নারী বৈষম্য

নারী মুক্তির প্রধান অন্তরায় নারী বৈষম্য। নারী বৈষম্য মানে মানদন্ডে পুরুষ এবং নারীর অসম মর্যাদা, সম্মান বা সামাজিক অবস্থান। তা হতে পারে দৈহিক গঠন, বুদ্ধিমত্তার মুল্যায়ন, কর্মক্ষেত্র, নিজের মত প্রকাশের ক্ষেত্রে। এমন কি নিজের পোষাক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশের নারীরা উল্লেখিত প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৈষম্যের শিকার। বৈষম্যের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে এখন তারা এটাকেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবেই মেনে নিয়ে নিজস্বতাকে হারিয়ে ফেলেছে। হঠাৎ করেই কিন্তু এ অবস্থার সৃষ্টি হয়নি। শত শত বছরের চলমান প্রক্রিয়ায় সুক্ষ্মভাবে তাদের মস্তিস্কে প্রোথিত করা হয়েছে-নারীর জন্মই হয়েছে পুরুষের সেবা করার জন্য। বছর বছর সন্তান জন্ম দেয়াই তাদের প্রধান কর্ম। নারীর চেয়ে পুরুষের সম্মান অনেক বেশী মুল্যবান। তারা একটা যন্ত্র বৈ অন্যকিছু নয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধর্মের উদ্ভট মতবাদ বা দৃষ্টিভঙ্গীও উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। পুরুষতান্ত্রিক ধর্মীয় সমাজ ব্যবস্থায় নারী শুধু ভোগ্য পন্য।

আমার বড় বোনের বদৌলতে নরসিংদী জেলার চরাঞ্চলের নারীদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচীতে জাইকার একটি টিমের সাথে ছিলাম কিছুদিন। গ্রাম গুলোর প্রতিটি বাড়ীতে গিয়ে নারীদের সাথে কথা বলে তাদের ভয়াবহ চিত্র অবলোকন করেছি। টিমের সদস্যদের জাপান থেকে বাংলাভাষা শিখিয়ে পড়িয়ে বাংলাদেশে পাঠানো হলেও, চরাঞ্চলে গিয়ে সেসব কোন কাজেই আসেনি। দুপক্ষের কেউ কারো কথাই বুঝতে পারছিল না। এ জন্য নারীদের সাথে কথা বলার দায়িত্ব চাপে আমার ও টিমের অপর বাংলাদেশী সদস্য নন্দিনীর উপর। আমরা নারীদের কথা শুনে তা আবার বাংলা, ইংরেজীর সাথে দু চারটা জাপানীজ শব্দ জুড়ে দিয়ে তরজমা করতাম। কোন বাড়ীতে গিয়ে নারীদের সাথে কথা বলতে চাইলে প্রথমেই তারা পালানোর চেষ্টা করতো। বুঝিয়ে শুনিয়ে উদ্দেশ্য বলার পর বেশীরভাগ নারীরই ভাষ্য-বেডি পাইতের আবার অসুক কিয়ের! কথাটা প্রথম শুনে রীতিমত চমকে উঠি। এ বিষয়ে আলাপ করতে গিয়ে বুঝলাম তাদের সাথে এ প্রসঙ্গে বেশী কথা বললে উত্তম মাধ্যমের সম্ভাবনাই বেশী। তাই রোগ,স্বাস্থ্য নিয়েই আলোচনা শুরু করলাম। এখানেও আরেক ঝামেলা। তাদের প্রশ্ন ‘মাইয়া মাইনষে কি চিকিস্যা করবো’? (আমি ছাড়া টিমের সবাই মেয়ে)।

টিমের সবাই জাপান থেকে এসেছে শুনার পর কিছুটা আশ্বস্ত হয় তারা।তাদের শারীরিক সমস্যার কথা জানতে চাইলে আরেক দফা চমকে উঠি আমরা। বেশীরভাগ নারীই জটিল গাইনী সমস্যায় আক্রান্ত দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু চিকিৎসার কথা তাদের মাথায়ই নাকি আসে নি, অথচ বছরের পর বছর অসহ্য যন্ত্রনা সয়ে যাচ্ছে শুধু স্বামীর চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে। কয়েক জনের মন্তব্য-স্যার আমার স্বামীর জীবনডা নষ্ট কইরা হালাইলাম, আমরার একটা ব্যাবস্তা কইরা দ্যান। একজনকে প্রশ্ন করি স্বামীর রাতের জীবন নিয়ে আপনি চিন্তিত, আপনার নিজের জীবন যে ঝুকির মধ্যে আছে তা নিয়ে আপনার স্বামী কি চিন্তা করে? আমার কথার কোন উত্তর সে নারী দিতে পারেনি। বোকার মত শুধু তাকিয়ে ছিল। কি উত্তর দিবে সে! এর কোন উত্তর তার জানা নেই। যে পরিবারের সবার আগে ঘুম থেকে উঠে সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে,উচ্ছিষ্ট অবশিষ্ঠ খেয়ে সবার শেষে শুতে যায় সে জানে নারীর জীবনের কোনই মূল্য নেই। তার দৃষ্টিতে রাস্তার কুকুর আর নারী একই মর্যাদার।

যখন আমি সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি তখন আমার দাদী জাতীয় এক মহিলার মুখে শুনেছিলাম ‘মাইয়া মাইনষের তিনটা দোষ। উপ্রে নাই দাড়ি মোছ, নিচে নাই অণ্ডকোষ’। তখন এসব বিষয়ে ভালভাবে বুঝার মত জ্ঞান না হলেও কথাটা আমার কাছে বেখাপ্পা লেগেছিল। কয়েক বছর পর তসলিমা নাসরিনের বই পড়তে গিয়ে কথাটা আবার আমাকে ভাবায়। বিষয়টাকে আমার কাছে অত্যান্ত জটিল মনেহয়। একজন নারীর দাড়ি-গোঁফ কিংবা অণ্ডকোষ না থাকাতে যদি সে নিজেকে দোষী বা অপরাধী ভাবে তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটা কত গভীরে প্রবেশ করেছে, কত কঠিন ভাবে তার মস্তিস্ককে বিকৃত করা হয়েছে। আর এ থেকে লাভবান হয়েছে পুরুষ, এবং পুরুষ। এ সমস্যার গভীর হতে নারীকে টেনে হিচড়ে কখনই বের করা সম্ভব নয়। জোর করে তাদের মুক্তিও দেয়া যাবে না। আইন বা আইনের প্রয়োগ করে বা সভা সমাবেশ, সেমিনার সিম্পোজিয়াম করেও সহসা সফল হওয়া সম্ভব না। এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক ও সামাজিক আন্দোলনের। প্রত্যেককে তার নিজ নিজ অবস্থান থেকে দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন করতে হবে। প্রত্যেকের শুরুটা যদি হয় নিজের পরিবার থেকে তবেই সম্ভব নারীর মুক্তি। একদিন নারী হয়ে উঠবে মানুষ। ফিরে পাবে তার স্বকীয়তা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

56 + = 59