মিথ অব মেটামরফোসিস(রূপান্তরের গল্প)

[ক]
মায়ের চোখে মুখে তীব্র করুণ একটি অভিব্যাক্তি। কেনো তা তন্বী ঠিক বুঝতে পারছে না। তবে এ ঠিক রাতে যখন আয়নার দিকে তাকিয়েছে নিজের চোখে মুখেও একই ধরণের অভিব্যাক্তি লক্ষ্য করেছে। অবশ্য এ নয় সে বুঝছে না কেনো এমন হতে পারে। সে শুধু এটা বুঝছে না যে কারণে এটা হতে পারে, তা কেনো হবে।

বলতে গেলে সে পালাচ্ছে। তার ইচ্ছেও হচ্ছে পালিয়ে যেতে। এমনকি মরে যেতেও। কিন্তু সেটা কতটা অবধারিত সে বুঝছে না। মায়ের মনে হচ্ছে এটা অবধারিত। তারও তাই মনে হচ্ছে। কেনো মনে হচ্ছে, তা ঠিক ভাবতে পারছে না। গতকাল থেকেই মা তার সাথে বলতে গেলে চিৎকার করছেন। এমন নয় খুব জোরে শব্দ হচ্ছে। কিন্তু তার দিকে তাকালেই মনে হচ্ছে এখনি তিনি চিৎকার করে উঠবেন। আর যখন তিনি কথা বলছেন, যেন তীক্ষ্ণ চিৎকার চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। তন্বী সেটা মোটেই সহ্য করতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে তার কানের পর্দা ছিড়ে যাবে। আর বারবার দম বন্ধ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে সে যেন কোন বদ্ধ গুহায় বন্দি।

কিন্তু মা যতটা সম্ভব স্বাভাবিকভাবে কথা বলার চেষ্টা করছেন। আর এমন ভাব করছেন যেন একটু শব্দ করলেই পাশের বাসার কেউ শুনে ফেলবে। এখানে কি ঘটছে তা বুঝে ফেলবে। তার প্রতিটা পদক্ষেপ তিনি সযত্নে ফেলছেন। যেন পা একটু এলোমেলো চললেই সেখানে হাজার প্রশ্ন চলে আসবে। চোখে মুখে ভয়, সন্দেহ। এমন যে পৃথিবীর সবাই তাদের সন্দেহ করছে। তারা কিছু লুকিয়ে ফেলছেন। ভয়াবহ কিছু ঘটে যাচ্ছে এখানে। প্রথমে তন্বীকে তিনি বোরকা পড়ার কথাও আজ বলেছেন। সে পড়েছিলও। কিন্তু কিছুক্ষণ পর মা কি ভেবে আবার তা খুলে ফেলতে বললেন। ভাবনা, যতটা সম্ভব স্বাভাবিক হওয়া চাই। কিন্তু তিনি যে কোনোভাবেই স্বাভাবিক আচরণ করছেন না, তার অস্থিরতায় সেটা ধরা পড়ছে না।

প্রথমে মা ভেবেছিলেন তিনি সাথে যাবেন। পরে ভাবলেন যাবেন না। তার সাথে যাওয়াটা কেউ স্বাভাবিক চোখে দেখবে না। তা কেন হবে তা বুঝা যাচ্ছে না। সেটা তিনি তন্বীকে ব্যাখ্যাও করছেন না। তাছাড়া তার সন্দেহ আরও বেড়ে গেছে। ঘর থেকে এক পা বাইরে ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। ভাবছেন, আগে মেয়েটা যাক। তন্বী শেষে ছোট ভাইয়ের সাথে রওনা দিল। যদিও একটা ভয় আছে। কিন্তু তবুও শুধু ছোট ভাই-ই সাথে গেল। মা বলে দিলেন, কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে ঢাকা যাচ্ছে। ঢাকা যে যাচ্ছে, মামাকে রাতে মা ফোন দিয়ে বলে দিয়েছেন। হঠাৎ যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন যদিও থাকে, কিন্তু মামা কোন প্রশ্ন করেনি। প্রশ্ন না করার কারণ কোন মামাই এখানে প্রশ্ন করতে পারে না। প্রশ্ন করলেও একটা অজুহাত মা বানিয়ে ফেলতেন। হয়তো অস্থিরভাবে এও বলে ফেলতেন, ভাগ্না-ভাগ্নিরা মামার বাসায় আসবে না নাকি!

কিন্তু যে পথ ধরে প্রতিদিন তন্বী যাতায়াত করতো, সেই একই পথ ধরে আজ হেঁটে যাওয়া তার জন্য কত কঠিন তা সে ছাড়া আর কেউ বুঝছে না। আর সেই কারণেই অবশ্য তার এখান থেকে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। মরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। যখন সে ছোট ভাইয়ের সাথে হাঁটছে, মায়ের মত ওর একই বোধ হতে লাগলো। ভয় ওর পুরো শরীরকে আচ্ছন্ন করে ফেললো। মনে হতে লাগলো ও পড়ে যাবে। কিন্তু ও হাঁটতে থাকলো। তবে মোটেই ধীরে নয়। একটা অস্থিরতা ওর দেহেও প্রবাহিত। হয়তো ভয় থেকেই সেটা হয়েছে। এমন ভয়, যেন হঠাৎ কেউ ওর দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে হেসে উঠবে। এমন কিছু বলে উঠবে, যা শোনার চেয়ে মরে যেতেও সে প্রস্তুত।

ও যতই এলাকা থেকে দূরে যেতে লাগলো, ততই হাঁটা ধীর গতির হতে লাগলো। একসময় এক রিকশায় উঠে বসলো। তারপর যখন তারা বাসস্ট্যান্ডে পৌছলো, বাসে উঠে চুপচাপ বসে রইলো। যদিও কেউ ওর দিকে তাকায়নি, ওর মনে হতে লাগলো সবাই তাকিয়ে আছে। একসময় যে ভয়টা ছিল সেটা কমে গেলেও তা পুরোটাই এখন ঘৃণায় পরিনত হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ কি মনে করে ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে পড়তে লাগলো। এটা যে মায়ের মতই স্বাভাবিক হবার চেষ্টা সেটা ঠিক ধরা যায়। এই চেষ্টাটা যে প্রতিনিয়ত বাড়বে সেটা তন্বী ঠিক বুঝতে পারছে।

এর পরের ভবিষ্যৎ কি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মৃত্যু ছাড়া সে কিছুই ভাবতে পারেনি। তবে মৃত্যু নিয়েও ঠিক ভাবতে পারছে না। যদিও সে ঠিক বুঝতে পারছে মরার পর আর যাই ঘটুক তাতে কিছুই আসে যায় না। কিন্তু একটা ভয় তাকে ভাবাচ্ছে। তখন হয়তো পরিবারকে একই অবস্থার স্বীকার হতে হবে, যে কারণে সে মরে যাবে, মরে যেতে চাচ্ছে। এরকম বহু বিষয় ভাবতে ভাবতে ও ঢাকা পৌছলো। এমনকি বহুবার বাস থেকে ঝাঁপ দেয়ার চিন্তা থেকেও নিজেকে রেহাই দিতে পারেনি।

[খ]
নিজের সাথে সে এমন অদ্ভুত জঘন্য ব্যবহার করছে কেন? ঢাকা আসার দুইদিন পর এই প্রশ্ন তন্বীকে আঘাত করলো। এখানে তো সবাই একদম আগের মতই আচরণ করছে! তবে সে কেন আগের মত হতে পারছে না? নিজেকে এখন নিজের দ্বারাই অত্যাচারিত মনে হচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে তা সে জানে কিন্তু সে তা বুঝছে না।

একা হতে পারলেই সে কাঁদছে। মাঝে মাঝে এমন- সবাই গল্প করছে, কোন বিষয় নিয়ে খুব হাসাহাসি হচ্ছে, সে চুপচাপ সেখান থেকে সরে পড়ে। আর কোথাও একাকিত্ব খুঁজে না পেলে বাথরুমে গিয়ে বসে থাকে। কাঁদে, নিজেকে আঘাত করে, মুখ চেপে ধরে দম বন্ধ করে বসে থাকে। আর সবার সামনে তার কান্না, অসহায়তা প্রকাশ না করতে সে রীতিমত যুদ্ধ করে যাচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যে মা কয়েকবার ফোনে কথা বলে একই কথা তুলেছে। বারবার একইভাবে সতর্ক থাকার কথা বলেছে। মা এটা কীভাবে পারছে তা সে বুঝতে পারছে না। এটা যে ওর জন্য আরও জঘন্য কিছু হচ্ছে তা তিনি বুঝছেন না। তাই অস্বাভাবিকতা থেকে বের হওয়া ওর জন্য ভয়ংকর কঠিন হচ্ছে।

তার ব্যবহার যে আগের চেয়ে একটু অদ্ভুত হয়েছে সেটা সবাই লক্ষ করছে। তবে এ নিয়ে হাসাহাসি করছে যে, এই বয়সে অনেকেই কিছুটা বদলে যায়, চুপ হয়ে যায়। ওর সমবয়সী কাজিনটা সে বিষয় নিয়ে কয়েকবার খুঁচিয়েছে। এমন সব প্রশ্ন, সে প্রেম করে কিনা, প্রেমিকের সাথে ঝগড়া হয়েছে কিনা!

এই সব প্রশ্ন ওকে আরও বিরক্ত করেছে। কারণ সে ইচ্ছে করেই ছেলেটির সাথে কথা বলছে না। তেমন বেশিদিন হয়নি ছেলেটি ওকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে। খুব বেশি ঘনিষ্ট হওয়ারও সুযোগ হয়ে উঠেনি। তবে ছেলেটিকে সেও ভালোবাসে। কিন্তু কয়েকদিন ধরে কথা হচ্ছিলো না। এর প্রধান কারণ অবশ্য ঘনিষ্ট হতে না পারা, কিছু আবদার না মেটাতে পারা। তবে সেটাও তেমন কিছু হতো না। কিন্তু এখন ওর আর মোটেই কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। বিষয়টা ভাবলেই একটা জঘন্য বোধ হচ্ছে।

আর ফোনটা নিয়ে আসলেও যে নম্বরটা ব্যবহার করতো সে তা বন্ধ রেখেছে। তাই কোন ফোন আসছে না। তবে বহুবার ভেবেছে সে একটা ম্যাসেজ দিয়ে রাখবে, ফেসবুকের কথাও ভেবেছে। কিন্তু কিছুই করতে পারেনি। আর এটা ভেবে নিজেকে আরো বেশি অত্যাচারিত মনে হচ্ছে। এমন যে, সে যা চাচ্ছে তার কিছুই করতে পারছে না। যদিও সে তা চাইলেই করতে পারে। কিন্তু চাইতে পারছে না। এমন যে তার রূপান্তর ঘটেছে। সেই তন্বী আর নেই যে এতোদিন ছিল। সে মরে গেছে। এখন যে আছে সে অন্য কেউ, অচেনা। তাকে চিনে নেবার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। এমন যে, কিভাবে চিনতে হয় তা জানে না। মানুষ অচেনা কাউকে হয়তো চিনে নিতে জানে, কিন্তু একদম অচেনা নিজেকে কীভাবে চিনে নিতে হয়? এক ভীতিকর প্রশ্ন। যার উত্তর সে খুঁজে পাচ্ছে না। আর একটা ভয় আরো অচেনা করে দিচ্ছে, তা হলো আর কোনোদিন না চিনতে পারার ভয়। অবশেষে না চিনতে পারলে কি হয় তা সে জানে।

চলবে………

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

69 + = 73