বাংলাদেশের এগিয়ে চলা

আমাদের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন প্রশাসনের তদানীন্তন অন্যতম কর্ণধার হেনরি কিসিঞ্জার স্বাধীন বাংলাদেশকে কি হেয় চোখেই যে দেখতেন তা সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ গ্রন্থের পাতায় পাতায় সজ্জিত রয়েছে। শুধু তাই নয়, সিআইএর এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের যে সকল গোপন দলিল এখন সময়ের রজ্জু ছিন্ন করে প্রকাশ হচ্ছে তাতেও নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসনের বাংলাদেশ বিদ্বেষ আর পাকিস্তানী হানাদারদের প্রতি তাদের যারপরনাই প্রীতির বিবরণ দেখতে পাওয়া যায়। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর গণহত্যার বিপরীতে পাকিস্তানে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাজনৈতিক সমাধানের জন্য বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে ভূমিকা পালনের ব্যাপারে আবেদন-নিবেদন জানিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তখন ‘পিংপং ডিপ্লোমেসির’ ছদ্মাবরণে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সর্বতো সহযোগিতার প্রত্যাশী হয়ে কূটচাল চেলেই যাচ্ছিল। তখন চীন-মার্কিন সম্পর্ক স্থাপনের এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রশাসনের দিক থেকে ইয়াহিয়া সরকারের প্রতি এই তোষণ নীতি পরিচালিত ও কার্যকর করা হচ্ছিল। ফলে ভারতের মিসেস গান্ধী ও তার সরকারের আহ্বানে সাড়া দেয়ার পরিবর্তে ভারতের প্রতি তথা বাংলাদেশের মানুষের প্রতি চরম বৈরিতামূলক অবস্থান গ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্র্র। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি চীনের মনোভাবও তখন দারুণ বৈরিতাপূর্ণ। চীন-ভারত সম্পর্কের দীর্ঘকালীন টানাপোড়েন এমনিতেই ঐ দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে দিয়েছিল, এর ওপর আবার একাত্তরে চীনের অন্যতম মিত্র পাকিস্তানের একটি সংহতি যখন পাকিস্তানী কুচক্রী শাসকরা নিজেরাই বিপন্ন করে তুলেছে তখনও চীন পাকিস্তানের ঐ গণহত্যাকারী শাসকদেরই পক্ষাবলম্বন করেছে! একাত্তর পেরিয়ে গেছে সে আজ কত কত কাল! আটলান্টিক মহাসাগরের অবারিত জলরাশি এতদিনে কত লক্ষবার এপার থেকে ওপারে গড়িয়ে গেছে তার হিসাব কে রাখে? ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ সকল রাষ্ট্রেই কত পরিবর্তন, চড়াই-উতরাই, উত্থান-পতন ঘটে গেছে। একাত্তরে যেসব রাষ্ট্র আমাদের প্রতি বৈরী ছিল তাদের অনেকের সঙ্গেই আমাদের সখ্য ও সুসম্পর্কও স্থাপিত হয়েছে। আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে কোন কোন রাষ্ট্রের সঙ্গে খানিক মন কষাকষিও সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে দেশী-বিদেশী চক্র-চক্রান্তে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার কতই না প্রয়াস-প্রচেষ্টা চলেছে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের মধ্যে পুনরায় বৈরিতা সৃষ্টির চেষ্টা চলেছে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের প্ররোচণায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেছে। চীন মাও সেতুং, লিউ শাও চী, চৌ এন লাইকে সময়ের মেঘলোকে উধাও করে দিয়ে আবার পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার গোড়াপত্তন ঘটিয়েছে ‘সমাজতন্ত্রের’ নতুন মোড়কে। গ্লোবাল ভিলেজ আর বিশ্বায়নের নামে বিশ্বব্যাপী এক নতুন ও জটিল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। আর এরই প্রভাবে উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিতে দেশে দেশে চলছে নানামুখী তৎপরতা। এই উদ্যোগ-আয়োজন থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকবে কেন? বর্তমান সরকার আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ভূ-লুণ্ঠিত চেতনা ও মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের মানমর্যাদা ও আত্মসম্মান ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। আর তাতে করে দেশে সকল মানুষের মধ্যেই আত্মোন্নয়নের এক প্রেরণা দেখা দিয়েছে। যার প্রভাবে সকলেই নিজেকে সেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে চলেছে। তাই আজকের বিশ্ব অর্থনীতির কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও বাংলাদেশের পরিশ্রমী মানুষ শক্ত হাতে হাল ধরেছে, জোয়াল কাঁধে তুলে নিয়েছে এই স্বপ্নকে বুকে নিয়ে যে, বাংলাদেশ আর পিছিয়ে থাকবে না। এগিয়ে যাবে দৃপ্তপদভারে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “বাংলাদেশের এগিয়ে চলা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 2