রাবীন্দ্রিক চেতনাঃ তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই

দমকা হাওয়া বইতে শুরু করেছে, আকাশ ছাই রঙের মেঘে মেঘে ঢাকা পড়ে গেলো। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আকাশজুড়ে । একটু পরেই শুরু হলো ঝমঝম বৃষ্টি। প্রতিটি বাঙালির এইরকম সময়ে মনে গুঞ্জন শুরু করে এক বিশেষ কবির গান- তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (২৫ বৈশাখ, ১২৬৮- ২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)

অথবা আরেকটি দৃশ্য দেখি- শীতের শেষ হয়ে এসেছে, গাছে গাছে নতুন কচি পাতারা ঝিলমিল করছে- আহ্বান জানাচ্ছে ঋতুরাজ বসন্তকে। এমন সময়ও কিন্তু রবিঠাকুরের গান ছাড়া বাঙালির গতি নেই। প্রকৃতি এবঙ পৃথিবী নিয়ে তাঁর অগণিত রচনা রয়েছে। কিন্তু তা বলে রবীন্দ্রনাথকে শুধুই প্রকৃতির কবি বলে আখ্যা দেওয়া চলে না। কেননা এই কবির লেখনীতে প্রকৃতির পাশাপাশি পূজা এবঙ প্রেমও উঠে এসেছে ঠিক সমানভাবে। রবীন্দ্রগবেষকদের মতে, রবীন্দ্রনাথের রচনার ভাণ্ডার এতোটাই বিস্তৃত যে তাঁকে কোনও একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়ে চট করে ঠিক চিহ্নিত করা যায় না।

রাবীন্দ্রিক চেতনার ব্যাখ্যাও তাই অতো সহজে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে আলোচনার সুবিধার্থে মূল দুইটি বিষয়কে উল্লেখ করা যেতে পারে- সৃষ্টিকর্তা এবঙ পৃথিবী। এই দুটো বিষয়ে বলতে গিয়েই গীতবিতানের তিনটি পর্যায়ঃ পূজা, প্রেম এবঙ প্রকৃতির সৃষ্টি করেছেন রবীন্দ্রনাথ।

প্রথম জীবনের লেখায় বসুন্ধরার নানান ঐশ্বর্য নিয়ে লিখেছেন তিনি। এরই সাথে বিভিন্ন সময়ে মনের অবস্থাও ফুটে উঠেছে তাঁর রচিত গান, কবিতা, নাটক এবঙ প্রবন্ধে। বয়স যতোই বেড়েছে, কবির লেখা পরিণত হয়েছে ততোই। শেষজীবনে এসে আমরা রবীন্দ্রনাথের মাঝে এক পরিপূর্ণ বাউলকে খুঁজে পাই যিনি জীবনের আঁকাবাঁকা পথ হেঁটে চলেছেন শুধু এক ‘মনের মানুষের’ সন্ধান পাবার আশায়। এই মনের মানুষ বলতে আসলে কাকে বুঝিয়েছেন? উত্তর মেলে তাঁরই উক্তিতেঃ

এই যে কবি , যিনি আমার সমস্ত ভালোমন্দ , আমার সমস্ত অনুকূল ও প্রতিকূল উপকরণ লইয়া আমার জীবনকে রচনা করিয়া চলিয়াছেন , তাঁহাকেই আমার কাব্যে আমি ‘জীবনদেবতা’ নাম দিয়াছি । তিনি যে কেবল আমার এই ইহজীবনের সমস্ত খণ্ডতাকে ঐক্যদান করিয়া বিশ্বের সহিত তাহার সামঞ্জস্যস্থাপন করিতেছেন , আমি তাহা মনে করি না । আমি জানি , অনাদিকাল হইতে বিচিত্র বিস্মৃত অবস্থার মধ্য দিয়া তিনি আমাকে আমার এই বর্তমান প্রকাশের মধ্যে উপনীত করিয়াছেন — সেই বিশ্বের মধ্য দিয়া প্রবাহিত অস্তিত্বধারার বৃহৎ স্মৃতি তাঁহাকে অবলম্বন করিয়া আমার অগোচরে আমার মধ্যে রহিয়াছে । সেইজন্য এই জগতের তরুলতা-পশুপক্ষীর সঙ্গে এমন একটা পুরাতন ঐক্য অনুভব করিতে পারি , সেইজন্য এতবড়ো রহস্যময় প্রকাণ্ড জগৎকে অনাত্মীয় ও ভীষণ বলিয়া মনে হয় না।

অবশ্য এর পেছনে বাউল সম্রাট লালন সাঁই-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিলাইদহে থাকাকালীন সময়েই রবীন্দ্রনাথ বাউলিয়ানার দিকে ঝুঁকে পড়েন। জমিদারির প্রতি তাঁর মনোযোগও কমে আসতে দেখা যায় এই সময়। পদ্মার পাড়ে নিজের কাচারিবাড়িতে বসিয়ে অসংখ্য বাউলের মুখে তিনি গান শোনেন। ছেউড়িয়া থেকে শিলাইদহে আসবার জন্য লালন সাঁইকেও আমন্ত্রন জানান রবিন্দ্রনাথা। লালন সাঁই সে প্রস্তাব গ্রহনও করেন। কিন্তু শেষাবধি লালন সাঁই-এর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সরাসরি সাক্ষাৎ হয়েছিলো কিনা সে বিষয়ে কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। তবে লালনের রচিত গান যে কবিকে মোহাবিষ্ট করেছিলো সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এর একটি উল্লেখযোগ্য প্রমাণ হল আমাদের জাতীয় সঙ্গীতটি। শিলাইদহের এক স্থানীয় বাউল গগন হরকরার মুখে ‘আমি কোথায় পাবো তারে’ গানটি শুনেই রবীন্দ্রনাথ ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটির সুর করেন। এরকম ভাঙা গানের উদাহরণ আরও অসংখ্য দেওয়া যায়। বাউলিয়ানার ছোঁয়া লেগেছিল তাঁর প্রাত্যহিক জীবনেও। বাউলদের সংস্পর্শে আসার পরেই তিনি বাউলদের মতন আলখাল্লাজাতীয় পোশাক গায়ে চড়ান, দাড়িও লম্বা রাখতে শুরু করেন। শেষ বয়সের তোলা ছবিতে তাঁর চোখের দৃষ্টিতেও বাউলের প্রভাব লক্ষনীয়।

কী কবিতায়, কী গানে- রবীন্দ্রনাথ একটি কথাই বার বার বলার চেষ্টা করেছেন যে স্রষ্টাকে তিনি পৃথিবীর ভিতরেই খুঁজে পেয়েছেন। তাঁর এই ‘জীবনদেবতা’কে তিনি কখনো খুঁজে পেয়েছেন প্রকৃতিতে, কখনো বা চারপাশের মানুষের মাঝেই। মানুষ ঈশ্বরের যত আরাধনাই করুক না কেন, পৃথিবীতে থাকা মানুষের সেবা না করলে, মানুষকে ভালো না বাসলে কোনোদিনই ঈশ্বরের মন জয় করা সম্ভব নয়- এ কথা রবীন্দ্রনাথের লেখায় বারেবারে এসেছে। মানুষকে ভালোবাসাই মুক্তির সাধনা বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

আমরা যেমনই মনে করি, আমাদের ভাই, আমাদের প্রিয়, আমাদের পুত্র, আমাদিগকে একটি জায়গায় বাঁধিয়া রাখে নাই; যে জিনিসটাকে সন্ধান করিতেছি, দীপালোক কেবলমাত্র সেই জিনিসটাকে প্রকাশ করে তাহা নহে, সমস্ত ঘরকে আলোকিত করে— প্রেম প্রেমের বিষয়কে অতিক্রম করিয়াও ব্যাপ্ত হয় । জগতের সৌন্দর্যের মধ্য দিয়া, প্রিয়জনের মাধুর্যের মধ্য দিয়া ভগবানই আমাদিগকে টানিতেছেন — আর-কাহারো টানিবার ক্ষমতাই নাই । পৃথিবীর প্রেমের মধ্য দিয়াই সেই ভূমানন্দের পরিচয় পাওয়া, জগতের এই রূপের মধ্যেই সেই অপরূপকে সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ করা, ইহাকেই তো আমি মুক্তির সাধনা বলি ।

পৃথিবীর প্রতিটি বস্তুকণা ও তাদের সৃষ্টিকর্তাকে তিনি একই সূত্রে গেঁথেছেন। একটি ব্যক্তিগত চিঠিতে এই বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ লেখেনঃ

জীবনের সমস্ত সুখদুঃখকে যখন বিচ্ছিন্ন ক্ষণিকভাবে অনুভব করি তখন আমদের ভিতরকার এই অনন্ত সৃজনরহস্য ঠিক বুঝতে পারি নে— প্রত্যেক কথাটা বানান করে পড়তে হলে যেমন সমস্ত পদটার অর্থ এবং ভাবের ঐক্য বোঝা যায় না ; কিন্তু নিজের ভিতরকা
র এই সৃজনশক্তির অখণ্ড ঐক্যসূত্র যখন একবার অনুভব করা যায় তখন এই সৃজ্যমান অনন্ত বিশ্বচরাচরের সঙ্গে নিজের যোগ উপলব্ধি করি; বুঝতে পারি, যেমন গ্রহনক্ষত্র-চন্দ্রসূর্য জ্বলতে জ্বলতে ঘুরতে ঘুরতে চিরকাল ধরে তৈরি হয়ে উঠেছে, আমার ভিতরেও তেমনি অনাদিকাল ধরে একটা সৃজন চলছে; আমার সুখ-দুঃখ বাসনা-বেদনা তার মধ্যে আপনার আপনার স্থান গ্রহণ করছে ।

রবীন্দ্রনাথের চেতনাকে আমরা আরও এক বিশেষ দৃষ্টিকোণে দেখতে পাই। সেটি হল আশাবাদিতা। তিনি বহুবার নিজের ভেতরে একরকমের শক্তির কথা উল্লেখ করেছেন- আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে মানুষকে এগিয়ে যেতে বলেছেন। বিশেষ করে তাঁর গানের বাণীতে- তা সে যে পর্যায়েরই হোক না কেন, জীবনের অন্তস্থঃ শক্তির ওপর ভর করতে বলেছেন। এ কারণেই হয়তো যারা ব্যক্তিজীবনে রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চা করেন, হতাশা তাঁদেরকে তেমন একটা গ্রাস করতে পারে না। বলা যায়, এক অবিনশ্বর মহৌষধ হল রবীন্দ্রনাথের গান- যে গান সুখে, দুখে, প্রেমে, বিচ্ছেদে, ক্লান্তিতে, সফলতায়- জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের প্রেরণা যোগায়। তাঁর একটি গানের দুটি চরণ দিয়েই তাঁর সমগ্র আশাবাদী চেতনাকে ফুটিয়ে তোলা যায়ঃ

তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই-
কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই।

এমনিভাবে জীবনের বন্ধুর চলার পথে প্রতিনিয়ত সাহস দেবার জন্য এক অফুরন্ত ভাণ্ডার রেখে গেছেন তিনি। বাঙালির প্রাণের কবি বলে যদি কাউকে পরিচয় দিতে হয়- তবে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আজ ২৫ বৈশাখ, ১৪২০ বঙ্গাব্দ। ১৫২তম জন্মবার্ষিকীতে প্রাণের এই কবিকে জানাই সশ্রদ্ধ প্রণাম।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “রাবীন্দ্রিক চেতনাঃ তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই

  1. রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে শুনতে
    রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। রক্তে মিশে গেছে। জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাতে রবীন্দ্রনাথ একটা বড় আশ্রয়। জন্ম জয়ন্তীতে কবিগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা। আর এতো চমৎকার পোস্টের জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

    1. কমেন্ট পড়ে মন ভালো হয়ে গেলো।
      কমেন্ট পড়ে মন ভালো হয়ে গেলো। আর

      জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাতে রবীন্দ্রনাথ একটা বড় আশ্রয়। – See more at: http://www.istishon.com/node/1706#new

      -এতো একেবারে আমার কথাটাই বলে দিলেন! আমি প্রতিদিন একবার করে এই কথাটা বলি। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আর শুভকামনা। 🙂
      _____________________________________________________________

    2. আচ্ছা, আমাকে কি একটা ব্যাপারে
      আচ্ছা, আমাকে কি একটা ব্যাপারে হেল্প করতে পারেন? এই পোস্টে অনেকগুলো ছবি জুড়তে চেয়েছিলাম, কিন্তু ছবির লিঙ্ক আমি ঢুকাতে পারছিনা। কী করে লিঙ্ক আনবো, জানাতে পারেন? :চিন্তায়আছি:
      ——————————————-

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

32 − = 27