প্রেম অপ্রেম

প্রেম শব্দটা শুনলেই আমার ভেতর একটা প্রেম প্রেম ভাবের অাবির্ভাব হয়। তখন চোখ দুটো বন্ধ করি। হৃদয়ের কোথায় যেন একটা অনাস্বাদিতপূর্ব পুলকানুভূতি জেগে ওঠে। একটা অচেনা পেলব স্পর্শ আমার সারা শরীর জুড়ে প্রবাহিত হতে থাকে। এ এক নিদারুন সুখ! শুধু কল্পবিলাসের ঘোরে ভাবের গভীর গহনে একান্তই ব্যক্তিগত রোমান্টিকতা! কিন্তুু এই আন্তরিক এবং অভ্যন্তরীণ রোমান্টিকতার একটা বাহ্যিক প্রকাশও আছে। সেটা কেমন?

প্রেম করা মানে নিজের জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, হাঁসি-কান্না, ব্যস্ততা -অবকাশ, ঘুম-জাগরণের নিজস্ব অধিকারটুকু অন্যের হাতে তুলে দেওয়া। কখন ফোনে কল আসবে সেই প্রতীক্ষায় বসে থাকা, কলটা যেন মিস না হয় সেজন্য উৎকর্ণ হয়ে থাকা, ঘুম ভাঙলেই তাকে মনে পড়ে, ঘুমানোর পূর্ব মুহূর্তেও তাকে মনে পড়ে। দেখা করার জন্য ছটফট করা, দেখা হলে স্পর্শের জন্য মন আনচান করা, রিকশা না চড়ে বাসে উঠে টাকা বাঁচিয়ে ফোন রিচার্জ করে রাত জেগে কথা বলা এমন কত কিছু ঘটে। নিজেকে এভাবে অ্যাবজেক্ট করে,অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকাটা কতটুকু ঠিক কাজ সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। এরপরও যদি নিশ্চয়তা থাকতো যে, যাকে নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখছি সেও একই স্বপ্ন দেখছে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য আমার মতো সেও ধনুক ভাঙা পণ করেছে, তাহলে একটা কথা ছিলো। কিন্তুু আমরা কেউই অন্যের মনের খবর জানিনা। আর খবর জানলেও, দুজনের একান্ত ইচ্ছা থাকলেও পরিস্থিতি অনুকূলে থাকেনা সবসময়। হাজারটা ভেরিয়েবল কাজ করে সমাজে। প্রেমের সম্পর্কতো সমাজের মধ্যেই ঘটে। তাই প্রেমও সমাজের নানাবিধ চলকের ওপর নির্ভরশীল একটা সামাজিক ক্রিয়া। এইসকল চলক সবসময় আমরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারিনা। যেমন বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজকাঠামোটা এমন যে এখানে প্রেম করার সুযোগই নেই প্রায়।কারণ প্রেম এখানে বিরাট ট্যাবু। নারীপুরুষের মেলামেশা নিষিদ্ধ। সামান্যতম মেলামেশার প্রচেষ্টা দেখলে সমাজ তাদের ওপর সদা সতর্ক নজরদারি করে।তারপরও যদি কোন অতি আগ্রহী ছেলেমেয়ে কোন এক কায়দায় প্রেম করেও ফেলে, সেই প্রেম প্রতিষ্ঠা করা দুঃসাধ্য। আর শহুরে জীবনে নারী পুরুষের সংখ্যা বেশী, দেখা সাক্ষাতের সুযোগ বেশী, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্মক্ষেত্রে একসাথে থাকার ফলে প্রেম ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশী। তবে এইখানে আছে অন্য উৎপাত। আধুনিকতা বা উত্তরাধুনিকতার প্রভাব: দ্রুতই সম্পর্ক গড়ে ওঠা এবং দ্রুতই ভেঙে যাওয়া। তবুও আজকে প্রেমের পক্ষেই লিখবো।


প্রেম এসব লেকচারের ধার ধারেনা। কারণ প্রেম বিষয়টা যতটা হৃদয়জাত (হৃদয়জাত কিছু হয়না আসলে। এটা মস্তিস্কেরই অন্য একটা খেলা যেখানে যুক্তির চেয়ে আবেগের প্রাধান্য বেশী)ততটা মস্তিষ্কপ্রসূত নয়। প্রেম স্রেফ হয়ে যায়, ভেতর থেকে চলে আসে। যখন ভেতর থেকে আসে তখন বাইরে থেকে আমাদের আর প্রেম না করে উপায় থাকে না। তবে লোক দেখানো প্রেম সহজেই চোখে পড়ে, তার উত্তাপ বেশী, আলো কম। আন্তরিক প্রেম খুবই subtle, তার অনুভূতি sublime.

প্রেম সবসময়ই ছিলো;ভিন্ন আঙ্গিকে,কখনো সৌম্যদর্শন, কখনো উত্তাল তরঙ্গায়িত। বৈষ্ণব পদাবলীর রাধা কৃষ্ণের প্রেম, শেকসপিয়ারের রোমিও জুলিয়েট, রবীন্দ্রনাথের অমিত লাবন্য সবাই প্রেম করে গেছে। বাদ দিলাম এদের কথা। এরা তো শিল্পীর কল্পনা। বাস্তবে কি নেই এমন প্রেম? প্রিন্স অষ্টম এডওয়ার্ড, ওয়ালি সিম্পসনের জন্য রাজত্ব ত্যাগ করলেন। তার পূর্বপুরুষ ষষ্ঠ হেনরী ছয়খানা বিয়ে করেছিলেন। সেগুলোকো প্রেম বলা যায় কি না তা নিয়ে কথা থাকতে পারে। তবে বিয়ে করার জন্য পূর্বের স্ত্রী কে ডিভোর্স দেওয়ার দরকার ছিলো। সেই অনুমতি নিতে হতো আবার রোমান ক্যাথলিক চার্চের কাছ থেকে। ক্যাথলিক চার্চ সেই অনুমতি দিতে রাজি না হওয়ায় হেনরি রোমান ক্যাথলিক চার্চের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করলেন।ইংল্যান্ড হয়ে গেলো প্রোটেস্টেন্ট।সেই ষোলো শতকের শুরুর দিকে চার্চের বিরুদ্ধে এমন বিদ্রোহ! ভাবা যায়! কোথা থেকে এলো এই প্রেরণা? প্রেম নয় কি তা? এসব পুরনো কথা তাই বাদ দিলাম। আমাদের অভিজিৎ রায় বন্যার টানে সিঙ্গাপুর থেকে অামেরিকায় পাড়ি জমিয়ে সুখের সংসার করেনি কি? অভিজিৎ স্কলার মানুষ। তিনি কি জানতেন না প্রেমের অনিশ্চয়তা? তবুও তিনি সাগর পাড়ি দিলেন। নাই বা হলো প্রেম । তবুও নির্মলেন্দু গুনের মত একটা আকাঙ্ক্ষা কি আমাদের সবার ভেতরে থাকে না?

“আমি বলছিনা ভালোবাসতেই হবে,
আমি চাই কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক,
শুধু ঘরের ভেতর থেকে দরোজা খুলে দেবার জন্য। বাইরে থেকে দরোজা খুলতে খুলতে আমি এখন ক্লান্ত”।

যারা প্রেম পায়নি তাদের কি হেলাল হাফিজের মত এমন আক্ষেপ কাজ করেনা ভেতরে?

“নষ্ট রাখীর কষ্ট নিয়ে অতোটা পথ একলা এলাম, পেছন থেকে কেউ বলেনি- করুণ পথিক
দুপুর রোদে গাছের নিচে একটু বসে জিরিয়ে নিও,
কেউ বলেনি ভালো থেকো সুখেই থেকো।
যুগল চোখে জলের ভাষায় আসার সময় কেউ বলেনি
মাথার কসম আবার এসো।”

প্রেমহীন কোন যুবকের না এমন অনুভূতি হয় যে অনুভূতি হয়েছিলো বিহারীলাল চক্রবর্তীর, যেটাকে আবার রবীন্দ্রনাথ আধুনিক বাংলা সাহিত্যে কোন কবির প্রথম রোমান্টিক আত্মপ্রকাশ বলছেন :

‘সর্বদাই হু হু করে মন,
বিশ্ব যেন মরুর মতন।
চারিদিকে ঝালাফালা।
উহু কী জ্বলন্ত জ্বালা,
অগ্নিকুণ্ডে পতঙ্গপতন।”

প্রেমের বেদনা ও বিচ্ছেদ উচ্চারিত হয় প্রেমিক প্রেমিকার মনে রবীন্দ্রনাথের সুর – দুর্মর আশার বাঁশরী :

আমার সকল কাঁটা ধন্য করে ফুটবে গো ফুল ফুটবে।
আমার সকল ব্যথা রঙিন হয়ে গোলাপ হয়ে উঠবে।

বিচ্ছেদের পরেও তবু মিলনের আশা জাগিয়ে রাখে বিরহী যুগল। প্রেম তো এতো সহজে ভোলা যায়না। নজরুলের মত তাই সে মনে মনে বলে :

কেঁদে কেঁদে রাতে যদি মোর হাতে লেখনী যায় গো থামি
বিরহ হইয়া বুকে এসে মোর কহিও – ‘এইতো আমি ‘।

প্রেম তাই থাকবে। তা প্রয়োজনীয়, না অপ্রয়োজনীয় নাকি বিলাসিতা এসব নিয়ে প্রেমীযুগলদের মাথাব্যথা নেই। যারা প্রেম পায়নি তাদের জন্য সমবেদনা।আর যারা হাত ভর্তি প্রেম পেয়েও মুঠো ভরে তা নিতে পারেনা তাদের জন্য করুণা। তারা সত্যিই দরিদ্র, অসভ্য এবং দুর্ভাগা। আর যারা বলেন প্রেম ভালোবাসা সব অভ্যাসের ব্যপার তার কলকাতার বাংলা মুভি “বেলাশেষে ” দেখে নিতে পারেন একবার। তাহলে বুঝবেন ভালোবাসাটা অভ্যাসের ব্যাপার না ,ওটা ভালোবাসার অভ্যাস।

আন্তরিক ভালোবাসা আবিষ্কার করতে হয় অন্তরের লুকায়িত ভাণ্ডারে অনুসন্ধান চালিয়ে। প্রতিনিয়ত পরিচর্যা করতে হয় তাকে। এজন্যই ভালোবাসা একটা শিল্প ;সভ্য মানুষ সেটা চর্চা করে। আর অসভ্যরা ধ্বংস করে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “প্রেম অপ্রেম

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 2