অশান্তি…

বৃষ্টির কোন আলাদা রঙ আমি খুঁজে পাই না। এজন্য বড়ই হতাশা বোধ আসে নিজের মাঝে। আকাশ ভেঙ্গে মাটিতে এসে পড়া বৃষ্টির সাথে সাধারণ পানির অমিল টা কোথায়? প্রতিদিন ই তো পানিতে ভিজতে হয় স্নানের বেলায়। তৃষ্ণার সঙ্গী খাবার পানির সাথে বৃষ্টির পানির বিশেষণ মিলিয়ে ফেলা টা আমার কাছে অযৌক্তিক। সৃষ্টিকর্তা এত কিছু তৈরি করেছেন, তার সৃষ্টি কে যত টা পেরেছেন সৌন্দর্য এর উপমায় ভরিয়ে তুলেছেন, তবে বৃষ্টির ফোঁটায় আলাদা কোন রঙের প্রলেপ এঁকে দেন নি! এ জন্য স্রষ্টাকে কঠোর ভাবে দোষারোপ করতে আমার কোন দ্বিধা নেই…

তাহলে কি রকম হতে পারতো বৃষ্টির রঙ? নীল? সবুজ হলেও তো মন্দ হতো না! এত এত রঙের খেলায় আচ্ছাদিত হতে পারতাম অসীম উন্মাদনায়। আকাশে মেঘের তাণ্ডবে মাটির পৃথিবী তে চলতো উন্মত্ত হোলি খেলা! দিবা স্বপ্নই দেখে যাই শুধু, আর স্বপ্নেই ভিজতে থাকি কাল্পনিক বৃষ্টি তে। বাস্তবতার পথ ধরে পার্থিব বৃষ্টি টাও যেন শহুরে ছকে মোড়ানো…

তবুও বিচিত্রতা খুঁজে পাই এই বৃষ্টির মাঝে। রঙ বিহীন বৃষ্টিতে নিজেকে স্নাত করতেমাথার নিউরনে যেন জোরে কষাঘাত পড়ে। দেহের ভার্টিব্রা সচল হয়ে উঠে, গরাদের মাঝেযান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি খুঁজে বেড়ায় অসুস্থ মন। বেরিয়ে পড়ি ঘর থেকে।

অনেক দিন ই আসলে বৃষ্টিতে ভেজা হয় নি। কখনো কর্পোরেট লেবাসের শেকলে আবদ্ধ থেকে,আবার কখনো অসুস্থতার ঘেরাটোপে পড়ে। বৃষ্টির বেগ বাড়ছে, পিচের রাস্তায় এই বৃষ্টির শব্দ টা যেন অনেক টা সম্মিলিত অর্কেস্ট্রার মত। এক তালে বেজে চলছে, বিরতিহীন। কখনো ঝিরি ঝিরি বেগে কোমল একটা স্বরে মস্তিষ্কে ছোঁয়া দিয়ে যাচ্ছে। আবার কখনো প্রবলশব্দে জানিয়ে দিচ্ছে, “আমাকে এত টা নরম ভেবো না, আমিও আঘাত করতে জানি সক্রোধে”

নাহ, আমি এতটা সৌভাগ্যবান নই। ছেঁড়া-ফাটা জিন্স আর মলিন হয়ে যাওয়া টি শার্ট ধারী একটা সাইকো ছেলের সঙ্গী কোন বাস্তবতা বাদী সুন্দর রমনী কখনই হতে চাইবে না। এক সাথে হাতে হাত ধরে ভিজতে ভিজতে রাস্তায় হেঁটে বেড়ানো টা বড়ই দূর কল্পনা, বরং আমার কাছে একাকীত্বের আবেদন টাই বেশি উপভোগ্য লাগে। নিজের সুন্দর মূহুর্ত গুলো কারো সাথে ভাগা ভাগি করে নেওয়ার মত মানুষ আমি নই, আমি স্বার্থপর। বৃষ্টির ফোঁটার স্পর্শ টাই আমার কাছে বেশি আবেগময়ী, কোন মেয়ের উষ্ণ হাতের স্পর্শের চাইতে…

হ্যাঁ, বেশ কিছু দিন হলো এক জন সঙ্গীকে আমি পেয়েছি আমার পাশে- আমার সাইকেল টি। সাইকেল বলাটা একটু অতিরিক্ত বাড়াবাড়িই হবে, ভগ্নদশার কোন রিক্সা কিংবা ভ্যান গাড়ির সংমিশ্রনে তৈরি সংকর জাতের দু চাকার একটা প্রাণহীন বস্তু। একটা টায়ারে আবার হাওয়ার বেশ অভাব,বেচারা অনেক টাই চিমসে আছে হাওয়া না পেয়ে। কথা বলার সামর্থ্য থাকলে হয়তো শিশুর মত চিৎকার করতো, “আমাকে হাওয়া দাও, আমি হাওয়া খাবো” বলে। হাওয়া ভরার এত টা সময় নেই,এভাবেই বেড়িয়ে পড়ি।

বৃষ্টির বেগ টা মাঝারি, তবে যথেষ্ট জোরালো। সাইকেলে ঘুরে ঘুরে বৃষ্টি বিলাশ! অনেকটা পাগল করা অনুভূতি… প্যাডেল করছি খুব জোরে। পুরো রাস্তা পানির নিচে ডুবে আছে। এক দিকে বৃষ্টিতে অবিরাম ভিজে যাওয়া- অন্য দিকে প্যাডেলের জোরে জমে থাকা পানি গুলো ছিঁটকে আবার গায়ে এসে পড়া… সে এক উদ্দাম আদিম মোহ! সেই সাথে বাতাসের বেগ টাও মনে হচ্ছে অবিরাম পেছন থেকে সবেগে ধাক্কা দিচ্ছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। বৃষ্টির বাগড়ায় রাস্তা প্রায় জনশূণ্য। এই ভর দুপুরে নিজেকে মুকুট ছাড়া এক বিশাল রাজ্যের রাজা মনেহয়… কারো সাধ্য নেই আমাকে বাধা দেওয়ার!

কিন্তু বিধি বাম। খোদ বিধাতাই বাধ সাধলো এই খেলার মাঝে। আকাশ টা আস্তে আস্তে নীরবহতে শুরু করলো। বাতাস টাও যেন এলো মেলো হয়ে এলো, যে ঘোরে ছিলাম সেটাও নিঃশ্বেষ হওয়ার পথে। বৃষ্টিবিলাসের সমাপ্তি এখানেই, নিজেকে অনেকটা বিভ্রান্ত মনে হলো- যে উদ্দেশ্যে বেড়িয়েছিলাম সেই উদ্দেশ্যের সমাপ্তি এত তাড়াতাড়ি ঘটবে তা ভাবি নি।

রাস্তা ঘাট আবারো কোলাহলমুখর হতে শুরু করেছে। পাশ দিয়ে হঠাত হঠাত ই হুশ করে গাড়িগুলো রাস্তার কাদা পানি গুলো ছিঁটিয়ে দিচ্ছে। ভাবলাম, এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কোনমানে নেই। জেল খানায় আবদ্ধ কয়েদী হয়ে থাকার চেয়ে কিছুক্ষন মুক্ত আকাশে ভেজা কাকহয়ে ঘুরে বেড়ানো টাই উত্তম হবে। সাইকেল টা তে আবারো প্যাডেল দেই।

বেশ ঠাণ্ডা লাগছে এখন। ক্রমাগত শরীর থেকে পানি পড়ছে, একটু উষ্ণ হওয়া দরকার। মগজের কোষ গুলোও কেমন যেন একটু লাগামহীন ঘোড়ার মত আচরণ করছে। শান্ত করা দরকার। ঘুরে ঘুরেএকটা টং এর দোকান খুঁজে বের করলাম। বেনসন নেওয়ার পর দোকানীকে টাকা দিতে গিয়ে দোকানীকে বলি, “মামা, এক টাকা কম আসে। সিগারেট টা কি দিলে তোমার খুব বেশি ক্ষতি হবে? যদি নাহয় তবে দেওয়ার দরকার নেই”

“আরে না না, সমস্যা নাই… নিয়া যান”। যাক, এই সস্তা ব্ল্যাকমেইল করাটা এখন সহজাত হয়ে গেছে। এক টাকা থাকা সত্ত্বেও সব সময় সাত টাকা দিয়েই বেনসন টা কেনা হয়। আট টাবেনসন কিনলে আট টাকা বাঁচবে। তাহলে অতিরিক্ত আরেক টা পাওয়া যাবে!! হাহাহা, উর্বরমস্তিষ্কের উর্বর চিন্তা ভাবনা। সিগারেট টা টানতে টানতেই সাইকেল নিয়ে এগুই। মাঝেমাঝে হ্যান্ডেল টা ঘুরে যায়- তবুও মাতালের মত চালাতে থাকি। মাথার ভিতর টা আস্তে আস্তে নিষ্ক্রিয় হয়ে আসছে। যাক, চাপ টা কমানো গেছে। বৃষ্টিতে ভালোভাবে ভিজতে না পারার ডিপ্রেসান টাও আস্তে আস্তে চলে যেতে শুরু করলো।

রোদের আভা এসে পড়েছে রাস্তার এক কোনায়। আস্তে আস্তে পুরো রাস্তা জুড়ে রোদের বিস্তার ছড়িয়ে পরলো, ঝলসানো রোদ নয় বরং অনেক টা ঠাণ্ডা, শীতল রোদ। সূর্য টাকে এতটা তীব্র মনে হচ্ছে না। বেশ শান্ত ভঙ্গিতে অনেক টা মাথা নোয়ানো ভঙ্গিতে মেঘের মাঝখান দিয়ে উঁকি দিচ্ছে। অনেক টা ঘোর আসতে শুরু করলো আবার মাথার ভেতরে, যেমন টা এসেছিল বৃষ্টি আসার সময়। অনুভূতিগুলো আবার শূন্যতায় ডুবে যাচ্ছে…

সাইকেল চালানোয় এত টা পটু নই। আর এখন সাইকেল চালাচ্ছি মাঝ রাস্তায়, কিন্তু আমার ভাবনা গুলো এখন ওই সূর্যের রশ্মি রেখা বরাবর আবদ্ধ। ছোট বেলায় সূর্যের দিকে অনেকখন খালি চোখে তাকিয়ে থাকতাম। মা প্রায় ই বকত। এখন তো আর বকার কেউ নেই!! রাজপথের আড়ালে চোখ জোড়া এখন আমার সূর্যের দিকে আবদ্ধ! শীতল রোদ আমার চোখ কে অন্ধ করেদিচ্ছে, আর আমি অন্ধত্ব বরণ করে তাকিয়ে আছি এক পলকে…

নাহ, কখন যে ভূপাতিত হয়েছি খেয়াল আসছে না! হঠাত ই বুঝতে পারলাম আমার দিকে রাস্তার লোক জন তাকিয়ে হাসছে! সারা শরীরে কাদা মেখে একাকার। আমার কালো টি শার্ট কাদার প্রলেপে পুরোপুরি খয়েরি রং ধারণ করেছে। মুখ টাও পুরোপুরি কাদা পানি তে ভরে আছে। বোধ হয় ভারসাম্য হারিয়ে কখন যে কাদার স্তুপের উপর এসে পড়েছি খেয়াল নেই। আশে পাশের লোক জন তাদের ক্রুদ্ধ হাসি দিয়ে আমাকে ক্রমাগত উপহাস করে চলছে… একজন মাঝ বয়সীলোক এসে হাত টা বাড়িয়ে দিলেন, “ কি ভাই, গাঁজা খাইয়া সাইকেল চালান নাকি??!! আরেকটু হইলে তো কোমর ডা ভাংতেন!”

কোন মতে তার উপর ভর দিয়ে দিয়ে উঠলাম চুপচাপ। গায়ের অতিরিক্ত কাদা গুলো কোন মতে ঝাড়া দিয়ে লোক টিকে ধন্যবাদ দিয়ে আবার সামনে এগুতে থাকি। এবার নিজের উপরই মেজাজ টা বিগড়ে যেতে থাকে। নিকোটিনের প্রয়োজন আরেক দফা। ব্যবস্থা হলো সামনের আরেক টা টং এরদোকান থেকে, তবে এবার সস্তা স্টারলাইট। ওখানে বেনসন নেই, সাপ্লাই বন্ধ। কোন রকমে মুখে দিয়ে অশান্ত ভাবে ধোঁয়া ছাড়তে লাগলাম। মাথাটা প্রচণ্ড ভার লাগছে, জ্বরের সুক্ষ্ম উপস্থিতি খুঁজে পাচ্ছি!

পকেট থেকে হেড ফোন আর মোবাইল টা বের করি, এভাবে সিগারেট টেনে শান্তি পাচ্ছি না…হেডফোন টা কানে দেওয়ার পর পর ই যেন তো আমার কাছে পুরো পৃথিবীটা নিস্তব্ধ হয়ে এলো। ডেভিড বাউউয়ি এর তীক্ষ্ণ কথা গুলো বুকের মাঝে তীরের মত বিঁধছে নির্ভানার গানে…

We passed upon the stair, we spoken was and when
Although I wasn’t there, he said I was his friend
Which came as a surprise, I spoke into his eyes
I thought you died alone, a long long time ago

Oh no, not me
We never lost control
You’re face to face
To The Man Who Sold The World

পৃথিবিটা আসলেই বিক্রি হয়ে গেছে, নষ্টসভ্যতার হাত ধরে। স্রষ্টার হাত ধরে চলতে শেখা তার প্রিয় সৃষ্টিগুলো আজ নিজে ভুলে গেছে তার স্রস্টাকে। রেখে গেছে আমার মত কিছু অথর্ব কে, যারা বাস্তব আর কল্পনার কাঁটাতারে পড়ে নিজের অস্তিত্ত্বের সংকটে ভোগে…

অশান্ত মনে আবার প্যাডেল বাড়াই। নিজের অজান্তেই আবারো উলটাপালটা প্যাডেল করে এগুচ্ছি, জ্বর টা বাড়ছে ধীরে ধীরে। নাকের কাছে একটা তীব্র গন্ধ এসে ধাক্কা মারছে। চোখ টা পাশে ফিরাতেই দেখি একটা ডাস্টবিনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছি। একজন বুড়ো মানুষ ডাস্টবিন থেকে ঘেটে ঘুটে উচ্ছিষ্ট জিনিস গুলো বের করে তার পেট পূজো চালাচ্ছেন। আমি এক মনে তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। মাথার ভেতর টা আবার এলো মেলো হয়ে যাচ্ছে!!

চমকে উঠলাম হঠাত করে, দেখি মানুষ টি আমার দিকে অগ্নি দৃষ্টি তে তাকিয়ে আছে! “ এই তুই তো মইরা গেসোস, তোর গা দিয়া রক্ত ঝরতাসে। তুই ক্যান এইখানে আইসোস… এইটা তো ডাস্টবিন, কবর না। যাইয়া মাটিতে শুইয়া পড়!”

পায়ের কাছে তীব্র একটা ব্যথা অনুভূত হলো, দেখলাম আমার জিন্সের প্যান্ট টা লাল হয়ে আছে। সামান্য তুলে দেখি- রক্তের ধারা বইছে। সহসা মাথার ভেতর একটা পচা লাশের গন্ধ এসে ধাক্কা লাগলো। সরাসরি মাথার ভেতর!! আমি কি আসলেই লাশ হয়ে গেছি??

বৃষ্টিতে তো সব আবর্জনা ধুয়ে যায়, চলে যায় সব গন্ধ!! তবে আমি কেন নিজের দেহ থেকে লাশের গন্ধ পাচ্ছি!! নষ্ট সময়ের ঘায়ে আমার শরীরে বোধ হয় পচন ধরছে। নিজেকে মৃত্যুপুরীর মৃত মানুষ মনে হচ্ছে… এলোমেলো লাগছে সব!!!

স্রস্টা, তুমি আবার বৃষ্টিটা নামিয়ে দাও! এই লাশের গন্ধ নিয়ে আমি বেঁচে থাকতে চাইনা! আমাকে এই অশান্তি থেকে মুক্তি দাও…… এই নষ্ট পৃথিবীকে ভাষিয়ে দাও। ভাষিয়ে দাও!!!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১১ thoughts on “অশান্তি…

  1. এক বাক্যে চমৎকার।
    ভালো লেগেছে

    এক বাক্যে চমৎকার।
    ভালো লেগেছে ভীষণ। প্রতিটি লাইনে নিজেকে খুঁজে পেয়েছি। এমন ভাবে মিলালেন কীভাবে!!!

    এমন সুন্দর লেখায় “হুদাই” ট্যাগ দিবেন না। কুৎসিত লাগে। বানানের প্রতি যত্নবান হবেন আশা করি… :গোলাপ:

  2. দারুন লিখেছেন। ইস্টিশনে
    দারুন লিখেছেন। :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: :থাম্বসআপ: ইস্টিশনে আমরা বেশ কিছু ভালো গল্পকার পেয়েছি। :নৃত্য: :নৃত্য: :নৃত্য:

  3. পৃথিবিটা আসলেই বিক্রি হয়ে
    :তালিয়া: :তালিয়া:

    পৃথিবিটা আসলেই বিক্রি হয়ে গেছে, নষ্টসভ্যতার হাত ধরে

    :রকঅন: :রকঅন:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 4