোহ করলেন। তাঁরা দাবি করলেন, ক্ষত্রিয়রাজা ব্রাহ্মণকে কন্যা দিতে পারবেন না। এরকম অবস্থায় শ্রীকৃষ্ণ এই বলে রাজন্যবর্গকে অনুরোধ করলেন, ‘ব্রাহ্মণ তো ধর্মের দ্বারাই কৃষ্ণাকে (দ্রৌপদীকে) লাভ করেছে, অতএব আপনারা নিরস্ত হন।’

এরপর কৃষ্ণ-বলরাম অলক্ষ্যে পাণ্ডবদের অনুসরণ করে ভার্গব কর্মশালায় প্রবেশ করলেন। দ্রৌপদীকে নিয়ে পাণ্ডবগণ মাতা কুন্তীসহ ভার্গবগৃহে সংসার পাতলেন। এ খবর অচিরে কৌরবরাজ ধৃতরাষ্ট্রের কানে পৌঁছুল। ধৃতরাষ্ট্রের ভীম ও বিদুরের সাথে পরামর্শ করে পাণ্ডবদের যথাযোগ্য মর্যাদায় ফিরিয়ে আনলেন। ভবিষ্যৎ বিরোধ পরিহারের উদ্দেশ্যে অন্ধ্ররাজ পাণ্ডবদের জন্য রাজ্য ভাগ করে ইন্দ্রপ্রস্থ নামক স্থানে রাজধানী স্থাপন করে স্বাধীন ভাবে বাস করার অনুমতি দিলেন। ইন্দ্রপ্রস্থে রাজধানী স্থাপন করার পর শ্রীকৃষ্ণের পরামর্শে যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করেন। যজ্ঞের প্রস্তুতির জন্য শ্রীকৃষ্ণ, ময়দানব বিশ্বকর্মাকে এক চোখ ধাঁদানো অতি মনোরম অট্টালিকা নির্মাণ করে দিতে বললেন। ময়দানব অনতিবিলম্বে যুধিষ্ঠিরের জন্য এক অদৃষ্টপূর্ব রমণীয় প্রাসাদ তৈরী করে দিলেন। যজ্ঞে আমন্ত্রিত দুর্যোধন নানাভাবে অপদস্থ ও অপমানিত বোধ করলেন। বিশেষত পাণ্ডবদের ঐশ্বর্য ও শ্রীবৃদ্ধি দেখে ঈর্ষায় জর্জরিত হলেন। পাণ্ডবদের সোপার্জিত ধনসম্পদ থেকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে মামা শকুনির পরামর্শে যুধিষ্ঠিরকে পাশা খেলায় আমন্ত্রণ জানালেন। কপট পাশা খেলায় যুধিষ্ঠির সর্বস্ব হেরে, নিজেকে পণ রেখেও হেরে গেলেন। অবশেষে শকুনির প্ররোচনায় পত্নী দ্রৌপদীকে পণ রেখেও হেরে গেলেন।
দুর্যোধন আদেশ দিলেন ‘দ্রৌপদীকে এক্ষুনি এখানে নিয়ে আসা হোক্।’ দ্রৌপদী সভাসদে যেতে অসম্মতি জানালেন।

দুর্যোধন প্রাতীকামীকে আদেশ দিলেন- ‘এখানেই দ্রৌপদীকে নিয়ে এস।’ প্রাতীকামী দূত দুর্যোধনের বাধ্যতাহেতু তাঁর আদেশ পালনে তৎপর হলেও দ্রৌপদীর ক্রোধের ভয়ে ভিত হয়ে সভ্যগণ কে আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘আমি দ্রৌপদীকে গিয়ে কি বলব?’ একথার উত্তর না দিয়ে দুর্যোধন তার ভাই দুঃশাসনকে ডেকে বললেন, ‘এই মূর্খ অর্বাচীন ভীমকে ভয় পাচ্ছে। দ্রৌপদীকে আনা এর কর্ম নয়। তুমি নিজে গিয়ে তাকে ধরে নিয়ে এস ।’ এরপর যা ঘটল, পৃথিবীতে এতবড় অন্যায় বোধহয় এর আগে কখনো ঘটেনি। অনেক রক্তপাত হয়েছে, অনেক নরহত্যা, ভাতৃহত্যাও ঘটেছে, কিন্তু নারীর এতবড় অপমানের সাক্ষ্য পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোথাও নেই।

দুঃশাসন সরাসরি দ্রৌপদীর কাছে গিয়ে তাঁকে কর্কশ ও শ্রুতিকটু ভাষায় জানল, ‘কৃষ্ণা,(দ্রৌপদীর আরেক নাম) দুর্যোধন তোমাকে পাশাখেলায় জিতেছেন। তুমি এখন দুর্যোধনের দিকে দৃষ্টিপাত করো। আর লজ্জা কিসের !’ একথা শুনে দ্রৌপদী যেখানে কুরুগৌরববৃদ্ধ রাজাদের স্ত্রীগণ ছিলেন, সেদিকে ছুটে গেলেন। দুঃশাসনও ক্রোধে গর্জন করতে করতে তাঁকে অনুসরণ করল। তাঁর নীল কুঞ্চিত কেশদাম ধরে টানতে লাগল। ‘দীর্ঘেষু নীলেষথ চর্মিৎসু জগ্রাহ কেশেষু নরেন্দ্রপত্নীম্ ।’ – ব্যাসদেব মহাভারতে দুঃশাসন কর্তৃক দ্রৌপদীর কেশাকর্ষণের কথা ঐ শ্লোকার্ধে বর্ণনা করে তাঁকে কিভাবে সভায় নিয়ে যাওয়া হল তার এক করুণ মর্মস্পর্শী বর্ণনা দিয়েছেন।

স তাং পরাকৃষয় সভাসমীপমানীয় কৃষ্ণামাতিদীর্ঘকেশীম্ ।
দুঃশাসনো নাথবতীমনাথবচ্চকর্ষ কদলীমিতাবার্তাম্ ।।

দুরাত্মা দুঃশাসন কৃষ্ণার চুলের মুঠি ধরে টানতে লাগল। কৃষ্ণার পাঁচজন পতির সামনেই টানতে টানতে তাকে সভায় আনা হল। সেই অসহায় কৃষ্ণা ক্রোধে, লজ্জায়, অপমানে, ঝরের দাপটে অসহায় কলা গাছের মত কাঁপতে লাগলেন। দ্রৌপদী লজ্জায় বিব্রত হয়ে পড়লেন। তিনি ব্যাকুলভাবে করুণস্বরে আবেদন জানালেনঃ ‘আমি রজঃস্বলা, একবস্ত্রে আছি। মূর্খ তুমি আমাকে সভায় নিয়ে যেওনা।’ দ্রৌপদীর করুণ আর্তির উপরে নরপশু দুঃশাসন যা জানাল, তা সর্বকালের, সর্বদেশের অশ্রাব্য, জঘন্য, গর্হিত অপরাধ, তা সকল নারীজাতির লজ্জার, বেদনার ও ক্ষোভের কারণ। গর্বান্ধ, মোহান্ধ ও বিজয়োল্লাসে মত্ত দুঃশাসন বলল, ‘তুমি রজঃস্বলা, কি একবস্ত্রা বা বিবস্ত্রা- ওসব কাঁদুনি আমি শুনতে চাইনা। পাশাখেলায় তোমাকে আমরা জিতেছি। এখন তুমি আমাদের দাসী। দাসীর মত ব্যাবহারই তোমার প্রাপ্য।’ এই বলে দুঃশাসন হিড়্ হিড়্ করে টেনে নিয়ে চলল। নির্মম ভাবে টানার ফলে তাঁর লম্বাচুলের গোছা এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়ল,গায়ের আধখানা কাপড় খুলে মাটিতে লুটোতে লাগল। রাগে জ্বলে গেলেও লজ্জাবতী দ্রৌপদী সংযম অবলম্বন করে শান্তকন্ঠে বললেনঃ ‘এই সভায় গুরুজনগনের সম্মুখে আমি এভাবে নিজেকে উপস্থাপিত করতে পারিনা।’ দুঃশাসনকে অনেক কাকুতি মিনতি করলেন, যাতে সে যেন তাঁর আব্রু রক্ষা করে। কিন্তু দুঃশাসন সাধ্বীর কোন কথায় শুনল না। লজ্জায় কুঁকড়ে যাওয়া দ্রুপদরাজকন্যাকে যখন টেনে হিঁচড়ে সভার সামনে হাজির করানো হল, বীরাঙ্গনা দ্রৌপদী তখন আর ক্ষোভ চেপে রাখতে পারলেন না। রাজ্যসভার সামনে তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। সভাসদ্গণের উদ্দেশ্যে বললেনঃ

‘ধিগস্তু নষ্টঃ খলু ভারতানাং ধর্মস্তথা ক্ষত্রবিদঞ্চ বৃত্তম্ ।
যত্র হ্যতীতাং কুরুধর্মবেলাং প্রেক্ষন্তি সর্বে কুরবঃ সভায়াম্ ।।
দ্রোণস্য ভীষ্মস্য চ নাস্তি সত্ত্বং ক্ষত্তুস্তথৈবাস্য মহাত্মনোহপি ।
রাজ্ঞস্তথা হীমমধর্মমুগ্রং ন লক্ষয়ন্তে কুরুবৃদ্ধমুখ্যাঃ ।।

ধিক্ ! ধিক্ ! ভারতবর্ষের ধর্ম ধ্বংস হয়ে গেল। দুর্বল ও আর্তকে রক্ষা করা যে ক্ষত্রিয়ধর্ম, তাও আজ শেষ। কেননা,সভায় উপস্থিত কুরুবংশীয় ক্ষত্রিয়গণ বিনা প্রতিবাদে ধর্মের এই ভয়ানক গ্লানি দেখেছেন। এরপর মুখ্য সভাসদ্গণের নাম উল্লেখ করে বললেন, দ্রোণ, ভীম, মহাত্মা বিদুর এদের কোন ক্ষমতাই নেই। এমনকি, রাজা ধৃতরাষ্ট্রেরও কোন ক্ষমতা নেই। থাকলে এই উগ্র অধর্ম তাদের নজর এড়িয়ে যেতনা।

শুধু প্রতিবাদ জানিয়েই দ্রৌপদী ক্ষান্ত হননি,তিনি নাম উল্লেখ করে প্রত্যেকের দুর্বলতার দিকে আঙুল তুলেছেন। তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করেছেন- তাঁরা শুধুই বরিষ্ঠ সভাসদ্, তাদের ধর্মরক্ষা করার ক্ষমতা নেই। এমনকি রাজাকেও তিনি ক্ষমতাহীন কাঠের পুতুল বলেছেন। তাঁর বলিষ্ঠ প্রতিবাদ, তাঁর ভাষার ওজস্বিতা, রাজ্যসভায় অর্ধনগ্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে সুতীক্ষ্ণ ভাষায় সভাসদদের সমালোচনা করেছেন।
দ্রৌপদীর ধিক্কারব্যাঞ্জক বাণীর সুতীব্র কষাঘাতেও সভা নীরব-নিরুত্তর। সভাসদ্গন সকলেই অপরাধবোধে বাকশক্তিহীন হয়ে পড়লেন। দ্রৌপদীর সুনির্দিষ্ট ও সুতীক্ষ্ণ প্রশ্নের কেউই উত্তর দেননি। দুঃশাসন সবলে দ্রৌপদীর বস্ত্র খুলতে করতে লাগল। কৃষ্ণার অসহায় অবস্থা দেখে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বিচলিত হলেন। নিরুপায় দ্রৌপদীও অন্য কোন উপায় না দেখে শ্রীকৃষ্ণকে ডাকতে লাগলেন। লজ্জাবিব্রতা পাঞ্চালী সভার মাঝে দাঁড়িয়ে কাতরকন্ঠে বলতে লাগলেনঃ

‘গোবিন্দ দ্বারকাবাসিন্ কৃষ্ণ গোপিজন প্রিয়।
কৌরবৈঃ পবিভূতাং কিং ন জ্ঞাস্যসি কেশব।।
হে নাথ, হে রমানাথ ব্রজনাথার্তিনাশন ।
কৌরবার্ণবমগ্নাং মামুদ্ধরস্ব জনার্দন।।
কৃষ্ণ কৃষ্ণ মহাযোগিন্ বিশ্বাত্মন বিশ্বভাবন।
প্রপন্নাং পাহি গোবিন্দ কুরুমধ্যেহবসীদতীম ।।

অর্থাৎ হে গোবিন্দ দ্বারকাবাসী, হে কৃষ্ণ গোপীজনবল্লভ! কৌরবরা আমাকে কিভাবে নিপীড়িত করছে তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না? হে প্রভু, হে লক্ষ্মীপতি, হে ব্রজেশ্বর, হে দুঃখ নিবারক, হে জনার্দন! আমি কৌরব সাগরে ডুবে যাচ্ছি। তুমি আমাকে উদ্ধার কর। হে মহাযোগী কৃষ্ণ, তুমি জগতের আত্মা, তুমি জগৎকল্যাণকারী, কুরুসভায় ভয়ানক কষ্টে পড়ে আমি তোমার শরণ নিচ্ছি। হে গোবিন্দ তুমি আমাকে বাঁচাও।

দ্রৌপদীর এই আকুল আহ্বানে শ্রীকৃষ্ণ সাড়া না দিয়ে পারলেন না। তিনি অন্তরীক্ষ থেকে বিচিত্র সুবস্ত্রে তাঁর অঙ্গ ঢেকে দিতে লাগলেন। শ্রীকৃষ্ণের আদেশে বিচিত্র বস্ত্র শয়ে শয়ে আবির্ভূত হতে লাগল। এই অদ্ভুত ঘটনা দেখে সভার মধ্যে ভয়ানক হৈ চৈ বেঁধে গেল। সভামধ্যে শতচেষ্টা করেও দুঃশাসন দ্রৌপদীকে বিবস্ত্র করতে পারলনা।

‘নারদ পুরাণ’ এবং ‘বায়ু পুরাণ’ অনুযায়ী, দ্রৌপদী একাধারে ধর্ম-পত্নী দেবী শ্যামলা, বায়ু-পত্নী দেবী ভারতী এবং ইন্দ্র-পত্নী দেবী শচী, অশ্বীনিকুনারদ্বয়ের পত্নি ঊষা এবং শিব-পত্নী পার্বতীর অবতার। বিগত জন্মে তিনি ছিলেন রাবণকে অভিসম্পাত-প্রদানকারী বেদবতী। তার পরের জন্মে তিনি সীতা। তাঁরই তৃতীয় ও চতুর্থ জন্ম দময়ন্তী এবং তাঁর কন্যা নলযানী। পঞ্চম জন্মে তিনি দ্রৌপদী।

মহাভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যা করুক্ষেত্রের যুদ্ধে পরিণতি লাভ করে । এই ঘটনার প্রভাবক ছিল দুর্যোধনের পাণ্ডবদের ও দ্রৌপদীকে নিগৃহীত করার বাসনা এবং তাঁর অপমানের প্রতিশোধ নেওয়া ।

চলবে…

আগের পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন , পরের পর্ব এখানে

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

68 − = 67