হিন্দু ধর্মের ইতি বৃত্ত, পর্ব ০৫

মহাভারত ও রামায়ণ, এই দুই মহাকাব্যের দুটি অবিসংবাদিত নারী চরিত্র হল যথাক্রমে দ্রৌপদী ও সীতা । মহাভারতের যুগে দ্রৌপদীর স্বামী অর্জুন আর রামায়ণের যুগে সীতার স্বামী রাম দুই মহাকাব্যের দুই মহা নায়ক। বিবাহের পরে স্বামীসহ দ্রৌপদীর হয়েছিল তের বছর অজ্ঞাতবাস, সীতার চৌদ্দবছর বনবাস। পাঁচটা তাগড়া জোয়ান স্বামী, ভীরু কাপুরুষ, পুরুষ নামের কলংক, মাথা নীচু করে কপাল চাপড়ায়, জাত গেল জাত গেল বলে হায় হায় করে আর চোখের সামনে তাদের স্ত্রীকে সভাসদে ন্যাংটা করানো হয়। একটা নিরপরাধ নারীকে উলঙ্গ দেখতে উপস্থিত পাষন্ডদের বিকৃত আনন্দে ফেটে পড়ার কী উচ্ছাস? কতো বড় নির্লজ্ব অকৃতজ্ঞ অথর্ব ছিল রাম যে, তার স্ত্রী সীতাকে সন্দেহ করে আগুনে পুড়িয়ে তার সতীত্ব পরীক্ষা করতে পারে? আরেকজন আছেন মঙ্গল কাব্যের ঊষা। কোনো কোনো গ্রন্থে বলা হয়েছে এই ঊষাই নাকি পরবর্তিতে দেবী স্বরসতীরূপে আবির্ভুত হন।


মহাভারত ও রামায়ণ, এই দুই মহাকাব্যের দুটি অবিসংবাদিত নারী চরিত্র হল যথাক্রমে দ্রৌপদী ও সীতা । মহাভারতের যুগে দ্রৌপদীর স্বামী অর্জুন আর রামায়ণের যুগে সীতার স্বামী রাম দুই মহাকাব্যের দুই মহা নায়ক। বিবাহের পরে স্বামীসহ দ্রৌপদীর হয়েছিল তের বছর অজ্ঞাতবাস, সীতার চৌদ্দবছর বনবাস। পাঁচটা তাগড়া জোয়ান স্বামী, ভীরু কাপুরুষ, পুরুষ নামের কলংক, মাথা নীচু করে কপাল চাপড়ায়, জাত গেল জাত গেল বলে হায় হায় করে আর চোখের সামনে তাদের স্ত্রীকে সভাসদে ন্যাংটা করানো হয়। একটা নিরপরাধ নারীকে উলঙ্গ দেখতে উপস্থিত পাষন্ডদের বিকৃত আনন্দে ফেটে পড়ার কী উচ্ছাস? কতো বড় নির্লজ্ব অকৃতজ্ঞ অথর্ব ছিল রাম যে, তার স্ত্রী সীতাকে সন্দেহ করে আগুনে পুড়িয়ে তার সতীত্ব পরীক্ষা করতে পারে? আরেকজন আছেন মঙ্গল কাব্যের ঊষা। কোনো কোনো গ্রন্থে বলা হয়েছে এই ঊষাই নাকি পরবর্তিতে দেবী স্বরসতীরূপে আবির্ভুত হন।

স্বরসতীকে বিভিন্ন বর্ণনায় একজন যৌনপ্রতিমা, গণিকা বা বেশ্যা যদি না’ই বলা হয় একজন Tart (বাংলায় সম্ভবত বহুগামী) রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। ঊষাকে নিয়েও নানা কাহিনি আছে। যেমন; ১. একদিন কৈলাস পর্বতে শিবের সাথে পার্বতী সঙ্গমরত ছিলেন। ঊষা এই দৃশ্য দখে অত্যন্ত কামপীড়িত হয়ে পড়েন। পার্বতী ঊষার এই মনোভাব বুঝতে পারেন। পার্বতী তাঁকে বলেন যে, স্বপ্নে যাকে তুমি দেখবে, সেই তোমার স্বামী হবে। ঊষা সেই রাত্রে স্বপ্নে অনিরুদ্ধকে দেখেন এবং তাঁকে পতি হিসাবে বরণ করেন। ২. ইনি চির যৌবনা ও অপরূপ সৌন্দর্যময়ী ছিলেন। বেদে আছে ইনি প্রজাপতির কন্যা। প্রজাপতি তাঁর কন্যাকে রাজা সোমের সাথে বিবাহ দিতে স্থির করেন। কিন্তু এঁকে বিবাহের জন্য অগ্নি, সূর্য, ইন্দ্র ও অশ্বিনীকুমারদ্বয় প্রস্তাব দেন। এই কারণে প্রজাপতি ঘোষণা দেন যে, যিনি অনন্ত আকাশ-পথ বিচরণে সক্ষম হবেন এবং সেই সাথে যিনি যত বেশি স্বরচিত বেদসূক্ত উচ্চারণে সমর্থ হবেন, তাঁর হাতেই ঊষাকে সমর্পণ করবেন। এই ঘোষণা অনুসারে অগ্নি, সূর্য ও ইন্দ্র অগ্রসর হয়েও অকৃতকার্য হন। এরপর অশ্বিনীদ্বয়- ইন্দ্রের কাছ থেকে বেদসূক্তি লাভ করে সফল হন। কিন্তু এরা সূর্যের অনুচর বলে, ঊষাকে গ্রহণ করলেন না। শেষ পর্যন্ত ঊষাকে সূর্য গ্রহণ করেছিলেন।

স্বর্গের অপ্সরা ঊষা মর্ত্যে বেহুলা হয়ে ছয় মাস স্বমীর মৃত দেহ নিয়ে দেশে দেশে ভেলায় ভাসে আর ঘাটে ঘাটে সতীত্বের পরীক্ষা দেয়। শেষ পর্যন্ত যে মৃত স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে বেহুলার এতো কষ্ট এতো ত্যাগ সেই তার আপন স্বর্গীয় স্বামী অনিরুদ্ধ (মর্ত্যের লখিন্দর) তাকে বিশ্বাস করলোনা। বেহুলাকে আগুনে ঝাপ দিয়ে প্রমাণ করতে হলো যে, সে অসতী ছিলনা। নারীর রূপ যৌবন আর সতীত্ব নিয়ে স্বর্গপূরীর ভগবানদের এতো মাথা ব্যাথা কেন? কবে কয়জন পুরুষ তার সততার পরীক্ষায় আগুনে ঝাপ দিয়েছে? বলা হয়েছে সতীসাদ্ধী পবিত্র সীতার জন্ম নারীর অপবিত্র যোনীপথে হয়নি, হয়েছে মাটি খোঁড়ার লাঙ্গলের ফলায়। কত্তোবড় জালিম কুপ্রবৃত্তির এই ধর্মগ্রন্থ লেখকেরা। একদিকে নারীকে দেবী বলে সম্মান দেখায়ে ভন্ডামী করে অন্যদিকে এই নারীর যোনীকে বলে অপবিত্র। নারী দেখলেই দেবতাদের মাথায় সেক্স উঠে যায় কেন? এই যদি হয় একটি ধর্মের ঋষি, মুণি, ভগবান, দেবতাদের মন মানসিকতা ধ্যান চিন্তার অবস্তা তাহলে তাদের মূল নায়ক তথা প্রধান অবতার বা পয়গাম্বর বা রসুলের অবস্থা কেমন হবে? ইসলামের নবী মুহাম্মদ তো বাহিরে সুন্দরী নারী দেখলে তিনি নিজের ঘরে বউয়ের কাছে দৌড়াতেন, এরা তো দেখি সেই সময়টাও পায়না, যত্র তত্র বীর্য ছেড়ে দেয় আর তা থেকেই জন্ম নেয় তাদের সন্তানাদি। চলুন হিন্দু ধর্মের পয়গাম্বরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। তার আগে কিছু কথা।

খুব গর্বের সাথে মডারেইট হিন্দুরা দাবী করেন-
‘বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলির প্রতিটি ধর্মই কোনো না কোনো একক ধর্মপ্রচারকের দ্বারা প্রবর্তিত যেমন, গৌতম বুদ্ধ বৌদ্ধধর্ম প্রবর্তন করেছিলেন, যিশু খ্রিস্ট খ্রিস্টধর্ম এবং মুহাম্মদ ইসলাম ধর্ম প্রবর্তন করেন কিন্তু হিন্দুধর্ম কোনো এক জন মাত্র ব্যক্তির দ্বারা প্রবর্তিত হয়নি। এটি তাদের ধর্মের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। কোনো এক জন মানুষের জীবনকথা হিন্দুধর্মের ভিত্তি নয়। হিন্দুধর্মের ভিত্তি হল সেই পরম সত্য ; যাঁকে ঈশ্বর নামে সকল ধর্মে পূজা করা হয়। ব্রহ্মজ্ঞ ঋষিদের ঈশ্বরদর্শনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই হিন্দুধর্মের প্রামাণিকতা। সাধারণ মানুষেরা ঈশ্বর সম্পর্কে যা অনুভব করে তা অসম্পূর্ণ। একমাত্র মহান ঋষিদের কাছেই ঈশ্বরের মহান সত্যটি প্রকাশিত হয়। প্রাচীন কালের ঋষিগণ তাঁদের এই ঈশ্বরানুভূতির কথা ধরে রেখেছিলেন এবং তা লিখে রেখেছেন ‘শ্রুতি’ নামে এক শ্রেণির শাস্ত্রে’।

তো এখানে অনন্য বৈশিষ্টের কী আছে? ঘুরে ফিরে কথাতো সমানই। ঈশ্বরদর্শনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অন্যান্য ধর্মের নবীদেরও আছে। কোরান একজনের লেখা নয় বাইবেলও নয়, তাদের আছে ‘বাণী’ আপনাদের ‘শ্রুতি’ তাদের বাইবেল, কোরান, আপনাদের বেদ। মুসলমানদের কোরান থেকে হাদিস, ফিকাহ, তাফসির, সিরাত আর আপনাদের বেদ থেকে মনুস্মৃতি, মহাভারত, গীতা ও রামায়ণ । শাস্ত্রীয় আইন কানুন, রীতি নীতি, বিধি বিধান সবই তো প্রায় একই রকম।

মুসলমানদের আল্লাহ আর হিন্দুদের ব্রহ্মা, মুসলমানদের কোরান আর হিন্দুদের বেদ, মুসলমানদের মুহাম্মদ আর হিন্দুদের মনু এই তো দুই ধর্মের স্বরূপ বা ভিত্তি। হিন্দু ধর্মের পয়গাম্বরের নাম ‘মনু’। তার সাথে সরাসরি ব্রহ্মার কথা হয়। তিনি জগতের মানুষকে ব্রহ্মার সৃষ্টির ম্যানুয়েল ‘কিতাব’ পড়ে শুনান। আসল মূল কিতাব ‘বেদ’ আর্যদের তৈরি, ব্রাহ্মণ মনু সেখান থেকে চুরি করে শুদ্রদের চুষণ,শাসনের লক্ষ্যে তার মনের মতো করে বানিয়েছেন এ কমপ্লিট কোড অফ লাইফ হিন্দুদের জীবন বিধান ‘মনুস্মৃতি’।

?w=480″ width=”512″ />

‘মনু’ ও তার ধর্মগ্রন্থ ‘মনুসংহিতা’ নিয়ে ‘চরৈবেতি’ নামক একটি বাংলা ব্লগে লেখক অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন :

‘ঋগবেদে মনুকে মানবজাতির পিতা বলা হয়েছে। তিনি আদিত্য বিবস্বতের পুত্র বলে বিবস্বান, স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মার পুত্র বলে স্বায়ম্ভুব মনু, যাস্কের নিরুক্তে মনু দ্যুস্থানীয় দেবতা, তৈত্তিরীয় সংহিতায় মনু এক পরিবারের পিতা, শুক্ল যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণে সুপ্রসিদ্ধ মনুমৎস্যকথা অংশে তিনি মানবজাতির সৃষ্টিকর্তা। তিনি মানবজাতির পিতা, তাই তিনি নৈতিক ও সামাজিক আদর্শের প্রবর্তক – মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি, যজ্ঞানুষ্ঠানের সৃষ্টিকর্তা, শাসক ব্যবহার বিষয়ে প্রামাণ্য ব্যক্তি, মহর্ষি, বেদবিদ্যায় বিদ্বান, পৃথিবীর উৎপত্তি-স্থিতি-প্রলয়ের কারণ তিনি জানেন। পুরাণ মত অনুযায়ী মনু ব্রহ্মার দেহ থেকে তৈরি হয়েছেন । সুতরাং, পৃথিবীতে ভগবান ব্রহ্মার একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন মনু। যাকে স্বায়ম্ভুব মনু বলা হয়। তবে জানা গেছে ব্রহ্মার ইচ্ছায় ১৪ জন মনু জন্ম নিয়েছেন এবং এদের সবাই ধর্মশাস্ত্র রচনা করেছেন । স্বায়ম্ভুব মনু ব্রহ্মার কাছ থেকে স্মৃতিশাস্ত্র পাঠ করা শিখে তা তার শিষ্যদের পাঠ করান। পরবর্তীতে ভৃগু নামে একজন মনুর আদেশে এই ধর্মশাস্ত্র ঋষিদের কাছে ব্যাখ্যা করেন। যা এখন “মনুসংহিতা” নামে পরিচিত। ভগবান ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ম্ভুব মনুর দেখানো পথ অনুসরণ করে বাকি ১৪ জন মনু এই শাস্ত্র ধারণ ও পরিবর্ধন করেছেন । মুলত “ভগবান ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ম্ভুব মনু” এর বর্ণিত শ্লোকগুলিই বাকি মনুরা সম্পাদনা ও টীকা বা ব্যাখ্যা যোগ করেছেন এবং কিছু কিছু আইন ও আচরণ পদ্ধতির প্রবর্তন করেছেন।

( এখানে ব্রহ্মার পুত্র স্বায়ম্ভুব মনুকে আমরা ইসলামের মুহাম্মদ ও অন্যান্য মনুকে মুহাম্মদের সাহাবি রূপে কল্পনা করতে পারি, কারণ ঘটনা একই উদ্দেশ্যে একই ধারাবাহিকতায় ঘটেছে।)

এখন প্রশ্ন হল মনু কি সত্যিই “ভগবান” ছিলেন ? মনুসংহিতার পাতাতেই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারি। বস্তুত মনু ছিলেন একজন শাসক বা রাজা, ব্রাহ্মণ-শাসক — ভগবান কখনোই নয়। ভগবান যে নয়, তার প্রমাণ মনুর সৃষ্টিতত্ত্ব। সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি তিন জায়গায় তিন রকম বর্ণনা করেছেন।

(১) মনুসংহিতার প্রথম অধ্যায়ের পঞ্চম থেকে উনিশতম শ্লোকে সৃষ্টিতত্ত্বে বলছেন, আদিতে এই বিশ্ব অন্ধকারময় ছিল, তার অস্তিত্ব বোঝা যেত না, কোনো কিছুরই লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্যসূচক চিহ্ন ছিল না, প্রমাণগ্রাহ্য ছিল না। সব কিছু ছিল অবিজ্ঞেয়। যেন সবদিকে প্রসুপ্ত, তারপর অপ্রতিরোধ্য শক্তিসম্পন্ন অন্ধকারনাশক ভগবান স্বয়ংভূ স্বয়ং অব্যক্ত থেকে পঞ্চমহাভূতাদি সকল পদার্থকে ব্যক্ত করলেন। ইন্দ্রিয়ের অগোচর সূক্ষ্ম, সনাতন, সর্বভূতময়, অচিন্তনীয় তিনি নিজেই উদ্ভূত হলেন। তিনি নিজের শরীর থেকে বিবিধ জীব সৃষ্টি করতে ইচ্ছুক হয়ে ভেবে ভেবে প্রথমে জল সৃষ্টি করে তাতে তাঁর বীজ আরোপিত করলেন। সেই বীজ সূর্যতুল্য প্রভাবিশিষ্ট স্বর্ণডিম্বে পরিণত হল। তাতে সমগ্র জগতের পিতামহ ব্রহ্মা স্বয়ং জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর প্রথম বাস ছিল জলে, জলকে যেহেতু নারা বলে অভিহিত করা হত সেইহেতু তাঁকে বলা হত নারায়ণ (নারা+অয়ন বা আশ্রয়)। সেই-ই প্রথম কারণ, যা অব্যক্ত এবং যা সৎও বটে, অসৎও বটে। তার থেকে উদ্ভূত পুরুষকেই লোকে ব্রহ্মা বলে। সেই অণ্ড বা ডিম্বে ভগবান এক বছর বসবাস করে তাকে দ্বিধা বিভক্ত করলেন, সেই দুই ভাগ থেকে তিনি সৃষ্টি করলেন স্বর্গ এবং মর্ত্য।

(২) মনুসংহিতা বা মনুস্মৃতির প্রথম অধ্যায়ে বত্রিশতম থেকে একচল্লিশতম শ্লোকে মনু বলছেন, ব্রহ্মা স্বদেহকে দ্বিধা বিভক্ত করলেন – একভাগ হল পুরুষ, অপরভাগ নারী। সেই নারীর থেকে তিনি সৃষ্টি করলেন বিরাজ্। এই বিরাজ্ তপস্যা করণান্তর একটি পুরুষ সৃষ্টি করলেন ; এই পুরুষই “মনুসংহিতা”-র প্রবক্তা মনু। জীবসিসৃক্ষু মনু প্রথমে সৃষ্টি করলেন প্রজাপতি স্বরূপ দশজন মহামুনিকে। তাঁরা সৃষ্টি করলেন সপ্তমনু, বিভিন্ন শ্রেণির দেবগণ, মহান ঋষি, যক্ষ, রাক্ষস, গন্ধর্ব, অপ্সরা, সর্প, বিহঙ্গ, বিভিন্ন শ্রেণির পিতৃগণ, বিদ্যুৎ, মেঘ, ক্ষুদ্র-বৃহৎ নক্ষত্ররাজি, বানর, মৎস্য, গোমহিষাদি, হরিণ, মানুষ, কীট, মক্ষিকা ও স্থাবর বৃক্ষাদি।

(৩) মনুসংহিতা বা মনুস্মৃতির প্রথম অধ্যায়ে চুয়াত্তরতম থেকে আটাত্তরতম শ্লোকে মনু বলছেন, সুপ্তোত্থিত ব্রহ্মা তাঁর মন সৃষ্টি করলেন। ব্রহ্মার সিসৃক্ষার প্রেরণায় উদ্ভূত হল শব্দগুণ আকাশ, আকাশের বিকৃতি থেকে সৃষ্ট হল স্পর্শগুণ বায়ু, বায়ু থেকে উদ্ভব দীপ্তিময় আলোকের, যার থেকে প্রাদুর্ভাব হল জলের, জল থেকে উৎপত্তি হল গন্ধযুক্ত ক্ষিতি বা মাটির’।

( এখানেও পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, মুহাম্মদ যে নবি ছিলেন না কোরানই তার প্রমাণ, মনু যে ভগবান ছিলেন না মনুস্মৃতিই তার প্রমাণ)

পাঠকদের বুঝার জন্যে শুধু বলে রাখি, মুসলমানদের কোরান থেকে শরিয়া আইনের সৃষ্টি আর হিন্দুদের বেদ থেকে মনুস্মৃতি একই আকারের একই উদ্যেশ্যে রচিত। ইসলামের ইতিহাস ও খলিফাদের প্রাসাদ ষঢ়যন্ত্র নিয়ে যারা অবগত আছেন তারা হিন্দু ধর্মগ্রন্থের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যটা ও অনুক্রম বা পরম্পরা বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। খলিফারা যেমন তাদের সকল ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে সকল আইনকে আল্লাহর আইন ও তাদের নিজেদেরকে আল্লাহর মনোনিত শাসক বলে প্রচার করতেন, হিন্দুদের ব্রাহ্মনরাও একইভাবে একই উদ্দেশ্যে তাদের সকল আইনকে ব্রহ্মার আইন বা ঐশ্বরিক মতবাদ ও নিজেদেরকে ব্রহ্মার প্রতিনিধি বা মনোনিত শাসক বা রাজা বলে প্রচার করতেন। অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আরো লিখেন;

“প্রাচীনকালে রাষ্ট্রের ঐশ্বরিক মতবাদ বহুল প্রচলিত ছিল। মধ্যযুগে সেন্ট অগাস্টাইন, সেন্ট পল, সেন্ট টমাস অ্যাকুইনাসের লেখনীতে এই মতবাদের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে ১৬৮৮ সালের ইংল্যান্ডের গৌরবময় বিপ্লবের পর থেকে এই মতবাদের গুরুত্ব হ্রাস পেতে শুরু করে। ঐশ্বরিক মতবাদের মূল বক্তব্য ছিল – (১) রাষ্ট্র ঈশ্বর সৃষ্টি করেছেন। এই সৃষ্টির পিছনে মানুষের কোনো ভূমিকা নেই। (২) রাজা হলেন ঈশ্বরের প্রতিনিধি। তাই ঈশ্বরের ইচ্ছা রাজার মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়। সেইজন্য রাজার আদেশ বা নির্দেশ, যা আইনরূপে গণ্য হয়ে থাকে, তা মান্য করা সকল মানুষের একান্ত কর্তব্য। রাজার আইন মান্য না-করার অর্থ হল ঈশ্বরকে অবমাননা করা। (৩) ঈশ্বরের বিধান অনুসারে রাজপদ উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করা যায়। রাজার মৃত্যু হলে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজা হবেন। (৪) রাজা যেহেতু ঈশ্বরের প্রতিনিধি সেইহেতু তিনি কখনোই অন্যায় করতে পারেন না। ঈশ্বর ছাড়া তিনি আর কারও কাছে তাঁর কাজের জন্য জবাব দিতে বাধ্য নন। (৫) ঈশ্বরের প্রতিনিধি এই রাজার বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহ করা যায় না। এই ধারণা বা তত্ত্ব শুধু ভারতবর্ষের হিন্দুধর্মেই নয় – এই তত্ত্ব মুসলিম, খ্রিস্টান, ইহুদি ইত্যাদি সব ধর্মেই প্রচার করা হয়েছে”।

মনু ও তার মনুস্মৃতি বা মনুসংহিতা নিয়ে রণদীপম বসু ‘মুক্তমনা’ ব্লগে ‘মনু’র বৈদিক চোখ: নারীরা মানুষ নয় আদৌ’ শিরোনামের সিরিজের ‘মনুসংহিতার উন্মেষ ও ব্রাহ্মণ্যবাদ’ অধ্যায়ে লিখেন; ‘

“বেদ (Veda) ও উপনিষদের পরে ভারতবর্ষে ছয়টি আস্তিক দর্শনের আবির্ভাব ও পর্যায়ক্রমে স্তরে স্তরে এগুলোর ক্রমবিকাশ ঘটে। অর্থাৎ বেদের সংহিতাকে আশ্রয় করে পরবর্তীতে পর্যাক্রমে রচিত অন্য সাহিত্য বা স্মৃতিগ্রন্থগুলো যেমন ব্রাহ্মণ, আরণ্যক হয়ে উপনিষদের যুগে এসে পুরোপুরি ভাববাদে প্রবেশ করেছে। ততদিনে ভারতীয় সমাজে হিন্দুইজম (Hinduism) বা বৈদিক দর্শন রীতিমতো শেকড় গেড়ে বসেছে। এবং সেগুলোকে আশ্রয় করে পরবর্তীকালে রচিত বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থের মাধ্যমে ধর্মীয় শাসনতন্ত্র তার শেকড়-বাকড় ছড়িয়ে সমাজদেহে পূর্ণ থাবা বিস্তার করে ফেলেছে। তারই ঐতিহাসিক উৎকৃষ্ট নিদর্শন হচ্ছে মনুস্মৃতি (Manu smriti) বা মনুসংহিতা (Manu samhita), যাকে বৈদিক সংস্কৃতি বা ব্রাহ্মণ শাসনের সংবিধান বললেও বাহুল্য হবে না। সামাজিক বিশ্বাস এমন যে- এর মধ্যেই নিহিত আছে সমস্ত বেদার্থ। অথচ এই মনুসংহিতাই হলো পৃথিবীর অন্যতম বর্বর, নীতিহীন, শঠতা আর অমানবিক প্রতারণায় পরিপূণ বর্ণবাদী ব্রাহ্মণ্যবাদের আকর গ্রন্থ। ভারতীয় শ্রুতি ও স্মৃতির পরম্পরায় বৈদিক পরিমণ্ডলের ধর্মীয় দুরুহতা অতিক্রমের জন্যেই উপনিষদগুলোর পরবর্তী ধাপে মনুসংহিতার মতো ধর্মশাস্ত্র সৃষ্ট হয় বলে দাবী করা হয়। এটিকে বেদের নির্যাস স্মৃতিগ্রন্থ হিসেবে দাবি করা হলেও মূলতঃ তা উপরিউক্ত সবগুলো গ্রন্থেরই নির্যাস নিয়ে রচিত ব্রাহ্মণ্য শাসনতন্ত্রের নীতিসূত্রগ্রন্থ বলে মনে করা হয়। তার আলোকেই হিন্দু ধর্মের যাবতীয় রীতিনীতি জীবনযাপন পূজাশাসন আচারবিচার সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং এখনো তার ভিত্তিতেই ধর্মীয় অনুশাসনের মাধ্যমে যাবতীয় ক্রিয়াকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকে। এমন কি বর্তমানেও হিন্দু ধর্মানুসারীদের জন্য প্রয়োগযোগ্য রাষ্ট্রীয় যে বিশেষ আইন যেখানে ‘হিন্দু আইন অনুযায়ী’ শব্দ-সমষ্টি দ্বারা ট্যাগ করা হয়ে থাকে তার অন্যতম উৎস হিসেবেও মনুসংহিতাই প্রধান। অর্থাৎ এটি সমাজ-উদ্ভূত বিশেষ আইনশাস্ত্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। অথচ মজার ব্যাপার হলো, চা থেকে যেমন পেয়ালা গরম হয়ে থাকে তেমনি বেদের সহনীয় নিরপেক্ষতার চাইতেও কথিত বেদাশ্রিত মনুসংহিতার আরোপিত অনুশাসনগুলো শতগুণ কট্টর বর্ণবাদী, বৈষম্যমূলক ও তীব্র অমানবিকই শুধু নয়, অদ্ভুত বর্ণাশ্রম প্রচলনকারী এই শাস্ত্রগ্রন্থে বস্তুত মানবিক সত্তাময় মানুষের উপস্থিতি নাই বললেই চলে। আর নারী তো সেখানে মানুষই নয়, হয়তো অন্যকিছু”।

কী লিখেছেন কী বলেছেন মনু নারীদের নিয়ে তার মনুসংহিতায়? এবার আমরা ‘যে সত্য বলা হয়নি’ বইয়ের ‘দুই ‘ম’ এর নারী শিক্ষা’ অধ্যায় থেকে নারীর প্রতি মনুর দৃষ্টিভঙ্গী কেমন ছিল তা জেনে নিব। সেই মানবধর্মশাস্ত্রে ‘নারী’ সম্বন্ধে ভগবান মনু বলেন,-

নবম অধ্যায়, চৌদ্দ নম্বর শ্লোক; সংক্ষেপে ৯:১৪) :
“নৈতা রূপং পরীক্ষন্তে নাসাং বয়সি সংস্থিতিঃ
সুরূপং বা বিরূপং বা পুমানিত্যেব ভুঞ্জতে”।
অর্থাৎ, স্ত্রীরা রূপ বিচার করে না, (যৌবনাদি) বয়সে এদের আদর নেই, রূপবান বা কুরূপ পুরুষ মাত্রেই সম্ভোগ করিতে চায়।(উল্টো হয়ে গেলোনা? আমরা তো উপরে বহুবার দেখলাম এ অভাবনীয় দুশ্চরিত্র বা অভ্যেসটা পুরুষ ব্রাহ্মণদেরই)।

মনু বলেন স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য হচ্ছে (৫:১৫৪) :

“বিশীলঃ কামবৃত্তো বা গুণৈর্বা পরিবর্জিতঃ।
উপচর্যঃ স্ত্রিয়া সাধ্ব্যা সততং দেববৎ পতিঃ”।

অর্থাৎ, পতি দুশ্চরিত্র, কামুক বা গুণহীন হলেও তিনি সাধ্বী স্ত্রীকর্তৃক সর্বদা দেবতার ন্যায় সেব্য।(বাহ, তাহলে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে স্বামী দুশ্চরিত্র, কামুক বা গুণহীন মূর্খ বোকা হতেই পারে?)

“স্ত্রী স্বামীকে অবহেলা করে ব্যভিচারিণী হলে সংসারে নিন্দনীয় হয়, শৃগালের জন্মপ্রাপ্ত হয় এবং (যক্ষ্মা কুষ্ঠাদি) পাপরোগের দ্বারা আক্রান্ত হয়”। (৫/১৬৪)।
স্ত্রীর আগে স্বামী মারা গেলে মনু স্পষ্ট ঘোষণা দেন (৫/১৫৭) : “স্ত্রী বরং পবিত্র ফল, মূল, ফুল খেয়ে দেহ ক্ষয় করবেন, তথাপি পতি মৃত হলে অন্যের নামোচ্চারণ করবেন না।” কিন্তু স্বামীর আগে স্ত্রী মারা গেলে মনুর নিয়মটি ঠিক উল্টো (৫/১৬৮-১৬৯): “পূর্বে মৃত স্ত্রীকে অন্ত্যেষ্টিক্রীয়ায় আগুন দিয়ে (স্বামী) পুনরায় বিবাহ করবেন; বিবাহ করে আয়ুর দ্বিতীয়ভাগ গৃহে বাস করবেন।”

আবার স্কন্ধপুরাণের নাগরখণ্ডের ৬০ নম্বর শ্লোকে বলা হয়েছে :

“নির্দয়ত্বং, তথা-দ্রোহং কুটিলত্বং বিশষতঃ
অশৌচং নির্ঘৃণতৃঞ্চস্ত্রীনাং দোষা স্বভাবজাঃ”।

অর্থাৎ, নির্দয়ত্ব, দ্রোহ, কুটিলতা, অশৌচ ও নির্ঘৃণত্ব এই সমস্ত দোষ নারী জাতির স্বভাবজাত।
স্কন্ধপুরাণের এই শ্লোকের সাথে মিল রয়েছে মনুসংহিতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ২১৩ নং শ্লোকের; সেখানে মনু বলেন,

“স্বভাব এস নারীণাং নরাণামিহ দূষণম্
অতোহর্থান্ন প্রমাদ্যন্তি প্রমদাসু বিপশ্চিতঃ।”

অর্থাৎ, নারীদের স্বভাবই হল পুরুষদের দূষিত করা…।

“নাস্তি স্ত্রীণাং ক্রীয়া মন্ত্রৈরিতি ধর্মে ব্যবস্থিতিঃ।
নিরিন্দ্রিয়া হ্যমন্ত্রাশ্চ স্থিয়োহনৃতমিতি স্থিতিঃ”। (৯:১৮) :

অর্থাৎ, ব্রাহ্মণসহ সকল সম্প্রদায়ের মহিলাদের জন্য বেদ-স্মৃতি পাঠ, মন্ত্র উচ্চারণ, পূজা-অর্চনা প্রভৃতিতে কোনো অধিকার নেই। নারীরা মন্ত্রহীন, মিথ্যার ন্যায় অশুভ।

আবার মনু বলেন (৯:১৫) :

“পৌংশ্চল্যাচ্চলচিত্তাচ্চ নৈঃহ্যোচ্চ স্বভাবতঃ।
রক্ষিতা যত্নতোহপীহ ভর্ত্তৃস্বেতা বিকুর্বতে”।

অর্থাৎ- পুরুষ দর্শনমাত্র স্ত্রীদের পুরুষের সাথে সঙ্গম করার ইচ্ছা জাগে এবং চিত্তের স্থিরতার অভাবে স্বভাবত স্নেহশূন্যতা প্রযুক্ত স্বামী কর্তৃক রক্ষিতা হলেও স্ত্রীলোক ব্যভিচার প্রভৃতি কুক্রিয়া করে।

মনুর এই স্বর্গীয় বাণী স্ত্রী, মা, বোন সকলের প্রতি প্রযোজ্য। পদ্মপুরাণে আরও উল্লেখ পাই (সৃষ্টিখণ্ড, ৯১ নম্বর শ্লোক)

“দাসীং হাত্যাতু লিঙ্গস্য নরকান্ন নিবর্ত্ততে-কামার্তে
মাতরং গচ্ছেন গচ্ছেচ্ছিব চেটিকাম।”

অর্থাৎ, শিবলিঙ্গ সেবিকা দাসী হরণ করলে চিরকাল নরক ভোগ হয়ে থাকে। কামার্ত হয়ে বরং মাতৃগমন করবে তথাপি শিবলিঙ্গ সেবিকা গমন করবে না।

“কামার্ত হয়ে মাতৃগমন” এর মা’নেটা কী?
চলবে…

আগের পর্ব এখানে।, পরের পর্ব এখানে

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

35 + = 36