কোন ইসলামকে শরিয়া হিসেবে দেখতে চান

মোল্লারা প্রতিনিয়ত দাবী করেন, “বাংলাদেশকে ইসলামের বিধান অনুসারে চলতে হবে। এখানে ইসলামি শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।” এটা শুধু মোল্লারা নন, দেশের অসংখ্য ধর্মজীবী মানুষেরও দাবী। একে আমি তাঁদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হিশেবেই দেখি।

এই দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে আমি শুধু তাঁদের কাছে জানতে চাইবো, কোন ইসলাম? কোন ইসলামকে আপনারা বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন? বেরেলভী-দেওবন্দি-তাবলিগি-মওদুদি-শাফেয়ি-মালেকি-হাম্বলি-ওহাবি-লা মাযহাবি-জাহিরি-ইশনা আশারিয়া-জাইদিয়া-ইসমাঈলিয়া-নুসাইরি-আলেভি-ইবাদি-আহমদিয়া আঞ্জুমান-জামাতে আহমদিয়া-বেকতাশি-বোরহানিয়া-রিফাঈ-মেভলেভি-বালাভিয়া-খালবাতি-নি’মাতুল্লাহি-সাধিলিল্লা-চিশতিয়া-নকশাবন্দি-বোস্তামিয়া-কালান্ধারিয়া-সোহরাওয়ার্দিয়া-মোজাদ্দেদিয়া-মাইজভাণ্ডারী ইত্যাদি বিভিন্ন গ্রুপের ইসলামের মধ্যে কোনটি?

উপরে উল্লেখ করা গ্রুপের মধ্যে রয়েছে আবার অসংখ্য সাবগ্রুপ। একটি উদাহরণ দিই। ইসমাঈলিয়া ইসলাম মুসতালি/বোহরা, নিজারিয়া, দ্রুজ ইত্যাদি ভাগে বিভক্ত। বোহরা ইসমাঈলিয়াগণ আবার মোটামুটি পাঁচ ভাগে বিভক্ত। এগুলো হলো যথাক্রমে দাউদি বোহরা, সুলাইমানি বোহরা, আলাভি বোহরা, হেবতিয়া বোহরা ও আতবা-ই-মালাক। এদের নিচে আরও কোন কিছু আছে কিনা, সে সম্পর্কে আমার কোন ধারনা নেই। থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে।

নবী মুহাম্মদ ৭২ টি ফেরকার কথা বলেছিলেন। আমার মনে হয়, ইসলাম ভেঙ্গে ভেঙ্গে এধরনের ফেরকার সংখ্যা এখন অন্তত এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত ভেঙ্গেচুরে যাওয়া এরকম তেজক্রিয় ইসলাম আমাদের দেশের মানুষ কীভাবে হজম করবে, কে জানে!

বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের অধিকাংশ মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণ করছে দেওবন্দি এবং ওহাবি মোল্লাগণ। এদের পরে বেশীরভাগ মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বেরেলভী মোল্লাদের হাতে। লা মাযহাবি বা আহলে হাদিসপন্থী মোল্লাগণ কর্তৃক অবশিষ্ট মাদ্রাসাগুলো পরিচালিত হয়। এই মোল্লাদের নিজেদের মধ্যে রয়েছে অবিশ্বাস্য মতভেদ এবং ঝগড়াঝাঁটি। যেমন,

দেওবন্দি-বেরেলভী মোল্লাগণ হানাফি মাযহাবের নিয়ম-কানুন মেনে চলেন। তাঁরা বলেন যে, প্রতিটি মুসলমানের জন্য চার মাযহাবের মধ্যে যে কোন একটি মাযহাব মেনে চলা ওয়াজিব। যারা মাযহাব মানে না, তাঁরা কাফের।

অন্যদিকে লা মাযহাবি বা আহলে হাদিসপন্থী মোল্লাগণ মাযহাব মেনে চলা মোল্লাদের মুশরিক হিশেবে ঘোষনা দিয়েছেন। তাঁরা বলেন, মুসলমানদের জন্য কোরান ও হাদিসই যথেষ্ঠ। হানাফি-শাফেয়ি-মালেকি-হাম্বলি প্রমুখ মাযহাবের দেখানো পথ ধরে মুসলমান চলবে কেনো? (হলে উপরের দুই গ্রুপের ছেলেদের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি হাস্যকর বিতর্ক বা ঝগড়াঝাঁটি পরিচালনা করার সৌভাগ্য হয়েছে আমার) আবার ওহাবি মোল্লাগণের একটা অংশ মাযহাব মেনে চলার পক্ষপাতী, অন্য অংশটি মাযহাবের বিরোধিতা করেন। তবে বেশীরভাগ ওহাবি মোল্লা কট্টর হাম্বলি মাযহাব মেনে চলেন।

দেওবন্দিগণ মনে করেন, পরকালে নবী মুহাম্মদ শুপারিশ করবেন তাঁর উম্মতদের জন্য। কিন্তু ওহাবিগণ বলেন, পরকালে নবী কারো জন্য শুপারিশ করবেন না। আবার বেরেলভীগণ বিশ্বাস করেন নবী মুহাম্মদ, তাঁর পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং তাঁর প্রিয়পাত্রগণ; সবাই কবরে জীবিত রয়েছেন এবং সবারই শুপারিশ পরকালে কাজে আসবে।

এই ছোট ব্যপারটি দিয়ে আমি উদাহরণ দিয়েছি, কারন ছোট হলেও এর গুরুত্ব অনেক বেশী। প্রচুর মুসলমান এই ভরসায় প্রচুর অকাজ-কুকাজ করে যে, পরকালে নবী মুহাম্মদ বা অন্য কেউ তাঁদের জন্য শুপারিশ করবেন কিংবা তারা কিছুদিন দোজখ খেঁটে মুক্তি পেয়ে বেহেশতের হুরদের কাছে চলে যাবেন।

ওহাবিদের মতে, প্রতিটি মুসলমানকে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি আল্লাহর পথে বিলিয়ে দিতে হবে। এবং মৃত্যুর সাথে সাথে তাঁর সোয়াবের খাতা বন্ধ হয়ে যাবে। নতুন করে আর কোন সোয়াব তাঁর নামে যোগ করা হবে না। দেওবন্দিগন বলেন, মৃত্যুর পরেও মানুষ সোয়াব পাবে, যদি সে মসজিদ-মাদ্রাসা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করে। আর বেরেলভী মোল্লাদের বিশ্বাস, সম্পদ দান করতে হবে নির্দিষ্ট কিছু দিনে। এসময় বেশী সোয়াব পাওয়া যাবে। অন্য সময়ে দান করলে সোয়াব কম হবে কিংবা হবে না।

বেরেলভীগনের কাছে নবী মুহাম্মদ হচ্ছেন ‘আল্লাহর নুর’। এই নুরের জন্মদিন আছে এবং জন্মদিন তাঁরা ধুমধামের সাথে পালন করে থাকেন। তাঁদের বিশ্বাস, এধরনের প্রতিটি মিলাদুন্নবীতে নবী মুহাম্মদ স্বয়ং উপস্থিত থাকেন। কিন্তু দেওবন্দি মোল্লাদের মতে, তিনি শুধুই একজন মাটি দিয়ে তৈরী মানুষ, যাকে আল্লাহ জ্ঞান-বুদ্ধি ইত্যাদি দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এদিকে ওহাবিগণ বলেন, নবী মুহাম্মদ অন্যান্যদের মতো একজন সাধারণ মানুষ মাত্র, এবং তাঁর জন্মদিন পালন করা অত্যন্ত গর্হিত একটি কাজ বা বিদয়াত। আহলে হাদিসের মোল্লাগণও মিলাদুন্নবী পালনের পক্ষপাতী নন।

যাই হোক, এধরনের বিভেদের কোন শেষ নেই। আজকাল অনেকেই বলে থাকেন, উপমহাদেশের বেশীরভাগ জঙ্গি দেওবন্দি ও ওহাবি মাদ্রাসাগুলো থেকে উৎপন্ন হয়েছে। কারন হলো, এরা জিহাদকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এদের তুলনায় বেরেলভী ও আহলে হাদিসগণ জিহাদের ব্যপারে একটু নরম। এজন্য বেরেলভীগণ প্রায়ই দেওবন্দি জঙ্গিদের হাতে বাংলাদেশে কিলঘুসি এবং পাকিস্তানে আত্নঘাতী বোমা হামলার শিকার হন। তবে আহলে হাদিসের মোল্লাগণ মার খেলে সাধারনত নিজেরাও পাল্টা আক্রমন করেন।

সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যপার, এতদসত্ত্বেও ইসলাম ধর্মের শাখাগুলোর মধ্যে ওহাবি-দেওবন্দি-বেরেলভী ও আহলে হাদিসের ভেতরেই সবচেয়ে বেশী মিল দেখা যায়। কিন্তু অন্যান্যদের থেকে বেশী মিল থাকার পরেও তাঁরা পরস্পরকে কাফের হিশেবে আখ্যায়িত করেন। নামাজে সুরা ফাতিহার পরে জোরে বা আস্তে ‘আমিন’ বলা নিয়েও যে তুমুল গালিগালাজ করা সম্ভব, সেটা এই মোল্লাদের না দেখলে বোঝার উপায় নেই।

বাংলাদেশের মুসলমানদের উপর সর্বাধিক প্রভাব বিস্তারকারী দেওবন্দি মোল্লাগণ ফতোয়া দিয়েছেন, আহলে হাদিস ও বেরেলভীগণ কাফের। তাঁরা ইংরেজের ষড়যন্ত্রের ফলে সৃষ্ট। তাঁদের সাথে চলাফেরা করা যাবে না, এমনকি ন্যূনতম সৌহার্দ্র প্রকাশও করা যাবে না। বেরেলভী ও আহলে হাদিসগণ মোল্লাগণও কম যান কীসে? তারাও অনুরূপ ফতোয়া দিয়ে বসে আছেন এবং তারা নিজেরা ব্যতীত অন্যদেরকে ইংরেজ দালাল বলে মনে করেন।

অথচ ইসলামের অন্যান্য বিদেশী শাখা ও উপশাখাগুলোর সাথে দেশীগুলোর যে পরিমাণ অমিল, সেটা শুনলে আমাদের জ্ঞানী-মূর্খ সবাই বিদেশীদের কাফের-মুশরিক বলে প্রচণ্ড গালিগালাজ করবেন। এবং আরো উল্লেখযোগ্য ব্যপার, এই বিদেশী শাখাগুলোও কিন্তু আমাদের দেশের মুসলমানদের কাফের হিশেবে জানে।

এজন্য এটাই আমার প্রশ্ন যে, কোন ইসলামকে বাংলাদেশের মোল্লাগণ শরিয়া হিশেবে দেখতে চান? দেশী না বিদেশী ইসলাম?? দেশী হলে কোনটি, দেওবন্দি-বেরেলভী-ওহাবি নাকি লা মাযহাবি-তাবলিগি-মওদুদি???

লিখাটি শাহিনুর রহমান শাহিন এর ফেসবুক ওয়াল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “কোন ইসলামকে শরিয়া হিসেবে দেখতে চান

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

96 − = 88