সর্বশেষ নবী সর্বশ্রেষ্ঠ না (শেষ পর্ব)

যত যত নামে হযরত মুহাম্মদকে (তাঁর উপর শান্তি) অভিহিত করা হয়েছে তার মধ্যে একক এবং অদ্বিতীয় উপাধি হল খাতামান নাবিয়্যিন বা শেষনবী। তাঁর নাম নিয়ে আয়াত শুরু হয়ে এই মহান পরিচয়ের কথা বলে তা শেষ হয়েছে।
আল্লাহ তাঁর এই নবীর মর্যাদা প্রসঙ্গে অন্যত্র বলেন- আমি তোমার যিকর বা স্মরণকে সমুন্নত করেছি (৯৪:৪)। এভাবে আরও যত মর্যাদায় তাঁকে অভিষিক্ত করা হয়েছে, সেগুলোই কি আমাদের জন্য উদ্ধৃত করা যথেষ্ট নয়? যা বলেন নাই, যেভাবে বলেন নাই সেটা করার এখতিয়ার আমাদের কোত্থেকে এল?


ছয়. শেষনবীর পরিচয় ও উপাধি
“তোমাদের সবার প্রতি আমি আল্লাহ প্রেরিত রাসূল” [إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا]-৭:১৫৮। “আমি তোমাকে সমগ্র মানবজাতির জন্যে সুসংবাদাতা ও সতর্ককারী রূপে পাঠিয়েছি” [وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا]-৩৪:২৮।
‘রাসূলুল্লাহ’ তাঁর সময় থেকে পুরো মানবজাতির জন্য নবী যেহেতু তারপর কোন নবীর আগমন ঘটবে না। এখান থেকে এই সর্বশ্রেষ্ঠত্ব প্রমানিত হয় না যে, তিনি সকল পূর্ববর্তী নবীগণের ইমাম বা নেতা।
এমন বিশেষায়িত বৈশিষ্ট্য অন্যান্য নবী-রাসূলগণের ক্ষেত্রেও রয়েছে। স্বয়ং মহামহিম আল্লাহ তাঁর শেষনবীকে কী কী অভিধায় অভিহিত করেছেন?

১. মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল (৪৮:২৯)।
২. তিনি ‘খুলুকিন আজীম’ বা উত্তম চরিত্রের অধিকারী (৬৮:৪); তিনি ‘রহমাতাল্লিল ‘আলামিন’ (২১:১০৭)।
৩. মুহাম্মদ কোন ব্যক্তির পিতা নন; বরং আল্লাহর রাসূল এবং শেষনবী (خَاتَمَ النَّبِيِّينَ-৩৩:৪০)।
৪. নবী সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী। আল্লাহর আদেশক্রমে তাঁর দিকে আহবায়ক এবং উজ্জ্বল প্রদীপ (৩৩:৪৫-৪৬)।
৫. তিনি আমাদের মতই একজন মানুষ যার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় যে, আল্লাহই একমাত্র ইলাহ (১৮:১১০; ৪১:৬)।

যত যত নামে হযরত মুহাম্মদকে (তাঁর উপর শান্তি) অভিহিত করা হয়েছে তার মধ্যে একক এবং অদ্বিতীয় উপাধি হল খাতামান নাবিয়্যিন বা শেষনবী। তাঁর নাম নিয়ে আয়াত শুরু হয়ে এই মহান পরিচয়ের কথা বলে তা শেষ হয়েছে।
আল্লাহ তাঁর এই নবীর মর্যাদা প্রসঙ্গে অন্যত্র বলেন- আমি তোমার যিকর বা স্মরণকে সমুন্নত করেছি (৯৪:৪)। এভাবে আরও যত মর্যাদায় তাঁকে অভিষিক্ত করা হয়েছে, সেগুলোই কি আমাদের জন্য উদ্ধৃত করা যথেষ্ট নয়? যা বলেন নাই, যেভাবে বলেন নাই সেটা করার এখতিয়ার আমাদের কোত্থেকে এল?

এটাও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে আমরা ‘রাসূলুল্লাহ’র অর্থ শুধুমাত্র শেষনবীতেই সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। কুরআনে একই পরিচয় অন্যান্য নবীগণের ক্ষেত্রেও করা হয়েছে, যেমন. হযরত মূসা, হযরত ঈসা, হযরত সালেহ (সালামুন ‘আলাল মুরসালিন)।

সাত. তাহলে সর্বশ্রেষ্ঠ কে?
যে ইব্রাহীমের ধর্মমত অনুসরণ করে তাকে দ্বীনে সর্বোত্তম বলা হয়েছে [وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ وَاتَّبَعَ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا]-৪:১২৫। কথায় তাকে সর্বোত্তম বলা হয়েছে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, বিশুদ্ধ আমল করে আর নিজেকে শুধু মুসলমান হিসেবেই পরিচয় দেয় [وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ]-৪১:৩৩।

হযরত ইব্রাহীম (তাঁর উপর শান্তি) আল্লাহর নবী, উত্তম আদর্শ, মুসলিম জাতির পিতা ও মানবজাতির নেতা বা ইমাম। আর আল্লাহ রব্বুল আলামীন স্বয়ং তাঁকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন- [وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا]। কোন সৃষ্টিকে খলীল বা বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার উদ্ধৃতি কুরআনে এই একটিই- এরচে’ বড় অর্জন একজন সৃষ্টির জন্য আর কী হতে পারে?

কিন্তু ‘ইমামুল আম্বিয়া’, সাইয়্যিদুল মুরসালুন’– এগুলো হযরত ইব্রাহীমসহ কারও জন্যই কুরআনে প্রয়োগ করা হয়নি। মূলতঃ কুরআনে সর্বশ্রেষ্ঠত্ব সংক্রান্ত কোন বিশেষায়ন কারও ক্ষেত্রে করতে দেখা যায় না।

তবে ‘সাইয়্যিদ’ পদটি কুরআনে বিদ্যমান এবং তা হযরত ইয়াহইয়ার (তাঁর উপর শান্তি) ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ তাঁর এই বান্দা সম্পর্কে ঘোষণা দিচ্ছেন তিনি পরিণত বয়সে ‘নেতা’ হবেন।

কোন নবীকে অন্যদের উপর মর্যাদা দেয়া হয়েছে বলে কুরআনে তিনজন নবীর নাম আমরা পাই, ক. হযরত মূসা যার সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন; খ. হযরম ঈসার কথা বিশেষভাবে এসেছে যাকে রুহুল কুদুস দ্বারা শক্তি দান করেছেন; গ. আর হযরত দাউদকে যবুর দানের কথা বলেছেন।

শেষনবীকে প্রশ্ন করা হল, “হে আল্লাহর রাসূল, মানুষের মাঝে সবচে’ সম্মানিত ব্যক্তি কে”? তিনি বললেন- “যে তোমাদের মাঝে সবচেয়ে তাক্বওয়াবান”। নির্দিষ্ট করে জানতে চাইলে বললেন- “আল্লাহর নবী ইউসূফ যিনি নবীর পুত্র এবং আল্লাহর নবীর পৌত্র, আল্লাহর খলীলের প্রপৌত্র।”

একই কথার প্রতিধ্বনি আমরা শুনতে পাই সূরা হুজুরাতে– “আর নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক সম্মানিত যে সবচে’ তাক্বওয়াবান”। [إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ]-৪৯:১৩

“নিশ্চয় আমাদেরকে হাশরের ময়দানে খালি পা, বস্ত্রহীন এবং খতনাবিহীন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে; …….। আর কেয়মাতের দিন সবার আগে যাকে কাপড় পড়ানো হবে তিনি হবেন ইব্রাহীম।”
কেউ একজন খাতামান নাবিয়্যিনের কাছে এসে সোৎসাহে আহবান করেছিলঃ ‘ও সৃষ্টির সেরা’ বলে, তখন তাকে এই বলে সংশোধন করতে কালবিলম্ব করেন নি তিনিঃ সে হচ্ছে ইব্রাহীম।
‘হাদীস’ গ্রন্থসমূহ থেকে সর্বোত্তম সৃষ্টি সম্পর্কিত ধারণা আমাদের এতটুকুই। এর বাইরে নবী-কথন নামে চালানো কিন্তু কুরআনের শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যহীন বা সাংঘর্ষিক এমন যে কোন বিবৃতি প্রথমেই পরিত্যাজ্য।

আট. নির্দায় ঘোষণা
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর চাপানো এই ডাহা মিথ্যা থেকে মুসলিম উম্মাহর সম্মিলিতভাবে নির্দায় ঘোষণার সময় এসেছে। মহাসত্যের মহাআলোকবর্তিকা কুরআনকে পরিত্যাক্ত রেখে মুসলমান জাতি অন্ধকারের ঘোর অমানিশায় নিমজ্জিত।

সর্বশ্রেষ্ঠ তত্ত্বের মাধ্যমে ইহুদি-খ্রীস্টানদের মতই একক আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করা হয়েছে। মুসলমান তার মন-মগজে আল্লাহ তায়ালার পাশেই হযরত মুহাম্মদের এক মিথ্যা মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। নবীকে অনুসরণের পরিবর্তে মুসলমান নবী-বন্দনায় মজেছে সহজে পার পাবার বাসনায় যা কখনোই বাস্তবায়িত হবার নয়। সৃষ্ট নবীকে স্রষ্টা আল্লাহর কাতারে স্থাপনের মাধ্যমে সে তাওহীদের একক অবস্থান, শক্তি ও সৌন্দর্যকে ধ্বংস করে ফেলেছে।

আল্লাহকে ভালবাসতে চাইলে নবীর অনুসরণের (এত্তেবা) কথা বলা হয়েছে। আর অনুসরণ মানে অনুকরণ বা অভিনয় নয়। রাসূলকে অনুসরণের মানে কুরআনের অনুসরণ এই হেতু যে তিনি কেবলমাত্র কুরআন অনুযায়ীই চলতেন আর তাঁকে সেই নির্দেশই দেয়া হয়েছে।

মিথ্যার মহাপ্রাচীর ভাঙার মধ্য দিয়েই মুসলিম মন-মানসে বদ্ধমূল হাজারো কলুষ বিশ্বাসের মূলোৎপাটন করা সহজ হবে। সর্বপ্লাবী আঘাত এই মিথ্যার উপরই হানতে হবে। মুসলমান সত্যের সাথে মিথ্যাকে মিশ্রিত করার অভিযোগে অভিযুক্ত। সত্যকে লুকিয়ে সে আত্মঘাতি।

দ্বীনের ধ্বজাধারীরা ইসলামকে নগন্য মূল্যে কেনাবেচা করে আল্লাহর চূড়ান্ত লানতের যোগ্য। “নিশ্চয় যারা সেসব বিষয় গোপন করে, যা আল্লাহ কিতাবে নাযিল করেছেন এবং সেজন্য অল্প মূল্য গ্রহণ করে, তারা আগুন ছাড়া নিজের পেটে আর কিছুই প্রবেশ করায় না। আর আল্লাহ কেয়ামতের দিন তাদের সাথে না কথা বলবেন, না তাদের পবিত্র করা হবে, বস্তুতঃ তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব।”-২:১৭৪।

হযরত ইব্রাহীম ও অন্যান্য নবীগণ (সালামুন ‘আলাল মুরসালিন) সম্পর্কিত বহুবিধ কুরআনী তথ্য গোপন করা হয় শুধুমাত্র এজন্য যে, শেষনবীকে নিয়ে রচিত শয়তানের এই মিথ্যাটি যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। মহামিথ্যাকে টিকিয়ে রাখতে আরও বহু মিথ্যার সহায়তা নেয়া হয়। পাশাপাশি সত্যকে সকল প্রচেষ্টায় দমিয়ে রাখা হয়।

এমন অনেক বিষয় রয়েছে কুরআনে, শেষনবীর বেলায় যার উল্লেখ আমরা জোরেশোরে করি; কিন্তু হযরত ইব্রাহীম বা অন্য নবীর বেলায় আমরা তা প্রকাশ করি না।

যেমন. ‘উসওয়াতুন হাসানাহর’ (উত্তম আদর্শ) আলোচনায় শুধু শেষনবীর কথাই বলা হয়, অন্যান্য নবীগণের উদ্ধৃতি দেয়া হয় না। অথচ উত্তম আদর্শের সাথে হযরত ইব্রাহীমের নাম যুক্ত করে আল্লাহ আয়াত নাযিল করেছেন।
যেমন. হযরত ইব্রাহীম নিজেই এক ‘উম্মত’ বা সম্প্রদায় তুল্য, তাঁর প্রতিষ্ঠিত দ্বীনের এত্তেবা করার জন্য সরাসরি শেষনবীকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে (১৬:১২০-১২৩)। শেষনবী যে সেই নির্দেশের যথার্থ প্রতিপালনকারী ছিলেন তারও সত্যায়ন করা হয়েছে (৩:৬৮)।

যেমন. হরহামেশাই আমরা সূরা বনী-ঈসরাইলের প্রথম আয়াত শুনি- “পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত”। অথচ হযরত ইব্রাহীম সম্পর্কিত ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ আয়াত প্রায় শুনিনা বললেই চলে (৬:৭৫)– “আর এইভাবে আমরা ইব্রাহীমকে দেখিয়েছিলাম মহাকাশমন্ডল ও পৃথিবীর সার্বভৌম রাজত্ব যাতে তিনি হতে পারেন দৃঢ়প্রত্যয়ীদের অন্তর্ভুক্ত”।

হযরত ইব্রাহীম সম্পর্কিত সত্যই কি শুধু গোপন করা হয়? না, হযরত ইব্রাহীম, হযরত ঈসা, মুসা, নূহ এবং অন্যান্য মহান নবীগণ (সালামুন ‘আলাল মুরসালিন) ও মু’মিনগণ সম্পর্কিত আরও বহু সত্যই আছে যা আলোচিত হয়না। যেমন. মসজিদের শত মুসল্লির প্রায় নিরানব্বই জনই সূরা আহযাবের ৫৬ নম্বর আয়াত জানে যে, “আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি আশীর্বাদ প্রেরণ করেন” [إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ] । কিন্তু তাদের একজনও একই সূরার ৪৩ নং আয়াত জানে কিনা সন্দেহ- তিনিই (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি আশীর্বাদ প্রেরণ করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও। [هُوَ الَّذِي يُصَلِّي عَلَيْكُمْ وَمَلَائِكَتُهُ] ।

সূরা আন’আমে (৬:৮১-৯০) আঠার জন নবী-রাসূলের নামোল্লেখ করে শেষনবীকে আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন তাঁদের সবার এক্তেদা করতে- ফাবি হুদাহুমুক্তাদি। যিনি এক্তেদা করেন তাকে বলা হয় মুক্তাদি, আর যার বা যাদের এক্তেদা করা হয় তাদের বলা হয় ইমাম। এখানে শেষনবীর ইমাম হিসেবে উল্লেখিত নবীদেরকে বোঝানো হয়েছে।

যে শরিয়তের ধারাবাহিকতা হযরত নূহ (তাঁর উপর শান্তি) থেকে চলে আসছে, তার উপর দৃঢ় থাকতে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে সূরা শুরায় (৪২:১৩)। “তিনি তোমাদের জন্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে সে শরিয়তই নির্ধারিত করেছেন (শারা’য়া লাকুম), যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি তোমার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি করে না।”

মহান নবী ঈসা-মূসার মর্যাদা সম্পর্কিত অনন্য বিবৃতি রয়েছে যা আলোচিত হয়না, উর্ধ্বে তুলে ধরা হয়না; শেষনবীর সর্বশ্রেষ্ঠত্ব তত্ত্বের মিথ্যা ম্লান হয়ে যাবার আশংকায়। কত রঙে, কত বর্ণে হযরত মূসা (তাঁর উপর শান্তি) আর তাঁর কওম বনী ইসরাইলের কাহিনী থেকে আমাদেরকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে। একই কথা হযরত দাউদ-ইয়াকুব-ইউসূফ-নূহের (সালামুন ‘আলাল মুরসালিন) ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ধৈর্যের শিক্ষা দিতে শেষনবীকে আদেশ দেয়া হচ্ছে তিনি যেন রাসূলগণের মধ্যে যাঁরা ছিলেন ধৈর্যধারণে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ তাঁদের অনুসরণ করেন [فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ]-৪৬:৩৫

হযরত ইউনুস কেন্দ্রিক আর একটি সম্পর্কও উল্লেখযোগ্য। ধৈর্য্যধারণ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাঁর শেষনবীকে সতর্ক করছেন এই বলে- “অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের আদেশের অপেক্ষায় সবর কর এবং মাছওয়ালার (ইউনুস) মত হয়ো না”-[ فَاصْبِرْ‌ لِحُكْمِ رَ‌بِّكَ وَلَا تَكُن كَصَاحِبِ الْحُوتِ]-৬৮:৪৮।

কুরআনে নাযিলকৃত বিষয়ের মধ্যে আরও অনেক মহাসত্যই রয়েছে যা ধর্মের প্রবক্তরা স্বেচ্ছায়, সচেতনভাবে চেপে যায়। ইহুদি-খ্রীস্টান-মুসলমান সম্মিলিতভাবে যাবতীয় মিথ্যাচারের মাধ্যমে বস্তুতঃ একক আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রত্যাখ্যানকারী।

সৃষ্টির কাছে স্রষ্টার পক্ষ থেকে সকল সত্য এসে গেছে। আসমান থেকে কোন সত্যই আর আসতে বাকী নেই। শুধু যুগ যুগান্তরের ধুলাবালি আর কালিমা মোচনের সময় এখন।

‘ইসলাম প্রচার বা প্রতিষ্ঠা’ বলতে যারা যাই বুঝুক- যদি তারা উদ্দেশ্যে সৎ হয়- তাদের কর্তব্য প্রথমেই ইসলামের নামে চালু এইসব বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে কুরআনে দিয়ে লড়ে যাওয়া। তাহলে লক্ষ্যের দিকে অনেকখানি এগিয়ে যাওয়া যায়।
এইসব বিভ্রান্তির কারণ, নিজ দায়িত্ব পালন না করে মুসলমান নবীর বড়ত্বের দোহাই দিয়েই পার পেয়ে যেতে প্রত্যাশী, যেমনিভাবে ইহুদী-খ্রিস্টান সম্প্রদায় মুসা-উযাইর-ঈসার ক্ষেত্রে একই কাজটি করেছে।

কত ভয়ানক সেই মিথ্যা, যাকে লালন করতে গিয়ে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত প্রতারক আর মুনাফিকের ভুমিকায় অভিনয় করতে হয়! যাকে জিইয়ে রাখতে আমরা কুরআনের সত্যকে জেনেও তা জোর গলায় বলতে পারিনা!

নয়. সত্যে প্রত্যাবর্তন
যারা ঈমানের দাবীদার, মুসলমান হিসেবে নিজেকে প্রমান করতে চায় ও মুসলমান হয়েই মরতে চায় তাদেরকে শেষনবীর সর্বশ্রেষ্ঠত্বের দাবী থেকে সরে আসতে হবে। এটা মিথ্যা দাবী, অবশ্যই তা প্রত্যাহার করতে হবে- এটা মূর্খোচিত, মতলবী উচ্চারণ।

এটা ‘হাদীসান ইউফতারা (মনগড়া কথা)’, ‘লাহওয়াল হাদীস (অসাড় কথাবার্তা)’- এর সপক্ষে আল্লাহ কোন দলিল নাযিল করেন নি। শেষনবীর জন্য এর কোন প্রয়োজন নেই- তিনি যা তাতেই যথার্থ প্রশংসার যোগ্য।

হযরত মুহাম্মদ সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, নবীগণের নেতা, তাঁকে সৃষ্টি না করলে কিছুই সৃষ্টি হত না ইত্যাদি বলে যা এতদিন চালানো হয়েছে তা সর্বৈব মিথ্যা। মতলববাজ গোষ্ঠী তাদের কায়েমী স্বার্থ টিকিয়ে রাখতে আর শয়তান তার অবিনাশী শপথ প্রতিপালনে তা করে যাচ্ছে।

মুসলিম জাতি ও সমাজকে আজ সমন্বিত ও সম্মিলিতভাবে এই সৎ ও সাহসী উচ্চারণ করতে হবে যে, হযরত মুহাম্মদের সর্বশ্রেষ্ঠত্বের এতদিনকার চালু ধারণা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এর উচ্চারণকারী কণ্ঠকেও কঠোর প্রতিরোধ করতে হবে।
শেষনবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব না হওয়ার মধ্যে ইসলামের বা মুসলমানের কোন ক্ষতি-বৃদ্ধি নেই। তিনি কস্মিনকালেও সর্বশ্রেষ্ঠ মানব না হওয়ার জন্য কোন গ্লানি বোধ করবেন না।

একজন খাঁটি মু’মিনও এজন্য গোঁ ধরবে না যে, কেন তাকে নবী-রাসূল নির্বাচিত করা হলনা। নির্ভীক উচ্চারণের মধ্য দিয়ে বরং তাদের সুদূরপ্রসারী অনেকগুলো কল্যাণ হবেঃ-
১. শত শত বছর ধরে চালু এই মিথ্যা উৎপাটনের মাধ্যমে মুসলমান ব্যক্তিগত ও সম্প্রদায়গতভাবে শিরকমুক্ত হয়ে তার ঈমানকে পরিশুদ্ধ করার পথে অনেকদূর এগিয়ে যাবে।
২. একটি ভয়াবহতম মিথ্যার পথ ধরে শত-সহস্র মিথ্যার বেড়াজালে মুসলমান সমাজ যুগযুগব্যাপী নিষ্পিষ্ট যাকে উপেক্ষা করার শক্তি ও সাহস সে পায়না। বহুনামে বহু মিথ্যা দেবতার মূর্তি সে ইতোমধ্যে রচনা করেছে- সেগুলোকে অবলীলায় অবজ্ঞা করা এখন তার পক্ষে সহজ হবে।
৩. মিথ্যার বিপণন ও বাণিজ্যে অনেক জাজ্ব্যল্যমান সত্য চাপা পড়েছিল- তা প্রকাশিত হবার অপার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
৪. মিথ্যার অপনোদন ও সত্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য ও শক্তি মানবজাতির কাছে সুস্পষ্ট হবে। এক আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে মানবজাতির সমন্বয় ও বৃহত্তর ঐক্যের পথ প্রশস্ত হবে।
৫. বিশেষ করে খ্রীষ্টান ও ইহুদী সম্প্রদায়ের জন্যও সহজ হবে স্বীয় নবীগণ সম্পর্কে তাদের মধ্যে যারা মিথ্যা রচনা করেছিল তা থেকে প্রত্যাবর্তনে। হযরত ঈসা এবং তাঁর মহীয়সী জননী মারইয়াম ছিদ্দিকাকে স্রষ্টার অপার সৃষ্টি হিসেবে দেখতেই প্রয়াসী হবে।
৬. মুসলমান তার ‘সর্বশেষ নবীর সর্বশ্রেষ্ঠত্বের মিথ্যা গোঁ’ পরিহার করলে, অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায় যারা হযরত মুহাম্মদকে নবী হিসেবে স্বীকারই করে না- সেই নীতি থেকে সরে আসতে পারে।
৭. বিশ্বের বহু ধর্মীয় জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন নামে মান্য ও পূজ্য আদম, ইব্রাহীম এবং নূহের অনুসারীদের পারস্পরিক বিভেদ-বৈষম্য দূরীকরণেও তা ভূমিকা রাখবে।
জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পুরো মানবজাতির কমন দূষমন শয়তান আদম-সন্তানদের মধ্যে বিদ্বেষ-বিভেদ (বাগইয়াম বাইনাহুম) আর বিভ্রান্তির দুর্ভেদ্য প্রাচীর রচনা করে তাদের জাহান্নামে যাবার পথকে যে সুপ্রশস্ত করে রেখেছে- দ্রুত তাদের সেই বোধোদয় হোক!

দশ. শেষকথাঃ আশরাফুল মাখলুকাত?
মানবকূল কি সকল সৃষ্টির সেরা বা আশরাফুল মাখলুকাত? আমরা কি স্রষ্টার সকল সৃষ্টির খবর রাখি?

পবিত্র আত্মা বা হযরত জিবরাইল আমীন (তাঁর উপর শান্তি)-এর ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে কুরআনে বহুবার। যিনি মানবজাতির কাছে আল্লাহর বাণী বাহক; আসমানে যাঁর কথা প্রতিপালিত হয়। এতদূর পর্যন্ত বলা হয়েছে, যে জিবরইালের শত্রু আল্লাহ স্বয়ং তার শত্রু।

শরীফ-এর আধিক্যবাচক বহুবচন আশরাফ, অর্থাৎ সবচে’ ভাল। সমগ্র কুরআনে এই শব্দের ত্রিবর্ণীয় মূল থেকে জাত একটি পদেরও অস্তিত্ব নেই। তবে মুসলমানের মুখে অতি প্রিয় এই শব্দটি; সে কুরআন থেকে শুরু করে সবকিছুতেই তা জোড়া লাগায়- কুরআন শরীফ, হাদীস শরীফ, ক্বাবা শরীফ, হুজরা শরীফ, মাজার শরীফ ইত্যাদি।

কেন আমদানি হল এই শব্দটি? আল্লাহ বলেন, কুরআনুল কারীম; বাল হুয়া কুরআনুম মাজীদ; আমরা বলি– না, বরং এটা কুরআন শরীফ। সমস্যাটা কোথায়? আল্লাহ যা কিছু যেভাবে বলেন তা আমাদের কেন ভাল লাগে না? এগুলোই কি প্রতিস্থাপন চক্রান্ত নয়?

তাই আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা কোন কুরআনী ধারণা নয়। আদম-সন্তানদেরকে সম্মানিত করা হয়েছে এবং অধিকাংশ সৃষ্টির উপর তাকে মর্যাদা দেয়া হয়েছে বলে ঘোষণা রয়েছে [وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا]-১৭:৭০।
এখানে কাছিরান (অধিকাংশ)-এর ব্যবহার অর্থবহ, কুল্লুন (সকল) ব্যবহৃত হয়নি; কুরআনের অন্যত্র ‘কুল্লুন’-এর বহু ব্যবহার রয়েছে। সৃষ্টিজগতে মানুষের চেয়েও সেরা সৃষ্টি থাকতেই পারে।

লিখাটি একজন মুসলমানের ফেসবুক নোট থেকে নেয়া।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 4