মু্হম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-৮

কোরানের বিপুল অসংলগ্নতার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আমরা আগের পর্বে পেয়েছিলাম। যারা আগের পর্ব পড়েন নি তাদের আমি আগের পর্বটি পড়ে এই পর্ব শুরু করতে পরামর্শ দেব। আগের পর্বের লিঙ্ক এখানে দেওয়া হল। আগের পর্বে আমরা ভাষাবিদ গার্দ-র পুইনের উল্লেখ পেয়েছি। ১৯৭২ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানার একটি মসজিদে কোরানের প্রাচীন হিজাজী লিপিতে নষ্ট হওয়ার দোড়গোড়ায় পৌছে যাওয়া সর্বপ্রাচীন (পরবর্তীকালে বিরমিংহামে আরো প্রাচীন কোরানের দুটি পৃষ্ঠা আবিস্কার হয়েছে)কোরানের পান্ডুলিপি আবিস্কার হয়। ইয়েমেনী সরকার এই পান্ডুলিপি পুনরুদ্ধারের যে প্রকল্প নেন তার প্রধান ছিলেন গার্দ-র পুইন। তিনি বর্তমানে প্রচলিত কোরানের সাথে সানায় প্রাপ্ত কোরানের বহু পার্থক্য লক্ষ্য করেন। তার মতে,

কোরান আসলে কি ছিল?

কোরানের বিপুল অসংলগ্নতার সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আমরা আগের পর্বে পেয়েছিলাম। যারা আগের পর্ব পড়েন নি তাদের আমি আগের পর্বটি পড়ে এই পর্ব শুরু করতে পরামর্শ দেব। আগের পর্বের লিঙ্ক এখানে দেওয়া হল। আগের পর্বে আমরা ভাষাবিদ গার্দ-র পুইনের উল্লেখ পেয়েছি। ১৯৭২ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানার একটি মসজিদে কোরানের প্রাচীন হিজাজী লিপিতে প্রায় নষ্ট হয়ে যাওয়া সর্বপ্রাচীন (পরবর্তীকালে বিরমিংহামে আরো প্রাচীন কোরানের দুটি পৃষ্ঠা আবিস্কার হয়েছে) কোরানের পান্ডুলিপি আবিস্কার হয়। ইয়েমেনী সরকার এই পান্ডুলিপি পুনরুদ্ধারের যে প্রকল্প নেন তার প্রধান ছিলেন গার্দ-র পুইন। তিনি বর্তমানে প্রচলিত কোরানের সাথে সানায় প্রাপ্ত কোরানের বহু পার্থক্য লক্ষ্য করেন। তার মতে,

“My idea is that the Koran is a kind of cocktail of texts that were not all understood even at the time of Muhammad. Many of them may even be a hundred years older than Islam itself. Even within the Islamic traditions there is a huge body of contradictory information, including a significant Christian substrate; one can derive a whole Islamic anti-history from them if one wants.”

তিনি আরো বলেন;

The Koran claims for itself that it is ‘mubeen,’ or ‘clear,’ but if you look at it, you will notice that every fifth sentence or so simply doesn’t make sense. Many Muslims—and Orientalists —will tell you otherwise, of course, but the fact is that a fifth of the Koranic text is just incomprehensible. This is what has caused the traditional anxiety regarding translation. If the Koran is not comprehensible—if it can’t even be understood in Arabic—then it’s not translatable. People fear that. And since the Koran claims repeatedly to be clear but obviously is not—as even speakers of Arabic will tell you—there is a contradiction. Something else must be going on.[1]

সানায় প্রাপ্ত কোরানের পার্চমেন্ট

প্রকৃতপক্ষে আমরা উপরে যা দেখলাম তা হল রিভিশনিষ্ট স্কূল অফ ইসলামিক স্ট্যাডিসের মূল ধারণার এক চুম্বক। অন্য অধিকাংশ ধর্মীয় শব্দের মত (পঞ্চম পর্ব দ্রষ্টব্য)আরবী কুর’আন (Quran) শব্দটিও সিরিয়াক উৎস থেকে আগত। এর ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হল ধর্মীয় স্তোত্রসংকলন। কোরানিক স্কলার এরভিন গ্রাফ দেখিয়েছেন সিরিয়াক শব্দটি খৃষ্টীয় স্তোত্র বোঝাতেই ব্যাবহার হত।আমরা তৃতীয় পর্বেই উল্লেখ করেছি অনেকগুলি আরবী বর্ণ দেখতে একই রকম। তাদের উপরে নিচে নানারকম চিহ্ন দিয়ে পার্থক্য বোঝানো হয়। কোরানের প্রাচীন ম্যানুস্ক্রিপ্টগুলির কোনটিতেই এইসমস্ত চিহ্নগুলি নেই। এগুলী পরে বসানো হয়েছে। কোরানের দুর্বোধ্য ও অসংলগ্ন অংশগুলো পরিস্কার হয়ে যায় যদি এইসমস্ত চিহ্নগুলি সরিয়ে দিয়ে নতুন করে অর্থ করবার করবার চেষ্টা করা হয়।

উপরের আলোচনার ভিত্তিতে প্রশ্ন উঠতে পারে, কোরান যেসব আয়াতে নিজেকে পৃথক শাস্ত্র হিসাবে দাবী করছে সেগুলোর কি হবে- যেমন “এগুলো সুস্পষ্ট গ্রন্থের আয়াত। আমি একে আরবী ভাষায় কোরআন রূপে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পার” [ সুরা ইউসুফ ১২:১-২ ]।এক্ষেত্রে সিরিয়াক উৎসের পর্যালোচনা করে লুক্সেমবা্র্গ এইভাবে অনুবাদ করেছেন-
“এটি হল সুষ্পষ্ট গ্রন্থের লিখিত প্রতিলিপি। আমি একে আরবী স্তোত্রসংকলন রূপে অবতীর্ণ করেছি যাতে তোমরা বুঝতে পার”(১)
প্রকৃতপক্ষে কোরান হল স্তোত্তসংকলন, এর আর কোন দ্বিতীয় অর্থ নেই। ওল্ড ও নিউ টেষ্টামেন্টের নির্দিষ্ট শ্লোকসমষ্টি বোঝাতে এই শব্দটি ব্যাবহার হত।

জটিল ভাষাতাত্বিক আলোচনার পূর্ণ বিবরণ এই পরিসরে দেওয়া সম্ভব হবে না, তার প্রযোজনও নেই। শুধু প্রক্রিয়াটা মাথায় রেখে নিচের সুরাটি ভালভাবে লক্ষ্য করুন

সুরা আলাক
১. পড় তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।
২. সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট-বাঁধা রক্তপিন্ড হতে।
৩. পড়, আর তোমার রব মহামহিম।
৪. যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।
৫. তিনি মানুষকে তা শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না।
৬. মোটেই নয়, নিশ্চয় মানুষ সীমালঙ্ঘন করে থাকে।
৭. কেননা সে নিজেকে মনে করে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
৮. নিশ্চয় তোমার রবের দিকেই প্রত্যাবর্তন।
৯. তুমি কি তাকে দেখেছো যে বাধা দেয়
১০. এক বান্দাকে, যখন সে সালাত আদায় করে?
১১. তুমি কি ভেবে দেখেছ, যদি সে সৎ পথে থাকে
১২. অথবা তাকওয়ার নির্দেশ দেয়?
১৩. তুমি লক্ষ্য করেছ কি যদি সে মিথ্যা আরোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়?
১৪. সে কি জানেনা যে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ দেখেন?
১৫. মোটেই নয় নয়, যদি সে বিরত না হয়, তবে আমি তাকে কপালের সম্মুখভাগের চুল ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাব।
১৬. মিথ্যাচারী পাপাচারী চুলগুচ্ছ
১৭. অতএব, সে তার সভাসদদের আহবান করুক।
১৮. অচিরেই আমি ডেকে নেব জাহান্নামের প্রহরীদেরকে।
১৯. মোটেই নয়, তুমি তার আনুগত্য করবে না। আর সিজদা কর এবং নৈকট্য লাভ কর।

(কোরানের অনুবাদগুলি মূলত www.hadithbd.com থেকে নেওয়া হয়েছে। আরো আট-দশটি অনুবাদ মিলিয়ে দেখা হয়েছে)

এই সুরাটি প্রথম আট আয়াতে মানুষের সৃষ্টিরহস্য আর আল্লার কৃপা ব্যাখ্যা করার পর আচমকা আমাদের একজন লোকের কথা বলতে থাকে যে কিনা তার বান্দাকে নামাজ পড়তে বাঁধা দিচ্ছিল। ইসলামিক স্কলার ইবনে রাওয়ান্দির(২) মতে গোটা সুরাটিই মোটের উপর অর্থহীন প্রলাপ। কাল্লা “মোটেই নয়” (no, indeed) শব্দটি সমগ্র সুরায় তিনবার ব্যবহৃত হয়েছে। ইবনে রাওয়ান্দি দেখিয়েছেন যে ষষ্ঠ আয়াতে কাল্লা- (এর অর্থ ‘মোটেই নয়’) এর কোনই অর্থ নেই কারণ এটি আগের আয়াতের (বা আয়াতগুলির) অস্বীকৃতি হতে পারে না। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে সুরাটি দুটি অংশে বিভক্ত, কারণ দুটি অংশের বক্তব্য বিষয় আলাদা এমনকি ভাষাতাত্বিক গঠনও আলাদা।

সংশ্লিস্ট বিষয়ে স্কলারদের যে বিশাল গবেষনা আছে তা এই ক্ষুদ্র পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়। আমরা সরাসরি দেখব স্কলাররা কি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। পরিস্কারভাবে সুরাটিতে সম্পাদনার চিহ্ন বর্তমান। প্রথম আটটি আয়াত প্রচলিত ইসালামিক বিবরণের সাথে পরিস্কারভাবে মিলে যায়। কিন্তু পরের আয়াতগুলির অর্থ বুঝতে গিয়ে যে কোন ব্যক্তির চুল ছেড়ার উপক্রম হবে। গবেষক গান্টার লুলিং তার লেখায় দেখিয়েছেন সুরা ৯৬ প্রকৃতপক্ষে হয়ত ছিল একটি খৃষ্টীয় প্রার্থনাসঙ্গীত, যেটাকে পরবর্তীকালে কিছুটা পরিবর্তীত করে ইসালমিক বিন্যাসের সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাচীন আরবী ম্যানুস্ক্রীপ্টের উপর ভিত্তি করে লুলিং সুরাটির ৯ থেকে ১৮ নং আয়াতের পুনর্গঠন করেছেন। “তুমি কি তাকে দেখেছো যে বাধা দেয় এক বান্দাকে, যখন সে সালাত আদায় করে?” (আয়াত ৯-১০) লুলিঙের পুনর্গঠনে হয়েছে – তুমি কি কখনও দেখছো তিনি তার বান্দাকে অস্বীকার করেন যে তার উপাসনা করে। উষ্ণ সতর্কবানী “তুমি লক্ষ্য করেছ কি যদি সে মিথ্যা আরোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়?-সে কি জানেনা যে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ দেখেন?” (আায়াত ১৩-১৪) হয়ে দাঁড়িয়েছে খৃষ্টীয় ঈশ্বরের আন্তরিকতার বার্তা; –তুমি কি কখনও দেখেছো তিনি মিথ্যা আরোপ করেছেন ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন? তুমি কি জাননা যে ঈশ্বর সব দেখেন। অত্যন্ত অবান্তর “অতএব, সে তার সভাসদদের আহবান করুক, অচিরেই আমি ডেকে নেব জাহান্নামের প্রহরীদেরকে।” (আায়াত ১৭-১৮) এটাকে অনুবাদ করা হয়েছে ঈশ্বরের স্বর্গীয় সভা ও দেবদূতদের প্রতি আহ্বান হিসাবে- ‘অতএব আহ্বান কর তার উচ্চ সভাসদদের! তারপর স্বর্গীয় দেবদূতদের আহ্বান করা হবে’(৩)

আমরা দেখতে পেলাম যে লুলিং এর পুনর্গঠনে সুরাটি হয়ে দাঁড়াল একটি প্রার্থনাসঙ্গীত যেখানে ধার্মিক ব্যক্তিবর্গকে ঈশ্বরের আহ্বান করতে বলা হচ্ছে এবং ঈশ্বরের আন্তরিকতা সম্পর্কে আস্বস্ত করা হচ্ছে। প্রসঙ্গত আবার উল্লেখ করছি আল্লা হল ঈশ্বরের আরবী প্রতিশব্দ মাত্র, মুসলিম-খৃষ্টান-ইহুদী নির্বিশেষে সমস্ত আরববাসী ঈশ্বরকে ওই নামে ডাকে। দেখা যাচ্ছে প্রসঙ্গহীন, বিশৃঙ্খল এই কোরানিক সুরাটির স্পষ্ট অর্থ করা সম্ভব হয় যদি আমরা ইসলামী অনুশাসনের বাইরে গিয়ে চিন্তাভাবনা করি। শুধুমাত্র এই সুরাটিই নয় প্রায় অধিকাংশ মক্কী সুরাকেই সামান্য যৌক্তিক অদলবদলের সাহায্যে খৃষ্টীয় শ্লোকে বদলে ফেলা যায়।

সুরা আলাক শুরু হচ্ছে ‘ইকরা’ (iqra) শব্দটি দিয়ে। তাফসিরকারক ও অনুবাদকরা এর অর্থ করেছেন পড় বা পাঠ কর ইত্যাদী। প্রাচীন আরবী ভাষাবিদ আবু উবায়দার গারিব আল-হাদিস (৮১৮ খৃঃ) গ্রন্থে পাওয়া যায় যে ক্রিয়াপদ qara- এর অর্থ হল পাঠ করা, iqra হল তার অনুজ্ঞাসূচক রূপ; অন্য একটি ক্রিয়াপদ dakara এর সমার্থক- অর্থ আহ্বান করা(invoke) । ইবনে রাওয়ান্দি এবং রবার্ট লুলিং দুজনেই ‘ইকরা’ এর অর্থ আহ্বান করা ধরেছেন। যে কোন ধর্মীয় যেহেতু স্তোত্তই উচ্চস্বরে, সুর করে পড়া হয় তাই এই দুই অর্থের মধ্যে পার্থক্য বিশেষ থাকে না। ‘ইকরা’ এর অর্থ invoke বা আহ্বান করা ধরলে সুরার প্রথম বাক্য আমাদের স্মরন করিয়ে দেয় হিব্রু বাইবেলের অত্যন্ত পরিচিত শব্দবন্ধ “qara be shem Yahwe” – প্রভুর নামে আহ্বান কর (জেনেসিস ৪:২৫-২৬। যে সমস্ত পাঠকদের বিষয়টি গলার্ধঃকরণ করতে অসুবিধা হচ্ছে তাদের আমি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে অনুরোধ করছি। বাইবেল থেকে সরাসরি আরো উদ্ধৃতি দিয়ে বিষয়টি প্রমান করা যেত, কিন্তু সেক্ষেত্রে আলোচনাকে অন্য খাতে নিয়ে যেতে হবে। কোরান ও বাইবেলের তুলনামূলক আলোচনা পরের কোন একটি পর্বে আমরা করব।

প্রকৃতপক্ষে শুধু লুলিং নয়, আরো অসংখ্য স্কলার কোরানে ইসলামিক কাঠামোর নিচে খৃষ্টীয় উপস্তরের অস্তিত্ব প্রমান করেছেন। এই বিষয়টি এতটাই প্রতিষ্ঠিত যে একে আর অস্বীকার করার কোন জায়গা নেই। কোরান আসলে ছিল খৃষ্টীয় ধর্মসঙ্গীত সংকলন। পরবর্তীকালে ইসলামী বিবরণ অর্থাৎ মুহম্মদ, জিব্রাইল, ওহী আসা ইত্যাদী প্রচারিত হওয়ার পর সম্পাদনার মাধ্যমে ইসলামিক বিন্যাসের সাথে খাপ খাইয়ে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরেকজন কোরান বিশেষজ্ঞ রিচার্ড বেল(১৮৭৬-১৯৫২) কোরানের বহু স্থানে সম্পাদনার চিহ্ন আবিস্কার করেছেন। যেমন-

“তারা বলে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। তিনি তো এসব কিছু থেকে পবিত্র, বরং নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যা কিছু রয়েছে সবই তার আজ্ঞাধীন। [ সুরা বাকারা ২:১১৬ ]

তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের উদ্ভাবক। যখন তিনি কোন কার্য সম্পাদনের সিন্ধান্ত নেন, তখন সেটিকে একথাই বলেন, `হয়ে যাও’ তৎক্ষণাৎ তা হয়ে যায়। [ সুরা বাকারা ২:১১৭ ]

যারা কিছু জানে না, তারা বলে, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে কেন কথা বলেন না? অথবা আমাদের কাছে কোন নিদর্শন কেন আসে না? এমনি ভাবে তাদের পূর্বে যারা ছিল তারাও তাদেরই অনুরূপ কথা বলেছে। তাদের অন্তর একই রকম। নিশ্চয় আমি উজ্জ্বল নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করেছি তাদের জন্যে যারা প্রত্যয়শীল। [ সুরা বাকারা ২:১১৮ ]

নিশ্চয় আমি আপনাকে সত্যধর্মসহ সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারীরূপে পাঠিয়েছি। আপনি দোখজবাসীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন না। [ সুরা বাকারা ২:১১৯ ]

ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা কখনই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ করেন। বলে দিন, যে পথ আল্লাহ প্রদর্শন করেন, তাই হল সরল পথ। যদি আপনি তাদের আকাঙ্খাসমূহের অনুসরণ করেন, ঐ জ্ঞান লাভের পর, যা আপনার কাছে পৌঁছেছে, তবে কেউ আল্লাহর কবল থেকে আপনার উদ্ধারকারী ও সাহায্যকারী নেই। [ সুরা বাকারা ২:১২০]

আমি যাদেরকে গ্রন্থ দান করেছি, তারা তা যথাযথভাবে পাঠ করে। তারাই তৎপ্রতি বিশ্বাস করে। আর যারা তা অবিশ্বাস করে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত। [ সুরা বাকারা ২:১২১ ]”

বেল দেখিয়েছেন আয়াত ১১৬-১১৭ হল ১২০ নং আয়াতে যে দাবী করা হয়েছে ইহুদী ও খৃষ্টানরা কখনই সন্তুষ্ট হবে না তার ব্যাখ্যা। প্রকৃতপক্ষে এই আয়াতদুটি ১২০ এর পরে আসা উচিত। ১১৮-১৯ আয়াতে সম্পূর্ণ আলাদা কিছু বক্তব্য দেখা যায়, যার সাথে অন্য তিনটি আয়াতের কোন সম্পর্ক নেই। এই আয়াতদুটিকে অন্যকোথাও থেকে তুলে আনা হয়েছে। বেল আয়াতগুলিকে পরপর সাজিয়েছেন এইভাবে-

“ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা কখনই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ করেন। বলে দিন, যে পথ আল্লাহ প্রদর্শন করেন, তাই হল সরল পথ। যদি আপনি তাদের আকাঙ্খাসমূহের অনুসরণ করেন, ঐ জ্ঞান লাভের পর, যা আপনার কাছে পৌঁছেছে, তবে কেউ আল্লাহর কবল থেকে আপনার উদ্ধারকারী ও সাহায্যকারী নেই।
[ সুরা বাকারা ২:১২০]

তারা বলে, আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন। তিনি তো এসব কিছু থেকে পবিত্র, বরং নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে যা কিছু রয়েছে সবই তার আজ্ঞাধীন। [ সুরা বাকারা ২:১১৬ ]

“তিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের উদ্ভাবক। যখন তিনি কোন কার্য সম্পাদনের সিন্ধান্ত নেন, তখন সেটিকে একথাই বলেন, `হয়ে যাও’ তৎক্ষণাৎ তা হয়ে যায়”। [ সুরা বাকারা ২:১১৭ ]

“আমি যাদেরকে গ্রন্থ দান করেছি, তারা তা যথাযথভাবে পাঠ করে। তারাই তৎপ্রতি বিশ্বাস করে। আর যারা তা অবিশ্বাস করে, তারাই হবে ক্ষতিগ্রস্ত।” [ সুরা বাকারা ২:১২১ ]”

কোরানের নিম্মোক্ত অংশেও সম্পাদনার চিহ্ন বর্তমান-

“তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতা, তোমাদের কন্যা, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভ্রাতৃকণ্যা; ভগিনীকণ্যা তোমাদের সে মাতা, যারা তোমাদেরকে স্তন্যপান করিয়েছে, তোমাদের দুধ-বোন, তোমাদের স্ত্রীদের মাতা, তোমরা যাদের সাথে সহবাস করেছ সে স্ত্রীদের কন্যা যারা তোমাদের লালন-পালনে আছে। যদি তাদের সাথে সহবাস না করে থাক, তবে এ বিবাহে তোমাদের কোন গোনাহ নেই। তোমাদের ঔরসজাত পুত্রদের স্ত্রী এবং দুই বোনকে একত্রে বিবাহ করা; কিন্তু যা অতীত হয়ে গেছে। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাকরী, দয়ালু” [সুরা নিসা,২৩]

এই আয়াতে পূর্নাঙ্গ বিবাহ আইন বর্ণিত হয়েছে যা স্বয়ংসম্পূর্ণ।বস্তুত আরবে তৎকালীন যুগে প্রচলিত আইনকেই ধর্মীয় নিয়ম হিসাবে কোরানের অন্তর্ভূক্ত করা হল।তার পরের আয়াত দেখুন-

“এবং নারীদের মধ্যে তাদের ছাড়া সকল সধবা স্ত্রীলোক তোমাদের জন্যে নিষিদ্ধ; তোমাদের দক্ষিণ হস্ত যাদের মালিক হয়ে যায়-এটা তোমাদের জন্য আল্লাহর হুকুম। এদেরকে ছাড়া তোমাদের জন্যে সব নারী হালাল করা হয়েছে, শর্ত এই যে, তোমরা তাদেরকে স্বীয় অর্থের বিনিময়ে তলব করবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য-ব্যভিচারের জন্য নয়। অনন্তর তাদের মধ্যে যাকে তোমরা ভোগ করবে, তাকে তার নির্ধারিত হক দান কর। তোমাদের কোন গোনাহ হবে না যদি নির্ধারণের পর তোমরা পরস্পরে সম্মত হও। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিজ্ঞ, রহস্যবিদ” [সুরা নিসা,২৪]

“আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি স্বাধীন মুসলমান নারীকে বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে না, সে তোমাদের অধিকারভুক্ত মুসলিম ক্রীতদাসীদেরকে বিয়ে করবে। আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞাত রয়েছেন। তোমরা পরস্পর এক, অতএব, তাদেরকে তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে বিয়ে কর এবং নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকে মোহরানা প্রদান কর এমতাবস্থায় যে, তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে-ব্যভিচারিণী কিংবা উপ-পতি গ্রহণকারিণী হবে না। অতঃপর যখন তারা বিবাহ বন্ধনে এসে যায়, তখন যদি কোন অশ্লীল কাজ করে, তবে তাদেরকে স্বাধীন নারীদের অর্ধেক শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ ব্যবস্থা তাদের জন্যে, তোমাদের মধ্যে যারা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে ভয় করে। আর যদি সবর কর, তবে তা তোমাদের জন্যে উত্তম। আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়”[সুরা নিসা,২৫](৪)

পরিস্কারভাবে আয়াত ২৪ এ বিকল্প সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বেলের মতে সাম্রাজ্য বিস্তূত হওয়ার ফলে পরবর্তীকালে বিবাহ আইনের কিছু শিথিলতা প্রয়োজন হয়ে পরে। তখন নতুন আয়াত যুক্ত করে নতুন পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য বিধান করা হয়। প্রসঙ্গত সুরা নিসা আর সুরা বাকারা ইসলামী আইনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন উপাদান।

কোরানিক শব্দ হুর (Hur) সাধারনভাবে কুমারী অর্থে অনুবাদ হয়ে থাকে। হুর শব্দটি শোনেন নি এরকম ব্যক্তি বাংলা অন্তর্জালে অন্তত পাওয়া যাবে না।কোরানের আল্লা প্রত্যেক জান্নাতিকে ৭২ টা হুর দেবার প্রতিজ্ঞা করেছেন। সমস্যা হল একজন ব্যক্তি ৭২ টা কুমারী নিয়ে করবেটা কি! তাও আবার কোরান অনুসারে মুনিন বান্দারা তাদের বিবিদের নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবেন [সুরা যুখরুফ,৭০]। এর থেকে হাস্যকর বৈপরীত্য আর কিছু হতে পারে না, যদি না কল্পনা করা হয় যে পার্থিব স্ত্রীরা দুঃখ ও ঈর্ষা নিয়ে হুরের সাথে তাদের স্বামীদের লীলাখেলা দেখবে। অনেকেই শুনলে অবাক হবেন যে হুর শব্দের আভিধানিক অর্থ হল শুধুমাত্র সাদা। কোরান অনুবাদকরা এর অর্থ করেছেন শ্বেতচক্ষুবিশিষ্ট, বৃহৎ চক্ষুবিশিষ্ট, লাস্যময়ী ইত্যাদী। এখন কোন নারীর চোখের প্রশংসায় কি সাদা চোখ অভিধা ব্যবহার হয় নাকি হওয়া সম্ভব। সাহিত্যে সুন্দরী রমনীর হয় কালো চোথ না হলে নীল চোখের বর্নণা ঝুড়ি ঝুড়ি পাওয়া যায়; কিন্তু সাদা চোখ নৈব নৈব চ। আরবীতে কুমারীর প্রতিশব্দ হল হুরী (Houri)। কোরানে তাহলে হুরীর বদলে হুরের উল্লেখ করা হল কেন? পূর্বোক্ত এক্ষেত্রেও গবেষক ক্রিস্তোফ লুক্সেমবার্গ অসাধারণ বিশ্লেষনের সাহায্যে সমস্যার সমাধান করেছেন। যে সমস্ত প্রসঙ্গে হুর উল্লিখিত হয়েছে, সেগুলী খতিয়ে দেখে তার অভিমত এখানে প্রকৃতপক্ষে সাদা কিশমিস অর্থ্যাৎ আঙুরের কথা বলা হয়েছে। আজ্ঞে হ্যাঁ, আঙুর- এবং এটি খৃষ্টীয় স্বর্গের ধারণার সাথে পরিপূর্নভাবে মিলে যায়। বহু খৃষ্টীয় শ্লোকে স্বর্গের দ্রাক্ষাকুঞ্জের সন্ধান পাওয়া যায়। লুক্সেমবার্গ নিজেই একটির উল্লেখ করেছেন- সিরিয় সেন্ট এফ্রাইমকৃত খৃষ্টীয় চতুর্থ শতকের একটি শ্লোক যেখানে স্বর্গীয় দ্রাক্ষাকুঞ্জের উল্লেখ আছে। লুক্সেমবার্গের মতে, আরবীতে দ্রাক্ষাকুঞ্জ ব্যকরণগতভাবে স্ত্রীলিঙ্গ, এর থেকেই কোরানের ভূল ব্যাখ্যা প্রচলিত হয়ে থাকবে(৫)।

Ref:
1. Luxemberg, Syro-Armaic

2. Ibn Rawandi, On Pre-Islamic Christian Strophic Poetical Texts in the Koran: acritical look at the work of Gunter Luling” in Ibn Warraq “What the Koran really says”

3. Ibn Rawandi, On Pre-Islamic Christian Strophic Poetical Texts
4. Richard Bell, “From Introduction to Koran” in Ibn Warraq Ed “What the Koran really says”
5.Robert Spencer, “Did Muhammad Exist”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “মু্হম্মদের ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহাসিক মুহম্মদ, পর্ব-৮

  1. “যারা আগের পর্ব পড়েন নি তাদের
    “যারা আগের পর্ব পড়েন নি তাদের আমি আগের পর্বটি পড়ে এই পর্ব শুরু করতে পরামর্শ দেব। আগের পর্বের লিঙ্ক এখানে দেওয়া হল।”

    – ভাই, আগের পর্বের লিঙ্ক কিন্তু দেন নাই। পর্ব ৭, ৬, ৫ … ১, এইগুলি কোথায় পাব? লিঙ্ক তো দেখছি না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 50 = 51