অপরাহ্ন

মাঘের শেষের এমন রৌদ্রজ্জ্বল সকালের গভীর আনন্দানুভূতি এবং হরেন সরকারের মানবিক অবস্থার পারস্পরিক সম্পর্কের দ্বিধা-দন্দে কিছুক্ষণের জন্য গাঢ় নিরবতা নেমে আসে ধামরাইয়ের অদূরে রঘুনাথপুরের মিয়াবাড়ির পেছনের সমস্ত প্রকৃতিতে। কিছুক্ষণ আগেও সে পাখির শব্দ আর মৃদু উত্তরীয় হাওয়ায় এক অদ্ভুত সুরের উদ্ভব হয়েছিল তা নেমে যায় এক আশ্চর্য নিরবতায়। এতকিছুর পরে সমস্ত নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে ছপছপ শব্দে ডেবে যায় রাতে শিশিরে ভেজা খড়কুটোগুলো। হরেন ধীর পায়ে খড়কুটো মাড়িয়ে এগিয়ে যায় তার পিতার রেখে যাওয়া একমাত্র অবলম্বনের দিকে। অসময়ের বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যাওয়া একখানি ছোট ক্ষেতের আল ধরে ধরে এগুতে থাকে সে। মাঝে মাঝে কালচে হয়ে যাওয়া ধান গাছগুলোকে ছুঁয়ে দেখার মত হাত বাড়িয়ে আবার সে হাত ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা এবং পুনঃচেষ্টার ঘটনাটি চক্রাকারে ঘটতে থাকে। তার সাথে তাল-লয় মিলিয়ে সূর্যটা মাথা চাড়া দিয়ে জেগে ওঠে। ভেজা ঘাসের উপর শুয়ে হরেন যখন আকাশ দেখার চেষ্টা করে ঠিকক তখন তার মাথার পাশে ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির বিন্দুটি শেষবারের মত সূর্যের আলোয় আরও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে ওঠে ভারী কান্নার মত ঝরে পড়ে মাটিতে। যে গোপন কান্নাটি চিরকালই সমস্ত মানুষের অজানা থেকে গিয়েছিল আজও তা হরেন এর কান্নার মত অজানাই থেকে যায়।

এই চৈত্রে যে মেয়ে ১৯ তে পা দিবে তাকে দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছে যেন দুই কুড়ি বয়সের এক অসুস্থা। অথচ ২ বছর ৭ মাস আগে যখন সে এই বাড়িতে এসেছিল তখন তার চোখের তারায় আনন্দ খেলা করে। তার মুখে হাসি-উচ্ছাস এর ফুলছুড়ি। কিছু বললেই খিল-খিল শব্দে সারা উঠোন কেঁপে কেঁপে উঠতো। আর এখন তাকে পেটালেও মুখ থেকে কথা বেরুতে চায়না। নিজের অজান্তেই দূর থেকে দেখে আর ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে হরেনের। উঠানে পা দিতেই বউ হাতের ঝাড়ুটা রেখে এসে দুয়ারে দাঁড়ায়। এই শীতের সকালেও তার কপালে শিশিরের মতন ঘাম ফুটে উঠেছে। রংচটে যাওয়া ছেড়া শাড়ির আঁচলে ঘামতা মুছবার চেষ্টা করে চৈত্রা। এরকমই কোন এক স্নিগ্ধ সকালে এক জীবন দুঃখ আর অসীম মমতা নিয়ে পৃথিবীর নিষ্ঠুর খেলায় অংশগ্রহণ করেছিল সে। বউকে বড় ভালোবাসে হরেন তবুও এই কথা হরেনের কাছে আজ আর অচেনা না যে যেখানে গরীবের নিজের বলতে কিছু থাকতে নেই সেখানে ভালোবাসা বাহুল্যতা ছাড়া আর কিছু না।

বউ উঠনের কোনে রোদের মাঝে পাটি বিছিয়ে দিলে তাতে ধপ করে বসে পরে নিজের উরু বের করে আপন মনে হাত দিয়ে দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে হরেন। বোরো ধান বোনার সময় লাঙ্গলের ফলায় যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল সেই শক্ত মাংশপেশীতে সেই ক্ষত এখন অনেকতাই ম্লান। তবে আগুনে পোড়া মাংসের উপর কলংকের মত ফুটে থাকে কালচে গভীর ক্ষত। বউটা হাত ধোয়ার গামলাটা এগিয়ে দিয়ে গ্লাসটা উচু করে ধরে। গামলার উপর হাত বাড়িয়ে হরেন হঠাতই সব কিছু ভুলে গিয়ে চৈত্রার মুখে খুঁজে পাওয়া নিষ্পাপ ভালোবাসার দিকে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। এরমাঝে কখন চৈত্রার একটি হাত নেমে এসে অপূর্ব মমতায় হরেনের হাতখানি ধুয়ে দেয় সেকথা উঠোনের কোণে আহারের অপেক্ষায় থাকা ছোট ছোট হাঁসের বাচ্চাগুলি ছাড়া বোধহয় আর কেও দেখতে পায়না। ভাতের গামলার ঢাকনা সরাতেই পানিতে ভেজা বকুল ফুলের মত জেগে উঠে কাল রাতে জলে ডুবানো অবশিষ্ট শাদা শাদা ভাতের উপর শুকনো মরিচ এলোমেলো রঙ। মুহুর্তেই হরেন চোখ তুলে তাকিয়ে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করে আর সে সে কথা বুঝে উঠার আগেই স্বশব্দে ঘরের দুয়ারে আছরে পড়ে ভেঙ্গে যায় মাটির পাত্রটি। হাঁসেদের বাচ্চাগুলি এরকম অনাকাংখিত আনন্দের ঘটনায় কিছুটা আশ্চর্য হলেও প্রায় সাথে সাথেই ছুটে চলে এসে গোগ্রাসে গিলতে থাকে বকুল ফুলের মত শাদা ভাত। প্রায় ঠিকক তখনই উঠোনের অন্যপ্রান্তে আরও বিকট শব্দে আছড়ে পড়ে একটা বহু পুরোনো কাসার গ্লাস এবং দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া একটা এল্যুমিনিয়াম এর পাত্র।

কাধের গামছাটি মাটিতে ফেলেই হনহন করে বেড়িয়ে যায় হরেন। চিটে পড়া ধানক্ষেতটির পাশে বাঁশ কেটে বানানো লম্বা মাচাটিতে সূর্যের দিকে মুখ বাড়িয়ে শুয়ে পড়ে সে। মাঘের এমন নির্মল রোদ আর শিমুল গাছের ছায়ায় চাপা পড়ে হরেনের পোড়া শরীর আর কান্না। যেসব দুঃখবোধে ইশ্বর তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় রঘুনাথপুরের সমস্ত লোকজনের মতো, তেমনি এক বিষণ্ণতায় চৈত্রাও নীরবে হেঁটে যায় তার পাশ দিয়ে। ছোট মিয়াঁর দুয়ারে আঁচলখানি মেলে ধরলে এই ঝলমলে রোদের দুপুরেও ছোটও মিয়াঁর চোখে খেলা করে গাঢ় অন্ধকার। সিঁড়ির নিচে দাঁড়ানো চৈত্রার ধুলো পড়া শরীরের দিকে চেয়ে নিজের অজান্তেই জিভ বেড়িয়ে এসে নিজের ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে নেয় সে, যেমনটা বহুকালের অভুক্ত পশু পায়নি মাংসের স্বাদ। মালাউনের সুমিষ্ট মাংসের গন্ধে আরও উন্মত্ত হয়ে যাওয়া ছোটও মিয়াঁর ঠোঁট থেকে বেড়িয়ে আসা লালা হাত দিয়ে মুছে ফেলার দৃশ্য চৈত্রা দেখতে না পেলেও অন্তর্যামীর মতো এই গল্প সে বহুকাল থেকেই জানে।

বিকেলের পড়ন্ত রোদের সাথে জায়গা পাল্টে নেবার সময় যখন কুয়াশা গাছের আড়ালে নিজেকে ঢেকে ঢেকে এগিয়ে আসে তখন রঘুনাথপুরের হাট ভেঙ্গে যায়। সরু মাটির পথ ধরে হাটুরেরা গামছায় বাঁধা সদাই নিয়ে বাড়ির পথে যাবার সময় হরেনের একটা শক্তিহীন শরীর আর সারাদিনের অভুক্ত পেটে বাড়ির দিকে হেঁটে যাবার দৃশ্য দূর থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে আধো জলে ভেজা চোখখানি মুছে ফেলে চৈত্রা। একটুখানি ডালের চর্চরী, ভেড়ার মাথা ভাঙ্গা আর শিউলি ফুলের মতো ফুটে থাকা গরম ভাতের গন্ধে হরেন নিজেকে আবিষ্কার করে রসুই ঘরে। সামনে বসা চৈত্রার নাকের ডগায় জমে ওঠে ঘাম, নাকের পাটাটা মাঝে মাঝে ফুলে ফুলে ওঠে। ঘরের পেছনের ডোবায় হাঁসেদের প্যাক প্যাক শব্দের সাথে মিশে যাওয়া হরেনের ভাত মাখার শব্দের সাথে মিল রাখতে না পেরে হু হু করে কেঁদে উঠে চৈত্রা। কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় হরেন। তারপর একলাথিতে সমস্ত খাবার ছুড়ে ফেলে শক্ত হাতে চেপে ধরে বউয়ের চুলের মুঠিতে। এরপর টানতে টানতে নিয়ে আসে উঠানের মাঝখানে। কোন কান্নার শব্দ শুনতে না পাওয়া গেলেও নরম শরীরে চ্যালাকাঠ এর স্বশব্দ আঘাতের শব্দ শুনতে পেয়ে থমকে যায় সূর্যও। তলিয়ে যাবার আগে কিছুক্ষণের জন্যে থেমে যাওয়া সূর্যের আলোয় চকচক করে উঠে চৈত্রার চিবুক ধরে এগিয়ে আসা রক্তের ধারা।

চ্যালাকাঠটি ছুড়ে ফেলে দিয়ে ধপ ধপ শব্দে পা ফেলে চলে যায় হরেন। বিধ্বস্ত ধানক্ষেতের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায় সে। সুর্যটা তেল ফুরিয়ে যাওয়া হারিকেনের মতো টিম টিম করে জ্বলতে থাকে। চুপি চুপি কুয়াশার গলা জড়িয়ে নামতে থাকে অন্ধকার। হাঁটু গেড়ে ক্ষেতের উপর বসে পড়ে হরেন। তারপর পৃথিবীর সমস্ত নৈঃশব্দ্য ভেঙ্গে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। এ কান্না যেমনটা নিদারুণ কষ্টের তেমনি গভীর ভালোবাসার । কোন মানুষের কানে এই কান্না না পৌঁছালেও হরেনের প্রতি মমতায় একদিন সন্ধ্যায় অন্তত পাখিরা পথ হারিয়ে ফেলে সূর্যের দিকেই উড়তে শুরু করলে সূর্য আরও কিছুক্ষণ মিটিমিটি জ্বলতে থাকে ফুরিয়ে যাবার আগে। মাঘের শেষের এমন রৌদ্রজ্জ্বল দিনের শেষের বিষণ্ণ সন্ধ্যার খবরটি কেউ জানতে পারেনা যেমনটি জানতে পারেনা চৈত্রার প্রতি হরেনের অসীম মমতার কথা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

32 − 26 =