বুদ্ধ, বিজ্ঞান ও বর্তমান


দৃশ্য ও দৃষ্টিভঙ্গির সংজ্ঞা জগত জুড়ে নানা রূপে পাওয়া যায়। এটি আবার ব্যক্তির মনোজগতের স্বাধীনতাও বটে। প্রকৃত অর্থে নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী একজন ব্যক্তি যে স্বচ্ছতায় তার দর্শনকে বর্ণনা করে মূলত ঐ ব্যক্তিকেই বলা যেতে পারে প্রজ্ঞাবান। এই মহা সৃষ্টিজগতের সমগ্র সৃষ্টি তথা জীবজগতের কার্যকারণ একজন প্রজ্ঞাবানের বক্তব্যে উৎকৃষ্ট স্বচ্ছ ও ন্যায্য। তাই বলা হয় পরিচ্ছন্নতার আরেক নাম আধুনিকতা। পৃথিবীর বুকে এ পর্যন্ত যতজন ব্যক্তির ঐতিহাসিক উপস্থিতি দেখা যায়, তাদের জীবন গবেষণা করলে দেখা যাবে তাদের মধ্যে ৯০ ভাগ ব্যক্তিই শুধুমাত্র দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতায় বস্তু এবং প্রাণীজগতের যে বাস্তব প্রবাহকে প্রমাণিত রূপ দিয়েছেন তারাই উল্লেখযোগ্যদের স্থান দখল করে আছেন। তাদের মধ্যে “বুদ্ধ” অন্যতম ও অনস্বীকার্য একজন ব্যক্তিত্ব বলতে হয়।

ইতিহাস বলছে – সিদ্ধার্থের আবাসস্থল ও বেড়ে ওঠা কপিলাবস্তুতে। এবং এই জম্বুদ্বীপেই সিদ্ধার্থের বুদ্ধত্ব লাভ এবং এখানেই বুদ্ধের ধর্মপ্রচারের বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন আর্য্য ক্ষত্রিয় বংশপরম্পরা। সুতরাং আর্য্য হিসেবে তিনি বেদ জানতেন এবং তার পূর্বের উপনিষৎগুলোও তিনি জানতেন। সেদিক থেকে ধরতে গেলে এটিও পরিষ্কার যে তিনি সাংখ্যদর্শনও জানতেন। তবুও তার অতৃপ্তির কারন – এইসবের মাঝে তিনি মানুষের চিরন্তন দুঃখ থেকে মুক্তির কোন সঠিক পথ খুঁজে পেলেন না। বুদ্ধের আবির্ভাবের পূর্বেই ভারতবর্ষে বহুবিধ ধর্মদর্শনের উদয় হয়েছিলো। প্রথমদিকে ছিলো যাগ-যজ্ঞ। যাগ-যজ্ঞ করে দেবতাদের মনতুষ্টি ইত্যাদি ধারনা ছিলো তৎকালীন ভারতবর্ষের মানুষের ধর্মিয় সন্তুষ্টি। সনাতনী ধ্যান-ধারনা, পাপ-পূণ্য, স্বর্গ-নরক ইত্যাদি বহু আলৌকিক ধর্মিয় দর্শন প্রচলিত ছিলো সমগ্র ভারতবর্ষে বুদ্ধের আবির্ভাবের পূর্ব হতেই। ইত্যাদি অদৃশ্যের আরাধনা, যাগ-যজ্ঞ ও অলৌকিক সাধন দ্বারা মানুষের চিরন্তন যে দুঃখ প্রবাহ, তা থেকে মানুষের মুক্তি ও পরম সুখের (যাকে বলে নির্বাণ) পথ তিনি কোথাও দেখছেন না বলেই উনত্রিশ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করেন।

বুদ্ধদর্শনে “আত্মা” এবং “মোক্ষ লাভ” বলতে কোন কিছুই নেই। এই দুই প্রচলিত ধারণাকে অস্বীকার করেই বুদ্ধ উচ্চারণ করেছেন – “জগতের সকল কিছুই অনিত্য”। সকল সৃষ্টির ধ্বংস হবেই। এমনকি আজ যাহা বিচিত্র, কাল তাহা শুণ্য হবেই। জগতে অমর বলতে কেউ নেই, কোন কিছুই অক্ষয় রবে না। তাই বলেছেন এই সত্যকে জেনেই মানুষের উচিৎ অপ্রমত্তের সহিত আপন কর্ম সম্পাদন করা। প্রমাদগ্রস্থ ব্যক্তি বিচলিত হন এবং নিজের ও অপরের প্রভূত ক্ষতিসাধনের কারনও হন। নিত্যনৈমিত্তিক কাজে ধ্যানী হওয়াকেই বুদ্ধ মূলত অপ্রমত্ত হওয়ার দেশনা দিয়েছেন। পালিতে ধ্যান শব্দের অনুবাদ করলে পাওয়া যায় “মনোযোগ”। সর্বদা মনোযোগী হয়ে আপন কর্ম সম্পাদন করে যাওয়ার মধ্য দিয়েই লোভ,দ্বেষ, মোহ হতে উত্তির্ন হয়ে একটি নির্মোহ অবস্থানে পৌঁছে যাওয়ার নামই “নির্বাণ”। তাহলে আমাদের বুঝতে হবে কোথাও দিনরাত্র চোখবুজে বসে থাকার নাম ধ্যান নয়, এভাবে নির্বাণ লাভও অসম্ভব। তবে বর্তমানে আমরা ধ্যানের যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেখতে পাচ্ছি তা প্রকৃত ধ্যানের ব্যবহার হতে বহু দূরে সরে এসেছে। কারণ এর সাথে জড়িত রয়েছে ভাববাদ ও পূঁজিবাদের এক অন্তর্নিহিত সম্পর্ক, যাকে ব্যবহার করেই আজকাল খুব সহজেই অর্হৎ হওয়ার সামাজিক প্রথা রয়েছে। নির্বাণ হলো ব্যক্তির মনোজগতের সর্বোউৎকৃষ্ট অবস্থান, যেখানে অসিন একজন ব্যক্তি সাদাকে সাদা, কালোকে কালো দেখার মতো স্বচ্ছতা অর্জন করে, যাকে বলে ন্যায্যতা। তারা শুধুমাত্র দেখা নয়, যা দেখছে তার নির্যাশ মানুষের উপকারে ব্যবহারের জন্যও রেখে যান। নির্বাণ কোন মৃত্যু পরবর্তি অবস্থান নয়, এটি অর্জনে পারমীর জোর লাগে না, লাগে না অতীত জন্মের কুশল কর্মের প্রভাব। শুধু প্রয়োজন ব্যক্তির সৎ আত্মপ্রচেষ্টা। তাই বুদ্ধ বলেছেন “আত্মদ্বীপ ভব”। অর্থাৎ, আপনাকে দ্বীপ করে জ্বালো। নিজেকে আলোকিত করার মধ্য দিয়েই মানুষের প্রকৃত উৎকর্ষতা। এর মূলে রয়েছে –
১. সংষ্কার বদ্ধতা থেকে মুক্ত হওয়া।
২. শ্রুত ও পূর্ব কথিত বলে বিশ্বাসে আঁকড়ে না রাখা।
৩. পুরাতনকে ছেড়ে নতুনকে গ্রহণ করার মতো মানষিক সুস্থতা।
৪. আর গ্রহন-বর্জন উভয়ের পূর্বেই নিজের কাছে গ্রহনযোগ্যতার অবকাশ রাখা।
৫. মোহাচ্ছন্ন অন্ধতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা।

বাস্তববাদী বুদ্ধের ছিলো না কোন আত্মার প্রতি বিশ্বাস। আত্মা রূপান্তর হয় ও মৃত্যুর পর জন্মান্তরের একটি চক্র রয়েছে, যা পাপ-পূণ্যের ভয় ও লোভে মানুষের নিরন্তর অনিশ্চিত যাত্রা চলে, যেখানে মুক্তির পথ নেই, নেই দুঃখের পরিসমাপ্তির হদিস। তাই বুদ্ধ তার ব্যক্তি প্রচেষ্টায় আবিষ্কার করেন মুক্তির উপায়। সে আবিষ্কারগুলোকেই মানুষের জন্য দিয়ে গেছেন এবং সারাটি জীবন উৎসর্গ করে গেছেন। সেগুলো –
১. আর্য্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ
২. চারি আর্য্য সত্য ও
৩. প্রতীত্য-সমুৎপাদ।
আর বুদ্ধের এই মূল শিক্ষাগুলো গবেষণা পর্যালোচনা করলে যা পাওয়া যায়, তাতে কোন প্রকার পরকাল, পাপ-পূণ্য, স্বর্গ-নরক কিছুই নেই। যা আছে তা হলো এই ইহকালেই মুক্তির কথা, সকল প্রকার কুসংস্কার ও অন্ধত্ব থেকে মুক্তির কথা। কুসংস্কার ও অন্ধত্বে যে জীবন অতিবাহিত হয় বুদ্ধ তাকেই বলেছেন “নরক” জীবন। এসব থেকে মুক্ত যে জীবন তাকেই বলেছেন স্বর্গীয় জীবন। মৃত্যুর পরের স্বর্গ-নরক প্রথাগুলোকে তিনি এড়িয়ে যান, এবং আলোচনাই রাখেন নি কোথাও। তাহলে এ থেকে আমরা কি শিক্ষা পাই?
পাপ কি, পূণ্য কি? যে সমস্ত কর্ম অসুন্দর(বেরমণীয়) বুদ্ধ তা থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিয়েছেন, আর সুন্দর(রমণীয়) কর্ম সম্পাদন করতে বলেছেন, কোথাও পাপ-পূণ্যের কথা বলেন নাই। যাহা সৃষ্টির সকল প্রাণীর জন্য হিতকর বুদ্ধ তাহাই করার শিক্ষা দিয়েছেন এবং পাপ-পূণ্য শব্দগুলোকে অত্যন্ত সচেতনে তিনি এড়িয়ে গেছেন, কারন এগুলো বুদ্ধের বহুকাল পূর্ব থেকেই ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিলো। একমাত্র তিনিই বলেছিলেন – “সব্বে সত্তা সুখিতা হোন্তু”।

বর্তমান বিশ্ব মানুষকে প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত করে। একে লৈঙ্গিক পার্থক্যও বলা চলে – নারী এবং পুরুষ। তবে বুদ্ধ বিভাজন করেন নাই। তিনি সমগ্র মানবজাতীকে পঞ্চস্কন্ধ বলেই অভিহিত করেছেন। এই পঞ্চস্কন্ধ হলো সকল প্রাণীর জন্যই অমুলদ সংজ্ঞা। যাকে বলে ধ্রুব সত্য। তাহলে এই পঞ্চস্কন্ধ কি? পঞ্চস্কন্ধ হলো-
১. রূপঃ মানবদেহের যে বাহ্যিক সাধারণ অবকাঠামো আমরা দেখতে পাই তাকেই রূপ বলেছেন।
২. বেদনাঃ মানব দেহ তথা হৃদয় পর্যন্ত যাহা কিছুই অনুভূত হয় তাকেই বলা হয় বেদনা।
৩. সংজ্ঞাঃ কোন কিছুর পরিচিতি বা সনাক্তকরণ প্রক্রিয়াকেই বলা হয় সংজ্ঞা।
৪. সংষ্কারঃ আমরা যাহা কিছুতে অভ্যস্ত তাকেই বলা হয় সংষ্কার।
৫. বিজ্ঞানঃ এটি মানুষের চেতনা।
(পরিভাষাগত শব্দের ভাব পরিষ্কার না হলে ভাবার্থ বোঝা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়)

মানবের সংজ্ঞা বুদ্ধ দিয়েছন “পঞ্চস্কন্ধ” এটি পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য সমান সত্য যেমন নারী, পুরুষ, উভয়লিঙ্গ। এই পঞ্চস্কন্ধের সমষ্টিই মানব। আর ভেবে দেখুন এই পঞ্চস্কন্ধ প্রতিমুহূর্তেই পরিবর্তনশীল। এখানে তার নিজের বলতে কিছুই নেই। মৃত্যুর সাথে সাথেই পঞ্চস্কন্ধ বিলিন হয়ে যায়। এখানে আর কোন কিছুই নেই শুধু একটি জড় দেহ, তাহলে যেখানে আর কিছুই নেই সেখান থেকে পরের জন্ম বা জন্মান্তর হয় কিভাবে? সবই তো শুণ্য হয়ে গেল, শুণ্য হতে কি কোন কিছুই নব সৃষ্টি সম্ভব? না, শুণ্য মানে শুণ্যই। বৌদ্ধধর্মে জন্মান্তরবাদ নেই, নেই আত্মার সৃষ্টা ঈশ্বরের অস্তিত্ব, যেখানে আত্মাই নেই সেখানে ঈশ্বরের প্রশ্নই আসে না। নেই পাপ-পূণ্যের তাড়না, যেখানে পাপ-পূণ্যের তাড়না নেই, সেখানে স্বর্গ-নরকের প্রশ্নও আসে না। তাই বুদ্ধ বলেছেন- জগতের সকল কিছুই অনিত্য। অনিত্যতাই অনাত্ববাদ বা আত্মায় অস্বীকার।

জন্মান্তরবাদ বহু আগে থেকেই ভারতীয় দর্শনে চর্চা হয়ে আসছে। জন্ম ব্যতিত কর্ম সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব। যদি কর্মই হয় মানবের জন্মের কারণ, যখন জন্মই হয় নি, তখন কোন কর্মের ফলে তার প্রথম জন্মটি হলো? এর ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারছে না আদৌ। যেহেতু কর্ম সম্পাদনের প্রথম শর্ত তাকে জন্ম নিতে হবে, আর জন্ম না নেওয়া পর্যন্ত তার দ্বারা কোন কর্মই সম্পাদন সম্ভব না। যখন কোন কর্মই সম্পাদন হলো না, কর্মের ফল আশা করা তো অলিক বস্তু। এমন বহু যুক্তিহীন প্রথায় ভরপুর বর্তমান বৌদ্ধধর্ম। বুদ্ধই একমাত্র বলেছেন –
“অত্তাহি অত্তনা নাথো, কো হি নাথো পরো সিয়া?
অত্তনা’ব সুদন্তেন নাথং লভতি দুল্লভং।
অর্থাৎ, আপনি নিজেই নিজের নাথ(আশ্রয়), এছাড়া আর কোন আশ্রয় দাতা আছে? নিজেকে সুসংযত করতে পারলেই দুর্লভ আশ্রয়(নাথ) লাভ হয়। আপনি ছাড়া আর কেউ নেই আপনাকে মুক্তির স্বাদ দিতে পারে, আত্মপ্রচেষ্টায় নিজেকেই নিজের মুক্তির পথের সন্ধান বের করে নিতে হবে। বুদ্ধ যে মহৎ কাজগুলো করে গেছেন মানবের মুক্তির জন্য তা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।

অনেকের মুখে শুনেছি বিহারে গিয়ে মন্ত্র শুনলে নাকি উপকার হয়। এসব তন্ত্র-মন্ত্র এগুলো জৈন ও সনাতনী প্রথা, যা এখনো আমাদের মূর্খতা আঁকড়ে বয়ে বেড়াচ্ছে। বুদ্ধের উপদেশগুলোকে পালিতে বললে মন্ত্র হয় না। যে পাঠ করলেই পূণ্যার্জন হবে, দেবতা আমন্ত্রণ বা দেবতা তাড়ানো যাবে। বুদ্ধের শিক্ষায় তন্ত্র-মন্ত্র বলতে কিছু ছিলো না, যা ছিলো সব উপদেশ সর্ব মানবের হিত কামনায়। আপনারা সে উপদেশ বাণীগুলো বাংলায় পড়ে দেখেছেন ওখানে কি বলা হয়েছে? সবইতো নীতি বাক্য। নীতি বাক্য যব করলে ধর্ম হয় না, তার আচরন অপরিহার্য।
যেমন মহামঙ্গল সূত্রে বলা হয়েছে…….
“বহু সচ্চঞ্চ সিপ্পঞ্চ বিনযো চ সুসিক্খিতো
সুভাসিতা চ যা বাচা এতং মঙ্গল মুত্তমং।”
অর্থাৎ-
বহু শাস্ত্রে জ্ঞান লাভ করা, বহু শিল্প শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া, বিনয়ী ও সুশিক্ষিত হওয়া, সুভাষিত বাক্য প্রয়োগ করা উত্তম মঙ্গল।
এখানে বলা হয়েছে শাস্ত্র বিদ্যায় সুশিক্ষিত হওয়া উত্তম মঙ্গল। সেটা আপনাদের কাছে হয়েছে মন্ত্র। যদি তাই হতো বুদ্ধের উদ্দেশ্য, তাহলে এ যাবত বুদ্ধের উপদেশ, বানী, মন্ত্র তো কম পাঠ হয় নি, এতোদিনে তো সমাজ তথা রাষ্ট্রের সকল দুঃখ ও সমস্যা বহু আগেই নির্মূল হয়ে যাওয়ার কথা। বুদ্ধ বলেছেন ব্যক্তির নিজের কায়, মন ও বাক্যে পরিচ্ছন্ন হওয়ার কথা, আর তাহাই যদি হয় মন্ত্র, শুধু পাঠ করেই পূণ্যার্জন স্বর্গের লোভে তাহলে বুদ্ধের উপদেশ ও তার প্রয়োগ আপনাদের কাছে বৃথা। এজন্য আর্য্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের প্রথম ধাপে তিনি বলেছেন সম্যক দৃষ্টির কথা।

কালামগণ একদিন বুদ্ধকে বললেন- ভদন্ত, আমাদের এখানে যেসব সাধুসন্ন্যাসী ও শাস্ত্রবিদগণ আসেন, তারা সবাই নিজেদের মতবাদকে বড় করে দেখান, ফলাও করে বলেন, সমালোচনায় উড়িয়ে দেন, তাতে শুধু আমরা বিভ্রান্ত হই, কার কথা সত্য- মিথ্যা বা কার কথা গ্রহণীয়- বর্জনীয় আমরা বুঝতে পারি না। তখন বুদ্ধ বললেন –
হে কালামগণ- শোনা কথায় বিশ্বাস করিও না। বংশপরম্পরায় প্রচলিত বলে বিশ্বাস করিও না। সর্বসাধারণে বলছে বলে বিশ্বাস করিও না। ধর্মগ্রন্থে লিখিত আছে বলে বিশ্বাস করিও না। গুরুজন বা বয়োজ্যেষ্ঠরা বলছে বলে বিশ্বাস করিও না। কারো ব্যক্তিত্বের প্রভাবে অভিভূত হয়ে বিশ্বাস করিও না। তর্কের চাতুর্য্যে বিশ্বাস করিও না। নিজের মতের সাথে মিল আছে বিশ্বাস করিও না। দেখতে সত্য বলে মনে হয়- একারণেও বিশ্বাস করিও না।
হে কালামগণ- নিজের বিচার বুদ্ধি, বিচক্ষণতা প্রয়োগ করে যদি দেখতে পাও এগুলো যুক্তির সাথে মিলে এবং নিজের ও সকলের জন্য মঙ্গলজনক ও কল্যাণকর, তাহলে সেটা গ্রহণ করবে এবং সেই অনুযায়ী জীবন যাপন করবে।
বুদ্ধের এই কথোপকথন “কালামসূত্র” হিসেবে লিখিত আছে পালিতে, যাকে বাংলায় অনুবাদ করলে এটিই পাওয়া যায়। এখানে বুদ্ধের মহত্বের ও যুক্তিবাদের যে চিরন্তন সত্য নিদর্শন আমরা পাই, তাতে বোঝা যায় সত্যিই বুদ্ধ একজন আধুনিক মানুষদের মধ্যে অন্যতম ব্যক্তিত্ব, এতে কোন সন্দেহ নেই। এবং এই কালামসূত্র জানা ও চর্চারত একজন ব্যক্তি প্রজ্ঞাবান হলে তার দ্বারা সমগ্র মানব সমাজের উপকার বৈ অপকার হবে না।

আমরা জানি যৌনতা একটি স্বাভাবিক ক্রিয়া। সমগ্র জীবকুলেই যৌনতার স্বাভাবিক ক্রিয়া রয়েছে। একটি নিষ্পাপ ফুলের পরাগায়ন তথা পশু-পাখি ও মনুষ্যকুল পর্যন্ত যৌনতার নির্মল ক্রিয়া বাস্তব। শুধুমাত্র শিল্পীই যৌনতার শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ দেখাতে পারে, আর এই যৌনতার বাড়াবাড়িকে বলা যায় কাম। যেখানে থেকে একমাত্র মানবকুলেই যথেষ্ট যৌনতা বিকৃতি দেখা যায়, আর কোন প্রাণীতে দেখা যায় না। এখান হতেই সৃষ্টি হয় এক কামুক প্রবৃত্তি এবং কামকে সর্বেসর্বা করে চিন্তার ও ব্যবহারিক জীবনের নানা স্থুলন ও অস্বাভাবিক আচরণ আমরা দেখি। লালন সংষ্কৃতি যৌনতার যে শৈল্পিক মাত্রায় মানবের কামকে নিঃষ্কামের দিকে প্রবাহিত করার বা সুস্থতার দিকনির্দেশনা দেয় তা এই মানব সমাজের মাঝে একটি দৃষ্টান্ত উপদেশ বটে। কামের একনায়কতন্ত্র প্রভাব বিস্তারে পুরুষতন্ত্র ও ব্রাহ্মণ্যবাদের সুত্রপাত। যেখানে মানুষ হয়ে ওঠে কোন এক লিঙ্গের প্রতিনিধি এবং তাদের দ্বারা অবদমিত হয় বিপরীত লিঙ্গের দুর্বল গোষ্ঠি। তাদের ওপর আরোপ করা হয় প্রবল পুরুষতন্ত্রের স্বেচ্ছাচারী নানা বাহানায় হাজার অযৌক্তিক বিধিনিষেধ। আমাদের আজকের এই সভ্যতার গোড়ার দিকে তাকালে দেখা যায় সে সমাজটি ছিলো মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। যেখানে মায়ের চোখ দিয়ে লালন হতো পরিবার ও সমাজ। মা যেমন তার সন্তানকে পুত্র কিংবা কণ্যা নির্বিশেষে গভীর ভালোবাসায় আগলে রাখে, ঠিক একইভাবে সে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ মায়ের কোমল হৃদয় দিয়ে সন্তানের মতো লালন-পালন হয়ে এসেছে। যার ধারা এখনো পাহাড়ি উপজাতিদের মধ্যে প্রবাহমান, কিন্তু আমাদের সমাজ থেকে তা বহু আগেই উৎখাত হয়ে যায়। পুরুষের পেশিবলে নারীরা পেরে না ওঠার দুর্বলতাকে ব্যবহার করছে এই হীনমন্য পুরুষতন্ত্রের শাসকগোষ্ঠী। যুগ যুগ ধরে অবদমন ও নিষ্পেষিত হয়ে আসছে নারীরা এই বাংলায়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের দিকে তাকালে এই বর্বর চিত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন এ বৈশ্বিক আধুনিক সভ্যতায়। এ পুরুষতন্ত্রের বর্বরতা বুদ্ধকেও মুক্তি দিচ্ছে না আজো অব্ধি। তারা বুদ্ধের চরিত্রেও নারী বিদ্বেষী নানান প্রথা ও উপকথার ছাপ বসাতেও দ্বিধা বোধ করে নি। ইতিহাসে পাওয়া যায় বুদ্ধ একজন বারবনিতা আম্রপালিকে তার অনুগ্রহে বুদ্ধের মৈত্রী শিক্ষায় সিক্ত করেছেন এবং তিনিও একসময় অর্হত্বফল লাভ করে বৌদ্ধ ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের স্বাক্ষর রাখেন। সিদ্ধার্থ ছোট থেকেই দেখেন নারীদের সামাজিক অধিকার হতে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। একটি গৃহপালিত পশুর যে জীবন, একজন নারীরও সে একই পরিণতি। এই দুর্দশা দেখেই তিনি সে সমাজে বড় হয়ে ওঠেন। তাই তিনি মানবিক মর্মের গভীরতা থেকে অনুভব করেন নারী মুক্তির অপরিহার্যতা। এবং তাই তিনি যখন যেখানে যেভাবে পেরেছেন নারীদের এই অসভ্য শৃঙ্খল ভাঙ্গার স্পৃহা যুগিয়েছেন। নারী মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। তবে বর্তমানে যে পুরুষতন্ত্রের দালালদের দেখছি, বুদ্ধের সময়েও তাদের উপস্থিতি কম ছিলো না। এমন প্রতিকূল সমাজে বুদ্ধকে কতনা কণ্টকপূর্ণ পথে এগিয়ে যেতে হয়েছে তার করুন চিত্র এখনো চিন্তাজগতের মানুষদের ভাবায়।
বুদ্ধের ও আনন্দের কথোপকথন থেকে এটি একদম পরিষ্কার হয় যে বুদ্ধ নারীদের শ্রামণ্য দিক্ষা নিতে ও ভিক্ষুত্ব গ্রহনে যে স্বতঃস্ফূর্ত স্বাগতম তার জুড়ি নেই। এবং বুদ্ধ নিজেই স্পষ্ট করেন যে – নারী এবং পুরুষ উভয়েরই সাধনা দ্বারা বুদ্ধত্ব লাভ করা সম্ভব। কারন প্রতিটি মানুষই বুদ্ধাঙ্কুর। এটিই ইতিহাসের সাক্ষ্য দেয় মানুষের চিন্তার চরম মুক্তির উক্তি, এতটুকু স্বাধীনতা আর কেউ কোথাও দেখিয়েছেন বলে জানা নেই। তাই নারীদের এগিয়ে যেতে হবে সুদৃঢ় মনোবল নিয়ে।
শতবাধাকে তুচ্ছজ্ঞান করে এই পুরুষতন্ত্রের প্রতি করুণা করা মা, মাতৃহৃদয়ে পরিসেবার নির্মল ধারাপাতের যে গুরুদায়িত্ব নিয়েছেন তা শ্রদ্ধেয় ভিক্ষুণী সঙ্ঘের মমতা না বুঝলে বোঝাই যায় না। সেই বুদ্ধের করুণা, সেই মানব প্রীতির ধারা আবার নবজন্ম পেলো এই বাংলায়।
সহস্র বন্দনা।

আরজ আলী মাতুব্বর বলেছেন- “বিদ্যাশিক্ষার ডিগ্রী আছে, কিন্তু জ্ঞানের কোনো ডিগ্রী নেই। জ্ঞান ডিগ্রীবিহীন ও সীমাহীন।” বিশ্বজোড়া পাঠশালায় শিক্ষার কোন অন্ত নেই। তাই আমি মনে করি- সম্যক শিক্ষা লাভ করতে হলে বুদ্ধের শিক্ষার যতদিন সঠিক প্রয়োগ হবে না ততদিন মানব সভ্যতার উন্নতি হবে না। অবকাঠামোগত উন্নতিকে সভ্যতা বলা যায় না। একজন দালাই লামা হয়তো পৃথিবীতে বার বার জন্ম গ্রহন করবে না। কিন্তু তার যে কাজের বিস্তৃতি এই পর্যন্ত, তার সীমায় পৌঁছনো কোটি ডিগ্রীপ্রাপ্তদের কাছে অকল্পনীয়। তিনি বলেন- হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, মুসলমান হয়ে কি হবে, যদি না একজন প্রকৃত মানুষ না হওয়া যায়। সারা পৃথিবীর বড় বড় প্রভাবশালী আজ ওনার কাছে নত, শুধুমাত্র তার মানবীয় শিক্ষার কাছে কৃতজ্ঞতা রেখেই। মানুষ মানুষের জন্যই, এ পৃথিবী মানুষের। কোন সাম্প্রদায়িক বিভক্তির কষাঘাতের শিকার হওয়া একজন প্রজ্ঞাবানের জন্য চুড়ান্ত অবক্ষয়ের। এতে শুধু সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়াই নয়, জন্ম হচ্ছে মানুষে মানুষে যুদ্ধ ও ধ্বংসের হিংসাত্তক মনোভাব, যা দৈনন্দিন পিছিয়ে দিচ্ছে হাজার হাজার মাইল পেছনে একটি উন্নত পৃথিবীর দ্বার প্রান্ত হতে। একেই বলা হচ্ছে অবনতি।

কার্ল মার্ক্স যে পুঁজিবাদের ব্যাখ্যা করেছেন তাতে দেখা যায় রাষ্ট্র এবং ধর্মের যে রক্ষণশীল ব্যবহারিক চরিত্র, তার ভেতরে রয়েছে মানুষকে দাস বানিয়ে রেখে প্রভাবশালীদের উন্নতির এক নীলনকশা। যা মানুষকে অন্ধ করে রেখেছে ধর্মিয় অন্ধবিশ্বাস ও মানষিক দাসত্বের দ্বারা। মানুষের মনোজগতে প্রত্যেকটি ধর্মের ধারণা বংশপরম্পরায় ছোট থেকে প্রতিটি পরিবার তাদের মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই তা ঢুকিয়ে দেয় এবং ক্রমান্বয়ে শিশু থেকে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে তারা শিখে নেয় ধর্ম অনেকগুলো অবধারিত মৌলিক নীতিমালার সমষ্টি যা অবশ্যই তাদের ব্যক্তি জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এই অন্ধত্ব তাদের মানষিকভাবে বিকলাঙ্গ করে ও স্বাভাবিক ভাবেই অভ্যস্ত করে দাসত্বে। যেখানে থাকে না তার ব্যক্তিস্বাধীনতা। শিখিয়ে দেওয়া বুলি মুখস্ত করেই আজীবন পার করে দেয় স্বর্গের লোভে। নেই কোন আগ্রহ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ও গ্রহন-বর্জনের প্রয়োজনীয়তা। এই দাসত্বের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠতে উঠতে তারা যে পারিবারিক ধর্মিয় শিক্ষা কাঁধে বয়ে নিয়ে আসে, একটি সময় দেখা যায় সেখান থেকে বেড়িয়ে আসার মতো মানষিক দৃঢ়তা বা মানষিক সুস্থতা তারা হারিয়ে ফেলে এবং এক একজন হয়ে ওঠে যার যার সম্প্রদায়ের মুখপাত্র এবং অবচেতনেই লালন করে ধর্মিয় মৌলবাদের। ঠিক তখনই মনে জন্ম নেয় অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি হিংসা ও প্রতিপক্ষ ভাবার মতো প্রবণতা। সেখান থেকেই সৃষ্টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হানাহানি, হত্যা ও একের পর এক ধ্বংস। শুরু হয় সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রবল ভয়াল আক্রমণ সংখ্যালঘুর উপর। নিপিড়িত হতে থাকে কোটি অসহায় ও সাধারণ সাদা সিধে মানুষ। এর সাথে রয়েছে রাষ্ট্রীয় পূঁজিবাদের সম্পর্ক। ধর্ম হতে আসে কোটি কোটি ফায়দা, কারন মানুষ খেয়ে হোক বা না খেয়ে দান দিতে সে বাধ্য। ধর্মের নামে কোন কঠিন সত্য শুনতে সে নারাজ। দানের পর দান আর অর্থের প্রাচুর্য সচল রাখছে দুর্নিতির চাকা। মানুষকে ঠকিয়ে একটি পয়সা গ্রহন করা দুর্নিতি, মিথ্যা বলে একটি পয়সা গ্রহন করাও দুর্নিতি, লোভ ও ভয় দেখিয়ে একটি পয়সা গ্রহন করা দুর্নিতি। এই দুর্নিতির দায় কার? রাষ্ট্র এবং ধর্মের। তারাই নাকে দড়ি লাগিয়ে এই অসহাস মানুষগুলোর মাথা বেঁচে খায়।

হুমায়ুন আজাদ বলেন – এই দেশের এক একজন ভিখারিও দুর্নিতিগ্রস্থ। দেশের সুউচ্চ লিডার থেকে একজন পিয়ন পর্যন্ত সবাই দুর্নিতিগ্রস্থ। একে তিনি Crime Pyramid বলে অভিহিত করেন। একদম উঁচু থেকে নেমে আসা দুর্নিতির প্রবাহ চুইয়ে চুইয়ে ছড়িয়ে পড়ছে, বিস্তৃত হচ্ছে সমগ্র। যেভাবে একটি পিরামিডের উপর হতে ছেড়ে দেওয়া পানির ফোয়ারা ছড়িয়ে পড়ে পিরামিডের গা বেয়ে এবং যত নিচে নামছে তা আরো বিস্তৃত হচ্ছে। তিনি বলেন – যেদিন রাষ্ট্র এবং ধর্মের নামে অবৈধভাবে একটি পয়সাও মানুষ গ্রহন করবে না, সেদিন থেমে যাবে এই অবৈধ পূঁজিবাদের চাকা এবং দেশের শতভাগ মানুষ দু’বেলা খেতে পাবে পেটভরে। নির্মুল হবে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য। এবং এভাবেই একটি রাষ্ট্রের উন্নতি সম্ভব, অন্যথায় নয়। তাই তিনি বলেন – ধার্মিক হওয়ার চেয়ে, সৎ হওয়া জরুরী। দেশের প্রত্যেকটি মানুষ সৎ হবে।

অবশেষে মহামতি লেনিন এর উক্তিটি দিয়ে শেষ করছি –
“আদিম বর্বর মানুষ প্রাকৃতিক শক্তির ভয়ে যেমন পূজা করত, আধুনিক অজ্ঞ মানুষও নিজের অসহায় অবস্থা থেকে মুক্তির কামনায় ধর্ম ও ঈশ্বরে বিশ্বাস করে”।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 5